কর্ণ তোমাকে

 

কর্ণ তোমাকে, 

আজ আমরা মহাপ্রস্থানের পথে পা বাড়িয়েছি। হিমালয়ের কত নাম না জানা হিমবাহখরস্রোতা নদী এবং পঞ্চকেদার পেরিয়ে পাড়ি দিলাম পারিজাতের দেশেপাখিদের স্বর্গরাজ্যে। তুমি হয়ত পুনর্জন্ম নিয়ে আবার আসবে এ পথেতাই পাহাড়ের গায়ে লিখে রেখে গেলাম এই স্বগতোক্তি। আমার ইহকাল পরকাল সবই কালের স্রোতে ভেসে চলে গেছে জম্বুদ্বীপের জ্বালাময়ী আগুনে। আমার অভিশপ্ত জীবনের শেষ ইচ্ছের তাগিদে এই চিঠি তোমাকে লেখা। শেষ হতে হতে তবুও এখনও শেষ হলাম না। এইবার বোধ হয় আমার মোক্ষলাভ হবেতাই সেই মুক্তিপ্রদেশে পৌঁছনোর অপেক্ষায় রয়েছি। স্বর্গরাজ্যের আঙিনায় এ চিঠি লিখে রেখে গেলাম পাহাড়ের গায়েপ্রযত্নে হিমালয়এই ঠিকানায়।

কোনোও এক সময়জোনাকগুচ্ছ আলো দেখিয়ে আর আমার গন্ধবাতাস পথ চিনিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবে এই ঠিকানায়। এই পাথরে খোদাই করে রেখে গেলাম আখরগুলি, আমার চিহ্ননামশুধু তোমার জন্য।

এই চিঠিতে আমি প্রায়শ্চিত্ত করে যাবোস্বয়ংবরা হয়ে যে অপমান একদিন তোমায় করেছিলাম,সেই না বলা কাহিনী। সারা জম্বুদ্বীপের মানুষেরাও জেনে যাবে সেই সব না বলা কথা।

পাঞ্চালদেশে আমার জন্ম কিনা জানিনা তবে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদতাঁর কন্যার পরিচয়ে। যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতা বানিয়ে ইন্দ্রজালের মোহেধোঁয়ার আড়ালে যজ্ঞের আগুণের মধ্যে থেকে আমাকে বেরিয়ে আসতে বলা হয়েছিল। জনসাধারণ জানত না এত সব ভেলকি।

আমার নাম হল যাজ্ঞসেনীআমি হলাম দ্রুপদরাজের অগ্নিকন্যা কৃষ্ণরূপা দ্রৌপদীসমগ্র জম্বুদ্বীপের কৃষ্ণা। যজ্ঞের অলৌকিক শক্তির মাহাত্ম্যে আমার গোধূমবর্ণ পুড়ে এই হাল হল, জানল সকলেদেখল সকলে। আর পুড়েছিল আমার অদৃষ্ট।

তুমি জানতে কর্নযে রাজা দ্রুপদ আমাকে দত্তক নিয়েছিলেনএ ছিল রাজামশায়ের রাজনৈতিক চাল। ধনুর্ধর দ্রোণ আর পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কোঁদল অনেক কালের। একসময়ে তারা ছিলেন হরিহর আত্মা। কিন্তু দ্রুপদ প্রতিপত্তি হয়ে ওঠার পর অভাবের তাড়নায় আশ্রয়প্রার্থী বাল্যবন্ধু দ্রোণকে সপরিবারে আশ্রয় দেননি সেই কারণে অপমানিত দ্রোণ আশ্রয় নিয়েছিলেন হস্তিনাপুরেধৃতরাষ্ট্রের রাজপ্রাসাদে। বুকে ছিল তাঁর একরাশ ক্ষতচোখে ছিল প্রতিশোধের আগুন। কৌরবদের অস্ত্র শিক্ষা গুরু দ্রোণ আক্রমণ করলেন পাঞ্চালবন্দী করলেন দ্রুপদকে। দ্রুপদ ও সেই রাগে দ্রোণকে বধ করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। কুরুপাঞ্চাল বিবাদ আজও মেটেনি কর্ণএখনও ধিকি ধিকি জ্বলছে, জম্বুদ্বীপের অভ্যন্তরেও সেই আগুনের ফুলকি এসে লেগেছে। মহারাজ দ্রুপদ শুধুই দ্রোণের ওপরে প্রতিশোধ নিলেন নাদ্রোণকে উপলক্ষ করে সমগ্র কুরুবংশের ওপরে প্রতিশোধ নিলেন। ক্ষুদ্র লক্ষ্য দ্রোণাচার্যবিশেষ লক্ষ্য হস্তিনাপুর।

আমার স্বয়ংবর সভা কেন হল জানো? দ্রোণাচার্য যখন পাঞ্চাল আক্রমণ করলেন তখন দুর্যোধন আর তার ভাইদেরআর এমন কি তোমাকেও প্রতিহত করেছিলেন মহারাজ দ্রুপদ। কিন্তু আক্রমণ করতে গিয়ে যে তরুণ বীর যোদ্ধার হাতে দ্রুপদ বন্দী হয়েছিলেন সেই তরুণটি দ্রুপদকে রাজোচিত মর্যাদার সঙ্গে সসম্মানে নিয়ে গেছিলেন দ্রোণের সামনে। দ্রুপদ মুগ্ধ হয়েছিলেন সম্বর্ধনায়। স্বপ্নের আবেশে আবিষ্ট হয়ে সেই তরুণটিকেই মনে মনে চেয়েছিলেন যে কিনা তাকে সাহায্য করতে পারবে যদি কুরুপাঞ্চাল যুদ্ধ হয়। এই তরুণটিই ছিল অর্জুন যার জন্য আয়োজন হল স্বয়ংবর সভার। কৌরবরা কখনো পান্ডবদের পক্ষে যুদ্ধ করবে না আর কৌরবরাই দ্রুপদের শত্রু অতএব এই তরুণ পান্ডব অর্জুনকেই চাইলেন দ্রুপদ।

এদিকে যখন সারাদেশের মানুষ জানল যে, বারণাবর্তে অবস্থানকালেদুর্যোধনের চক্রান্তে, একই গৃহের মধ্যে আগুণে পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে পঞ্চপান্ডব সহ কুন্তীদ্রুপদ সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন এক মহান রাজনৈতিক চাল চেলে। যার প্রথম পদক্ষেপই ছিল স্বয়ংবর সভা। আসলে দ্রুপদের নিকট খবর ছিল যে পান্ডবরা বারণাবর্তে পুড়ে মরেননি তাই শূন্য থেকে ঝোলানো মাছের চোখে লক্ষ্যভেদের মত কঠিন পরীক্ষার আয়োজন করলেন যা উত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা একমাত্র অর্জুনেরই আছে। আর আমিই হলাম সেই তুরুপের তাস যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে অর্জুনের গলায় মাল্যদান করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এও আমাকে শেখানো হয়েছিল। স্বয়ংবর সভায় চার প্রোথিতযশা বীরকর্ণদ্রোণপুত্র অশ্বথামাযাদব কৃষ্ণ আর অর্জুন থাকবে । প্রতিশোধী পিতা দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা তার মাতুল কৃপাচার্যের মত চির কৌমার্যব্রত পালন করছেন অতএব তিনি প্রতিযোগী নন। কৃষ্ণ নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন প্রতিযোগী হিসেবে নয় অতিথিরূপে। অতএব কর্ণ তুমি আর অর্জুন ছিলে সেদিনের দুই প্রধান প্রতিযোগী। দ্রুপদ পাখিপড়া করে আমাকে শিখিয়ে ছিলেন অর্জুনকেই মাল্যদান করতে হবে। আমার চোখের সামনে দুই পুরুষ। দুজনেই বীরদুজনেই যোদ্ধাদুজনেই সুন্দর পুরুষ। তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা একটা ঝোড়োবাতাস আমাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। তোমাকে দেখেই আমার মনে হয়েছিল এই পুরুষই আমার প্রথম প্রেমতোমার ডান মণিবন্ধে তখন শানিত তরবারিকর্ণের দোদুল্যমান কুন্ডল আর সুঠাম বক্ষবেষ্টন করা নিশ্ছিদ্র বর্ম আর বামহস্তে পাণিগ্রহণের অঙ্গীকারবিহ্বলাচঞ্চলা নবযৌবনা কৃষ্ণা তখন ষোড়শী শ্রীময়ী । যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতার চোখে তখন একরাশ কামনা, আমি চেয়েছিলাম শুধু তোমার কৃষ্ণা হতে। আমি লক্ষী মেয়ের মত তোমাকে সূতপুত্র বলে অভিহিত করলামগান্ডীব ধরতে নিরস্ত করলাম, সেও দ্রুপদের আদেশে। বিশ্বাস করোঅর্জুন কে চিনতাম নাভলোওবাসিনি। যুগ যুগ ধরে জম্বুদ্বীপের ইতিহাস আমার মত কালো মেয়েকে এই ভাবেই কাজে লাগিয়ে আসছেঅবলা করে রেখে দিয়েছে। অর্জুনের অপলক দৃষ্টি ছিল মীনের অক্ষিগোলক আর আমার ছিলে তুমি। আমি ক্ষণেকের জন্যে তোমার বলিষ্ঠতাপৌরুষে আকৃষ্ট হয়েও নিজেকে সংযত করেছিলাম অনেক কষ্টে। স্বামী সোহাগিনীআদর্শ বধূ হতে চাইনিইতিহাস রচনা করতে চেয়েছিলামদেশ গড়তে চেয়েছিলামইতিহাসের পাতায় পঞ্চকন্যার সঙ্গে স্মরনীয়া ও বরনীয়া হতে চেয়েছিলাম। তার জন্য যা করতে হয় সেই উচ্চাশার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার আশায় সেই স্বপ্নকে সার্থক রূপ দেবার আশায় ছিলাম। যদিও সাধারন পাতিব্রত্য আর ঘর-গেরস্থালিও আমার মাথায় ছিল। তাই তোমাকে দূরে সরিয়ে দিলাম নিমেষেই। স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলামস্বপ্ন নিয়েই চলে এসেছি এই মহাপ্রস্থানের দুর্গম পথে। স্বপ্ন পূরণ হলনা। শুধু রূপেই তোমাদের ভোলাব না এ ছিল আমার অমোঘ মন্ত্র। নিছক যৌবনই আমার সম্বল নয়। তিল তিল করে নারীত্বের সবটুকু দিয়ে সর্বগুণান্বিতাতিলোত্তমা করে পাঠিয়েছিলেন বিধাতা আমাকে। রূপে লক্ষীগুণে সরস্বতী! রন্ধনে পটিয়সীচলনে বলনেচিন্তা শক্তির দূরদশিতায় আমি হয়ে উঠেছিলাম যুগশ্রেষ্ঠা। তোমাদের সেই কালো মেয়ে দ্রৌপদী যার নাম, নারী থেকে পূর্ণ মানবী হতে চেয়েছিল যেতাই সেদিন স্বয়ংবরা হয়ে দ্রুপদের কথায় বাধ্য মেয়ের মত মালা পরিয়েছিলাম অর্জুনকে আর প্রত্যাখান করেছিলাম তোমায়অঙ্গরাজ তোমাকে।

স্বয়ংবরসভা রচনা করল ইতিহাস আর সকলের অলক্ষ্যে ঘটে গেল কত কিছু। সেদিনটার কথা মনে পড়ে যায়…।

পাঞ্চালনগরীর আকাশে বর্নালীর ছটাফুলেল বাতাস সংপৃক্ত কেওড়াকস্তুরীআতরের গন্ধেএক নারীকে জয়ের জন্য কত পুরুষের আগমন। আমি তোমাদের সেই কালো মেয়ে পুতুলের মত মালা হাতে জীবনের সর্ব প্রথম রাজনীতির অচেনাঅদেখা সুপরিকল্পিত এক মঞ্চে হাজিরআমার মত কালো মেয়ের এত দামআমাকে লাভ করার জন্য এত বড় বড় বীরেরারাজপুত্রেরা পরীক্ষা দেবেনআমার অদম্য ইচ্ছা ছিল নারীত্বের পূর্ণতা পেতে সেটা বধূ বা মাতারূপে নয় সমগ্র জম্বুদ্বীপের ইতিহাসে মানবী রূপে প্রতিষ্ঠা পেতে। আদর্শ দেশ গড়ার ব্রতে ব্রতী হতে চেয়েছিলাম। সেই কারণেই রাজী হয়ে গেছিলাম স্বয়ংবর সভার প্রস্তাবে। আমার জীবন বাঁক নিল অন্যধারায়জীবনধারা বইতে শুরু করল অন্যখাতেজীবনদর্শন বদলে গেল নিমেষে।

তোমাকে জাতপাঁত তুলে সূতপুত্র” বলতে চাইনি আমি। বিশ্বাস করো। তুমিও পরিস্থিতি সামলে নিয়েছিলে যদিও তা তোমার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। তোমার বক্র হাসিতে সেদিন ঝরতে দেখেছিলাম প্রচ্ছন্ন ক্রোধাগ্নিঅপমানের নীরব অশ্রু। সর্ব সমক্ষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছিল তোমার বীরত্বের অহঙ্কার। সেই মূহুর্তে আমার মনে হয়েছিল পৃথীবিতে তোমাকেই আমি সবচেয়ে ভালোবাসিসবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, আরো আরো ভালবাসি। কিন্তু রাজনীতির মারপ্যাঁচে তোমার সঙ্গসুখ থেকে চিরকালের মত বঞ্চিত হলাম। আর সেই সঙ্গে জননী কুন্তীর আদেশে আমার পাঁচস্বামীর ব্যবস্থাটিও পাকাপাকি হয়ে দাঁড়াল। কৃষ্ণা হোল ভাগের স্ত্রীরত্ন। উৎকৃষ্ট ভোগ্যবস্তুলোভনীয় বিলাসিতার দ্রব্য যেমন মিলেমিশে ভাগ করতে হয় তেমন এক ভোগ্যপণ্যে পর্যবাসিত হল দ্রৌপদীর মেয়েবেলা। দ্রুপদ ব্যবহার করলেন আমায়, অর্জুনকে পাওয়া তো হয়েই গেছে এখন আরো চারজন কে বিনামূল্যে জামাই রূপে পাওয়া…।

সে তো তাঁরই দলের শক্তিবৃদ্ধি ঘটাবে আর স্বার্থসিদ্ধির ব্যাঘাত ঘটাবে না অতএব মোটেই উদ্বেগ প্রকাশ করলেন না আমার এমন বহুস্বামিনী হওয়ার ঘটনায় ।

এ নাকি আমার ভাগ্যলিপিমোটকথা তোমার কৃষ্ণা হোল রাজমহিষীপঞ্চস্বামীর ভার্য্যা।

এবার বলি আমার রাজ অন্তঃপুরের বেত্তান্ত। ইন্দ্রপ্রস্থের পাঁচকুমারের ভোগ্যবস্তু হলাম ঠিকই কিন্তু যাকে তুমি ভালোবাসা বল সেই ভালোবাসার কড়িখেলা আমার কোনোদিনও খেলা হল না অঙ্গরাজ। স্বয়ংবরসভায় তোমাকে প্রত্যাখান করবার পরেই আমার রূপমনযৌবন সব কিছুই ভেবেছিলাম সঁপে দেব অর্জুনকে মিথ্যে বলব নাতার বীরত্বব্যক্তিত্বকেও মনে মনে সেলাম করেছিলাম !

দ্যূতসভায় সর্বস্ব খুইয়ে যুধিষ্ঠির যখন আমাকে পণ রাখলেন তখন আমি একবস্ত্রারজস্বলা। লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে আমাকে আসতে হল সেখানেযেখানে একপাল নীতিবাগীশ, নপুংসকের দল বসে উপভোগ করছেন আমার লজ্জাডুবে যাওয়ার চরম মূহুর্তআমার লাঞ্ছনার প্রতিটি দন্ডপ্রতিটি পল। না কর্ণনা। ভালোবাসা আঘাত দেয়দেয় আরো নিবিড় করে কাছে পাওয়ার আকুতি। কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয় কিন্তু অপমান করতে কি শেখায়আমি তোমার জন্যে যে অপমানের আখরগুলো ছুঁড়েছিলাম তার কি হবে কর্ণ? আমিও তো রক্তমাংসের মানুষ ছিলামছিলাম যৌবনসর্বস্ব একনারী। এখনও শুনি ইতিহাস রচনা করার কলমের শব্দদেখতে পাই সংগঠিকার বেশেদেশনেত্রী রূপে কল্পনা করে যাই নিজেকে। তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো সেই অপমানের কিছুটারাজবধূরাজনন্দিনীর কি এই প্রাপ্য ছিলচুলোয় গেল রাজেন্দ্রাণীর পদমর্যাদাঘুচে গেল স্বপ্নরসাতলে গেল তার ইজ্জত। পদ্মপলাশ অক্ষিকুঞ্চিত দীর্ঘ কেশ, সর্বাঙ্গসুন্দরী তোমার না পাওয়া কৃষ্ণাকে নিয়ে জম্বুদীপের ইতিহাসে স্থাবরঅস্থাবর সম্পত্তির মত টানা হেঁচড়া করা হল। সেই কালো মেয়েটার রূপের অহঙ্কার মাটিতে মিশে গেল। একদল অতি বৃদ্ধবৃদ্ধপ্রৌঢ়যুবক তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলেন আমার লাঞ্ছনার সে সব দৃশ্য ।

কৌরবদের অট্টহাসিতে দাসীরূপে বন্দী হল তোমাদের কৃষ্ণা আর তুমি নিলে প্রতিশোধ! স্খলিত আমার উর্ধাঙ্গের বসনলজ্জারূপ ভূষণ, জলাঞ্জলি ততক্ষণে। একপাল লোলুপ লোভাতুর চোখ আমাকে গিলছে তখন। ক্লীবেদের বোধবুদ্ধি তখন ভেসে চলে গেছে নদীমাতৃক জম্বুদ্বীপের মোহানায়গড্ডলিকা প্রবাহেতুমিও তার ব্যাতিক্রম ছিলেনা। নতুন সমাজ গড়বে তোমরা

সেদিনই বুঝেছিলাম… নতুন দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়বে এই মানুষ গুলো?

ধর্মঅধর্মইহকালপরকাল সবকিছুর বিসর্জন সেই মূহুর্তে। দুঃশাসন আমার কেশাকর্ষণ করে সকলের সম্মুখে নিয়ে এসে একে একে আমার বস্ত্র উন্মোচিত করতে শুরু করলসে তো তুমিও দেখেছো তাই না

আর সেই স্বয়ংবরসভার প্রতিশোধ সেদিন তুমি নিলে কর্ণআমায় বেশ্যাবারাঙ্গনা বলেছিলে কারণ আমি তো নাথবতী অনাথবৎ। আমায় বেশ্যা বলে অভিহিত করতেও তোমার বাধ সাধলো না?

যুদ্ধ থেমে গেছে কর্ণ। অভিমন্যুর পুত্র পরীক্ষিত হয়েছে জম্বুদ্বীপের রাজা। আমি আমার পাঁচস্বামীর অনুগামিনী হয়ে যাত্রা করলাম মহাপ্রস্থানের পথেআবার আদর্শ স্ত্রীলোকের মত জীবনের শেষ বেলাতেও তাঁদের সঙ্গীনী হলাম, আবার শেষ চেষ্টা করে দেখি নারী থেকে মানবী তারপর মানবী থেকে ইতিহাস গড়তে পারি কিনা! এ হোল যুক্তিহীন স্বামীর সঙ্গে অনুগমন। আমার চারিপাশের স্বপ্নের বর্ণালীরাব্যথার ঝরাপাতারা না বলা বর্ণমালারা টুপটাপ ঝরে পড়ে গেল। আমার জন্য বেঁচে থাকার প্রহরগুলো আর অবশিষ্ট নেই। জীবনটাকে নিজের মত করে পেলাম না। শেষের সেদিন সত্যি ভয়ংকর। আজ আমার রূপযৌবন বয়সের ভারে কুব্জ এবং ন্যুব্জ। চলেছি নিরুদ্দেশের পথে যেখানে নেই কোনো কামনানেই কোনো ভোগবিলাসের হাতছানি। আছে আমার জন্য অপেক্ষমানা ধরিত্রীর একটুকরো মাটি। হয়তো অচিরেই মিশে যাবো সেই মাটিতেকোনো হিমশীতল হিমবাহ অচিরেই ভেসে চলে যাবে তোমার কালো মেয়ের পায়ের ছাপ। ফুরিয়ে যাবে শ্বাসনিবে যাবে প্রাণপ্রদীপ। আবার এই মাটিতেই ফিরে আসার ইচ্ছে থেকে যাবে সঙ্গে। সত্যের পথে আবার পা বাড়াতে চেষ্টা করবে তোমার কৃষ্ণা। শুধু সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসবে তার না দেখা স্বপ্নগুলোকে…।

আজ থেকে কালকাল থেকে পরশু কিম্বা ভবিষ্যতের সীমানায়। সেদিন দেখবে জম্বুদ্বীপের একটা সার্থক সকাল। ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে পা রাখবে তোমাদের কৃষ্ণা। পঞ্চভ্রাতাকে একসূত্রে বন্ধনকারী গ্রন্থীস্বরূপ নারীর মর্যাদায়,পঞ্চস্বামীর পত্নীরূপে সতীত্ব রক্ষায়সপত্নীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে আর পাঁচস্বামীর কাছ থেকে পাওয়া পাঁচটি পুত্রের অভাগীনি জননী রূপেইতিহাস তাকে মনে রাখবে যুগ যুগ ধরে ।

যেখানেই থাকো ভালো থেকো কর্ণআমায় যেন ভুল বুঝোনা তুমি ।

ইতি,

তোমাদের অভাগিনী দ্রৌপদী 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত