| 2 মার্চ 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

শর্টকাট  

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে হলে একটানা লম্বা রাস্তাটা পার হতে আমার কালঘাম ছুটে যায়। এই রে, কী বললাম কথাটা? কালঘাম। কালো রঙের ঘাম ভাবছেন নাকি? দূর, কালো রঙের ঘাম আবার হয় নাকি? হ্যা হ্যা হ্যা। শুনুন, কালঘাম মানে হল, দাঁড়ান মশাই, ডিকশনারিটা খুলে দেখে বলি। এখনই বলবেন ডিকশনারি বলার দরকার কী? কেন? অভিধান বলা যায় না? যায় যায়, অনেক কিছুই বলা যায় মশাই! কিন্তু অফিসের পরে হেঁটে হেঁটে মেট্রো স্টেশনে পৌঁছতে ফের সেই কালঘাম ছুটে যায়। কী পরিশ্রম উফ! হাঁপিয়ে উঠি। খিদেও পায়। মনে হয়,এককাপ গরম চা যদি পেতাম রে ভাই…! উফ, ভাবা যায়না! না, চা আমি খাই অফিসে। কিন্তু সে তো কাজের মধ্যে ডুবে সুত সুত দুটো চুমুক। ব্যস। কাপ ফক্কা। এইটুকু চা খেতে কতক্ষণ  বা লাগে বলুন। খুব ইচ্ছে করে ছোটবেলায় ডুয়ার্সে থাকতে মা যেমন উঠোনে ছোট কাঠের উনুন জ্বেলে কেটলি করে চা করতো,তেমনি ঘন দুধের  চা খেতে। কতকাল হল ডুয়ার্সে যাই না! সেই চা খাওয়া হয় না।

যাকগে, যা বলছিলাম। মেট্রোতে উঠে ঝিমোতে ঝিমোতে যখন নাকতলায় এসে ঢুকছে গাড়ি, আমি ভিড় ঠেলে দরজা পর্যন্ত যেতে পারছিনা এমন অবস্থা। রোজই এমন হয়। নাকানি চোবানি খেয়ে যখন প্ল্যাটফর্মে পা রাখি, বাইরে বেরোনোর রাস্তাটা চিনতে ভুল হয়ে যায়। এমন করে একদিন গোলোকধাঁধায় ঢুকে কোনদিকে যে চলে গিয়েছিলাম…! শেষে বুদ্ধি করে নিজেই ফিরে এসেছি মূল গেটে। না, গেট নয়, নীচে নেমে যাওয়ার চলন্ত সিঁড়ির কাছে। তো আমার সেই বিষাক্ত দশা থেকে নেমে ফের কতটা পথ পেরিয়ে তব্বে বাড়ি পৌঁছই। তো কালঘাম ছুটবে এ আর বেশি কী? মৃত্যু যন্ত্রনায় ঘেমে যায় মানুষ। সেই ঘামেরই নাম হলগে কালঘাম। বুঝলেন তো? কী পরিশ্রমের যন্ত্রণা দাদা বুঝতে পারবেন যদি আমার জায়গায় দাঁড়াতেন একদিন।

আমার পাড়ার আগের পাড়ায় থাকেন ঋষভ গোপ । একই সঙ্গে গাড়িতে উঠি প্রায়দিনই। একই সঙ্গে বাড়িয়েও ফিরে আসি। প্রায় দিনই। তো হাঁটতে হাঁটতে টায়ার্ড ফিল করা একজনের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে, অন্যজন আরামে হাঁটছে, এ তো হতে পারে না !

তো, সেদিন কী হল, হেঁটে হেঁটে ফিরছি দুজনেই। হঠাৎ একটি লোক আমাদের সামনের গলিটা দিয়ে বেরিয়ে এল। চারপাশ ভারি নির্জন। এই সময়ে তো আরও নির্জন। বাঁইয়ে বিশাল এক পুকুর। পুকুরের চারপাশ ঘিরে নারকেল গাছের সারি। ছায়ান্ধকার জায়গাটা। ঝট করে একটা লোক বেরিয়ে আসতেই আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। বেশ লম্বা লোকটা। শুঁটকোপনা মুখে রাজ্যের বিষন্নতা নারায়ণ পুজোর সিন্নির মত মাখামাখি হয়ে আছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে কিছু বলবে বলবে করে থেমে গেল। এই যাঃ। ভিখিরি মনে হচ্ছে না লোকটাকে। কিছু চায় কি? হুম, সিওর কিছু চায়। মুখ গম্ভীর করে ঋষভ গোপ গলাটাকেও ভারি করে ফেললেন।

-কে? কী চাই? দেখে মনে হচ্ছে কিছু চাই।

-আজ্ঞে ঠিক বলেছেন। চাই।

-কী? টাকা পয়সা ঘড়ি মোবাইল…কিসুই সঙ্গে রাখিনা আমরা বুঝলে? সরে যাও। নাহলে একশো নম্বরে ফোন করলুম বলে।

-ছি ছি ছি। কী বলতেছেন? চাই মানে টাকা পয়সা ঘড়ি টড়ি নয় গো। চাই মানে, একটা কথা বলতে চাই।

-বাহ, কথা? বলে ফেল। দেখি কী কথা।

– আজ্ঞে, কথা তো দেখা যায়না। শোনা যায়।

-হয়েছে। বেশি বুদ্ধিমান। বল, বল। সময় নেই। খুব পরিশ্রান্ত আমরা। তারমধ্যে গাড়ি থেকে নেমে এতটা পথ হেঁটে হেঁটে …। বল। শুনি তোমার অমৃতবচন।

-আজ্ঞে, সেই কথাই বলতে চাচ্ছি। রোজই দেখি আপনারা বড্ড ক্লান্ত থাকেন এদ্দুর হেঁটে। কত দূরেই না যেতে হয় আপ্নাদের। আমি বলি কি, আপনারা রাস্তাটা সাইজ করে নিন না।

-মানে?

-মানে, স্টিশনের পেসনের রাস্তাটা দিয়ে যদি আসেন, দেখবেন, এই সামনে আপনাদের  বাড়ির রাস্তা এসে গেছে। পনেরো মিনিট সেফ। শর্টকাট।

-তাই নাকি? তা,রাস্তাটা সত্যি পনের মিনিট বাঁচিয়ে দেবে?

-আজ্ঞে।

-না, না। এসব ঝক্কি নেওয়ার দরকার নেই বুঝলেন? কী মতলব কে জানে! সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় বলে কথা আছে। পরিশ্রমের ভয়ে ওর কথামতো চলা বোকামি হয়ে যাবে।ঋষভ গোপ সাবধান বাণী ছাড়েন আমার উদ্দেশে।

আমার মনটা কিন্তু লোকটার কথায় দুলছিল। যাব? কি যাব না? এইরকম ভাবতে ভাবতে যাবনা ভেবেই ফের হাঁটতে শুরু করেছি। কে এই লোকটা? ও আমাদের ওপর বেশ নজর রেখেছে দেখছি! একে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না।

আমরা হাঁটছি লোকটাকে পাত্তা না দিয়ে। লোকটা খানিক সঙ্গে সঙ্গে এল ঘ্যান ঘ্যান করতে করতে-চলুন না, বিশ্বাস করুন, কোন ঝামেলা চাইনা। আপ্নাদের সাহায্য করতেই চাই। মাইরি। রক্ষে কালীর দিব্যি। মনবাতাসা মায়ের দিব্যি।

আমরা ওর কথার পাত্তা না দিয়ে হুড়হুড় করে চলছি। লোকটা একসময় আমাদের সঙ্গ ছেড়ে দিল। পেছন ফিরে দেখি পুকুরপাড় দিয়ে চলে যাচ্ছে।

আহা, সাহায্য করতে এসে বিফল হল। হা হা আহ।  আমি আর ঋষভ হেসে বাঁচিনা। আচ্ছা, মনবাতাসা মা আবার কোথা থেকে আমদানি হল? আগে নাম শুনিনি তো।

ঋষভ বলল- আমি শুনেছি আমার কাজের মেয়ের থেকে। মনের অশান্তি দূর করে বাতাসার মত মিষ্টি করে দেন যে মা,তিনিই হলেন মনবাতাসা মা।

নামটা বেশ। শুনেই মন ঠান্ডা হয়ে গেল। আর খিদেটাও বেড়ে গেল। ইস, আজ যদি বাড়িতে ঘন দুধের চা, আর ফুলকো লুচি রেডি রাখে আমার বউ? তালে কী ভাল হয় !

সেদিনের মত তো হল। পরের দিন অফিস থেকে ফেরার পথে সেই লোকটাকে দেখতে পাব ভেবে সাবধানেই ছিলাম। ঋষভ বলেছে লোকটা ফের  যদি আসে, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব। এরা মতলববাজ হয়। নিশ্চয় কোন মতলব আছে।

আসেনি অবশ্য। হপ্তাখানেক পরে একদিন খুব একটা কান্ড হল। সে কথা বলার আগে বলে নিই, সেই লোকটিকে আর এই সাতদিনে দেখতে পাইনি। একটি দিনের জন্যও নয়। তো আমার ছেলে বলল যে স্কুলে শুনে এসেছে ইদানিং দুটো লোক ঘোরা ঘুরি করছে এই এলাকা দিয়ে। এরা টেররিস্ট হতে পারে বলেছে ছেলের বন্ধু অঙ্কন। তা আমি মুখে কিছু না বললেও মনে মনে ভয় যে পাইনি একেবারে, তা নয়। ভয় যথেষ্টই পেয়েছি। সেই লোকটার কথা মনেও হয়েছে। কে জানে,কে কী উদ্দেশ্য নিয়ে চলে! তো সেদিন এমন এক কান্ড হল যে আমার সব ধারণার মাথায় জল ঢেলে দিল। কান্ডটা বলি, শুনুন। কদিন ধরেই নিম্নচাপ নিম্নচাপ করে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে মিডিয়া। বৃষ্টিরও ক্লান্তি বলে কিছু নেই। অবিরাম একই গান ঢালো জল, ঢালো জল। অফিস থেকে ফিরছি। মাথার ওপরে মেঘ ঝুলে গুম গুম করে ভয় দেখিয়ে যাচ্ছে। বুঝলাম,আজ ভিজতেই হবে। বৃষ্টি নামল বলে। বেজার আবহাওয়া বলে রাস্তাঘাট বেশ নির্জন। তাড়াতাড়ি করে বাড়ি পৌঁছতে পারলে হয়। ভাবলাম স্টেশনের পেছনের পথ দিয়ে না হয় যাই আজ? কী আর হবে? পথ আছে যখন, কেউ না কেউ তো যাতায়াত করেই। সেই লোকটা বলেছিল এই পথ দিয়ে গেলে পনের মিনিট সেফ। ঋষভকে প্রস্তাবটা দিতে সে তো লাফিয়ে উঠল- মাথা খারাপ নাকি? এই ওয়েদারে ওই রাস্তায় যায় কেউ? সমাজবিরোধীদের তুমুল আড্ডা সেখানে।

আমার জেদ চেপে গেল। এত ভয় নিয়ে বাঁচা যায় নাকি? ধ্যাতৎতেরি।

ঋষভ আতঙ্কিত গলায় চেঁচাল –ও কি? ওদিক দিয়ে যাচ্ছেন নাকি?

-হ্যাঁ ভাই। আপনিও আসুন। বেশ গল্প করে করে চলে যাব।

-না, পারলাম না। আপনাকে সাবধান করছি আরেকবার। যাবেন না। আমার মন সায় দিচ্ছে না।

-বেশ। আমিই যাচ্ছি। বলে আমি পা চালালাম। কথা বলে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। ঋষভ চেঁচিয়ে বলল- আমি যেতাম। কিন্তু একটু বাজার করে নেব ছয় নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে। আর কিছু ফুল। কাল বেস্পতিবার। বাড়িতে পুজো আছে।

-আচ্ছা,ঠিক আছে। আমি পেছন ফিরে হাত নেড়ে দিলাম। দেখলাম ঋষভ দুলে দুলে যাচ্ছে। হাসি পেল। বাজার না হাতি। আসলে ওই পথটাকে ভয় পাচ্ছে ঋষভ!। বাহানা তুলে পালাল।

রাস্তাটা নেমে গেছে মাঠের দিকে। একটা সরু পায়ে চলা পথ টিকটিকির লেজের মত অনেকটা চলে গেছে মাঠের ওপর দিয়ে। ঘুমঘুমে আকাশের নীচে সুনসান রাস্তাটা  দেখে ভয় ভয় করে বৈকি। ছিনতাইবাজরা আরামে এখানে থাকতে পারবে। কিন্তু এত নির্জন এলাকায় কার পকেট ছিনতাই করবে? লোকই তো নেই!

চারপাশে তাকাতে তাকাতে যাচ্ছি। দূরে দূরে গাছপালার অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। আস্তে আস্তে সন্ধ্যের ছায়া নেমে আসছে মাঠের ওপর। শুনেছি,কোন একসময়ে এখানে নাকি শ্মশান ছিল। এখন আর নেই। এখানে সরু নদী ছিল। সে বহু বহু বছর আগের কথা। এখন যারা বেঁচে আছে,তারা কেউই দেখেনি নদী। কেবল গল্প শুনেছে মাত্র। আমি একটা নদীর রেখা খুঁজতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসা মাঠে নদীর চিহ্ন দেখতে পাওয়া দুরাশাই শুধু নয়,রীতিমতো অসম্ভব বলাই ভাল। হয়তো স্থানীয় লোকেরা জানে।বা বুঝতে পারে! জলের ব্যবস্থা ছিল বলেই শ্মশানের ব্যবস্থা ছিল। আসল কথা হল, এই শ্মশান টশান শুনেই লোকে এদিকটা এড়িয়ে চলে। ভয় পায়! ঋষভ যেমন, ভয় পেয়ে কোন ঝুঁকি নিতে চাইল না। সত্যি কথা হল, ভয় থাকলে কি এদিকে সমাজবিরোধী থাকতো? আচ্ছা, সমাজবিরোধীরাই বা কোথায়? কারও টিকি দেখলাম না এতক্ষণে! সব কি ভয়ে ঘরে গিয়ে ঢুকেছে? মানুষ নিজের চোখে না দেখে কেবল শুনে কত কী যে বিশ্বাস করে !

একটু দাঁড়ালাম। ভারি নির্জন চারধার। এত নৈঃশব্দ্য ভাল লাগে না! মোবাইলে গান লোড করা আছে। শুনতে শুনতে যাই? পকেট থেকে ফোন বের করে গান বেছে নিলাম। জ্যোৎস্ন্যারাতে সবাই গেছে বনে…! নাহ,এ গান এই পরিবেশে যাচ্ছে না! কবিগুরু মৃত্যু চেতনা থেকে এই গানটি লিখেছিলেন। পুত্রের মৃত্যুর পর দাহ শেষ করে ফিরে আসতে আসতে এই গান মনের ভেতরে রচনা করেছিলেন। এই ঝিমঝিমে পরিবেশ থেকে, এই হিম নৈঃশব্দ্য থেকে বাঁচতে গান শুনতে চেয়েছি। না, বরং ঝিন চাক গান শুনি। আমি মাঝে মাঝে ঝিনচাক গান শুনি। তেমন দু চারটে আছে। হুমম,এই যে। গান শুরু হতে মনে বেশ ফুরফুরে ভাব এল। অরিজিৎ সিং এর গলা। রইস ছবির গান। আসলে এই গানটি গেয়েছিলেন নুসরত ফতে আলি খান।পরে তাঁর ভাইপো রাহাত ফতে আলি খান রিমেক করেন। রইস ছবির জন্য অরিজিৎ সিং-কে দিয়ে গানটি গাওয়ানো হয়েছিল। মেরে রসকে কমর, তুনে পহেলি নজর, ইস নজর সে মিলায়ি মজা আ গয়া… রিদমিক…!

আচ্ছা, বাতাসে কেমন একটা ধোঁয়াটে, ঝাঁঝালো গন্ধ না? বর্ষার ড্যাম্প ধরে যাওয়া ঘরের দেওয়াল থেকে কি এই রকম গন্ধ বের হয়? না, এটা কাঠ কয়লার সঙ্গে সামান্য সস্তা সেন্ট দিয়ে যে ধূপকাঠি তৈরি হয়, ওতেই যদি ড্যাম্প ধরে যায়, অনেকটা সেই রকম গন্ধ বলে মনে হচ্ছে। মানে জলে ভেজা পুরনো কাপড়ের থেকে…আচ্ছা,আমি ড্যাম্প ব্যাপার থেকে সরে আসতে পারছি না! আসলে সত্যি সত্যি গন্ধটা বিশ্রি গন্ধ। নাকে এসে লাগল। কিসের গন্ধ এটা? গা গুলিয়ে উঠছে যেন।

-আগে এখানে দাহ হতো কিনা। সেই গন্ধ লেগে আছে এখানকার বাতাসে। কখনও কখনও সেই গন্ধ উড়ে আসে বাতাসের হাত গলে। বলতে বলতে আমার পেছন থেকে এগিয়ে এল লোকটা। আমি চমকে গিয়েছি দেখে হেসে ফেলল- আরে! ভয় পাবেন না। চোর ছ্যাঁচড় নই মশাই। আমি রোজই এই পথ দিয়ে যাই।

-ওহ। আমি স্বস্তি পেলাম। লোকটাকে দেখে সমাজবিরোধী বলে মনে হচ্ছে না। খুবই সাধারণ নিরীহ লোক।

-আমার চায়ের দোকান। ওই মোড়ের মাথায়? দেখেছেন কি? সারাদিনই দোকান খুলে রাখি। আজ দিনটা মেঘলা করেছে। ভাবছি,কাস্টমার আর পাব না আজ। বরং ঘরে ফিরে রেস্ট নিই। তাছাড়া যা জল জমে যায় এই পথে !

আমরা দুজনে গল্প করতে করতে হাঁটতে থাকি। আকাশের দিকে তাকাই। ঘন মেঘে সমাচ্ছন্ন যাকে বলে আর কি ! ঠান্ডা বাতাস বইছে। শীত শীত করছে।

-এ সময়ে এক কাপ ঘন দুধের চা…আহা, সুন্দর ফ্লেভার লিফের…! কতদিন ছেলেবেলায় খাওয়া চা খাইনি। দানা দানা সিটিসি চা…কমলা রঙ্গের চা…!

-ইস! ইস! আপনার মধ্যে এত দুঃখ? মাক্কালী, খুব খারাপ লাগছে আপনার জন্য।  কতদিন কেউ এভাবে চা খেতে চায়নি! আগে বলবেন তো! সঙ্গে কিছু ভাজাভুজি? লাগে না? লেড়ো? না? বেশ,বেশ। দাঁড়ান। লোকটা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম এক অদ্ভুত কান্ড। ফাঁকা মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। এক  মেঘভর্তি আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে দু’হাত উঁচু করে ডানার মতো মেলে ধরল লোকটা। অদ্ভুতভাবে হাত পা নাড়তে লাগল। মাথাটা ঘুরিয়ে নাড়িয়ে সে এক অস্বাভাবিক কান্ড আর কি! লোকটা কি পাগল? মনে তো হয়নি এতক্ষণ! এখন দেখে মনে হচ্ছে লোকটা যেন জাদুকর! আমাদের ছোটবেলায় এইরকম এক জাদুকরকে দেখেছিলাম। ঠিক এভাবে হাত পা নেড়ে খেলা দেখিয়েছিল। লোকটাকে দেখছি, হাত পা নাড়তে নাড়তে হাওয়া থেকে উনুন, কেটলি, জল, দুধ চিনি চা পাতা এনে ফেলেছে! ফটাফট চা বানিয়ে ফেলল লোকটা। গরম কাপটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-নিন।

অবাক অবস্থাতেই কাপ হাতে নিয়ে এবারে বিমূঢ় দশা আমার। হুবহু ছেলেবেলায় খাওয়া মায়ের হাতের সেই চা! ভুরভুরে চা পাতার সুঘ্রাণ, ঘন দুধের ক্ষীর ক্ষীর গন্ধ…এর সঙ্গে কাঠের জ্বালানির সামান্য ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধ মিলে …আহা হা লা জবাব!

এমন উঁচুদরের জাদুকর এভাবে রাস্তাঘাটে জাদু দেখিয়ে বেড়াচ্ছে? বলেই ফেললাম কথাটা– আপনি স্টেজ শো করুন। আপনাকে চায়ের দোকান করে খেতে হবে না। অসাধারণ ম্যাজিক আপনার! আচ্ছা, আপনার নাম কী? আমি সবাইকে বলব আপনার কথা। এভাবে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন কেন? আর যা স্বাদ এই চায়ে, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না স্রেফ জাদু দিয়ে এরকম চা বানানো যায় !

আমার কথা শুনতে শুনতে ঘাড় চুলকোতে শুরু করেছে লোকটা। লজ্জা পাচ্ছে আর কি!

-না, না, সত্যি বলছি। নিজেকে লুকিয়ে রেখে লাভ কী? পাঁচজনকে ম্যাজিক দেখালে একদিন আপনি টাকার গদিতে শুয়ে থাকবেন। আচ্ছা, আপনার নাম কী?

-কী বলছেন মশাই ? আমি তো কিছুই বুঝছি না ! আপনাকে ম্যাজিক কখন দেখালাম ?

-হুম, বলতে চান না। বুখেছি। হেসে ফেল আমি-এমন অনেকেই আছেন যারা নিজের ঢাক পেটাতে চাননা। চায়ে লাস্ট চুমুক দিয়ে কাপটা লোকটার হাতে ফেরত দিতে দিতে হাসি- আরেকদিন চা খাব বলে রাখছি। কাপটা আমি বাড়িয়ে দিলেও বিমূঢ় লোকটা হাত বাড়ায়নি। আমার কথা শুনে ব্যোম মেরে আছে। সুতরাং কাপটা আমি ছেড়ে দিয়েছি,অথচ লোকটা হাত বাড়িয়ে ধরেনি। কাপটা পড়ে ভেঙে… না, না, চুরমার হল নাতো! একচুয়ালি কাপটা ধোঁয়া হয়ে যাচ্ছে। কী কান্ড এটা ? এটাও কি ম্যাজিক নাকি ? লোকটাকে সেকথা জিজ্ঞাসা করব বলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই আমি তো যাকে বলে হাঁ হয়ে গেলাম। লোকটা কাপটার মতই ধোঁয়া হয়ে যাচ্ছে! ফুস ফুস করে মিশে যাচ্ছে বাতাসে। একি! এইমাত্র ছিল সামনে, এখন লোকটার চিহ্নমাত্র নেই?

মানে?

দৌড়তে শুরু করেছিলাম। আমি বুঝে গেছি লোকে কেন এদিকটা এড়িয়ে চলে! যাদের একসময় দাহ করা হয়েছিল, তাদের কেউ কেউ এখনও রয়ে গেছে এই মাঠের বাতাসের অনুপরমাণুতে। মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসে। কথা বলে।

আচ্ছা, তারা যদি বেরিয়ে এসে দুটো কথাই বলে, তাহলে ভয়ের কী? কেবলমাত্র ধোঁয়া

হয়ে গেল বলে কি এত ভয় পেলাম? ইস, কী বাজে কাজ করলাম। ছি। লোকটা কি ক্ষতি করেছে আমার? চা করে খাইয়েছে। আমাকে খুশি করতেই চেয়েছে। আর আমি?

একটা মানুষ বেঁচে নেই বলে তাকে অচ্ছেদ্দা করার কী আছে? লোকটার সঙ্গে দেখা হলে ক্ষমা চাইতে হবে। কাল ফের এই রাস্তাটা দিয়ে যাব। দেখা হতে পারে।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত