কমলকুমারকে যেভাবে পড়তে পারি: একটি প্রস্তাবনা…

“সে ক্ষমতা নিজের কাছেও গোপন থাকে, সেই গোপনতা যখন একজনের কাছে সম্যকরূপে তাহার সমস্ত লক্ষণ লইয়া দেখা দেয়, এবং সেই একজন যখন আমাদের সে কথা বলেন তখনই তিনি শিল্পী বলিয়া পরিগণিত হন।” কমলকুমার মজুমদার (‘বঙ্গীয় শিল্পধারা’, প্রবন্ধ সংগ্রহ কমলকুমার মজুমদার ,জানুয়ারি ২০০৯, চর্চাপদ/১০২ পৃষ্ঠা)

বাংলাসাহিত্যে লিখনশৈলীর জন্য আর কোনো লেখকই কমলকুমারের মতো বিতর্কিত নন। কেউ কেউ অবশ্যই রচনার বিষয়বস্তুর জন্য বিতর্কিত হয়েছেন, তা সে বুদ্ধদেব বসু কি সমরেশ বসু, ‘রাত ভরে বৃষ্টি’ বা ‘বিবর’র জন্য। কারো কারো বিতর্ক ব্যক্তিগত জীবনাচরণের জন্য। এদিক থেকেও সমরেশ বসু এগিয়ে। আর যারা যারা, তারা লেখার জন্য জীবনকে ভেঙেছেন, প্রতিনিয়ত বিপন্ন হয়েছেন, যেমন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাও খুব বেশি লিখনশৈলীটি ভাঙাতে উদ্যোগী হননি। কদিন আগে কিন্নর রায়ের একটি লেখা ‘নিঃসঙ্গতা আর অপমান আমায় ঘাড় ধরে লিখেয়ে নেয়’(মল্লার, ত্রয়োদশ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ১৪১৭-১৪১)-তে দেখি তিনি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে ‘পঞ্চাশের শ্রেষ্ঠ লেখক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পঞ্চাশের প্রজন্মের মধ্যে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, দেবেশ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, মতি নন্দী, অমলেন্দু চক্রবর্তী, লোকনাথ ভট্টাচার্যসহ এমন সব লেখক আছেন, যেখানে কারোর সঙ্গে কারোর প্রায় তুলনা চলে না। প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র এবং সৃজনে কি উদ্ভাবনে অনন্য। আছেন সুনীল, শীর্ষেন্দুর মতো লেখকরাও। কিন্নরের কথাটা তাই বেশ একটা ধাক্কা লাগে। কিন্তু খুব খেয়াল করে দেখলে শ্যামল সত্যিই সবদিক থেকে এগিয়ে থাকেন। এর প্রধান কারণ নিজস্ব গদ্যভঙ্গি যা একদিকে কাব্যিক অন্যদিকে সুবোধ্য, গতিময়, এর সঙ্গে তার লেখায় থাকে চেনা বিষয়ের অভাবনীয় উন্মোচন। মুর্শিদ এ.এম.-এর কথায়, ‘‘শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায় পরিষ্কার দুটি তল। উপরিসৌধের ঔজ্জ্বল্য ও পাঠক-প্রিয় গদ্য এবং অতলের এক অবিনাশী মানব সম্পর্কের অকৃত্রিম দর্শন।’’ পঞ্চাশের অন্য সব লেখকের লেখায় এই দুয়ের এমন মিল ঘটেছিল। দেখা গেল বিষয় গভীর, গদ্য জটিল; কারো জটিল গদ্য, বিষয় অগভীর, কারো সপ্রতিভ গদ্য আছে, কিন্তু বিষয়ে বিস্তৃৃতি নেই, সূক্ষ্মতা আছে জটিল উন্মোচন নেই। গৌরকিশোর ঘোষ একথায় বলেন,‘‘শ্যামল গঙ্গেপাধ্যায় অসাধারণ অতুলনীয়।’’

কমলকুমারকে নিয়ে লিখতে গিয়ে শ্যামলকে টানার কারণ তিনি ঠিক এর আগের প্রজন্মের লেখক। চল্লিশের লেখক কি তাঁকে বলা যায়? কারণ তাঁর ছোটগল্প ‘লালজুতো’ প্রকাশিত হয়েছিল ভাদ্র ১৩৪৪ সালে, কিন্তু বই হিসেবে প্রথম প্রকাশ ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র প্রকাশ আশ্বিন ১৩৬৬, প্রথম সংস্করণ ১৩৬৯, সেদিক থেকে ষাটের প্রথম দিকে। তাঁরই সঙ্গে আছেন অমিয়ভূষণ মজুমদার। কমলকুমারের জন্ম ১৯১৪, অমিয়ভূষণের ১৯১৮। দুজনেই একটু বেশি বয়সে সাহিত্যের জগতে পা রাখেন। মন ও হাত আগে থেকেই প্রস্তুতি তো ছিল, এজন্যই পা রাখার কথা বলছি। পা মানে প্রকাশনার জগৎ, তাঁদের বইপত্র পাঠকের হাতে পৌঁছানো। অমিয়ভূষণের প্রথম বই নীলভুঁইয়া ( পরে যেটির নাম হয় নয়নতারা) পৌষ ১৩৬১ , জানুয়ারি ১৯৫৫। ততদিনে সমরেশ বসু প্রতিষ্ঠিত লেখক। সমকালে আছেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, ননী ভৌমিক, রমেশচন্দ্র সেন; আগে পরে, এদিক ওদিক মিলিয়ে নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সুবোধ ঘোষ, সন্তোষকুমার ঘোষ, রমাপদ চৌধুরীরা। এই রকম বিচিত্র লেখকের দলে-পাঁপড়িতে মিলিয়ে চল্লিশের লেখকরা। ত্রিশের তো ওই বিভূতি-তারাশঙ্কর-মানিক এই তিন বাড়ুজ্জে। এঁদের একটু পরে দল ছাড়া সতীনাথ ভাদুড়ী। ফলে ত্রিশ ও পঞ্চাশের লেখকদের মধ্যে থেকে সেরা-শ্রেষ্ঠ বের করার ব্যাপারে কারো কারো মত থাকলেও চল্লিশের সাহিত্যিকদের নিয়ে বেশ গোলকধাঁধায় পড়তে হয়। আর এই গোলকধাঁধার শীর্ষে থাকেন কমলকুমার মজুমদার। আদতে এইসব সেরা/শ্রেষ্ঠ বলা তো একেবারেই ব্যক্তিগত ব্যাপার। তা কিন্নর রায় বলুন কি গৌরকিশোর ঘোষই বলুন।

চল্লিশের দশক বাংলাসাহিত্যের চরম ভাঙচুরের সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িকতা, দেশভাগে ছিন্নভিন্ন দশক। সেই ছিন্নভিন্ন জীবন ও সময়ের ভেতরে থেকে আসেন কমলকুমার মজুমদার। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘পাঠক না প্রেরণা, কাকে মনে রেখে লেখেন?’ উত্তরে বলেছিলেন,‘নিজে ভাবতে চেষ্টা করেছি এটা। এটা হলে অত্যন্ত বিলাসিতার একটা উত্তর দিতে হয়। কিন্তু ব্যাপারটা কি জানেন এটা লেখা উচিত এ রকম একটা বোধ থাকে।’ তাহলে লেখাটা কমলকুমারের কাছে ঔচিত্যবোধ নামের মাঠের ফসল। সেখানে তিনি চাষবাস করতে গিয়ে কী কী ঘটিয়েছেন? উপন্যাসের ক্ষেত্রে তো বটেই তাঁর সাহিত্যের মূল দিক বাস্তববাদের এক নিদারুণ সংকট থেকে জাত।

আমরা দেখি ইউরোপে বাস্তববাদ মোকাবেলা করতেই হাজির হচ্ছে সিম্বলিজম (প্রতীকবাদ), এক্সপ্রেশনিজম (অভিব্যক্তিবাদ), ফিউচারিজম, কনস্ট্রাকটিভিজম (নির্মিতিবাদ), ডাডাইজম (দাদাবাদ), স্যুররিয়ালিজম (পরবাস্তববাদ), ফর্মালিজম (গঠনবাদ), এক্সজিসটেনশিয়ালিজম ( অস্তিত্ববাদ), অ্যাবসার্ডিজম (কিমিতিবাদ) প্রভৃতি। স্যামুয়েল বেকেটে উপন্যাস মরফি প্রকাশিত হচ্ছে ১৯৩৮ সালে, মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে আগে। বেকেট তো বাস্তবতার কেন, সব রকমের প্রথা ভেঙেচুরে আর অবশিষ্ট রাখেননি। বেকেটের পর তাক লাগানোর চেষ্টা হয় নব উপন্যাসের নানান তত্ত্বের মাধ্যমে। মূলত ফরাসি সাহিত্যই ছিল এর কেন্দ্র। আমরা জেনেছি যে, কমলকুমার ফরাসি সাহিত্যের এই কেন্দ্রটি থেকে নিজে নন্দনতাত্ত্বিক জায়গাটিকে ঝালিয়ে নিয়েছিলেন। নাতালি সরোৎ, আলা রবগ্রিয়ে, মিশেল বুতোর, মার্গারিত দ্যুরসের মতো লেখকরা ছিলেন এই ধারায়, ছিলেন নোবেল প্রাইজ পাওয়া ক্লদ সিমো। এদের প্রায় সবাই প্রচলিত ক্ল্যাসিকাল উপন্যাসের প্লট, বাস্তবতাবাদ, মনোবিশ্লেষণ, ভাষাপ্রয়োগ সব অস্বীকার করেছিলেন। বিশেষ করে পট ও চরিত্র নির্মাণকে আমূল বদলে দিয়ে, ভাষাকে দুর্বোধ্য করে সময়ের ক্রমধারা তাদের গল্প-উপন্যাসে নস্যাৎ হয়ে গেছে।

বাংলাসাহিত্যের একই গতের বাস্তববাদী সাহিত্যের বর্ণনা ও ভাষাভঙ্গির বিপরীতে দাঁড়ালেন কমলকুমার। পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, রামকৃষ্ণ অনুরাগী কমলকুমার বাঙালি কৃষিবিশ্বের জীবনবীক্ষায় অভিসিক্ত, কিন্তু ভাষাভঙ্গিতে হয়ে উঠলেন অসম্ভব রকমের সংযোগবিহীন, ব্যক্তিগত, ইঙ্গিতময়, আধুনিক কবিতার কাছাকাছি। তিনি যদি চাষীর বাগভঙ্গিতেই এদেশের জীবনকে বহন করতে চান তাহলে তার ভাষার এই ধারা হলো কেন? তার কারণ ওই প্রচলিত বাস্তববাদ। ফলে এক মারাত্মক আত্মঘাতী স্ববিরোধিতার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে তাঁর রচনাবলি। পার্থপ্রতিমের মতে,‘‘আসলে কমলকুমার যে মূল্যবোধ ও বীক্ষা ফিরিয়ে আনতে চান বাস্তবে তা কোথাও নেই। এই অস্তিত্ববিহীন বীক্ষাটি তাঁর নিজের মধ্যবিত্ত শ্রেণী কোন সময়েই সঠিকভাবে নেয়নি। রামকৃষ্ণের লৌকিক প্রায় চাষীসুলভ বীক্ষা অচিরেই ইংরেজী শিক্ষিত বিবেকানন্দের অদ্বৈতবাদে হারিয়ে যায়।’’ পার্থপ্রতিম এখান থেকে কমলকুমারের সূত্রটি ধরিয়ে দেন। ধরিয়ে দেন তাঁর রচনার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সূত্রটি। সেই সূত্রটি হলো, বাস্তবে নেই এমন এক জগতকে উপন্যাসে তিনি আনতে চাইলেন যার শৈলী হবে সম্পূর্ণ নতুন। ফলে তিনি রচনার অভিমুখ অন্যদিকে নিয়ে গেলেন। প্রথমেই চিহ্নিত করলেন যে, উপন্যাসে বাস্তববাদের মূল একক হলো ‘বাক্য’। ‘বাক্যের অন্বয়কে’ সম্পূর্ণ না ভাঙলে যেমন এই সংকট থেকে বেরুনো যাবে না, তেমনি তিনি লুপ্ত হয়ে যাওয়া, কিংবা নিতান্ত বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিতভাবে উপস্থিতি বীক্ষাটিকেও পাঠকের কাছে ‘বাস্তবসম্মত’ করা যাবে না। তা-ই বাস্তববাদকে ধ্বংস করেই তাঁর বীক্ষাটিকে উপন্যাসের শিল্পকর্মে আনতে হবে। ঠিক এখান থেকে তিনি তাঁর গদ্যভঙ্গি ও রচনাশৈলী বদলাতে শুরু করেন।

আসলে তিনি রিয়ালিজম বা বাস্তববাদের যে চরম প্রকাশ ন্যাচারালিজম বা প্রকৃতিবাদ সেখান থেকে এমন এক পথে যেতে চাইলেন যা বাংলাসাহিত্যে সত্যিই অভিনব। তিনি তাঁর ‘পরিপ্রেক্ষিত’ নিবন্ধে বলেছেন,‘‘আমরা জানি গ্রাহ্য বস্তুর সহিত সঙ্গীতের বস্তুর (object musical) বিভিন্নতা বর্তমান, এবং ইহাও আমাদের ধারণা গল্পের বস্তুত্বের নিজস্ব কাঠামো আছে এবং তাহাকে, গল্পত্বকে আমাদের খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে।’’

তিনি গল্পের বস্তুত্বকে বহুত্বে মিশিয়ে নানা তলে ভেঙে দিতে চাইলেন যা কিউবিস্ট শিল্পপ্রয়াসের একটি বিশেষ দিক বলেই বোধ হয়। কিন্তু কিউবিস্ট শিল্পীদের মূল লক্ষ্যও অতিপরিচিত রূপকে ভেঙে তার ভেতরের বাস্তবকে দেখা ও দেখানো (হালের যাদুবাস্তবতা অব্দি বাস্তবকে ধরাই সমস্ত মত ও পথের আসল লক্ষ্য হয়ে আছে)। এতে বস্তুর মাত্রাগুলিকে বিভিন্ন তলে ভেঙে দেওয়া হয়। কিন্তু ছিন্নভিন্ন হওয়ার পরও তার অংশগুলোর ভেতরে থাকে একটা তীব্র-তীক্ষ টান। ফলে সেগুলো স্থির হয়েও নিত্য সেগুলি স্পন্দিত হয়। কমলকুমার ‘টানে’র এই বিশেষ দিককে বলছেন ‘টেনশন’, যা থেকে  তৈরি হয় কমলকুমারীয় গদ্যের অনন্য জ্যামিতিক বিন্যাস।

কলমকুমার বলেনও যে, ‘‘আমি নিজে জ্যামিতির অনুগ্রাহী… আমি ঠিক এনালিটিক কিউবিজমের পক্ষপাতী; এখানে টেনশনে রেখা সকল যতক্ষণ না সৃষ্টি ( অনেকটা timber-এর মত অথচ এইগুলিকে অনেকে রসধমব বলেন) এতক্ষণ গল্প হয় নাই বলিয়া আমার ধারণা, আমি আদতে ইয়েরোগ্লিফিক লেখক নই। লেখার প্রেরণা যখন (সৃষ্টিক্ষমতা বাক্য বড় উচ্চমার্গের) এই ঘটনাপ্রবাহের নিকট যাওয়া আসা করে তখনই গল্পের বস্তুত্বের অনুভব হয়। ইহা স্মর্তব্য যে টেনশন ব্যতীত বস্তুত্বের স্থাবরতা সম্ভব নয়। অবশ্য এই এনালিটিক ব্যাপারে সহিত স্তাঁদালীয় বিশেষণের যথেষ্ট পার্থক্য আছে।’’

আর তা তো থাকবেই। তিনি নবউপন্যাস-পন্থীদের মতো পূর্বেকার প্লট-নির্মাণ, চরিত্র সৃজন, ভাষার সুবোধ্যতা, মনোবিশেষণের প্রচলিত গতিপ্রকৃতি থেকে সরে আসতে চাইছিলেন। যেমন আর শুরু দিকার গল্পের গদ্যশৈলীর নমুনায় আমরা টেনশনটা খেয়াল করতে পারি

‘‘আমোদ ধীরে ধীরে তার গায়ে হাত দিয়েছে। বয়স হয়েছে তার, গা-টা শিউরে উঠছে। অধৈর্য হয়ে দুভাগ হয়ে যায় কিন্তু আবার মনে মনে বলেছে সে শুধু জ্বালাবার জন্যে নয়। তার কারণ তাতে, গোরা অদ্ভুত মানসিক অবস্থায় এলোমেলো খর-গা-টা ছোঁয়া যাবে। আর এও সে দেখেছে, যে যখন তার গা ছোঁয় তার হাতের ছোট ছোট রোমগুলি কাঁটার মত হয়ে উঠে। আমোদ হাত বুলায় আবার বুলায় আর মাথা নাড়িয়ে বললে বলব না। তার এলো খোঁপা খুলে একপাশে ঝড়ে পড়ে। মুখে জল আসে।’’ (‘আমোদ বোষ্টুমী’)

অন্তর্জলী যাত্রা’য় এর প্রকাশ আরো প্রকট। একটি দৃষ্টান্ত

‘‘আর যে এইক্ষণেই তিনি মানসচক্ষে অবলোকন করেন, কাহারা যেমত বা এক মধুর গীত গাহিতে গাহিতে আসিতেছে, ইহাদের স্বেদ নাই, ইহারা ক্লান্ত নহে, যে গীতের মধ্যে আশা, যে আশার মধ্যে গোলাপের গন্ধ, যে গোলাপ গন্ধের মধ্যে বাল্যকাল, যে বাল্যকালের মধ্যে নিরীহতা, কাহার অন্তরীক্ষ আলেখ্য বহনে গর্বিত।’’

এখানে দেখা যাচ্ছে যে গান গাওয়া হচ্ছে  সেই দৃশ্যটি বর্ণনা না করে, তিনি দৃশ্যটিকে বিভিন্ন  তলে ভাগ করে দিয়ে এর ভেতরের বাস্তবতাটি তুলে আনছেন। এতে ব্যবহৃত শব্দগুলি, যেমন ‘আশা’, ‘ গোলাপ’,‘ গোলাপের গন্ধ’, ‘বাল্যকাল’, ‘বাল্যকালের মধ্যে নিরীহতা’ এই যে একদিকে শব্দের প্রবাহ অন্য দিকে চিত্র ও চিন্তার মেলবন্ধন এই বিষয়টি যারা ধরতে পারেন, তাদের কাছে কমলকুমারের লেখা কতখানি উপাদেয়, যা রীতিমতো একটি ভোজে পরিণত হয়, বোধ্যতা দুর্বোধ্যতার সব সীমা ঘুচে গিয়ে, কবিতা যেমন বোঝার আগেই ভালো লাগে, কমলকুমারের লেখাও তা-ই। তিনি তাঁর গল্প বলাতে ওই এনালিটিক কিউবিজমের টেনশনটি তৈরি করতে চান।

সুনীল যে বলেছিলেন, তাঁর উপন্যাসগুলো ‘আধুনিক চম্পূ’, মানে গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণে লেখা কাব্যবিশেষ, সেটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র বৈকি। ফলে তাঁর লেখায় শব্দ এর আভিধানিক অর্থ থেকে বেরিয়ে আসে, ঘটে শব্দের অভ্যুত্থান, আর শব্দের এই অভ্যুত্থানেই তৈরি হয় শিল্প। যেকোনো প্রকৃত শিল্পের মতো তাঁর লেখা সেই স্তর স্পর্শ করে।

হিরন্ময় গঙ্গোপাধ্যায়ের কথানুয়ায়ী ‘অন্তর্জলী যাত্রা’য় কিউবিজমের প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা গেলেও পরবর্তী উপন্যাস-গল্পে কিউবিজমের লক্ষণ থাকলেও তা যেন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।’

তা-ই কি? ফিকে হয়ে গেছে হয়তো শব্দ ও চিত্র ও চিন্তায় এই তিনের জটিল বিন্যাসের যোগফলে। তাঁর শেষ দিককার লেখা ‘কশ্চিত জীবন চরিত: তিনটি খসড়া’তে দেখি

‘‘দুধ ও দুধের যে ধবলত্ব তাহার মধ্যে আমরা ভেদ রেখা টানিয়াছি, ফলেই উহা আলাদা বর্ত্তিল, তথৈব জল আর জলের তরঙ্গ, সাপ আর সাপের তীর্যক গতি, যে বুদ্ধি কর্ত্তৃক ঐ পার্থক্য যুক্তির বুঝাইল; সেইটির ব্যাপারে, আমাদের ইদানীংকার সরলতার বিস্ময়ের থৈ ছিল না….’’ এই হলো কমলকুমারের গদ্যের শেষ দিককার দৃষ্টান্ত। তিনি ভাষাকে আক্রমণ করে বাঁচিয়েছিলেন এটা আসলে ভাষায় ব্যবহৃত বাক্যপ্রকরণের প্রতি আক্রমণ। আদতে তো বাক্যই ভাষা। এর সমর্থনও আছে। যেমন, নোয়াম চমস্কিও ভাষার ‘বাক্য’কেই ভাষার আসল জিনিস বলতে চান। আর বাক্যের মূল দিক হলো বক্তব্য। ফলে যে বাক্যের বক্তব্য নাই, সেটি ভাষাও নয়। কমলকুমার সেই বাক্য তো ভাঙেনই, তার ভেতরের শব্দগুলিকেও অনেকান্তিক অর্থ ও অর্থান্তরের দিকে নিয়ে যান, ফলে কমলকুমারের লেখা এক দুবার পাঠেই এর মর্মমূলে যাওয়া সম্ভব এটা তার সব লেখার ক্ষেত্রে ঠিক নয়। কমলকুমার পাঠ দুইবা ততোধিক তো বটেই তারও অধিক পাঠে তবে আয়ত্ত করা যেতে পারে, আবার তারপরও অনায়ত্ত থেকে যেতে পারে অনেক কিছু। সম্ভবত জয়েস বলেছিলেন, ‘এক জীবনে আমি যা লিখে যাবো, অন্যের সারা জীবন লাগবে তা পড়তে’ অর্থাৎ কোনো পাঠকের সারা জীবন লাগবে সেটার প্রকৃত মর্ম উদ্ধার করতে। কমলকুমারের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ব্যাপার।

কেউ কেউ বলেন যে, তিনি দুর্বোধ্য হলেও দুষ্পাঠ্য নন, (কারণ তার লেখায় আশ্চর্য এক গতি রয়েছে, সংগীতের মতো ভেসে যায়, বোঝা না-বোঝার সীমা পার হয়ে) আমরা বলতে চাই তিনি দুষ্পাঠ্য হলেও দুর্বোধ্য নন। কারণ তার লেখা পড়াটাই কঠিন, কিন্তু পড়তে পারাটা আয়ত্ত করে নিতে পারলে তাঁর লেখার অনন্য রূপরহস্য কতই না হৃদয়গ্রাহী। তাঁকে পড়ার সূত্রগুলি বের করতে (আমরা এখানে দুয়েকটা দেওয়া চেষ্টা করেছি মাত্র, পাঠক চাইলে তার নিজের উদ্যোগে তার লেখার আরো আরো প্রবেশপথ তৈরি করে নিতে পারেন) পারলে কমলকুমার পাঠ হয়ে ওঠে রোমাঞ্চকর, অশেষ এক অভিযান।

 

 

 

 

 

.

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত