| 19 জুন 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

বাচ্চা ভূত টুনু এবং…

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

 

 

কলিংবেলটা বেজে উঠলো। ঘড়িতে বাজছে দুপুর ৩.৩০টা। ফারিয়া বসে বই পড়ছিলো। আওয়াজ শুনে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলেন। অন্তুু এসেছে। হাফাতে হাফাতে ঘরে ঢুকেই কাধের ব্যাগটা ছুড়ে দিয়ে ধাম্ করে সোফায় বসে পড়লো। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। ফারিয়া ছেলের কাছে যেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন,
-কিরে, খুব ক্লান্ত?
-আর বলোনা আম্মু। স্কুল করে আবার প্রাইভেটে দৌড়াদৌড়ি। আর ভাল লাগে না।
-আচ্ছা। কি আর করা। যা হাত মুখ ধুয়ে আয়। খেতে দিচ্ছি।
-ঠিক আছে, বলে উঠে চলে যায় অন্তুু।

অন্তু ক্লাস সেভেনে এ পড়ে। পড়াশোনার এখনই যা চাপ, সে দম ফেলতেও সময় পায় না। আজকাল কি যে হয়েছে, স্কুলে টিচাররা ঠিকভাবে পড়ান না। এই কারণে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়তে যেতে হয়। বাসায় এসে রেস্ট নিয়ে নিজে পড়তে বসতে বসতে সন্ধ্যা লেগে যায়। খেলাধুলাও করতে যেতে পারেনা। এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ফারিয়া। রাত ১১.৩০টা। অন্তুু নিজের ঘরে বসে বসে গল্পের বই পড়ছে। এতক্ষণ পড়াশোনা করে ভাবলো একটু বসাই যায় বইটা নিয়ে। খুব ইন্টারেস্টিং একটা বই। ভূতের গল্প। একটা বাচ্চা ভূতকে নিয়ে। নাম টুনু। এর কান্ডকারখানা এমন! অন্তুু ভয় পাবে কি, ও তো হাসতে হাসতেই গড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে ওর বাবা আসলেন,
-কিরে এখনও ঘুমাসনি?
-না আব্বু।
-কাল ক্লাস নেই?
-আছে। ঘুমাবো একটু পরই।
-আচ্ছা। ঘুমিয়ে পড়িস তাড়াতাড়ি। গুড নাইট।
-গুড নাইট।
পুরো নীরব হয়ে গেছে বাসা। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্তুু বই পড়ছে আর একটু পর পর হেসে উঠছে। হঠাৎ, একটা শব্দে ও চমকে উঠলো। কেউ যেন মনে হচ্ছে কথা বলে উঠলো। পাশে তাকিয়ে অন্তুু দেখে একটা বাচ্চা পা ঝুলিয়ে বসে আছে। ও হা করে কতক্ষণ তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলে, এটা কে? কোথা থেকে আসলো? ঠিক এই সময় বাচ্চাটা কথা বলে উঠলো,
-আমাকে চিনতে পেরেছো?
-নাতে! তুমি কে?
-চিনো নি? আমি তো টুনু।
-টুনু?! তুমি এই বইয়ের ভূতটা?
এই কথা বলে অন্তু একবার হাতে রাখা বইটার দিকে তাকালো।
-তুমি এই বইটা থেকে কিভাবে বের হয়ে এলে?
-আরে আমি তো ভূত। তাই আমি অনেক কিছু করতে পারি।
-ইইই! সত্যি?
-হ্যাঁ।
-মজার মজার খাবার এনে দাও তো।
-এটা তো পারবো না। আমার বাবা এটা পারবে। আমি তো ছোটখাটো কিছু কাজ করতে পারি।
-যেমন?
হঠাৎ অন্তু দেখে যেখানে ভূতটা ছিল, ওখানে কিছু নেই। ও ভাবলো, নিশ্চয়ই এতক্ষণ ভুল দেখেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আবার টুনুকে দেখলো অন্তুু। জিজ্ঞেস করলো-
-কোথায় গিয়েছিলে?
-অদৃশ্য হয়ে গেলাম। এটা আমি ভালই পারি।
-বাহ্! মজা তো।
টুনু খুক খুক করে হাসতে থাকে অন্তুর কথা শুনে। অন্তুুর কথা শুনে।
-তা হঠাৎ তুমি আমার কাছে এলে কেন?
কৌতুহলী হয়ে অন্তু জিজ্ঞেস করে টুনুকে,
-আমি ভাবলাম, তোমাকে কিছু ব্যাপারে সাহায্য করবো। তাই চলে এলাম।
-সাহায্য করবে? কি নিয়ে সাহায্য করবে?
অবাক হয় অন্তুু। কি বলে বাচ্চা ভূতটা?
-হ্যাঁ। সাহায্য করবো। আমি তোমার স্যারকে ভয় দেখাবো। ভয়ঙ্কর চমকে ওঠে অন্তুু। জিজ্ঞেস করে, ভয় দেখাবে? কোন স্যরকে? আর কেন?
-আরে দাড়াও দাড়াও। এতগুলো প্রশ্ন একসাথে করলে কিভাবে হবে? আমি তো বাচ্চা। একটু আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করো।
-আচ্ছা ঠিক আছে। বলো তো, কি করবে তুমি?
-তুমি যেই অঙ্ক স্যারের কাছে পড়তে যাও? তাকে আমি ভয় দেখাবোএ
-কিন্তু কেন?
-কারণ আমি জানি, সে তোমাদের ক্লাসে না পড়িয়ে প্রাইভেট পড়ায় বাড়তি টাকার জন্য।
-এটা অবশ্য ঠিকই বলেছো। কিন্তু তুমি কি করে জানলে?
-আমি দেখেছি। আমি এটাও দেখেছি সে ভাবে, ‘আজ ক্লাসে পড়াবো না। তাহলে বাচ্চারা প্রাইভেটে পড়তে আসবে।’
অন্তুু এই কথাগুলো শুনে তেমন অবাক হলো না। আনিস স্যার কেমন যেন। তিনি ক্লাসে এসে বসে থাকেন, ঠিকমত পড়ান না। ক্লাসের ছেলেদের চুপ করে বসে থাকতে বলেন। আর তার কাছে যখন সবাই পড়তে যায়, তখন ঠিকই পড়ান। এই পড়াটা ক্লাসে পড়ালেই তো হয়।

-কিভাবে ভয় দেখাবে তুমি? অন্তুু টুনুকে জিজ্ঞেস করলো।
-আরে, সেটা কালই দেখতে পাবে। এখন ঘুমিয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়েছে। এই কথা বলে টুনু অদৃশ্য হয়ে গেলো। অন্তুু কতক্ষণ খুঁজে দেখলো। কেউ নেই। কি আর করা। বই বন্ধ করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো সে। এই কথা, সেই কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লো অন্তুু।

৭টা বাজে। ফারিয়া ঘরে এসে দেখে অন্তুু অঘোরে ঘুমুচ্ছে। ‘আরে এখনও উঠিসনি? স্কুলে যাবি না?’ বলতে বলতে অন্তুুকে ডাকা শুরু করলো ফারিয়া। ধড়ফড় করে উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে অন্তুু। এত দেরি হয়ে গেছে? তাড়াহুড়া করে রেডি হয়ে স্কুলে দৌড় দিল সে। সারাদিন ক্লাস, আড্ডা দিয়ে কেটে গেলো। আজ আনিস স্যারের বাসায় পড়তে যেতে হবে। স্কুল থেকে সোজা রওনা দিল অন্তুু। এর মধ্যে হঠাৎ ওর টুনুর কথা মনে হলো। স্কুলে আসার পর ও তো ভুলেই গিয়েছিল যে কাল রাতে কিছু ঘটেছে। ওর হঠাৎ মনে হল ও স্বপ্ন দেখেনি তি। এই কথাটা ভাবতেই টুনু সামনে এসে দাড়ালো-
-উফ! বাবা। আমি সত্যিই আছি। আজ দেখবে আমার কারসাজি। হুহু!
অন্তুু টুনুর কথা বলার ধরন দেখে হেসে ফেললো,
-আচ্ছা ঠিক আছে।

সব ছেলেরা বসে আছে ক্লাসে। স্যার এসে ঢুকলেন। অন্তুর একটু ভয় ভয় করতে লাগলো। স্যারের পেছন পেছন টুনু ঢুকছে। কিন্তু স্যার মনে হয় টুনুকে পাচ্ছেন না। কি যে হবে আজ কে জানে।কতগুলো অঙ্ক বোঝানোর পর স্যার ওদের কিছু অঙ্ক করতে দিলেন। সবাই তাড়াতাড়ি করা শুরু করলো। তবে অন্তু আজ কোনভাবেই মনযোগ দিতে পারছে না। একটু পর পর তার চোখ স্যারের দিকে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ অন্তু খেয়াল করলো স্যারের মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। আবার মনে হলো কেউ যেন তার মুখ চেপে ধরেছে। চোখ দুটো বড় হয়ে গেছে। কয়েক মুহূর্তেই অন্তু টুনুকে স্যারের কানের পাশে কথা বলতে দেখলো। এত দূর থেকে কি বলছে টুনু সেটা শোনা যাওয়ার কথা না ঠিকই। তবে অন্তু খেয়াল করলো সে সব কথাই শুনতে পাচ্ছে।
-কিঁ স্যাঁর? ভাঁলো আঁছেন? আঁপনি তোঁ খুঁবই ভাঁল আঁছেন দেঁখছি! বাঁচ্চাদের ক্লাঁসে নাঁ পঁড়িয়ে প্রাঁইভেট পঁড়ান? বাঁড়তি টাঁকা নেঁন? আঁজ থেঁকে এঁগুলো বঁন্ধ কঁরবেন। নাঁ হঁলে এঁমন অঁবস্থা কঁরবো যাঁ আঁপনি স্বঁপ্নেও ভাঁবতে পাঁরবেন নাঁ। বুঁঝেছেন?
স্যার প্রশ্নের উত্তর আর কি দেবেন, তিনি মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন!

আনিস স্যার এরপর থেকে আর একদিনও ক্লাসে না পড়িয়ে বসে থাকেন না। অঙ্ক করান। ছাত্রদের এখন আর আলাদা করে প্রাইভেট পড়তে যেতে হয় না। অন্তু টুনুকে থ্যাঙ্ক ইউ বলেছিলো। আর-
-আচ্ছা, তুমি স্যারকে আপনি করে বললে কেন? তুমি তো ভূত!
-আরে, আমি তো ছোট। উনি আবার স্যার মানুষ। মাইন্ড করলে সমস্যা। তাই একটু সম্মান করলাম।
-হাহাহাহা!

টুনু এরপর থেকে অন্তুর কাছেই আছে। ওরা দুজন এখন বন্ধু হয়ে গেছে। খুব ভাল বন্ধু।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত