শিকাগো ডায়েরি (পর্ব-৮)


আজ আষাঢ়ের দ্বিতীয় দিন। বর্ষাকাল। বর্ষার প্রথম বৃষ্টি ভিজিয়ে দিলো প্রকৃতি। বাতাসে কদম ফুলের ঘ্রাণ উড়ে এলে মন কেঁদে ওঠে। পাশের বাড়ির রান্নাঘর থেকে খিচুড়ির বাগার ভেসে আসে। এমন বরষা দিন ভেবেই কি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় শিকাগো ডায়েরিতে লিখেছিলেন “খ এ খিচুড়ি”।


খ এ খিচুড়ি 

 

আকবর বললেন, একজন মানুষ কি টাকার জন্য সব করতে পারে?
বীরবল বলল, আলবাত!
আকবর বললেন প্রমাণ করো তবে।

পরদিন বীরবল একজন হত দরিদ্র হা’ঘরে কে ডেকে আনল রাজার সামনে। অনতিদূরে একটি জলাশয়ে শীতে বরফাচ্ছন্ন প্রায়। “যদি সত্যিই তোমার অর্থের প্রয়োজন হয় তবে তবে তুমি  সারারাত সেই জলাশয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে” শীর্ণ, দীর্ণ, পোষাকহীন লোকটিকে আকবর বললেন।  দরিদ্র লোকটি নিরূপায়। খাদ্য নেই, বস্ত্র নেই সেই শীতে। অগত্যা সে সেই জলাশয়ে দাঁড়িয়ে রইল।  সারা রাত ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে পরদিন সে রাজার কাছ থেকে অর্থের আশায় দরবারে এল।

আকবর জিগেস করলেন, “এবার বল হে ঐ ঠান্ডায় কেমন করে সম্ভব হল তোমার শীত সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা?”

লোকটি বলল,  মহারাজ ঐ দূরে একটা আলো দেখা যাচ্ছে, হয়ত সেই আলোর তাপেই ঠান্ডা সহ্য করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আকবর বললেন, ওহ্! এই ব্যাপার? তাহলে তোমার আর পুরষ্কার পাওয়া হল না।  তুমি ঠকিয়েছ আমাকে। পুরষ্কার পাওয়া এতই সোজা?

গরীব লোকটি বিফল মনোরথ হয়ে খালি হাতে ফিরে গেল। বীরবল অনেক বোঝালেন আকবরকে কিন্তু তিনি শুনলেন না কোনো কথা।

দিন যায় মাস যায়, বীরবল আর আসেনা রাজার দরবারে। খোঁজ পাঠালে বীরবল জানাল তিনি খিচুড়ি রাঁধতে ব্যস্ত আছেন। তারপরেও যখন অনেকদিন কেটে গেল বীরবল আর আসেনা তখন আকবর নিজে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলেন বীরবল নিজের ঘরে বসে খিচুড়ি বানাচ্ছে।  রাজা দেখলেন খিচুড়ির জোগাড় হয়েছে কিন্তু তা রান্নার জন্য তাপের ব্যাবস্থা এক মিটার দূরে।   আকবর বললেন, এটা কি তামাশা হচ্ছে? অতদূরে তাপ থাকলে এ জীবনে খিচুড়ি রান্না হবে?  তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি কি লোপ পেয়েছে বীরবল?

বীরবলের কোর্টে তখন বল। সে বলল, “অমন ঠান্ডার রাতে দূরের একটা আলোর তাপে যদি সেই দরিদ্র লোকটির শরীর তপ্ত হতে পারে তবে অত দূরে বসানো খিচুড়ির হাঁড়িও তো গরম হওয়া উচিত মহারাজ, তাই অপেক্ষায় আছি আমি”

আকবর নিজের ভুল বুঝতে পারলেন আর সেই দরিদ্র লোকটিকে ডেকে এনে স্বর্ণমুদ্রা পুরষ্কার দিলেন।

” বৃষ্টি মানেই পিটারপ্যাটার বৃষ্টি মানে টুপটাপ
বৃষ্টি মানেই মায়ের হাতে ভুনি খিচুড়ির উত্তাপ।”

আভিধানিক অর্থ বলছে, ‘বৈসাদৃশ্যময় উপকরণে তৈরি মিশ্র খাদ্য।’ হচপচ আইডিয়া ছিল বুঝি খিচুড়ির জন্মলগ্নে।  তা সে জগন্নাথদেবের দুর্লভ খিচুড়িতেও। তাই তার থেকেই জগাখিচুড়িরও জন্ম।

আলবেরুনী ভারততত্ত্বে যেমন খিচুড়ি প্রসঙ্গ এড়ায়নি তেমনি মনসামঙ্গলে আছে পার্বতীকে ডাবের জল দিয়ে মুগডালের খিচুড়ি রান্নার ফরমায়েশ করছেন শিব।

‘আদা কাসন্দা দিয়া করিবা খিচুড়ি’ এটিও মঙ্গলকাব্যের।

সংস্কৃত শব্দ কৃশরান্ন বা  খিচ্চা, ইবন বতুতার কিশরি,  মিশরীয় সৈন্যশিবিরের চটজলদি রান্না  কুশারি,  আর ভারতীয়দের কমফর্ট ফুড খিচুড়ি বা খিচরি যাই বলি না কেন  সবেতেই মধ্যমণি দুজনঃ চাল এবং ডাল।  তারপর এশিয়ার নানান রসুইঘরে রবীন্দ্রগানের মত হয়েছে খিচুড়ির ইম্প্রোভাইজেশন। চাল ডালের মধ্যে মাংস পড়েছে। সব্জী পড়েছে।

এই যেমন আজ বাংলাভাষা খিচুড়িভাষায় পরিণত হচ্ছে কালে কালে। বাঙালীদের সবেতেই কথায় কথায় একটা খিচুড়ি পাকানোর অভ্যেস যেন গেলই না, এমনটিও শুনে আসছি তবুও

শিকাগোর রান্নাঘরে সেদিন, বাইরে বৃষ্টি ঝরবে কথা ছিল। যোগাড় ছিল মহার্ঘ্য খিচুড়ির।

গোবিন্দভোগ চাল আর শুকনোখোলায় ভেজে রাখা সোনামুখ ডাল মেপে ধুয়ে ভিজিয়ে রাখা হল। ডুমো ডুমো ফুলকপি, কুচোনো গাজর, বিনস আর ফ্রোজেন মটরশুঁটি  পড়ল তাতে।  এবার একটা বাটিতে গ্রেট করা আদা, আর ট্যোম্যাটো কুচি। তার ওপর ছড়ানো হল জিরে আর ধনের পাউডার। সামান্য লাল লঙ্কার গুঁড়ো। এবার ইনস্ট্যান্ট পটে সামান্য ঘিয়ে তেজপাতা , জিরে আর গোটা গরমমশলার ফোড়ন। স্য়তে মোডে দুমিনিট। চড়বড়িয়ে উঠলেই আদা-মশলার পেষ্ট। সবশেষে চালডাল দিয়ে নাড়াচাড়া, ওলটপালট। এবার সব্জী দিয়ে মেপে জল। এবার ইন্স্ট্যান্ট পটের ঢাকনা সিল। টাইমারে এলার্ম। দশ মিনিট পর ঢাকা খুলে নেড়ে নুন্, মিষ্টি, হলুদ ছেটানো। আবারো ওয়ার্ম মোডে মিনিট দশেক। পরিবেশনের আগে ঘি ছড়িয়ে গরমমশলা গুঁড়ো। খিচুড়িকে জব্দ করেই লাবড়ার যোগাড়।

পালংশাক একটু, আধটু ফুলকপির কচিকচি পাতা, বাঁধাকপি কুচোনো। বেগুণ, আলুর টুকরো ফালাফালা করে কাটা। ঝিরিঝিরি করে কাটা রাঙা মূলো, ফুলকপির কচি ডাঁটা  আর অগতির গতি ফ্রেঞ্চ বিনস। কুমড়ো? চিন্তা নেই একর্ণ স্কোয়াশ আছে। অবিকল কাঁচা কুমড়োর টেষ্ট আর দেখতেও তেমন। ছোট্ট গোটা হাতের মুঠোর মধ্যে ধরা যায় এমন একটা ছোট্ট ঘন সবুজ স্কোয়াশ এনেছিলাম নিজের হাতে পরখ করে সব্জী বাজার থেকে। এবার তেলের মধ্যে শুকনো লঙ্কা গোটাকয়েক আর পাঁচফোড়ন। সব্জী ভেজে নিয়ে শাকপাতা ছড়িয়ে নুন, হলুদ দিয়ে সেদ্ধ হলেই মিষ্টি আর ধনে, জিরের গুঁড়ো। ব্যাস! মাখোমাখো লাবড়ার সুগন্ধে ভরপুর রান্নাঘর।

এবার কি ভাজা যায় খিচুড়ির সঙ্গে? পাঁপড় আছে। কিন্তু বৃষ্টির দিনে শুধু পাঁপড়? ডিপ  ফ্রিজ থেকে বেরুল ড্রায়েড শ্রিম্প। প্রণ কা বাবালোগ। আমাদের ঘুষোচিংড়ি। চায়নায় প্রোসেসড। প্যাকেট কেটে দেখি চিংড়ির সুগন্ধে ভরপুর। আর কি চাই? সেই বর্ষায়?  কাঁচের বাটিতে  শুকনো চিংড়ির মধ্যে পড়ল কাঁচালঙ্কা, পিঁয়াজ কুচি, পোস্তদানা, লঙ্কাগুঁড়ো, হলুদ আর বেসন। নুন দেওয়া থাকে এই মাছে তাই আর দিলাম না। এবার হাতের যাদুতে চটকে নেওয়া সেই মিশ্রণ। তারপর ঠিক খাওয়ার আগেই চ্যাপ্টা আকারে ভেজে তুলে নেওয়া ঘুষোচিংড়ির বড়া।

চালে ডালে খিচুড়ি বসিয়ে দেওয়া দেখে খুশীতে ডগমগ হয়ে বলে তারা দুজনে…

-এমন গন্ধ বেরোয় না গো, সত্যি বলছি মা। কি কি দিলে আর?

পিয়ারস সাবানের বিজ্ঞাপনের মত বলি,

-“কিচ্ছু না”

ফ্রেশ আদার গুণ ব্যাস! তোরা যে ফ্রোজেন আদা পেষ্ট দিস, ওর গন্ধ অন্যরকম হয়।

অমনি বলে ওঠে,

-আমাদের  অত সময় নেই।

-আমরা কি হালুইকর বামুন হব?যে টাটকা মশলা বেটে খাব।

-তাহলে যা রাঁধবি তাই উত্তম, নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা বলে চালিয়ে দিবি, বুঝলি? একটুআধটু মনের মত না হলে বলবি “সেই সত্য, যা রচিবে তুমি”।

 

 

 

 

 

 

 

 

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত