| 27 মে 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

বেস্ট ফ্রেন্ড

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

(১)

“মাম্মি, এবার আমাকে একটা ফেলুদার গল্প বলবে তো?”, ‘হ্যাপি মিল’ লেখা লাল কাগজের বাক্সটা হাতে ধরে ফুড কোর্ট থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে বলল ঋক। বাক্সের মধ্যে একটা ‘পপ-আপ ফ্রগ’ আর দুটো পেপার ন্যাপকিন ছাড়া আর কিছুই নেই; এক্সট্রা চিজ দেওয়া এগ বার্গার, হ্যাস ব্রাউন আর কোল্ড-ড্রিংস তো অনেক আগেই খাওয়া হয়ে গিয়েছে ঋকের।
“বলবো, বলবো”, মিষ্টি হেসে ছেলের কথায় সন্মতি জানাল মধুরিমা। ঋকের সাথে শর্ত ছিল ব্রেকফাস্ট করতে নামার আগে পর্যন্ত ও যদি মোবাইলে গেম না খেলে তাহলে মধুরিমা ওকে একটা ডিটেকটিভ গল্প শোনাবে। পুনা থেকে ঘণ্টা দেড়েক আগে গোয়ার জন্য রওনা হয়েছে ওরা। মধুরিমার শর্ত মেনে ঋক এই সময়টাতে একবারও মোবাইলের জন্য বায়না করেনি, সারাক্ষন গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। উৎসাহিত হয়ে ঋক বলল, “ফেলুদার গোয়াতে গিয়ে মিস্ট্রি সলভ করার গল্প বলতে হবে কিন্তু”। মধুরিমা এবার বেশ মুশকিলে পড়ল। না, গোয়াতে ফেলুদা কোনো রহস্যের সমাধান করেছে বলে তো মনে পড়ছে না। ইদানিং সময়ের অভাবে খুব বেশি গল্পের বই পড়া হয় না মধুরিমার, কিন্তু আগে রহস্য গল্প বা ভুতের গল্পের বই একবার হাতে পেলে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলত। মধুরিমার মনে হল শুধু ফেলুদা নয়, কিরীটি, ব্যোমকেশ বা অন্যান্য বাঙালী গোয়েন্দাদের কেউই বোধহয় রহস্যের জট খুলতে গোয়াতে যাননি। কোনো অজ্ঞাত কারণে বাঙালী লেখক-লেখিকাদের মধ্যে গল্পের প্রেক্ষাপট হিসাবে গোয়াকে বেছে নেওয়ার প্রবণতা বেশ কম।
“গল্প নয়, আমি তোকে আজ গোয়ার ইতিহাস বলবো। সেটাও গল্পের মতই ইন্টারেস্টিং”।
মায়ের দিকে একবার গোমড়া মুখে তাকিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল ঋক।
কাল ঋকের আট বছরের জন্মদিন। এ বছর বার্থ-ডে সেলিব্রেট করতে মাম্মি-ড্যাডির সাথে ঋক চলেছে গোয়াতে। ড্যাডি অবশ্য আগেই বলে দিয়েছে,”সিনেমাতে গোয়াকে যেমন দেখো, তার সাথে কিন্তু খুব একটা মিল খুঁজে পাবে না। কারন, সিনেমাতে সাধারণত কালাংগুটে বা আঞ্জুনা বিচ দেখায়। দেশী-বিদেশী টুরিস্টেরা ওখানেই বেশী ভিড় জমায় কি না। ওখানে সি-বিচ শুরু হওয়ার আগে প্রায় আধ কিলোমিটার জুড়ে নানা ধরনের সুইমিং কস্টিউম, টুপি, সল্টেড কাজু আর মেমোরাবিলিয়ার দোকান গিজগিজ করছে। ভিড় ঠেলে ঠেলে সে সব পেরিয়ে তবেই সি-বিচের ধারে পৌঁছানো যায়। তবে বিচে পৌঁছেও শান্তিতে সমুদ্র দেখার উপায় নেই। প্রত্যেক পাঁচ মিনিটে কেউ না কেউ বিরক্ত করতে চলে আসবে। হয় প্যারা-গ্লাইডিং করো, নয়তো জেট-স্কি বা সারফিং। অতো অ্যাডভেঞ্চার করতে ভালো লাগে না? তাহলে বালির ওপর স্কুটার চড়ো, নাহলে ঘোড়া কিংবা ঘোড়ার গাড়ি। এখন আর আমার অতো ভিড়ভাট্টা ভালো লাগে না। তাই আমরা থাকবো ভারকা বিচের একটা রিসর্টে। ভারকা বিচ খুব শান্ত জায়গা। তাছাড়া রিসর্টের লাগোয়া প্রাইভেট সি-বিচ আছে। যারা ওই রিসর্টে থাকবে তারাই শুধু ওই বিচটাতে যেতে পারবে। তাই অনেকক্ষণ ধরে সমুদ্রের ধারে বসে ঢেউ দেখতে বা স্নান করতে কোনো অসুবিধা নেই।”

ফোর সিটার গাড়িটার পিছনের সিটে মধুরিমা আর ঋক পাশাপাশি বসে পড়ল। ঋকের বাবা প্রবাল বসল সামনে, ড্রাইভারের পাশের সিটটাতে। প্রবাল পেশায় সাংবাদিক। তাই বেড়ানোর সাথেই চলে একটু অন্য ধরনের খবরের খোঁজ। প্রবালের ইচ্ছা আছে এবারে গোয়া থেকে কিছু অফবিট স্টোরি নিয়ে আসার। গাড়ির দরজা ভালোভাবে লক করে ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনটা বের করল মধুরিমা। তারপর ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলটা ফোনের নির্দিষ্ট জায়গায় ঠেকিয়ে মোবাইল লক খুলে, নোটস আইকনে ক্লিক করল। ওখানেই একটা ফাইলে সেভ করা আছে গোয়ার ইতিহাস। ঋককে বলার জন্য সেটা আর একবার পড়ে নিল মধুরিমা।
মানুষের জীবনে এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যা প্রভাব পড়েছে তাতে কোথাও বেড়াতে যাওয়া মানেই সবার আগে সেই জায়গার ফটো তুলে সবার সাথে শেয়ার করা। তারপর খাওয়ার ফটো, হোটেলে থাকার ফটো, নিতান্ত্য ব্যক্তিগত ছোটোখাটো বিষয়ের ফটো তুলে ফেসবুক, হোয়াটশঅ্যাপ বা ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করতে করতে বেড়ানোটাই মাটি হয়ে যায়। কিন্তু নিজেকে জাহির করার লোভ সামলানোও মুশকিল, তাই এখন কোথাও বেড়াতে গেলে মধুরিমা মোবাইলের ইন্টারনেট অফ করে রাখে।

নোটটা পড়ার পর সবকিছু একটু গুছিয়ে নিয়ে মধুরিমা গোয়ার ইতিহাস বলতে শুরু করল ঋককে,”গোয়ার ইতিহাস বলতে গেলে পর্তুগিজদের কথা বলতেই হয়। পর্তুগিজরা গোয়ায় এসেছিল ১৫১০ সালে মানে ১৫১০ এ.ডি.। বি.সি. আর এ.ডি. মানে কি, সেটা জানিস তো?” মায়ের প্রশ্নে দুপাশে মাথা নাড়াল ঋক। “বি.সি. হল ইংরেজি শব্দ ‘বিফোর ক্রাইষ্ট’-এর অ্যাব্রিভিয়েশন বা শর্ট ফর্ম, যার মানে যিশুখ্রিস্টের জন্মের আগের সময়। আর এ.ডি. মানে হল ‘অ্যানো ডমিনি’। এটা একটা ল্যাতিন শব্দ যার মানে ‘ইন দি ইয়ার অফ দি লর্ড’ বা যীশু যে বছর জন্মগ্রহন করেছিলেন।”, ঋক অবাক হয়ে মায়ের কথা শুনছিল। ঋকের উৎসাহ দেখে মধুরিমা মনে মনে বেশ খুশী হল। মোবাইলে আর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করল,”পর্তুগীজরা গোয়াতে রাজত্ব করেছিল ১৫১০ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত। ১৯৬১ সালে ভারতীয় সেনারা গোয়ায় প্রবেশ করে টানা ৩৬ঘণ্টা যুদ্ধের পর গোয়াকে পর্তুগীজদের শাষনমুক্ত করে। প্রতি বছর ১৯শে ডিসেম্বর গোয়ার ‘মুক্তি দিবস’ পালন করা হয়। ওই দিন সব স্কুল,কলেজ আর সরকারী অফিসে ছুটি থাকে।”

প্রথমদিকে বেশ মন দিয়ে শুনলেও এখন আর গোয়ার ইতিহাস শুনতে একেবারেই ভালো লাগছিল না ঋকের। বার বার মনে পড়ছিল বেদান্তের কথা। বেদান্ত ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। সেই প্লে-স্কুলে পড়ার সময় থেকে ওদের বন্ধুত্ব। লাস্ট ইয়ার ক্রিসমাসের ছুটিতে ওরা সবাই মিলে লোনাভালা বেড়াতে গিয়েছিল। কি মজাটাই না হয়েছিল তখন। দুজনে মিলে কত রকমের চিক্কি টেস্ট করেছিল, কাজু চিক্কি, রাজগীরা চিক্কি, ড্রাই ফ্রুট চিক্কি। পাছে পেটে ব্যাথা হয় তাই মাম্মি আর মেঘনা আন্টি বার বার বারণ করছিল। কিন্তু ঋষভ আঙ্কেল বলেছিল,”ওদেরও একটু মজা করতে দাও। একদিন এ সব খেলে কিছু হবে না।” কি ভালোই না হোতো যদি এবারেও ওরা ঋকদের সাথে আসতো। সবাই মিলে কি সুন্দর সমুদ্রে স্নান করা যেতো। কিন্তু ওরা আসবে কি করে, বেদান্তের যে হাই ফিভার। জ্বর হয়েছে বলে তিন-চার দিন ও স্কুলেও আসেনি। বেদান্ত কেমন আছে জানার জন্য মাম্মি কাল সন্ধ্যায় মেঘনা আন্টিকে ফোন করেছিল। আন্টি বলেছে, বেদান্তের ব্লাড টেস্ট করতে দিয়েছে, রিপোর্ট পেতে দিন দুয়েক লাগবে।

(২)

আজ ঋকের জন্মদিন। ওরা ভারকা বিচের যে রিসর্টটায় রয়েছে সেটা লোকালয় থেকে বেশ খানিকটা ভেতরে। আর ধারেকাছে কোনো দোকানপাটও নেই। তাই ড্যাডি কাল আসবার পথেই ঋকের বার্থ-ডে কেক কিনে নিয়েছিল। আজ সকালে কেক কাটার পর ওরা গিয়েছিল সমুদ্র দেখতে। সকালের নরম রোদে একেবারে অন্য রকম লাগছিল সমুদ্রটাকে। ঋকের ইচ্ছা ছিল অনেকক্ষণ ধরে সমুদ্রে স্নান করবে। কিন্তু ড্যাডি তাড়া দিল। কারণ ড্যাডি প্ল্যান করেছে আজ পানাজি যাবে। পানাজি হল গোয়ার স্টেট ক্যাপিটাল। পর্তুগিজরা পানাজিকে, পাঞ্জিম বলত। যাওয়ার পথে দেখে নেওয়া হবে ওল্ড গোয়ার বিখ্যাত চার্চ, ‘ব্যাসিলিকা অফ বম জেসাস’। দুপুর বারোটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত সব চার্চ বন্ধ থাকে। তাই চার্চ দেখতে হলে আর দেরী করা চলবে না।
পুনাতে যেমন একটু দূরে দূরেই সাঁইবাবার ছোট্ট ছোট্ট মন্দির আছে, গোয়াতেও তেমনই রয়েছে ছোট ছোট চার্চ। ড্যাডি অবশ্য বলেছে এগুলো ঠিক চার্চ নয় এদের বলে চ্যাপেল। খ্রীষ্টানেরা এখানে প্রভু যীশুর আরাধনা করে, তাঁর কাছে নিজেদের প্রার্থনা জানায়। চ্যাপেলের থেকে চার্চ একটু বড় হয় আর তাদের নির্দিষ্ট মনাস্টিক কমিউনিটি থাকে। আর যে সব বড় বড় চার্চে বিশপের আসন বা ক্যাথিড্রা রাখা থাকে তাদের বলে ক্যাথিড্রাল।
‘ব্যাসিলিকা অফ বম জেসাস’ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল ঋক। এতো বড় চার্চ ও এর আগে কখনও দেখেনি। চার্চের ভিতর কি সুন্দর সোনালী রঙের কারুকার্য করা রয়েছে। চোখ ভরে সে সব দেখতে লাগল ঋক। মাম্মি বলল, এই চার্চটাকে ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মার্যাদা দিয়েছে। এখানে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের মরদেহ রাখা আছে। ১৫৯৪ সালে এই চার্চ তৈরির কাজ শুরু হয় আর শেষ হয় ১৬০৫ সালে।
লাঞ্চ করার জন্য ড্যাডি আগে থেকেই ওল্ড গোয়ার এক রেস্তোরাতে টেবিল বুক করে রেখেছিল। তবে আজ আর সাহেবি খানা নয়, আজ খাওয়া হবে সাদা ভাত আর তার সাথে গোয়ার স্পেশাল গোয়ান ফিস কারি। ঘন ঘন ঝোল দিয়ে ভাত মেখে এক চামচ মুখে তুলতেই ঋক বুঝতে পারল গ্রেভিটা নারকেলের দুধ দিয়ে তৈরি। তবে দিদার তৈরি চিংড়ি মাছের মালাইকারির থেকে একেবারেই আলাদা। ভরপেট খাওয়ার পর একটু মিষ্টি না খেলে চলে? তাই অর্ডার করা হল গোয়ান ডেসার্ট ‘বিবিংকা’। দেখতে চৌকো কেকের মতো হলেও এটা আসলে একধরনের পুডিং। ডিম, চিনি ময়দা, মাখন আর নারকেলের দুধ দিয়ে তৈরি। আমসত্বে যেমন আলাদা আলাদা স্তর থাকে বিবিংকাতেও তেমনই বেশ কয়েকটা স্তর রয়েছে।
রেস্তোরা থেকে বেরিয়ে যাওয়া হল, ডোনাপাওলা বিচ দেখতে। এখানে ঋক দূর থেকেই সমুদ্র দেখল, কারন সমুদ্রের ধার বরাবর রয়েছে লোহার রেলিং। পার্কে যেমন হেলান দিয়ে আরাম করে বসার জন্য বেঞ্চ থাকে এখানেও তেমনই বসে বসে সমুদ্র দেখার জন্য বেঞ্চ রয়েছে। ড্যাডি বলল পুরোনো দিনের অনেক সিনেমার শুটিং হয়েছে এখানে। রেলিং ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা চাতালের মতো জায়গায় চলে এল ওরা। চারপাশে কত দোকান, বেশিরভাগই দোকানেই নানা ধরনের টুপি আর নকল গোলাপফুল দিয়ে তৈরি হেয়ারব্যান্ড বিক্রি হচ্ছে। ঋক একটা বড়সড় ডার্ক ব্রাউন কালারের কাউবয় হ্যাট নিল। ড্যাডি নিল ব্ল্যাক বর্ডার দেওয়া অলিভ গ্রিন ফেডোরা। আর মাম্মি টুপি না নিয়ে, ছোট ছোট লাল গোলাপ দেওয়া একটা হেয়ারব্যান্ড কিনে টুপির মতো করে পরে নিল। তারপর ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে তুলে নিল ওদের হাসিমুখের সেলফি।
খাওয়াদাওয়ার পর আর বেশি ঘোরাঘুরি করতে ভালো লাগছিল না। তাই ড্যাডি ঠিক করল, এখন রিসর্টে ফিরে যাওয়া হবে। বিকেলে যাওয়া হবে কোলভা বিচ, ওটা ভারকা থেকে বেশ কাছে। আর কাল ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়া হবে বাকি বিচগুলো দেখতে। মীরামার, আঞ্জুনা, কালাংগুটে, মরজিম, বাগা, কতো বিচ রয়েছে গোয়াতে।

(৩)

কাল পুনা ফিরতে হবে। রাস্তার যা হাল তাতে প্রায় দশ-বারো ঘণ্টা লাগবে পুনা পৌঁছাতে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রওনা হতে হবে। কাল সকালে আর সমুদ্র দেখা হবে না। তাই পড়ন্ত বিকেলে ঋকেরা আবার চলে এসেছে রিসর্টের লাগোয়া সি-বিচে, গোয়া ছেড়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো খালি পায়ে বালিতে হাঁটতে, সমুদ্রের ঢেউ পায়ে লাগাতে।
রেজিস্টারে নাম আর রুম নাম্বার লিখে সমুদ্রের দিকে এগোতেই প্রবালের মোবাইল বেজে উঠল। অফিস থেকে ফোন এসেছে। হাইওয়ের হাল-হকিকত নিয়ে লেখা আর্টিকলটার ব্যাপারে এডিটর সাহেব কথা বলতে চান। কালই স্টোরিটা মেল করেছিল প্রবাল। সাঁকো থেকে নেমে সমুদ্রের দিকে না এগিয়ে প্রবাল শুকনো বালির ওপর দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে লাগলো। ঋক আর মধুরিমা এগিয়ে চলল সমুদ্রের দিকে। কুর্তির পকেট থেকে মোবাইল ফোনটাকে বের করে দিকচক্রবালে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাওয়া সূর্যের ভিডিও তুলতে লাগল মধুরিমা। বাবা-মাকে ব্যস্ত দেখে ঋক আর তাদের বিরক্ত করল না। ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে আশেপাশের বালি সরিয়ে সরিয়ে দেখতে লাগল যদি দু-একটা ঝিনুক পাওয়া যায়।

“শরদ, এই শরদ এদিকে আয়। এখানে অনেক ঝিনুক আছে। আমরা দুজনে মিলে কুড়োবো।”, হঠাৎ বেদান্তের ডাক শুনে চমকে উঠে সেদিকে তাকালো ঋক। একটু দূরে ঢেউয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বেদান্ত। হাসিমুখে ওকে ডাকছে। ঠিক যেমন টিফিনের সময় খেলতে যাওয়ার জন্য ডাকে। ঋকের ভালোনাম শারদঅর্ঘ্য, দূর্গাপুজোর কয়েকদিন আগে জন্ম হয়েছিল বলে দাদু ভালোবেসে এই নামটা রেখেছিল। তবে বেদান্ত এতো বড় নাম বলতে পারে না, তাই ও ঋককে শরদ বলে ডাকে। ঋক ঠিক দেখছে তো? সত্যি সত্যি বেদান্ত ওখানে দাঁড়িয়ে আছে? চোখ কচলে নিয়ে আবার একবার সেদিকে তাকিয়ে দেখল ঋক।
“কি অতো ভাবছিস? তাড়াতাড়ি আয় না। না হলে ঝিনুকগুলো ঢেউয়ের সাথে আবার সমুদ্রে ফিরে যাবে।”, তাহলে মনের ভুল নয়, ঋককে সারপ্রাইজ দেবে বলে বেদান্ত গোয়াতে চলে এসেছে। আনন্দে বেস্টফ্রেন্ডের দিকে ছুটে গেল ঋক। বেদান্ত ওর দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বেদান্তের হাতটা ধরার জন্য ঋকও হাত বাড়িয়ে দিল, আর ঠিক তখনই একটা মস্ত বড় ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিল ঋককে। আচমকা ঢেউয়ের ধাক্কায় টাল সামলাতে না পেরে বালির ওপর পড়ে গেল ঋক, একগাদা নোনা জল ঢুকে গেল ওর নাকেমুখে। চোখের পাতায় বালি লেগে আছে তাই চোখ খুলতে না পারলেও ঋক বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারল ফিরতি ঢেউয়ের টানে বালি সরে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি আর তার সাথেই ও এগিয়ে যাচ্ছে গভীর সমুদ্রের দিকে।

(৪)

পাতলা কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে, স্যুইটের সোফায় বসে হট চকোলেটের কাপটাতে অনিচ্ছাসত্বেও দু-একটা চুমুক দিচ্ছিল ঋক। সামনের ছোট টেবিলে দুটো প্লেটে ওর পছন্দের মেক্সিকান মশলা দেওয়া পোট্যাটো চিপস আর চকোচিপস কুকি রাখা থাকলেও সেগুলো একেবারেই খেতে ইচ্ছা করছে না ঋকের। বিকেলের ঘটনাটার কথা মনে পড়লেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে, হাত-পা কাঁপছে ঠকঠক করে।

“আপনিই তাহলে বিখ্যাত লেখক চিহ্ন চট্টোপাধ্যায়। আপনার লেখা ‘অলৌকিকের টানে’ বইটা যে কতবার পড়েছি। আচ্ছা, সত্যিই কি আপনার সাথে ওই ঘটনাগুলো ঘটেছিল?” মাম্মির প্রশ্ন শুনে পাশে বসা ভদ্রলোকের দিকে তাকালো ঋক। আজ উনি না থাকলে যে কি হোতো? ঋক বোধহয় তলিয়েই যেতো সমুদ্রে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা আর রিমলেস চশমা পরা আঙ্কেলের গায়ের রংটাও ধবধবে ফর্সা। আঙ্কেল ড্যাডির থেকে লম্বা, মানে ফাইভ ফিট সেভেন ইঞ্চের ওপর হাইট। চেহারাটা রোগা হলেও পাতলা পাঞ্জাবির ভিতর দিয়ে মাশলগুলো বেশ বোঝা যাচ্ছে। লম্বা টিকালো নাক আর একমাথা কোঁচকানো চুল। ঋক একবার মাম্মির মোবাইলে গ্রিক গড অ্যাপোলোর ছবি দেখেছিল, পাসপোর্ট ফটোর মতো বুক অবধি ছবি। আজ আঙ্কেলকে দেখে বার বার সেই ছবিতে দেখা অ্যাপোলোর কথা মনে পড়তে লাগল ঋকের।

“আজ থেকে বছর বারো আগে, তখন আমার ঊচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে। কেমিস্ট্রি পরীক্ষার দিন সকালে আমার দাদু মারা যান। অন্যান্য সাবজেক্টে ভাল হলেও কেমিস্ট্রিতে আমি বরাবরই বেশ কাঁচা। তাই রেজাল্টের আগের দিন বেশ চিন্তায় ছিলাম। কেমিস্ট্রিতে পাশ করতে পারবো তো?”, ডান হাতের মুক্তোর আংটিটা ঘোরাতে ঘোরাতে চিহ্ন চট্টোপাধ্যায় বলে চললেন,”রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছি, হঠাৎ দেখলাম মাথার পাশে দাদু দাঁড়িয়ে। আমার কপালে হাত বুলিয়ে দাদু বলল, চিন্তা করিস না, তুই ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করবি। আমি সে বার সেভেনটি টু পারসেন্ট নম্বর পেয়ে পাশ করেছিলাম। সেই শুরু, তারপর থেকে মাঝে মাঝেই আমার এ ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে।”

“তা এখানে কি মনে করে? শুধুই বেড়ানো না কি কোনো ভুতের সন্ধান পেয়েছেন?”, হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল প্রবাল।
“এক ঢিলে দুই পাখি, বলতে পারেন। গোয়া দেখার ইচ্ছা অনেকদিন ধরেই ছিল। আর এখান থেকে পনেরো-ষোলো কিলোমিটার দূরে রয়েছে রাইয়া নামের একটি ছোট্ট গ্রাম। ওই গ্রামে একটি বাঁধ আছে, নাম ইগরশেম। সেখানে না কি দিনের বেলা, মানে দুপুর দুটো থেকে তিনটের মধ্যে ভুত দেখা যায়। ঠিক করেছি, কাল একবার জায়গাটা দেখে আসবো।”
“তার মানে আপনি মানেন যে ভুত আছে?”
“দেখুন, ভুতের ব্যাপারে এখনই কিছু বলতে চাই না। ওটা অনেক বড় স্পেকট্রাম। তবে এটুকু বলতে পারি যে আত্মা আছে। মৃত্যুর পর দেহ পঞ্চভুতে বিলীন হয়ে গেলেও আত্মা অবিনশ্বর। সে বার বার ফিরে আসতে চায় তার আপনজনদের কাছে। আর শুধু মৃত্যুর পরেই নয়, কিছুক্ষেত্রে মৃত্যুর আগে যখন পার্থিব শরীরের সাথে বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়, তখন অনন্তের পথে পা বাড়াবার আগে আত্মা আসে তার প্রিয়জনদের সাথে দেখা করতে। অজানা পথের সঙ্গী করে নিতে চায় তাদের।”
প্রবালের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়ার পর চিহ্ন চট্টোপাধ্যায় এবার ঋকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,”আজ বিকেলে ঠিক কি হয়েছিল ঋকবাবু? তুমি ওভাবে ঢেউয়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লে কেন?”

ঋক যা যা দেখেছিল তা সবই বলল তার চিহ্ন আঙ্কেলকে। সব শুনে উনি বললেন, “আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে আমরা যা অনুভব করি তা অনেক সময় ঠিক হয় না। তাই সব সময় সবকিছু নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বিচার করে দেখবে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় মানে কি জানো তো? ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হল মন। তুমি একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারতে তোমার বন্ধুর পক্ষে অসুস্থ শরীরে এতদূর আসা অসম্ভব।” তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,”আমি এখন আসি। আজ বিকেল থেকে আপনাদের ওপর যা গিয়েছে, আপনারা বরং এখন একটু বিশ্রাম নিন। কাল তো আবার সকাল সকাল রওনা হবেন।” চিহ্ন চট্টোপাধ্যায়ের মোবাইল নম্বর নিয়ে তাকে বিদায় জানালো প্রবাল আর মধুরিমা। হট চকোলেটটা অনেকক্ষণ আগেই ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। ঋক সেটা ফেলে রেখে, বিছানায় উঠে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল।

(৫)

সকালে চা খেতে খেতে মধুরিমা মোবাইল ফোনের ইন্টারনেট অন করল। কাল ফিরতে ফিরতে রাত পৌনে দশটা হয়ে গিয়েছিল। ঘরে ঢুকেই হাত ধুয়ে, কুকারে করে চাল,ডাল আর আলু একসাথে সেদ্ধ বসিয়ে দিয়েছিল মধুরিমা। সবার হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতে হতে ভাতেভাত রেডি।
প্রবালের মেল করা স্টোরিটা আজকের খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে। একমনে সেটাই পড়ছিল প্রবাল। ঋক বিরক্তমুখে দুধ-কর্নফ্লেক্স খাচ্ছে। মধুরিমার মোবাইলে টিং টিং শব্দ করে হোয়াটশঅ্যাপ মেসেজগুলো একে একে এসে চলেছে। বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয়। সেগুলোকে একে একে ডিলিট করতে লাগল মধুরিমা। হঠাৎ একটা মেসেজে চোখ আটকে গেল মধুরিমার। বেদান্তের মা মেঘনার মেসেজ। ঋকের ক্লাসমেটদের মায়েরা মিলে যে হোয়াটশঅ্যাপ গ্রুপটা বানিয়েছে তাতেই এসেছে মেসেজটা, ওরা যেদিন গোয়া রওনা হয়েছিল সেদিন সন্ধ্যায়। এ সব কি লেখা রয়েছে মেসেজটাতে? ফোনটাকে কাছে এনে আর একবার ভালো করে পড়ে দেখল মধুরিমা। মেঘনা লিখেছে, হঠাৎই বেদান্তের শরীরটা খারাপ হয়ে পড়াতে ওকে হসপিটালে ভর্তি করতে হয়েছে। ডাক্তার বলেছে, ওর রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা বেশ কম। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে সবকিছু ঠিক না হলে বেদান্তের আর বাঁচার আশা থাকবে না। বেদান্তের জন্য আমার সাথে তোমরাও ভগবানের কাছে প্রার্থনা কর।

তাড়াতাড়ি মেঘনার নাম্বারে ফোন করল মধুরিমা। রিং হয়ে হয়ে থেমে গেল, ওপাশ থেকে কেউ ফোন ধরল না। আর একবার ফোন করতে যাবে এমন সময় ঋকের দিকে চোখ পড়তেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল মধুরিমার, ভয়ে বুক কেঁপে উঠল, শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এল হিমশীতল স্রোত। বার বার মনে পড়তে লাগল চিহ্ন চট্টোপাধ্যায়ের বলা কথাগুলো,”যখন পার্থিব শরীরের সাথে বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়, তখন অনন্তের পথে পা বাড়াবার আগে আত্মা আসে তার প্রিয়জনদের সাথে দেখা করতে। অজানা পথের সঙ্গী করে নিতে চায় তাদের।”

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত