| 22 মে 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

জ্যোতিষ্ক

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

দুখিয়ার ছোটো ছেলে জিতু তিন-তিনটে লেটারসহ স্টার মার্কস নিয়ে মাধ্যমিক পাস করেছে। এই গ্রামে এই প্রথম কেউ এমন দুর্ধর্ষ রেজাল্ট করল। এর আগে নরেন মিত্তিরের মেজো ভাইপো হুঁপো আর সরিন মেসোর মেয়ে সাগরিকা কোনো রকমে টেনেটুনে গ্রামের নামটুকু ধরে রেখেছিল।
জিতু যে এভাবে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে সেকথা কখনও কারও মাথাতেই আসেনি। বেঁটেখাটো ছেলেটা সেই ছোট্টবেলা থেকেই কেমন পাগলাটে গোছের। রাস্তায় রাস্তায় একা একা ঘুরে বেড়ায়, নির্জন পুকুরের ধারে চুপচাপ বসে থাকে, নিজের মনে যখন তখন হো-হো করে হেসে ওঠে। সেই ছেলে কিনা সবাইকে এমন করে চমকে দিল।

ভাটপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের ভুবন স্যার অবশ্য জিতুকে বরাবরই একটু বেশি প্রশ্রয় দিয়ে এসেছেন। এর পেছনে অবশ্য একটা রহস্য রয়েছে। সেদিন ভোররাত থেকেই ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছিল। বর্ষার এই ছন্দে সুরে বেজে ওঠা জিতুর খুব পছন্দ। আজ তো আর স্কুলে যাওয়া হচ্ছে না ভেবে জিতু গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নেয়। মুহূর্তের মধ্যে ইচ্ছে নাওয়ে সওয়ার হয়ে সাত সমুদ্র তের নদী পার। রাজকন্যার সঙ্গে দেখা হব হব এমন সময় শ্রীময়ী এসে ঠ্যালা মারে ‘আর কত বেলা পর্যন্ত ঘুমোবি শুনি। বলি পড়াশোনা কি শিকেয় তুলে দিলি বাবা!’ দুর্গাদালানের বড়ো ঘড়িটায় ঢংঢং করে নটার ঘণ্টা বেজে ওঠে। ধড়ফড় করে উঠে বসে জিতু। কোথায় বৃষ্টি? কোথায় কী? কালো মেঘ কেটে গিয়ে সোনার রোদ চারপাশ ধুইয়ে দিচ্ছে।

সত্যিই প্রকৃতি বড়োই অদ্ভুত। কখন যে তার কি খেয়াল হয়। যাকগে এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। জিতু আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে স্নান সেরে গুটি গুটি পায়ে রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মা হাতের কাজগুলো সরিয়ে রেখে ওকে ভাত বেড়ে দেয়। জিতুদের সংসার ছোটো হলেও কাজের কমতি নেই। মা একা হাতে দশভুজা হয়ে সব সামলায়। বাবা ভিন্ রাজ্যে ঠিকা মজুরের কাজ করে আর বড়দা পড়াশোনায় তেমন সুবিধা করতে না পেরে গঞ্জের একটা হোটেলে গিয়ে কাজ নিয়েছে। তিনমাস পরপর দু-এক দিনের ছুটি নিয়ে মায়ের সাথে দেখা করতে আসে। তখন জিতুর জন্য মাখা সন্দেশ, রঙিন ঘুড়ি এসবও নিয়ে আসে। জিতু মাসের পর মাস অপেক্ষা করে থাকে দাদার জন্য। দাদার খুব ইচ্ছে জিতু লেখাপড়া শিখে একটা বিশেষ কেউ হয়ে উঠুক। ও যা যা পারেনি সব যেন জিতু পারে। ওকে নিয়ে ওর দাদার অনেক স্বপ্ন। জিতুর ইস্কুল কলেজে পড়াশোনার কথা ভেবে মাকে লুকিয়ে বাড়তি রোজগারটুকু জমিয়ে রাখে জগন।

জিতুর অবশ্য সেসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। এমনিতেই কি ওর ভাবনার শেষ আছে। শালতলির ঘাটে কৃষ্ণচ‚ড়ার ডালে যেখানে ময়নাপাখির তিনটে ছানা হয়েছে, সেখানে কাল ও একটা মস্ত খরিশকে দেখেছে। সেই থেকে ওর মনটা কেমন অশান্ত হয়ে আছে। যদি মা ময়নাটা বুঝতে না পারে?
যেদিন দাড়িওয়ালা লোকটা স্কুল যাবার পথে একটা চকোলেট দেখিয়ে ওকে ডেকেছিল সেদিনও ওর এমনটা মনে হয়েছিল। তবে খরিশগুলোর জন্যও দুঃখ হয়। বেচারাদের থাকবার জায়গাটুকুও কেমন বেদখল হয়ে যাচ্ছে। ওরাই বা কোথায় যায়? কী করেই-বা খাবারটুকু জোটায়?

জিতু মনে মনে ঠিক করেছে ও বড় হয়ে একটা মস্ত জঙ্গল বানাবে । সেখানে স্যারের কাছে গল্পে শোনা মুগলীর মতো পশু পাখীদের সাথে বন্ধুত্ব করে ওখানেই থেকে যাবে। মা’ র জন্য মন কেমন করলে দাদার মত মাঝে মাঝে এসে দেখা করে যাবে। দিনরাত এইসব ভাবনাতেই ডুবে থাকে জিতু।
খাওয়া শেষ করে বইপত্র গুছিয়ে জিতু স্কুলের দিকে রওনা দেয়। খালপাড় পেরিয়ে ডানদিকের বাঁকটা ঘুরলেই বাঁহাতে জিতুদের স্কুল। নান্টু, মোহীন, ছুটকি, বুবলি বিতানরাও
পাশের গ্রাম থেকে জিতুদের স্কুলে পড়তে আসে। আশেপাশের দু তিনটে গ্রাম মিলিয়ে এই একটায় স্কুল। ভোটের সময় প্রতি বছরই অবশ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট, কাজ পাইয়ে দেবার বিস্তর প্রতিশ্রুতি মেলে। তবে ভোট চুকলেই তারা আর এপথ মারান না। এখানের মানুষগুলোর এসব বিষয় কেমন গা সওয়া হয়ে গেছে। মন ভোলানি কথায় মনের খিদে মিটলেও পেটের খিদে মেটি না। দিন আনা দিন খাওয়া পরিবার সব। সকাল হতে না হতেই বেরিয়ে পড়ে কাজের সন্ধানে তারপর বিস্তর খাটাখাটনির শেষে পাখি ফেরা সন্ধ্যেতে ফিরে আসে নিজের নিজের মাটির দাওয়াতে। ক্লান্তি ভেজা ক্ষুধার্ত শরীরটা এলিয়ে পড়তে চায়। মোটা চালের দুমুঠো ভাত পেটে চালান যেতে না যেতেই স্বপ্নদের দূরে ঠেলে ঘুম নেমে আসে দুচোখ জুড়ে। তবে যারা বেঁচে থাকতেই স্বপ্নগুলোর নাগাল পেতে চায় তারা ঘরদুয়োর ছেড়ে জিতুর বাবাদের মত শহরের দিকে হাঁটা দেয়।
আজ বোধহয় স্কুল বসে যাবে। বড্ড দেরি হয়ে গেছে। জোরে জোরে পা চালায় জিতু। খালপাড়টা পেরিয়ে সবে সবে ডান দিকে বাঁক নিয়েছে এমন সময় জিতুর মনে হল কেউ যেন খুব করুণ সুরে কাঁদছে। জিতুর মনটা মোচড় দিয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে ভুলে গেল স্কুলের কথা, বন্ধুদের কথা।

কান্নার উৎস খুঁজতে খুঁজতে দেখে একটা ফুটফুটে বেড়াল ছানা গর্তের মধ্যে কাদায় আটকা পড়ে কান্নাকাটি জুড়েছে। চারপাশে তাকিয়ে জিতু এমন কাউকে দেখতে পায় না যার সাহায্য নেওয়া যায়। বর্ষার সময় এই সমস্ত চোরা খালগুলো বড় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ওই গর্ত যে কতটা গভীর তা বোঝা খুব মুশকিল। তাছাড়া এইসমস্ত গর্তগুলো হল বিষাক্ত সাপ, বিছে, পোকামাকড়দের আড্ডা।

বেড়ালছানাটার জন্য খুব কষ্ট হয় জিতুর। কি যে করবে এখন। বইখাতাগুলো মাটিতে নামিয়ে এদিক ওদিক খুঁজে একটা মোটা লাঠি জোগাড় করে আনে জিতু। লাঠিটা নামিয়ে দেয় গর্তে। কিন্তু বেড়ালছানাটা কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে। সত্যিই ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে বাচ্চাটা। আহা রে বেচারা! ওর মা নিশ্চয় ওর জন্য চিন্তা করছে খুব। জিতুর নিজের মায়ের মুখটা বার বার ভেসে ওঠে ওর সামনে। ব্যাস …. আর কোনো কিছু না ভেবে গর্তের মধ্যে নেমে পড়ে জিতু, কোলে তুলে নেয় বাচ্চাটিকে। জামার হাতায় কাদা মুছে আদর করে গর্তের পাশে বসায় তাকে। এমন সময় রাস্তার পাশের অর্জুন গাছটার দিকে চোখ পড়ে। সেখান থেকে খুব গোপনে তাকে চোখে চোখে রাখছে একটা মেনি বেড়াল। ওটা সম্ভবত পুঁচকেটার মা।মনে হয় জিতুকে ভয় পেয়ে অর্জুনগাছের আড়ালে লুকিয়েছিল। মায়ের মন তো বিপদ ভেবেই সন্তানকে ছেড়ে যেতে পারেনি।ছানাটার মাকে ওখানে ওভাবে দেখে জিতু মনে মনে খুশিই হয়। ঠোঁটের কোণে একটু মিঠে হাসি ঝুলে পড়ে।জিতুর হঠাৎ মনে পড়ে “এই রে! আজ তো ভুবনবাবু বাংলা রচনা পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। ‘গর্ত থেকে তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে পিছলে আছাড় খায় বেশ কয়েকবার। দু চার জায়গা ছড়েও যায়। তারপর কোনোরকমে সেখান থেকে উঠে কাদামাখা অবস্থাতেই পড়িমরি করে ছুটে গিয়ে হাজির হয় স্কুলের দরোজায়। স্যার তো ওকে ওই অবস্থায় দেখে হকচকিয়ে যান। একটু সময় নিয়ে নিজেকে সামলান ভুবনবাবু। তারপর ভরসামাখা গলায় জিতুকে জিজ্ঞাসা করেন ব্যাপারখানা কি?চোখ বড় বড় করে জিতু বর্ণনা দিতে থাকে পুরো ঘটনাটার। ক্লাসের অন্যছেলেরাও লেখাপড়া ছেড়ে হাঁ করে গিলতে থাকে ওর কথাগুলো। ভুবনবাবুর চোখ থেকে টপটপ করে কয়েকফোঁটা জল ঝরে পড়ে। বুকের মধ্যে চেপে ধরেন জিতুকে। তিনি ঘোষণা করেন আজকের রচনা পরীক্ষায় জিতুই প্রথম। স্কুলের খাতায় নয় তবে জীবনের খাতায় জিতু যে অসামান্য রচনা লিখতে পেরেছে তাকে মূল্যায়ন করার ক্ষমতা বোধহয় পৃথিবীর কোনো শিক্ষকেরই নেই। সেদিনের রচনার বিষয় ছিল ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’।

তাই সেই ছেলে পরীক্ষায় স্টার পাওয়ায় ভুবন স্যার অন্তত অবাক হননি। আসলে এমন জ্যোতিষ্কের সন্ধান লক্ষেও মেলা ভার।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত