করুণাময় গোস্বামী : আমাদের আকাশপ্রদীপ

Reading Time: 4 minutes

আজ ৩০ জুন অধ্যাপক, সঙ্গীত বিশারদ ও গবেষক করুণাময় গোস্বামীর প্রয়াণ দিবসে ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


 

।। মফিদুল হক ।।

করুণাময় গোস্বামী গানের মানুষ, সংগীতে ছিলেন আজীবন সমর্পিত, ছিলেন গৃহী, তবে সেখানে ছিল বাউলের উপাদান, জাগতিক লাভ-ক্ষতির বিচার তিনি কখনো করেননি। গানের ভেতর দিয়ে ভুবন দেখার শক্তি ও আনন্দ ছিল তাঁর মধ্যে, এই আনন্দরস সবার মাঝে বিতরণে তিনি খুঁজেছেন জীবনের সার্থকতা।

ভারতবর্ষীয় সংগীত চারপাশের জীবন, জগৎ, প্রকৃতি ও মহাজীবনের সঙ্গে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে গানের চর্চা এখানে সাধনা হিসেবে গণ্য হয় এবং সাধকজনেরা বিশাল ব্যাপ্তিতে জীবন অবলোকনের তাগিদ অনুভব করেন। এই তাগিদ করুণাময় গোস্বামীকে শিক্ষক হিসেবে দিয়েছে সার্থকতা, সংগীতজ্ঞানী হিসেবে তাঁর রচনাদি ও বক্তৃতা-আলোচনা সব কিছুতে জুগিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং সাহিত্যিক হিসেবে এমন এক মাত্রায় তাঁকে উন্নীত করেছে, যার তুলনা বাংলায় তো বটেই এমনকি উপমহাদেশীয় সাহিত্যেও বিশেষ নেই। এ কথা বলার সময় আমরা নিশ্চিতভাবে নির্দেশ করব দেশভাগের সাহিত্য তথা পার্টিশন লিটারেচারের কথা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও তার পূর্বাপর ঘটনা ও এর জের বিশাল এই উপমহাদেশজুড়ে সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতি তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে যে বিষ-জর্জরতা, বিভ্রম ও বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে তার হদিস এখনো আমরা পুরোপুরি করে উঠতে পারিনি।

দেশভাগের সাহিত্যে বাংলার অবদান কম, বরং পাঞ্জাবে ও উর্দু সাহিত্যে এর অভিঘাত অনেক বেশি লক্ষিত হয়েছে। বিগত কয়েক বছর যাবৎ দেশভাগ নিয়ে গভীর বিচার-বিশ্লেষণে নিমগ্ন হয়েছিলেন করুণাময় গোস্বামী। আমাকে জানিয়েছিলেন তাঁর উপলব্ধি উপন্যাসের আকারে তিনি তুলে ধরছেন। করুণাদা সংগীতবিষয়ক অজস্র গ্রন্থের প্রণেতা, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল নিয়ে তাঁর রচনাদি গান ছাপিয়ে তাঁদের জীবন ও কর্মের নানা দিক উদ্ভাসিত করে, বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় তিনি দক্ষতার অধিকারী, অনুবাদ-সাহিত্যেও তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন, কিন্তু গল্প-উপন্যাস বা সৃষ্টিশীল সাহিত্যে তিনি কখনো বিচরণ করেননি। সত্যি বলতে কি, তাঁর এই প্রস্তাবনা আমাকে উৎসাহী করেনি, যদিও এটা তো জানা করুণাময় গোস্বামী ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও অধ্যাপক ছিলেন, সাহিত্যবোধ তাঁর তীক্ষ্ম, নানা ধরনের লেখালেখিতে তিনি দক্ষ, এমনকি একসময় ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন রম্যরচনা, যা পাঠপ্রিয়তাও পেয়েছিল, কিন্তু দেশভাগ নিয়ে বড় ক্যানভাসের কাজ, সে তো বিশাল চ্যালেঞ্জ, তিনি কি পারবেন সেই দাবি মেটাতে?

একসময় করুণাময় গোস্বামী আমার হাতে তুলে দিলেন পাণ্ডুলিপি, গ্রন্থনাম ‘ভারতভাগের অশ্রুকণা’, লাহোরের পটভূমিকায় হিন্দু-মুসলিম-শিখ-খ্রিস্টান পাত্রপাত্রী ও জীবনের স্রোতে তাদের ভেসে যাওয়া কিংবা তলিয়ে যাওয়ার কাহিনি। চার শতাধিক পৃষ্ঠার এই গ্রন্থ প্রকাশ পায় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তারপর লেখক-প্রকাশক মিলে অনেক সম্পাদক-সমালোচকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বই, কিন্তু দু-ছত্র মন্তব্যও জোটেনি। বিশালাকার উপন্যাস যে পাঠকের আনুকূল্য তেমনভাবে পাবে না, সেটা তো জানা কথা। তদুপরি এই উপন্যাসের পাঠগ্রহণ সহজ নয়, তরতরিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো গল্প নয়, বরং এ যেন এক ঘূর্ণাবর্তের কথকতা, বারবার ফিরে আসে একই চোরাস্রোত, সবাইকে টেনে নিয়ে যায় অতল থেকে আরো অতলে। সমাজ ও স্বদেশের গ্রন্থিচ্যুত হয়ে দেশত্যাগের যে কাহিনির শেষ হয় রক্তধারায়, তাই বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা রয়েছে, কিন্তু সেই বিপর্যয় ও বেদনার কোনো শেষ নেই।

উপন্যাসের পটভূমিকা লাহোর, সে শহর তার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মিলনাদর্শ নিয়ে যেন স্বয়ং হয়ে উঠেছে উপন্যাসের চরিত্র, যেমনভাবে মূর্ত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ লাহোরের সঙ্গে তাঁর যুক্ততার মাধ্যমে, আর বারবার ফিরে আসে গান-কবিতার কলি, সব গানই যে মধুর রেশ বয়ে আনে তা নয়, দেশভাগের বেদনাবহ গানের নিবেদন হাহাকার তৈরি করে বুকে।

‘ভারতভাগের অশ্রুকণা’ যে বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে রচিত সে বিষয়ে আলোচনা স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ ঘিরে পৃথক সাহিত্য রচিত হয়েছে, কিন্তু উভয় ট্র্যাজেডি তো একসূত্রে গাঁথা, সেই একরূপত্ব নিয়ে কোনো উপন্যাস রয়েছে বলে আমার জানা নেই। লাহোরে শিক্ষা ও শিল্পচর্চার সঙ্গে বাঙালির যে শতবর্ষীয় যুক্ততা ছিল সেটাও তো এখন বিস্মৃতির গর্ভে। সেই ইতিহাস তার সমগ্রতা নিয়ে জেগে উঠেছে করুণাময় গোস্বামীর উপন্যাসে, যার বিচরণ লাহোরে সমাপ্তি ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত গ্রামে, তাঁর নিজ অভিজ্ঞতার বৃত্তে দেশভাগের অভিঘাতের ছবি এঁকেছেন লেখক। তিনি বলেছেন গ্রামের সম্পন্ন পরিবারের গোপনে আকস্মিকভাবে দেশত্যাগের কথা, টুকরো টুকরো সেসব ছবি হূদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। বৈশাখ মাসে গ্রামে নিয়মিত বসে কবিগানের আসর, নরোত্তম সরকার এ যাত্রা শেষবারের মতো গাইবেন গান। গোস্বামী বাড়ির আঙিনায় এসে ঠাকুরমাকে বলছেন বন্দনা লিখে দিতে, সেটা লিখে দিয়েছিলেনও বটে এই বৃদ্ধা। কবিগানের দলের ঢোলী হাতজোড় করে বললেন, “আমি কী করব মা বলে দিন। আমি মনা ঢোলী, মুসলমান, পুরো নাম মুসলেহ উদ্দিন, সেই থেকে মনা। আমার এ দেশে থাকতে বাধা নেই, কিন্তু আমি থাকব কী করে! জমি-জিরাত নেই। সরকার দাদার সঙ্গে ঢোল বাজাই। বেতন-ইনাম-বখশিশ মিলে যা পাই, তাতেই চলে। বাবুদের বাড়িতে আসরে আসরে বাজিয়েই বড় হয়েছি। ঢোল বাজানো ছাড়া আর তো কোনো বিদ্যে জানা নেই। আমিও দাদার সঙ্গে আসাম চলে যাব কি না সে তো ভেবে উঠতে পারছি না। ”

সবশেষ সেই আসরের স্মৃতি তাড়িত করে লেখককে, তিনি তখন নিতান্তই বালক, ঠাকুরমা রচিত বন্দনা গেয়ে শুরু হয় কবিগান : “আসরের সূচনায় নরোত্তম সরকার সরস্বতী বন্দনাটি গেয়েছিলেন, তেওড়া তালে। প্রচলিত কবিগানের সুরে গানটি গ্রন্থিত ছিল। আসরে বসে দোহার ধরেছিলাম আমিও। পুরো গানটি মনে নেই। প্রথম দুটি লাইন মনে পড়ে : ‘বাজা গো বীণা হিয়া নাচিয়া ওঠে কি না/ দেশান্তরের ডাক যে এবার প্রাণের পড়ে দেয় হানা’। ”

একইভাবে গ্রাম থেকে বিলুপ্ত হলো আকাশপ্রদীপ তোলা, আশ্বিনসংক্রান্তি থেকে কার্তিক অবধি বাড়িতে বাড়িতে তোলা হতো আকাশপ্রদীপ। গৃহের আঙিনায় পোঁতা হয় কপিকল লাগানো লম্বা বাঁশ, তারপর ফানুসের মধ্যিখানে রাখা হয় ঘি অথবা শর্ষের তেলে জ্বালানো বাতি, ফানুসসহ বাতিটি গুণ টেনে ওপরে তুললেই হয়ে যায় আকাশপ্রদীপ। উপন্যাসের কথক বলছেন, “আকাশপ্রদীপ তোলার একটি মন্ত্র আছে। সে মন্ত্রে বলা হচ্ছে, হে অনন্ত, ‘এই আলোকে আকাশে তোলার ভেতর দিয়ে তোমাকে আমার প্রণাম জানাই। গৃহের ক্ষুদ্র আলো অনন্ত আলোর মধ্যে তুলে দিয়ে আমি পিতৃপুরুষকে স্মরণ করছি, তিনিও তো অনন্ত আলোকের মধ্যেই রয়েছেন। ’ এর আগে বাবা-জেঠামশায় আকাশপ্রদীপ তুলতেন। আমরা দাঁড়িয়ে দেখতাম ফানুসে বসানো আলো আকাশে উঠে যাচ্ছে। চেয়ে দেখতাম গ্রামের আকাশে আলো-ঝলমল ফানুসের দোলা। গ্রামের আকাশ এখন খালি। একটি দুটি ফানুস হাহাকারের মতো ভাসছে। ”

সে যাত্রা পিতা আকাশে প্রদীপ তোলার দায়িত্ব দিয়েছিলেন বালক পুত্রকে, চেয়েছিলেন বজায় থাকুক পিতৃপুরুষের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার এই রীতি। শঙ্কাও ছিল তাঁর, ‘গ্রাম যেভাবে ভাঙছে, সমাজ যেভাবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, ভাগ্যের পরিহাসে পরিত্যক্ত এই গ্রামে এসব আচার একদিন লোপই পেয়ে যাবে। বাবার সে আশঙ্কা সত্য হয়েছে। ’

‘ভারতভাগের অশ্রুকণা’র একটি সিক্যুয়েল প্রণয়ন করেছেন করুণাময় গোস্বামী, চলতি বছর প্রকাশ পেয়েছে বিশালাকার সেই উপন্যাস ‘লাহেরের রহিম খের’। ইচ্ছা ছিল এই প্রয়াসকে পূর্ণতা দিতে রচনা করবেন তৃতীয় পর্ব, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে। আরো অনেক কর্মপরিকল্পনা ছিল তাঁর, বহু বর্ণিল মানুষটির বহুধা-বিস্তৃত আগ্রহ ও অধ্যয়নের অনেক ফসল ঘরে তোলার ছিল। সে জন্য খেদ আমাদের যা-ই থাকুক, আমরা জানি জীবন তো অপূর্ণ। তবে এই সসীম জীবনে তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন অসীমের বার্তা, তাঁর কাজে ছড়িয়ে আছে যার নানা স্বাক্ষর। তিনি আমাদের আকাশপ্রদীপ, ঘনায়মান সন্ধ্যাকালে যে প্রদীপ গৃহ-আঙিনায় প্রোথিত থেকে উঠে যায় ওপরে, আলোক ছড়ায় অনন্ত আকাশ থেকে, পিতৃপুরুষের সঙ্গে পরম্পরায় উদ্ভাসিত করে জীবন, যোগসূত্র রচনা করে আমাদের সঙ্গে ইতিহাসের। সব অক্ষমতা-বর্বরতা-নৃশংসতা পেরিয়ে মানবের জাগরণী গান তিনি আমাদের শুনিয়েছেন, গৃহ থেকে আকাশপ্রদীপ উৎপাটিত হলেও অন্তরের আকাশে তিনি যে প্রদীপ প্রজ্বালন করে গেছেন সেই আগুন ও আলো নির্বাপিত করার সাধ্য কারো নেই।

লেখক : ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।

নোট: কালের কন্ঠ থেকে নেয়া।

                 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>