| 16 এপ্রিল 2024
Categories
শিশুতোষ

হ্যালো, আন্টি

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

কে—?

আমি –

আমি, আমি কে? নাম নেই তোমার? মিঁউ মিঁউ করছ কেন?

আমি পুঁটি বলছি। তোমার ছেলে রকি প্রতিদিন আমাকে টিজ করছে।

কে পুঁটি? ওই নামে কাউকে চিনিনে আমি। যত্ত সব আলতু ফালতু ফোন। ডিসগাসটিং—

কটাং করে কেটে গেল ফোনটা। পুঁটির চোখ দুটো জলে ভরে গেল। বাঁ হাতের থাবায় চোখটা মুছে নিয়ে মোবাইল ফেরত দিল ডম্বু দাদাকে। ডম্বু খুব গম্ভীর গলায় বললো, গ্যাঁও। খুবই চিন্তার বিষয়। রকির মা তোর কথা শোনার আগেই ফোন কেটে দিল! দেখছি কি ব্যবস্থা করা যায়। এখন আর মন খারাপ করে থাকিস না। আমার সাথে ভোলা ময়রার দোকানে চল। এতক্ষণ দুধ জ্বাল দেওয়া হয়ে গেছে। পুরু, মোটা সর খেতে যা লাগেনা!

না, পুঁটি গেলনা। আগে দু-একবার গেছে। কিন্তু সর খাওয়ার বদলে লাঠির বাড়ি খেয়ে ফিরে এসেছে। পায়ের ব্যথায় পাঁচদিন ঘর থেকে বেরোতে পারেনি। পুঁটির কপালটাই এমন। ওই যে বলেনা, যার মা নেই তার কেউ নেই। জন্মে ইস্তক মাকে দেখেনি। চোখ ফুটতে দেখে খঞ্জনী দিদার ঝোলার মধ্যে চুপটি করে বসে আছে। দিদার মুখে শুনেছে, দিদা ওকে কুড়িয়ে পেয়েছিল। তখনো চোখ ফোটেনি। দিদা খুব যত্ন করে কাপড় মুড়িয়ে ঝোলার মধ্যে রেখে, পলতে করে দুধ খাইয়ে দিত। তারপর চোখ ফুটলে ও পুট পুট করে তাকালো। অমনি দিদা ওর নাম রেখে দিল পুঁটি। এখন পুঁটি বড় হয়ে গেছে তাই আর দিদার সঙ্গে যায়না। দিদা দিনের বেলা খঞ্জনী বাজিয়ে গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে মাধুকরী করে। রাত্তিরে বাড়িতে ফিরে চাল, ডাল, সব্জি ফুটিয়ে খায়। পুঁটিকেও পাশে বসিয়ে ছোট্ট একটা বাটিতে করে খেতে দেয়। কোনো কোনোদিন দিদা একটু দুধ নিয়ে আসে পুঁটির জন্য। সেদিন খুব আনন্দ হয় পুঁটির। চুক চুক করে দুধ খায়, গোফ চাঁটে, নিজেকে মহারানী মনে হয় |

সবই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু রকিটা খুব জ্বালাচ্ছে আজকাল। বাইরে বেরোলেই ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করে। রকি গাছে চড়তে পারেনা এই যা রক্ষে! নাহলে এতদিনে ওকে মেরেই ফেলত। দিদাকে বলে কোনো লাভ নেই, দিদাকেও তাড়া করে। তবে দিদার সঙ্গে পারেনা। দিদার হাতে লাঠি থাকে যে! নালিশ করবে বলে আজ সকালে রকির মাকে ফোন করেছিল পুঁটি। কিন্তু রকির মা ও খুব বাজে, কথা না শুনেই ফোন কেটে দিল। কি যে করে পুঁটি! ডম্বু দাদাটা কেমন যেন, দেখতেই ওরকম। মাথাটা ডাম্বেলের মত বড়, বুদ্ধি নেই একদম। সবাই বলে বেড়াল নাকি বাঘের মাসি, ছি! ছি! বাঘের মাসির এই নমুনা? একটা নেড়ি কুকুরের ভয়ে মুশকো বেড়াল পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। পুঁটি এখন ছোট আছে তাই, নাহলে রকির কান কামড়ে ছিঁড়ে নিত। নচ্ছার, পাজী, বদমাশ, শয়তান কুকুর।

ওদিকে রকি আনন্দে ব্রেক ডান্স করছে। বেড়ালটা আজ হেব্বি জব্দ হয়েছে। মাকে ফোন করে বলা হচ্ছে আন্টি তোমার ছেলে আমাকে জ্বালাতন করে। কেমন জব্দ, ঘেউ—ঘেউ—ঘ্রেউ- ইয়াউ—ইয়াউ-ঘ্রিয়াউ। ওঃ যা আনন্দ হচ্ছে না! তবে মা বাড়ি থাকলে কেস জন্ডিস হয়ে যেত। ভাগ্যিস মা তখন মাংসের ছাঁটের খোঁজে রামু হালদারের দোকানে গিয়েছিল। ওই পুঁটি না ফুঁটি বুঝতেই পারেনি ওটা মা নয় আমার গলা। ইল্লু—ইল্লু—ইল্লু—উল্লু বেড়াল। মিঁউ মিঁউ করে ডাকে, আবার বড় গলা করে বলে আমরা হলাম বাঘের মাসি। ঘাউ—ঘাউ—ঘাউ ওই নমুনা বাঘের মাসির, কুকুর দেখলেই হাঁচড় পাঁচড় করে গাছে ওঠে। রকি গাছে উঠতে পারলে পুঁটিকে ঘোল খাইয়ে ছাড়ত। এই খবরটা লেল্টু, কেল্টু, ভেল্টুকে দিতেই হচ্ছে নাহলে মজাটা ঠিক জমছে না। তারপর রাতে পার্টি করবো, এমন হুল্লোড় করবো ওই খঞ্জনী বুড়ির ঘরের পাশে পুঁটির আদুরে ঘুমের দফা রফা হয়ে যাবে।

রকি গলায় বাঁশি ঝুলিয়ে মাস্তানের মত ঘাড় উঁচিয়ে বাড়ি থেকে যেই বেরোতে যাবে, ওর মা এসে কান ধরে এইসা বকুনি দিল- পাজী ছেলে তোর জ্বালায় এ পাড়ায় আর থাকা যাবেনা দেখছি। বাইরে বেরোলেই শুধু নালিশ শুনতে হবে। ভোলা ময়রা এত ভালো, রোজ আমাকে পরোটা খাওয়ায় সেও আজ তাড়া করলো। আর একগাদা কমপ্লেন তোর নামে। দোকানের ভেতর ঢুকে হামলা করেছিস, কড়াই চেটেছিস। মাথামোটা ওই বেড়ালটা – ডম্বু সেও ছিল। সাক্ষী দিল, আরো বলল, তুই পুঁচকে পুঁটিকে ভয় দেখাচ্ছিস? রকি গাঁই-গুঁই করে কিছু বলার চেষ্টা করছিল কিন্তু ওর মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে মাথা নিচু করে কেঁউ—কেঁউ—করতে করতে পিছনে হেঁটে পালিয়ে গেল। অবশ্য যেতে যেতে আড়চোখে একবার দেখে নিয়েছে পুঁটি এই বাজে দৃশ্য দেখে ফেলল কিনা। তাহলে একেবারে প্রেস্টিজ পাংচার।

ওদিকে কান্ড হয়েছে একখানা। খঞ্জনী দিদার সাথে এক্কেবারে পুঁটির মত দেখতে একটা বেড়াল এসেছে। আসলে বেড়ালটাকে দেখে দিদা ভেবেছিল ওটা পুঁটি। তাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। কিন্তু বাড়ি এসে দেখে গুটিসুটি মেরে পুঁটি বসে আছে মনখারাপ করে।  নতুন বেড়ালটাকে দেখে পুঁটি লাফ দিয়ে উঠল, আরে! এটা কে?

দিদা ওর নাম দিল পটা। পুঁটি আর পটা রাত্তিরে একসঙ্গে এক বাটিতে দুধ ভাত খেল, তারপর দিদার কোলের মধ্যে শুয়ে গল্প জুড়ল। পটার মনেও খুব দুঃখ। ওরও মা নেই কিনা! পুঁটি থাবা দিয়ে পটার চোখের জল মুছিয়ে দিল। অবশ্য নাকে একটু খোঁচা লেগে নাকটা ছড়ে গেল, হাতের নখগুলো খুব বড় বড় হয়ে গেছে। কে আর কেটে দেবে! তারপর পুঁটি দিদার ছেঁড়া কাঁথার লাল সুতোর রাখি পটার হাতে পরিয়ে ভাই বলে ডেকে মন খুলে সব কথা পটাকে বললো। রকির দুষ্টুমির কথা শুনে পটা চোখ গোল গোল করে, গায়ের লোম ফুলিয়ে তক্ষুণি বেরিয়ে যাচ্ছিল রকিকে জব্দ করতে। পুঁটি থামালো, এখন তো রাত। পটা এখানকার রাস্তাঘাট কিছুই চেনেনা। কয়েকদিন থেকে সব চিনে নিক, তারপর অ্যাকসন নিতে হবে। পটা ভেবে দেখল কথাটায় যুক্তি আছে। এখন বরং ঘুমিয়ে নেওয়াই ভালো।

খেলা পুরো জমে গেছে। রকি, কেল্টু, ভেল্টুরা ভড়কে গেছে, এই দেখছে পুঁটি বাবলাদের পাঁচিলে আবার দেখছে ভোলা ময়রার দোকানে। এই নিয়ে ওদের মধ্যে জোর তর্ক-বিতর্ক এমনকি মারামারি পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। রকির মা পর্যন্ত তাজ্জব। এ কি ম্যাজিক নাকি? ভয়ও পেয়েছে খুব। পুঁটি নিজের কানে শুনেছে, রকির মা বলছে চল রকি এ পাড়া ছেড়ে চলে যাই।

 ওরা তো কেউ জানেনা আসল ঘটনা। এবার দেখ্ কে কাকে ঘোল খাওয়ায়। বাঘের মাসির ক্ষমতা দেখ্। বলে কিনা মিঁউ মিঁউ করে! এই সুন্দর মিঁউ মিঁউ করে ডাকে বলেই তো মানুষগুলো পুঁটিদের এত্তো ভালবাসে। সবাই আদর করে, কোলে নিয়ে ঘোরে। ঘেউ ঘেউ করা বদমাশ রকি, কেল্টুদের কি কেউ কোলে নেয়?   

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত