| 20 মে 2024
Categories
শিশুতোষ সাহিত্য

রিকি ও তার বাহারি চশমা

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

হরিণ শিশু রিকি সারাক্ষণ মার সঙ্গে ঘ্যান ঘ্যান করে, ‘আমাকে শেয়াল পন্ডিতের মতো একটা চশমা এনে দাও, চশমা এনে দাও।’
আহা! আমার যদি একটা চশমা থাকত! শেয়াল পন্ডিতকে বনের পশু-পাখি সবাই কত্ত সম্মান করে! সব ঐ চশমার গুণ! চশমার কারণেই তার এত এত সম্মান! আমি চশমা পরলে আমাকেও সবাই শেয়াল পন্ডিতের মতো সম্মান করবে। দারুণ মজা হবে!
মা বলেন, ‘ছি! বাবা, এমন জেদ করতে নেই। তুমি হরিণ শিশু, দেখতে কত্ত সুন্দর! কী সুন্দর মায়াবি তোমর চোখ, কী বাহারি তোমার গায়ের চামড়া! বাদামী চামড়ায় কি সুন্দর সাদা ছোপ, তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। এমন বাহারি চামড়া বনের আর কোন পশু-পাখির কী আছে? আর শিং জোড়া সে আর কী বলব! সবকিছু মিলিয়ে তোমার রূপের প্রশংশায় সবাই পঞ্চমুখ। দেখতে সুন্দর হওয়ায় সবাই তোমাকে কত্ত ভালোবাসে। শুধু কি বনের পশুপাখি? মানুষরা তোমার সৌন্দর্যের প্রশংসা করে। তোমার চোখজোড়া নিয়ে কত কবি কত কত কবিতা লিখেছেন। কবিরা বড় বড় চোখের সুন্দর মেয়েদের সম্পর্কে লেখেন, ‘হরিণের মতো ডাগর-নয়না সুন্দরী!’ হরিণীর মতো চোখের মেয়ের প্রেমে পড়ে সবাই। নিজের যা আছে তাই নিয়েই সুখে থাকতে হয় বাবা। না হলে বিপদে পড়তে হয়।’
রিকি রেগেমেগে মাকে বলে, ‘ওসব নীতিকথা রাখো তো বাপু। আমার শেয়াল পন্ডিতের মতো চশমা চাইই, চাই।’

চশমার খোঁজে সে সারাদিন বনেবাদাড়ে ঘুরে ঘুরে হয়রান! হতাশ হয়ে সন্ধ্যায় ফিরে মাকে বলে, ‘নাহ, বনে তো কোথাও পেলাম না চশমা। যাই একবার শহরের দিকে। ওখানে গেলে ঠিক ঠিক একটা চশমা পেয়ে যাব। শহরের ছেলেমেয়েরা জাহাজে চড়ে যখন এই সুন্দরবনে বেড়াতে আসে তখন লাল, নীল, সবুজ কত রং-বেরংয়ের বাহারি চশমা পরে থাকে! আমারও বাপু ওরকম একটা বাহারি চশমা চাই। শেয়াল পন্ডিতের চশমাটার তো কোন রংই নেই। দেখতে একটুও সুন্দর নয়।’

শহরে যাওয়ার কথা শুনে, মার বুকটা ধক করে ওঠে। রিকিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘ওমন কথা বলো না সোনা মানিক। শহরে পদে পদে বিপদ। শহরে গেলে তুমি আর বেঁচে ফিরতে পারবে না বাবা। শহরের মানুষরা তোমাকে দেখলেই ধরে ফেলবে। আর শহরে কত বড় বড় গাড়ি ঘোড়া চলে। তুমি সেগুলোর নীচে পড়ে মারা পড়বে বাবা।’
‘কী যে বোকার মতো কথা বলো না তুমি! রাতের অন্ধকারে ওরা তো আমাকে দেখতেই পাবে না মা। আর দেখতে পেলেই কী, আমাকে ধরতে এলে আমি শিংজোড়া দিয়ে এমন গুতো দিব, ওরা বাপ বাপ করে পালাবে। আর গাড়িঘোড়ার নীচে পড়ব কেন? আমার কী চোখ নেই?’
রিকি তিড়িংবিড়িং করে শহরের দিকে চলল। মা অনুনয় করতে লাগল, ‘যাসনে মানিক, যাসনে সোনা। শোন, আমার কথা শোন। ওরে যাসনে, মারা পড়বি। একদম মারা পড়বি।’
রিকি মার কথা শুনল না। মা রিকির চিন্তায় অস্থির হয়ে কান্নাকাটি শুরু করল।

বন পেরিয়ে রিকি শহরের দিকে এগুতে থাকে। শহরের বড় রাস্তায় ওঠার পর ওর মন খুশিতে নেচে ওঠে। কী সুন্দর লাল, নীল, সবুজ, হলুদ বাতি! আহা! শহরে যদি থাকতে পারতাম! জীবন ধন্য হতো। পোঁ পোঁ পোঁ! কান ফাটানো তীব্র শব্দে দানবের মতো একটা ট্রাক ছুটে এলো মুহুর্তেই। ভয়ংকর সেই শব্দে রিকির হৃৎপিন্ডটা তিড়িং করে লাফিয়ে ওঠে। রিকি দ্বিগবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে ছুটতে শুরু করে।

বড় বড় ট্রাক আর বাসের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে ছুটতে থাকে সে। কয়েকবার সে বাস আর ট্রাকের তলায় পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে ময়লার একটা ডাষ্টবিনের কাছে চলে আসে রিকি। ডাস্টবিনের মধ্যে লাল একটা জিনিসের উপর তার চোখ আটকে যায়। ওয়াও! চশমা! রিকির মন খুশিতে নেচে উঠে। লাইটপোষ্টের আলো সেই চশমার উপর পড়েছে। লাল রংটা রিকির চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।
রিকি খুশি হয়ে চশমাটা ঝটপট তুলে নিয়ে বলে, ‘শহরে আর এক মুহুর্ত নয়। মা ঠিকই বলেছিল। শহরে পদে পদে বিপদ।’

সে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। খুব সাবধানে ভয়ে ভয়ে ট্রাক আর বাসের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে হাঁটতে থাকে রিকি। ভয়ে রিকির দম আটকে আসে। কারণ বহুবার সে চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে যায়।
বাড়ির কাছাকাছি এসে সে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেয়। যাক আর ভয় নেই। এবার সে খুশিতে নাচতে নাচতে বাড়ির দিকে এগুতে থাকে। বাড়িতে আসতে আসতে ভোরের আলো ফোটে। রিকি চশমাটা পরে খুব ভারিক্কি ভাবে হেলেদুলে হেঁটে বাড়িতে ঢোকে। মা রিকিকে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর করে। রিকি চশমা পরে সারা বন ঘুরে বেড়ায়। বনের সব পশুপাখি রিকিকে দেখে ধন্য ধন্য করে। কী সুন্দর রং, আর কী তার বাহার! শেয়াল পন্ডিতের চশমা এর কাছে কিছুই নয়। সব পশুপাখি রিকিকে দেখলেই সালাম দেয়। অনেক সম্মান করে। রিকির অহংকারে যেন মাটিতে পা পড়ে না। রিকির বন্ধু বান্ধবরা ওর সঙ্গে খেলতে চাইলে রিকি ধমক দিয়ে বলে, আমি তোদের বন্ধু নয়। আমার সঙ্গে তোরা কোন সাহসে খেলতে আসিস? আমি এখন পন্ডিত, হরিণ পন্ডিত। আমাকে তোরা কখনও বন্ধু বলবি না। আমাকে বলবি, পন্ডিত মহাশয়।
ওর বন্ধুরা খুব মন খারাপ করে চলে যায়। আহা! কত দিনের বন্ধুত্ব আমাদের! সুন্দর একটা চশমা পরে এভাবে আমাদেরকে ভুলে গেল রিকি!
মা বলে, ‘এরকম অহংকার করতে নেই বাবা। অহংকার পতনের মূল। বন্ধুরা কত শখ করে তোমার সঙ্গে খেলতে এলো, আর তুমি দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলে। কাজটা একদম ঠিক করলে না বাবা।’
‘আহ্ মা! তোমাকে নিয়ে তো ভারি জানালা দেখছি! তুমি তো কিচ্ছু বোঝ না। আমি এখন চশমা পরি। আমি অন্যদের মতো আর সাধারণ হরিণ নই। আমি হলাম গে পন্ডিত, হরিণ পন্ডিত। আমার প্রেসটিজ আছে না! এখন সাধারণ হরিণদের সঙ্গে খেলা উচিত নয় আমার।’

প্রতিদিন দলে দলে পশুপাখি রিকির বাড়িতে আসে সুন্দর রংয়ের সেই বাহারি চশমা দেখার জন্য। শেয়াল পন্ডিতের চশমা নিয়ে রিকি খুব হাসাহাসি করে, ‘হে! হে! হে! শেয়াল পন্ডিতের চশমার না আছে রং, না আছে ঢং। শেয়াল পন্ডিত চশমা পড়লে দূর থেকে তো বোঝায় যায় না। কালো পিনপিনে চিকন সুতার মতো চশমা! ওটা আবার চশমা হলো নাকি!’

শেয়াল পন্ডিতের কানে সব কথা যায়। একদিন শেয়াল পন্ডিত দূরে দাঁড়িয়ে রিকির চশমা দেখে। সে বুঝতে পারে রিকির চশমার বিপদটা কোথায়। হাজার হলেও পন্ডিত মশায় সে, আগে থেকেই সবকিছু বুঝতে পারে।
এক সকালে রিকি চশমা পড়ে হেলেদুলে হাঁটছে আর মাঝে মাঝে পেছনের দুপায়ে ভর দিয়ে ছোট ছোট গাছের ডাল থেকে কচি কচি পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে। এমনসময় চারিদিক তোলপাড় করা শব্দ! রিকি তাকিয়ে দেখে বনের সব পশু প্রাণপনে ছুটে পালাচ্ছে। একপাল বাঘ তাড়া করেছে। যে যেদিকে পারছে ছুটছে। রিকিও ছুটতে শুরু করল। কিন্তু বনের একটু গভীরে যাওয়ার পর সে আর ভালোভাবে কিছু দেখতে পারছে না। সবকিছু ঝাপসা দেখছে। বিভিন্ন গাছপালার সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। এভাবে ধাক্কা খেতে খেতে রিকির একপাশের শিংয়ের অর্ধেকটা ভেঙ্গে গেল। রিকি কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কেন সে ঠিকমতো দেখতে পারছে না, সবকিছুর সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। আগে তো কখনও এমন হয়নি! এর আগে বহুবার সে বাঘের ধাওয়া খেয়েছে। মুহুর্তেই বাঘের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারতো রিকি। হরিণরা তো দৌড়ানোয় সেরা। আর রিকি সবসময় বন্ধুদের সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় ফার্ষ্ট হয়। কিন্ত রিকির মাথায় ঢুকছে না, কেন সে আজ দৌড়াতে পারছে না? কেন সে ধাক্কা খাচ্ছে? কেন সে সবকিছু ঝাপসা দেখছে। বাঘের পাল ছুটে আসছে। রিকিকে আরও জোরে দৌড়াতে হবে। কিন্তু সে দৌড়াতে পারছে না।

রিকি ভয়ে কন্না শুরু করল। শেয়াল পন্ডিত একটা গর্তের মধ্যে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে রিকিকে দেখছিল। রিকিকে দেখে শেয়াল পন্ডিতের খুব মায়া হলো। আহা! বেচারা রিকি! ছোট্ট হরিণ শিশু! কতই আর বয়স!

আমার ছোট মেয়েটারই বয়সি সে। রিকি কাঁদতে কাঁদতে যখন ওই গর্তের পাশ দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল তখন শেয়াল পন্ডিত গর্ত থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এলো। একঝটকায় রিকির চশমাটা খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আবার গর্তের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। চশমা খোলার সঙ্গে সঙ্গে রিকি সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পেল। তীরের বেগে সে ছুটতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বাঘের নাগালের বাইরে চলে গেল।

বাঘের পাল চলে গেলে বনের সব পশুরা যে যার বাড়ি ফিরে এলো। রিকি ওর ভাঙ্গা শিংজোড়া নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে আসে। মা ওকে অনেক আদর করে বলল, মন খারাপ করো না সোনা মানিক। তোমার সুন্দর শিং জোড়া আবার কিছুদিনের মধ্যেই গজাবে। তুমি আবার আগের মতো সুন্দর হয়ে উঠবে।
রিকি ভাবে, শেয়াল পন্ডিত যদি আমার চোখ থেকে তখন চশমাটা খুলে না নিত তাহলে আমি এতক্ষণ বাঘের পেটে থকতাম। মনেহতেই রিকির ছোট বুকটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। রিকি শেয়াল পন্ডিতের কাছে যেয়ে তাকে ধন্যবাদ দেয়। আর তার চশমা নিয়ে হাসাহাসি করার জন্য মাফ চায়।
ডাগর নয়না ফুটফুটে সুন্দর রিকি এখন সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে বনেবাদাড়ে ছুটোছুটি আর খেলাধুলা করে।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত