অনেকদিন পর হঠাৎ আবার বাবার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। বাবা উল্টোদিক থেকে আসছিল, একটু যেন ঠোকর খেতে খেতে। বাইফোকাল চশমায় সব উঁচুনিচু দেখে কিনা। আমি প্রথমে খেয়াল করিনি। হঠাৎ চমকে উঠে দেখলাম সামনে বাবা।
বাবা আমায় চিনতে পারেনি। না চেনবারই কথা। যাকে রেখে গিয়েছিল ১৮ বছরের এক কিশোরী, সে এখন মধ্য চল্লিশে। এখন বাবা আর আমি প্রায় সমবয়সী। আর বছর পাঁচেকের মধ্যেই আমি বাবার বয়সটা ধরে ফেলব।
‘বাবা কেমন আছো?’
বাবা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়, একটু যেন সম্ভ্রম ফুটে ওঠে চোখে। চুলের ওপর তোলা সান গ্লাস, এথনিক গয়না আর দক্ষিণী শাড়িতে কক্ষনো দেখেনি তো আগে। আমার গলার কাছে একটা শক্ত পুঁটলি পাকায়।
‘আমাকে চিনতে পারলে না বাবা? মনে আছে সেই ২০শে জানুয়ারি, ৮৮, শীতের রোদে ভাসা দুপুর? তুমি আমাকে কালকূটের পৃথা পড়ে শোনাচ্ছিলে? আর মা বারবার এসে বকাবকি করছিল তোমাকে। ১৮ বছরের মেয়েকে কীসব শোনাচ্ছ! তুমি বলেছিলে আমি ওকে তৈরি করে দিয়ে যাচ্ছি।’
বাবার চোখে মুহূতের জন্যে যেন স্মৃতি খেলে যায়, ঠিক জলের আয়নার মতো।
‘আচ্ছা, তাই? চলুন না ওই রথের ওপর বসে কথা বলি। কথা বলতে বলতে ঠিক মনে পড়ে যাবে। দাঁড়ান, তার আগে একটা চারমিনার নিয়ে আসি, মোড়ের পটার দোকান থেকে’
‘চারমিনার পাবে নাকি এখন? ব্র্যান্ড বদলে গেছে।’
বাবা একটু মুষড়ে পড়ে।
‘বদলে গেছে? কিন্তু এই যে রাসমঞ্চ, রথ, এই মাঠ, ওদিকে কোষাঘাট, শো হাউস সিনেমা হল, সবই তো আছে একরকম। আর একটু হাঁটলে জিতেনের চপের দোকান, কমলের সাইকেল রিপেয়ারিং – সব দেখতে পাব মনে হয়’
‘পাবে হয়তো। বাইরে থেকে এক মনে হবে, কিন্তু ভেতরটা আমূল বদলে গেছে। অনেকক্ষণ হেঁটে গেলেও কেউ তোমাকে চিনতে পারবে না। আমাকেই পারে না’
‘পারে না? আপনাকেও পারে না?’
আবার আমার চোখে জল এসে যায়। আমি তাড়াতাড়ি সানগ্লাসটা চোখে নামিয়ে নিই। বলি
‘বললে যে রথে বসবে’
বাবা অন্যমনস্কভাবে বলে ‘চলুন’
তিনশো বছরেরও বেশি পুরনো ভাঙ্গাচোরা রথ, পায়ের কাছে কুণ্ডলী পাকানো লোহার শিকল, দেখলে গা শিরশির করে।
‘মনে আছে, তুমি আমাকে একটা খাতা দিয়ে কিছু লেখার জন্যে এখানে পাঠিয়েছিলে। বলেছিলে রথে বসে কিছু লিখে আনো। তখন আমার ছ বছর বয়স।’
বাবাকে এই প্রথম একটু কৌতূহলী মনে হয়।
“আচ্ছা! কিছু লিখেছিলেন খাতাটায়?’
আমি চোখের জল আটকে গলা পরিস্কার করে বলি
‘তোমার কিচ্ছু মনে নেই! তখন আমাদের দোতলা উঠছিল। বাড়িতে খালি বালি , সিমেন্ট, ইঁট নিয়ে কথা। আমি খাতাটা আঁকড়ে ধরে পেন্সিলে গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছিলাম সিমেন্ট কিনে এবছর আমাদের খুব লস হয়েছে।’
‘লস!’
বাবা যেন চমকে ওঠে, তার চশমার নিচে কি জানি, ভুল হতে পারে আমার, বৃষ্টির ছাঁটের মতো অশ্রু!
তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ে বাবা। আমি উঠতে পারি না, আজকাল হাঁটুতে কী একটা ব্যথা।
‘আমি আসি তাহলে?’ বলে একটু ইতস্তত করে হঠাৎ আমার মাথায় হাত রাখে বাবা।
‘শুনুন, আমি আপনার বাবার বয়সী না হলেও বয়সে খানিকটা বড়ই হব, আমি বলছি, কোন লস হয়নি, কোথাও কোন ক্ষতি হয়নি!’

এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ কবি ও কথাকার। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, কল্পবিজ্ঞান, মৈথিলী অনুবাদকর্মে তিনি প্রতিমুহুর্তে পাঠকের সামনে খুলে দিচ্ছেন অনাস্বাদিত জগৎ। জন্ম কলকাতায়। শৈশবে নাটক দিয়ে লেখালেখির শুরু, প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘সামগন্ধ রক্তের ভিতরে’, দেশ, ১৯৯২। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘আবার অমল’ রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯৯৫।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক তৃষ্ণা পূর্ণসময়ের সাহিত্যকর্মের টানে ছেড়েছেন লোভনীয় অর্থকরী বহু পেশা। সরকারি মুদ্রণ সংস্থায় প্রশাসনিক পদ, উপদেষ্টা বৃত্তি,বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে আঞ্চলিক ভাষায় অভিধান প্রকল্পের দায়িত্বভার- প্রভৃতি বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর লেখনীকে এক বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।
প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- পূর্ণেন্দু ভৌমিক স্মৃতি পুরস্কার ২০১২, সম্বিত সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩, কবি অমিতেশ মাইতি স্মৃতি সাহিত্য সম্মান ২০১৩, ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ) ২০১৩, ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার ২০১৫, সোমেন চন্দ স্মারক সম্মান (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) ২০১৮, সাহিত্য কৃতি সম্মান (কারিগর) ২০১৯ ও অন্যান্য আরো পুরস্কার।
প্রকাশিত গ্রন্থ
কবিতা
বেড়াল না নীলঘন্টা?, একুশ শতক, ২০০২
উলটে মেলো, একুশ শতক, ২০১৩
অজাতক সমগ্র থেকে, কলিকাতা লেটারপ্রেস, ২০১৭
গোপন ট্যাটু, কৃতি, ২০১৮
লাইব্রেরি শার্ট খোলো, কৃতি, ২০১৯
অনুবাদ কবিতা
অজিত আজাদের কবিতা, নবারম্ভ প্রকাশন, ২০১৮
মূল মৈথিলী থেকে অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক
গল্প
ছায়াযাপন, একুশ শতক, ২০০৯
দশটি গল্প, পরশপাথর, ২০১১
নির্বাচিত ২৫টি গল্প, একুশ শতক, ২০১৪
ইয়াকুবমামার ভারতবর্ষ, প্রশাখা প্রকাশনী, ২০১৮
গল্প ৪৯, কৃতি, ২০১৯
উপন্যাস
বাড়িঘর, একুশ শতক, ২০১১
অনুপ্রবেশ, এবং মুশায়েরা,২০১৭
এখানে টাওয়ার নেই, একুশ শতক, ২০১৭
স্বপ্নের শিকারা, এবং মুশায়েরা, ২০১৯
অগ্নিবলয়, আকাশ, ২০২০
প্রবন্ধ
প্রযুক্তি ও নারী- বিবর্তনের প্রতি-ইতিহাস, গাংচিল, ২০১০
মেয়েদের একাল, সেকাল ও চিরকাল, সোপান, ২০২০
প্রযুক্তি
ছাপাখানার অ-আ-ক-খ, শিশু কিশোর আকাদেমি, ২০১০
সহলেখক- সৌমেন বসাক
সম্পাদনা
ভারতীয় ভাষার গল্প, এবং মুশায়েরা,২০১৭
মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্প, এবং মুশায়েরা, ২০১৭