| 20 এপ্রিল 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

আজব দেশে

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

একটা পাতার আড়ালে টুক করে লুকিয়ে পড়লো আন্না। আন্না আর তান্না দুজনে জঙ্গলে পাকা কামরাঙ্গার খোঁজে সেই সকালে বেড়িয়ে কোথাও কামরাঙ্গা গাছ দেখতে পেলো না। তান্না আন্নাকে বলল চল দিদি ঐ যে দূরে নদীটা দেখছিস, নদীটার ওপারে তো আরো বেশী জঙ্গল। ওখানে পাওয়া যাবেই। চল যাই দিদি। ছোট্ট দুই বোন হাঁটতে হাঁটতে যখন নদীর কাছে আসলো তখন সূর্য ডুবে যায় যায়।আন্না তান্নাকে বলল এবার কি হবে?
তান্না বলল কি আর হবে ঐ লম্বা গাছটায় উঠে রাতটা কাটিয়ে দিলেই হলো।
বাড়িতে কি বলবি?
– সে দেখা যাবে। চল চল গাছে উঠে যাই চট করে।
আকাশের চাঁদটা একটা মস্ত থালার মতো গোল হয়ে আছে। সারা বনটা জ্যোৎস্নায় মাখামাখি।
ওরা যে গাছটায় উঠেছিল সেটা একটা মস্ত জামরুল গাছ। দু’একটা রাতচড়া পাখি বিকট চিৎকার করে উঁড়ে গেল।অত উঁচুতেও মশার কামড়ে চোখের পাতা ফেলতে পারেনি কেউ। জ্যোৎস্না ঢালা আকাশ দেখতে দেখতে কখন যে ভোর হয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি ওরা। গাছ থেকে নেমে আন্না কয়েকটা পেয়ারা গাছ থেকে পেরে সকালের প্রাতরাশ সেরে নিয়েই হাঁটা শুরু করলো।

পথের দু’ধারে লজ্জাবতী গাছ ওদের কিসব যেন ফিসফিস করে কানেকানে বলে দিল।আন্না মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানিয়ে আবার চলতে আরম্ভ করলো। নদীর কাছাকাছি আসতেই একটা বেশ বড় কাছিম জোড়ে হেঁকে বলল- এই যে তোমরা কোথায় চললে গো?
তান্না বলল- ওপারে যাবো গো খুড়ো।
– কেন, ওপারে যাবে কেন?
– কামরাঙ্গা আনতে যাবো খুড়ো।
– তা বেশ বেশ। তবে চুপচাপ যেও বাবা ওপারের রাজা আবার ভীষণ রাগী। যাও যাও, সাবধানে যাও বাবা।
নদীর জলে পা দিতেই একটা চেলা মাছ কুট করে পায়ে কামড়ে দিয়ে বলল- জানো না, এই ঘাটটা আমার ইজারা নেয়া আছে? হেঁটে পার হতে গেলেই পা কামড়ে দেব। আমার নৌকোতে ওপারে যেতে পারো। নগদ পাঁচ ঝুড়ি শামুক দিয়ে ইজারা নিয়েছি বাপু।
আন্না বলল আমাদের কাছে তো পয়সা নেই।যাবো কি ভাবে?
চেলামাছ বলল- যাও, যাও এখান থেকে। তা বলি কি তোমাদের ওপারে কেউ থাকে বুঝি?
তান্না বলল- রাজা মশাই আমাদের দাদু হন আমরা দাদুর বাড়ি যাবো।
কথাটা শুনেই চেলা থরথর করে কাঁপতে আরম্ভ করলো।
তান্না বলল- ভয় পেয়ো না চেলা দাদা, আমাদের পাড় করে দাও, কাউকে কিছুই বলবো না।
চেলামাছ তার শালপাতার বিশাল নৌকোটা আনতেই আন্না তান্নারা অবাক হয়ে গেল। এত্তো বড় পাতার নৌ…কো! এত বড় পাতা ওরা কখনোই দেখেনি।

চেলামাছ দাঁড় বেয়ে চলেছে। মাঝ নদীতে পাতার নৌকোটায় একটা জলপিপি উঠে বসতেই চেলা চিৎকার করে বলল নেমে যা নেমে যা হতভাগা, এরা রাজামশাইয়ের নাতনি। আর যাবে কোথায়, জলপিপি এক লাফে নৌকো থেকে নেমেই দে দৌড়।
তান্না ভ্রুরুতে হাতটা রেখে দেখলো ওপারে পিঁপড়ে, গোবরে পোকা, কাঁকড়া এপারে আসার জন্য অপেক্ষা করছে। কাছাকাছি আসতেই তান্নারা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল।এ…ত ব…..ড়।
আন্না-তান্না নৌকো থেকে নামতেই সবাই দুপাশে সরে গেল।
এপার এক আজব দেশ। সব কিছু স্বাভাবিকের চেয়ে একশো গুন বড়।
একটা দোতলা সমান শামুক জঙ্গল থেকে বেড় হয়ে রাস্তাটা পাড় হতে যাবে আর অমনি এক কাক তাকে ঠোঁটে কামড়ে ধরে কোথায় উঁড়ে গেল। রাস্তার দুপাশে ঘন জঙ্গল।দু’একটা জংলী ডাঁই পিঁপড়ের বাড়ি।
সূর্যের তেজ এখানে খুব বেশী নয়। এখানের সাইমূল পাখি রোদ পেলেই গপাগপ খেয়ে ফেলে। সূর্য তাই খুব একটা রোদ নিয়ে এখানে আসে না।
হাঁটতে হাঁটতে তান্নার খুব খিদে পেয়ে গেল।এই দেশে কোন কিছুর অভাব নেই। চারপাশে নানান খাবারের গাছ। তাতে সুস্বাদু খাবারগুলো চোখের সামনে ঝুলছে। চারদিকে ভালোভাবে দেখে নিয়ে তান্না আন্নাকে বলল- দিদিরে ওই দেখ কি সুন্দর জেমস ঝুলে আছে। ঝুলে তো আছে,কিন্তু ওরা পাড়বে কিভাবে। এক একটা জেমস ট্রাক্টরের টায়ারের মতো বড় আর ওরকমই মোটা। অনেক চেষ্টা করেও ওরা তা পাড়তে পারলো না। ক্ষুধার চোটে দুজনেই একসময় ঘুমিয়ে পড়লো।

ঘুম ভাঙ্গলো বিকট একটা বাজ পরার আওয়াজে। আসলে আওয়াজটা বাজের নয়, একটা দৈত্যাকৃতি বানর জেমস খেতে খেতে একটা হাত ফস্কে নিচে পড়ে গিয়েছিল। আন্না তান্নারা ভীষণ খুশী হলো।ভয় পেয়ে একটা ঘাসের আড়ালে চুপ করে বসে থাকলো। বেশ কিছুক্ষণ পর বাঁদরটা চলে যেতেই দু’জনে জেমসের কাছে গেল।কিছুতেই দাঁতে কাটতে পারলো না সেটা। ওরা জিভ দিয়ে চাটতে আরম্ভ করলো। কি অদ্ভুত স্বাদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই জেমস নরম হয়ে গেলে পেট ভরে খেলো দুজনে। একটু ভাত ঘুম পেলেও বিকট অদ্ভুত বাজনায় লেটুস বনে লুকিয়ে পড়লো ওরা। তাকিয়ে দেখলো বিশালদেহী রাজহাঁস, মাথায় চকচক করছে মনিমুক্তোর মুকুট, সাদা পাখনায় হীরের মালা জড়ানো। ইনিই এ দেশের রাজা এটা বুঝতে ওদের খুব কষ্ট পেতে হলো না। বিরাট মিছিল সামনে রাজা হাঁস, পিছনে মোড়গ মন্ত্রী, বনবেড়াল, কাঠবেড়ালি, পাতিবক, ওয়াবক, শেয়াল, পানকৌড়ি, শালিক, ভোদড়, ময়না, টিয়া এরা সবাই এক একজন বিশিষ্ট মন্ত্রী।
মিছিলের সামনে কয়েকজন সান্ত্রি ওদের নিয়ম অনুযায়ী রাস্তায় মুড়ি ছড়াচ্ছিলো পাছে রাজা মশাইয়ের যদি ক্ষিদে পায়!
একটুর জন্য বেঁচে গেল আন্না। সেই ছিটানো মুড়ির একটা ছিটকে ওই লেটুস বনে গিয়ে পড়লো। আন্নার ডান দিক দিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ায় বেঁচে গিয়েছিলো আন্না। বাঁ দিকে গড়ালেই আন্না চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে যেতো। আরে বাপরে মুড়ি তো নয় আস্ত একটা পাহাড়। গড়িয়ে আসা মুড়িটাকে দেখে আন্না চিৎকার করে উঠলো ভয়ে।
– প্যাঁক প্যাঁক? কে এমন বেয়াদপ, আমার মিছিলে চিৎকার করে? খোঁজ তাকে। কথাটা বলেই একটা বিরাট আমড়া গাছের গুড়িতে গিয়ে বসলো রাজা মশাই। সবাই খুঁজতে লেগে গেল জোর। কাউকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজা মশাই বললেন- তাহলে কি আমি ভুল শুনেছি বলতে চাইছো? প্যাঁক প্যাঁক।
সবার হাত পা ক্রমশ ঠান্ডা হতে লাগলো। এই বুঝি প্রানটা যায় আর কি!
আর ওদিকে হলো কি ঐ লেটুস বনে একটা মশা বারবার আন্নাদের খেতে আসছিল। একটা লেটুস পাতা তুলে তান্না তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিল ঠিকই কিন্তু সেই বিরাট আকারের মশার নখের আঁচড়ে তান্নার হাঁটুর কিছুটা ছাল গেল ছড়ে, আর অমনি আবার বিকট চিৎকার করে উঠতেই সারা লেটুস বাগানে সুনামীর তান্ডব শুরু হয়ে গেল। হাজার লুকিয়েও পাড় পেলো না আন্না-তান্নারা। একটা বক মাথায় লাল পুলিশের টুপি, হাতে দোতালা সমান লাঠি। সে তার সরু ঠোঁট দিয়ে একসাথে দু’জনকে তুলে এনে রাজা মশাইয়ের কাছে ফেলতেই আন্না পায়ে ব্যথা পেলো খুব। হাঁস রাজা তার চোখ দু’টো বড় বড় করে অনেকক্ষন ওদের দেখলো। তারপর ঠোঁটটা আকাশের দিকে তুলে আনন্দে প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক  শব্দে নৃত্য করতে লাগলো। রাজার সাথে বাকিরাও নৃত্য আরম্ভ করলো। সে কি নাচ। প্রাণ যায় আর কি!
নাচ থামিয়ে হাঁসরাজামশাই তার ডানায় ওদের তুলে নিলো। জিজ্ঞেস করলো- তোমরা কে গো? কোথায় থাকো। এখানে এলে কিভাবে। তোমরা তো এদেশের নও গো?
দুই বোন হাত জোর করে বললো আমরা আকাশদ্বীপে থাকি রাজা মশাই।
-আকাশদ্বীপ! সে তো অনেকদুরে। হঠাৎ এখানে এলে কেন?
-না, মানে আমরা, এখানে, কিজন্য মনে করতে পারছি না রাজামশাই।
তান্না বললো- আমরা কামরাঙ্গা নিতেএসেছিলাম।
-কি বললে কা -ম -রা -ঙ্গা? রাজা খাদ্যমন্ত্রী টিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন- খাদ্যমন্ত্রী? আমার দেশে খুব ভালো কামরাঙ্গা কোথায় আছে বলতে পারো?
খাদ্যমন্ত্রী তার লাল টুকটুকে ঠোঁটটা বারকয় জামায় ঘষে নিয়ে বলল- খোঁজ নিচ্ছি জাঁহাপনা। এই বলে টিয়া নীল আকাশে বিশাল ঝড় তুলে দূরে উঁড়ে গেল। ততক্ষনে রাজামশাইয়ের নরম পাখায় ওরা দু’জনেই ঘুমিয়ে পড়লো।

রাজামশাই ওদের নিয়ে যখন রাজপ্রাসাদে চলে এলো তখন জ্যোৎস্না রাত। দুই বোন খায় দায় আর ঘুমিয়ে কাটায়। আর ওদিকে ওদের বাবা মা হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে ওদের। গ্রামের সবাই ধরে নিয়েছে নির্ঘাত বাঘে খেয়েছে মেয়ে দু’টোকে। এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল।

দুই বোন সেদিন পিঁপড়ের ছানাদের সাথে এক্কাদোক্কা খেলছিলো হঠাৎ শনশন শনশন শব্দে আর জোর হাওয়ায় খুব ভয় পেয়ে খেলা ফেলে রাজবাড়ীতে ঢুকে গেল ওরা।আকাশে কি যেন একটা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে সেটা। সেই টিয়া মন্ত্রী তার ঠোঁটে করে কি যেন নিয়ে রাজবাড়ীর পোলো মাঠটায় নামলো। বস্তুটাকে খুব চেনা চেনা লাগছে।তান্না চিনতে পেয়ে বললো- দেখ দিদি কত্ত বড় কামরাঙ্গাটা!
আন্না অবাক হয়ে শুধু দেখেই যাচ্ছে।
পাকা কামরাঙ্গার মিষ্টি গন্ধে চারদিক ম ম করছে।
হলুদ রংয়ের টসটসে কামরাঙ্গাটা।
সান্ত্রীদের চিৎকারে ওদিকটায় তাকাতেই ওরা দেখতে পেলো যে রাজামশাই এদিকেই আসছে। একদম সামনে এসে বললো- এই নাও তোমাদের কামরাঙ্গা।
তান্না বললো- আমরা একবার ছুঁয়ে দেখবো রাজামশাই?
রাজামশাই বললেন- ছুঁয়ে দেখো, খেয়ে দেখো।ওগুলো তো সব তোমাদের জন্য।এতক্ষণে ওরা দেখলো দূরে আরো প্রচুর কামরাঙ্গা রয়েছে। তান্না  বোঁটাটা ধরে একটু ওপরে উঠে  কামরাঙ্গাটায় বসালো এক কামড়। কি স্বাদ আর মিষ্টি। টপটপ করে রস গড়িয়ে যাচ্ছে নিচে আর সেই রসে ভেসে যাচ্ছে আন্না। রসের নদীতে কোনভাবে সাঁতরে বেঁচে গেল আন্না। তারপর দু’জনে পেট ভরে খেল কামরাঙ্গা।
এবার যে ঘরে ফিরতে হবে আমাদের রাজামশাই।
রাজামশাই ওদের অভয় দিয়ে বললো- কাল অমাবস্যা। কাল নয় পরশু তোমাদের যেতে হবে। সারারাত দু’বোনে খুব পরামর্শ করতে লাগলো এতবড় কামরাঙ্গাগুলো ওরা নিয়ে যাবে কিভাবে। ওদের  ফিসফিস কথা রাজামশাই সব শুনেছেন।
ভোর না হতেই সাজো সাজো রব রাজ্য জুড়ে। আজ দু’বোন নিজের দেশে ফিরে যাবে তারই আয়োজন এটা। রাজামশাই বললেন- এত দূরের পথ তোমরা যাবে কিভাবে! আমি তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসবো। আর মন্ত্রীমশাই আপনি আপনার বাহিনী নিয়ে  কামরাঙ্গাগুলো নিয়ে যাবেন ওদের দেশে। পূবদিকে সূর্য উঠতেই রাজামশাই তার পাখা মেললেন আকাশে। পিঠে আন্না আর তান্না।নিমেষেই নদী পার হয়ে একদম ওদের গ্রামে। গোটা গ্রাম তখনো ঘুমে কাদা। নদীর পারে কামরাঙ্গাগুলো রেখে রাজা মন্ত্রী আবার নিজেদের দেশে উড়ে গেল। বলে গেল আবার এসো আমাদের দেশে। পাশ ফিরতেই আন্নার ঘুমটা গেল ভেঙ্গে।আন্না তান্নাকে ডেকে বললো- চল দেখে আসি সেই কামরাঙ্গাগুলো।
তান্না চোখ কচলে আন্নাকে জিজ্ঞেস করলো কিসের কামরাঙ্গারে দিদি। আন্নার বুঝতে পারলো সবটাই সে স্বপ্নে দেখেছে।
ভাঙ্গা ছনের ঘরের বাইরে এসে আন্না দেখলো সারাটা আকাশ জুড়ে সোনালী হাঁসের ঝাঁক কোন এক রূপকথার দেশে উড়ে যাচ্ছে। সূর্যের আলোয় তখন পুবের আকাশটা লালে লাল হচ্ছে ক্রমশ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত