| 5 মার্চ 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

অন্য ভুবন 

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে রাজকুমার।  দেখে মন খারাপ হয়ে যায় রাজার।রানিকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘রাজকুমার এতো গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে কেন দিন দিন?’

-হয়তো চাপে
-চাপ?
-হ্যাঁ, পড়াশোনা, গান, নাচ, আঁকা, সাঁতার এর ফাঁকে অবসর নেবার সময় পাচ্ছে না মোটেই
-এতো চাপ দিচ্ছো কেন? আমরা তো অত চাপে বড় হইনি।
-তোমাদের ছেলেবেলার সঙ্গে এদের ছেলেবেলার পার্থক্য আছে মশায়। 
-বলো কি ছেলেবেলাও পাল্টে যায়। 
-যাবে না। তুমি তরোয়াল ঘুরিয়ে রাজা হয়ে গেছো। এখন তা করলে হবে। এখন যুদ্ধ হয় মিসাইল, ফাইটার প্লেন, সাবমেরিন, জৈবঅস্ত্র এসব নিয়ে। এসব নিয়ে যুদ্ধ করতে গেলে রাজাকে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি সব জানতে হবে। শুধু কি তাই? রাজ্য সঠিক ভাবে পরিচালনা করার জন্য চাই ম্যানেজম্যান্টের ধারণা।
-বাবা একজনে এতো কিছু শিখবে 
-হুম শিখতে তো হবেই। না শিখলে চলবে বলো।
-তাহলে তো খুব চাপ?
-তা একটু বটে
-কিন্তু খেলাধূলা করবে না ?
-এতো সব সামলে সময় কখন বলো?
-তাও ঠিক।
রাজকুমার কে দেখে কষ্ট হয় রাজার।হাসে না,খেলে না। থপথপ করে হাঁটে।ধীরে ধীরে কথা বলে। গোমড়া মুখে দিনরাত পড়ে যায়। একজন মাস্টারমশাই যান আর একজন আসেন। একদিন জানালা দিয়ে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে রাজা জিজ্ঞাসা করেন, ‘মন খারাপ?’
-হুম 
-কেন
-আমারও তোমার মতো ঘোড়ায় চড়ে দূরে দূরে যেতে ইচ্ছে করে। খেলার মাঠে হুটোপুটি করতে ইচ্ছে করে। রাজকুমারের কথা শুনতে পেয়ে রানি বলেন, ‘জীবনে ঐ সব করার সময় অনেক পাবে। এখন শুধু মন দিয়ে পড়ে যাও।’
-কিন্তু রানি যে বয়সে যেটা করার সেই বয়সে সেটা না করলে পরে কি আর করা যায়?রাজার কথায় কড়া গলায় রানি বলেন, ‘শুনো ছেলেকে বেশি আস্কারা দেবে না, তাহলে আর ওর ভবিষ্যত বলে আর কিছু থাকবে না। ‘এরপর গলার স্বর নরম করে রাজকুমার কে বলেন,’যাও বেটা পড়তে বসবে যাও। সামনে তোমার পরীক্ষা না?’ পরীক্ষার আগে রাজকুমার যেন কেমন হয়ে গেল-কারও সঙ্গে কথা বলে না। ভালো করে খায় না, কারও দিকে চোখ তুলে চায় না।সবসময় কেমন যেন একটা ঘোরে থাকে।’ এটা তো ভালো নয়। ‘বলেন রাজা।
-আমিও কদিন ধরে ভাবছি আপনাকে বলবো ব্যাপারটা। বলেন রানি। ‘কি জানি ভেতরে ভেতরে টেনশন করছে নাকি? সামনে তো পরীক্ষা।’
-তা বলে এরকম চুপচাপ থাকবে। হাসি নেই, কান্না নেই, কথা বলা নেই। না না এ ভালো নয়। আমি আজই রাজবৈদ্যকে ডাকছি। ‘মহারাজ এ শরীরের নয়। মনের রোগ?’ গভীর পর্যবেক্ষনের পর বলেন রাজবৈদ্য।
-সে তো বুঝলাম, কিন্তু সারবে কিভাবে?
-মনের ভার কমাতে হবে। বিদূষক কে ডাকুন। মজার মজার গল্প বলে বিদূষক। শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে রাজকুমার।তারপর জোরে চিৎকার করে ওঠে।মাথা চুলকে বিদূষক বলে, ‘মহারাজ এ আমার কম্মো নয়। আমায় রেহাই দিন। ‘মহারাজ পড়েন বিপদে, কি হবে এবার? কে সারাবে রাজকুমারকে? একদিন সেনাপতি এসে তরোয়াল নিয়ে কসরত দেখিয়ে যায় যদি মন ভোলে রাজকুমারের এই আশায়। হা করে দেখে রাজকুমার। তারপর ইশারায় তরোয়ালটা চায়। হাতে নিয়ে তেড়ে যায় সেনাপতির দিকে। বাপ বাপ বলে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে পালায় সেনাপতি। এর পর কি হবে? কেউ কি আছে যে সারিয়ে দিতে পারে রাজকুমারকে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহারাজ গ্রামে গ্রামে ঢ্যারা পেটালে হয় না?’
-যা ইচ্ছে হয় করো। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না। গ্রামে গ্রামে ঢ্যারা পেটানো হলো  ‘যে রাজকুমারের অসুখ সারাতে পারবে তাকে একহাজার স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হবে। ‘স্বর্ণমুদ্রার লোভে দলে দলে লোক জুটলো।কেউ রূপকথার গল্প বলে, কেউ মজার তো কেউ বিভিন্ন দেহভঙ্গিমা করে মন হালকা করার চেষ্টা করে। কিন্তু কোন কিছুতেই কিছু হয় না। এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক কত রকমের ডাক্তার এলো কারও ঔষধে কোন কাজ করল না। কেঁদে আছড়ে পড়লেন রানি,’ তবে কি আমার কুমার সারবে না মহারাজ।’
-সারবে সারবে। ধৈর্য ধরো রানি। বলেন বটে কিন্তু উপায় খুঁজে পেলেন না। তবে উপায় হলো। একদিন রাজ্যে এসে হাজির হলেন এক অদ্ভুত দেখতে বুড়ো। গালভর্তি সাদা সাদা দাড়ি। কাঁধে ঝোলাব্যাগ। ঠোঁটে হাসি।এসেই হাঁক পাড়েন, ‘কই রাজকুমার কই।’
-আপনি কে? রাজকুমারকে আপনি চেনেন?আর ও ভাবে রাজপ্রাসাদের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছেন যে? না পাহারাদারদের কোন গ্রাহ্যই করলেন না বৃদ্ধ। সোজা গিয়ে হাজির হলেন সেখানে, যেখানে রাজকুমার আছে। রাজা রানি ঐ ঘরেই ছিলেন তাদেরকেও ভ্রূক্ষেপ না করে বলেন,’চলো।’
-কোথায়?অবাক হয়ে জানতে চায় রাজকুমার। 
-বাইরে
-কেন?
-বাইরে না গেলে দেখবে কেমন করে-ঝর্ণা কেমন করে সুর তোলে, পাখি গান গায়, শনশন শব্দে বাতাস বয়, শামুক কেমন করে চলে, ফড়িং কেমন করে ওড়ে, প্রজাপতি কেমন করে ফুলে ফুলে মধু খেয়ে বেড়ায়।দেখবে আর শিখবে। শিখবে আর জানবে।
-কিন্তু মা যদি বকে?
-কিচ্ছু বলবে না। তুমি আমার সঙ্গে যাবে তো। সে সব আমি ম্যানেজ করে নেবো। ঐ বৃদ্ধের সঙ্গে বেরিয়ে গেলে অস্থির হয়ে পড়েন রানি, ‘ওগো কাউকে সঙ্গে পাঠাও।’
-দরকার হবে না রানি।তবু আমি নিজে যাবো।
-তুমি যাবে?তাহলে আমিও যাবো। বাইরে বেরিয়ে রাজকুমার দেখে একদল ছেলে ফুটবল খেলছে। বল মারতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায় একজন। হো হো করে হেসে ওঠে রাজকুমার। ভিড়ে যায় দলে সেও।কাঁদা মাখে সারা গায়ে। চেপে বসে গরুর গাড়িতে। ছেলেদের সঙ্গে দলবেঁধে এর ঘরে আম, তার ঘরে পেয়ারা পেড়ে আনে।তাড়া খেয়ে ছুটে পালায়। এই ভাবে এক অন্য ভুবন খুঁজে পায় রাজকুমার। যে ভুবনে মন খারাপ নেই, দুঃখের কথা নেই।আনন্দ আছে।ফূর্তি আছে।মন ভালো করা আছে।ভালো মন নিয়ে পড়তে বসে চটপট শিখে ফেলা আছে। দুঃখ দূর হয় রাজার। রাজকুমার সেরে ওঠায় হাসি খুশি হয়ে ওঠেন রানিও।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত