কালীকুমার চক্রবর্তী’র গল্প: আয়না

খুব-ই ছোটবেলায় , যাকে বলে শৈশবে ,ঝিমলির সামনে একটা স্বপ্নের আয়না ধরেছিল ওর মা বিনতা…তুই তো মেয়ে , ওইসব ফুটবল , ডাঙগুলি খেলা চলবে না…রান্নাবাটি খেল্ ।
   ঝিমলি আলতো স্বরে বলিছিল , ওসব খেলা কে খেলবে ? 
বিনতা বলেছিল ? তোর ভাই বাবাই…
   সেই শৈশবে ঝিমলির  স্বপ্নের আয়নার পারদে ভেসে উঠত , ঘাস পাতা করবী গোটার রান্নার ছবি । ভাত খাও , ডাল খাও , মাছ খাও , মাংস খাও , আলতো গলায় গিন্নির নকল আওয়াজ ।…কী ভালো না বাপী ?…বাপী মানে তার বাবা সাগর চৌধুরী , হাসতে হাসতে বলত , দারুণ…এবার একেবার পাকা গিন্নি…
না–আ–আ, গিন্নি হবো না আমি…আয়নায় চির ধরে যায় , ঝাপসা দেখায় ।
তেরোতে এলে ঝিমলির স্বপ্নের আয়নার রঙ হঠাৎ পাল্টে গেল , তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী সে ।তার আয়নায় মানুষজন-প্রকৃতি অন্যভাবে দেখা দেয় । বড় সুন্দর, মনোরম এ পৃথিবী । এ আয়নায় ভাসে পাশের বাড়ির নন্দন-শুভ-অনন্য-অভি’র মুখ । …তারা ঝিমলির সঙ্গে লুকোচুরি খেলে…কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাকে পাবি তাকে ছো…এই ছোঁয়াছুঁয়ি জাপটাজাপটি হাতাহাতিতে ঝিমলির শরীরে শিহরণ খেলে…উত্তেজনায় কিশোরী ঝিমলির আয়নাটা চিরচিরিয়ে ফেটে যায়…তার ঠোঁট কাঁপে , শরীর কাঁপে, ভেতরে শুরু হয় ভূ-কম্পন ।
ঝিমলির চোখে মেঘ জমে , মেঘ ভাঙে , ঝরে পড়ে…বৃষ্টি, বৃষ্টি । আবার যুবতী ঝিমলি আয়নায় মুখ রাখে । উজ্জ্বল মুখ , কমলা কোয়া ঠোঁট , পাখি-চঞ্চল চোখ , কাজলঘন আঁখিরোম …ঝিমলি স্বপ্ন দেখে । দেশ -বিদেশের শুভ -অনন্য-অভি’র …ওরা ডাকে , আয়রে ঝিমলি আয় দূর  সাগরে যাই…ওদের ডাক যেন পাহাড় থেকে , বহুদূর থেকে ভেসে আসা ডাক । ডাকতে ডাকতে শুভ যায় জার্মানে , চাকরি নিয়ে , অভি যায় আমেরিকায় , ডিগ্রি বাড়াতে ।
ঝিমলির স্বপ্নের আয়নায় আবার দাগ পড়ে ।তার বাবা মারা গেল ট্রেনে ছিনতাই দলের হাতে । মা বিনতা ওকে বলে , সত্যি করে বল্ , কোন ছেলেকে ভালোবাসিস্ ?…
 মা , মাগো , ভালোবাসা কারে কয় ? আমি যে গিন্নি হতে চাই না…সঙ্গিনী , সহমর্মিনী , সহগামিনী হতে চাই…মনে মনে বিড় বিড় করে ঝিমলি ।
 আয়না মোছে , পরিষ্কার করে , আবছা ময়লার পর্দা ওঠাতে চায়…আবার মুখ রাখে আয়নায়…আজকাল অনন্য নতুন কথা শোনায় তাকে…সব স্বপ্ন কি ফলে ঝিমলি ?
স্বপ্ন পাল্টায় , মানুষ পাল্টায় , পৃথিবী পাল্টায় , দিনকালও পাল্টে যায় ।
কিন্তু এভাবে ? ছোটবেলার স্বপ্নগুলো এভাবে পাল্টাবে ?
হ্যাঁ , পাল্টাবে । আবার স্বপ্ন তৈরী করবে , বাঁচার স্বপ্ন , বাস্তবের স্বপ্ন ।
শুভ , অভিরা আর ফিরবে না ?
না , ওদের স্বপ্ন আলাদা । টাকা-সুখ-ভোগের স্বপ্ন ।
আর তুমি ?
আমি বাস্তব স্বপ্ন দেখি…তোমাকে নিয়ে…চল পাহাড়ে যাই , মন উঁচু হবে ।
      ওরা পাহাড়ের আকাশ দ্যাখে …মেঘ দ্যাখে…মেঘে মেঘে রঙের খেলা দ্যাখে , নিজেদের মন দ্যাখে ।ভবিষ্যৎ দ্যাখে ।ঘরবাড়ি সন্তানের স্বপ্ন দ্যাখে…দেখতে দেখতে ঝিমলি ঝরনা হয়, পাথর ভাঙা নদী হয় , নদীর উজানে ভাসতে ভাসতে সমতলে আসে । সমতলের পাথরে আবার টুকরো টুকরো হয়ে যায় ঝিমলির আয়না…
 আয়নার পারদে যে অন্য ছবি— অনন্যর স্ত্রী আছে , সন্তান আছে , লুকোচুরির নেশা আছে ।
      হতাশায় বিষাদে ঝিমলি তবু আয়নায় মুখ রাখে ।
বাঁচার স্বপ্নের আয়নায়…ভাঙাচোরা আয়নায় ।আয়নার এক একটা টুকরো এক একটা স্মৃতি অভিজ্ঞতার স্খলিত মুহূর্ত । সে ছুটে যায় নন্দনের কাছে…বোহেমিয়ান চিত্রশিল্পী , ছন্নছাড়া ছবি আঁকিয়ে ।
        ঝিমলিকে দেখে হাসল নন্দন , তুলি হাতে তাকিয়ে আছে তার ছবির দিকে…বিশাল পাহাড়ের পটভূমিকায় সে একটা স্বপ্নপুরীর ছবি আঁকছে । অনেক যুবক-যুবতী পাহাড়ের গা বেয়ে স্বপ্নপুরীর দিকে ছুটছে । সেই দুর্গম স্বপ্নপুরীর সিংহদ্বার বন্ধ ।
এটা কি আঁকলে নন্দন ? যুবক-যুবতীরা বন্ধ স্বপ্নপুরীতে ঢুকবে না ?
না , স্বপ্নপুরী স্বপ্নেই থাকে যে…তুমি কী নন্দন ?
মানুষ ।
স্বপ্ন নেই ?
আছে । তবে তার সীমাবদ্ধতা আছে ।
ন-ন-দ-ন শব্দ করে ঝিমলি নন্দনের আঁকা ছবির সামনে ইজেলের তলায় লুটিয়ে পড়ে । তার আয়নাটা একেবারে ভেঙে গুড়ো গড়ো হয়ে যায়… অবচেতনে তার তা মনে হয় ।
কৃতজ্ঞতা:
অবগুণ্ঠন সাহিত্য পত্রের জানুয়ারি ২০০৩ সংখ্যায় প্রকাশিত । এখনো পর্যন্ত অগ্রন্থিত । কবি ও কথাসাহিত্যিক অমিতাভ দাসের সংগ্রহ থেকে পাওয়া।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত