| 5 মার্চ 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

ডন মুস্তফা

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

হাসননগরের মুস্তফা মনে করে টাউনের ডন সে। মনে করে সে যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটে, ফিসফিস করে মানুষজন।
ডন মুস্তফা যায়!
চুপ! চুপ! চুপ!
ডন মুস্তফা যায়! সাবধান! সাবধান!
টাউনের মায়েরা কার কথা বলে ঘুম পাড়ায় দুরন্ত শিশুদের?
‘ঘুমাও ছোট্ট বদমায়েশ বাচ্চা। না হলে ডন মুস্তফা তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে কিন্তু।’
ডন মুস্তফার নামে ষোলঘরের লিখন, বাসস্ট্যান্ড রোডের ফরিদ, উকিলপাড়ার কাওসার মামু, এক টিউবওয়েলের পানি খায়। ডন মুস্তফার হাত অনেক লম্বা। কত লম্বা? ঢাকা পর্যন্ত? ঢাকা! অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস কতদূর, ততদূর লম্বা। নিয়ন্ত্রণ অবশ্য রাখতে হয় ঢাকারও। রামপুরার উলন রোডে কাওসার মামু থাকে, নারিন্দার শরৎ গুপ্ত রোডে সহিদুল থাকে, পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে থাকেন বুলবুলভাই। নিউ সাউথ ওয়েলসে থাকে বাপি। ডন মুস্তফার জবান এদের জবান। দায়িত্ব কম না।
কাল রাতে ঘুমাতে কিছু দেরি হয়ে গিয়েছিল। ডন মুস্তফা দুই ঘন্টা সাকিনা এবং সাতচল্লিশ মিনিট সাইরার সঙ্গে চ্যাট করেছে অনলাইনে। সাকিনা ডন মুস্তফার পুরনো প্রেমিকা। চট্টগ্রামের ঘাট ফরহাদ রোডে থাকে। বর্তমানে তার জামাই মালয়েশিয়ায়। মিটিং করতে গেছে। চ্যাটের আগে ম্যাসেঞ্জারে তার দুটো ছবি পাঠিয়েছে সাকিনা। ফর্সা, শঙ্খসাদা শরীর সাকিনার। পিংক রঙের নাইটি পরে আছে। কিছু বোঝা যায় কিছু যায় না।
সাইরা টাঙ্গাইলের মেয়ে। বিন্দুবাসিনী কলেজে পড়ে। ডন মুস্তফার প্রেমিকা এখনও হয়নি। হয়ে যাবে। কাল রাতের চ্যাটে এ ব্যাপারে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
কিছু পাখি এর মধ্যে দিনের ঘোষণা দিতে শুরু করেছে। সুবেহ সাদেক দেখেছে এবং দূরে মেঘের ডাক শুনেছে, আর কিছু মনে নেই তার, ঘুমিয়ে পড়েছে ডন মুস্তফা। দুপুরে একবার ঘুম ভেঙেছিল হয়ত কিংবা বিকেলে, বৃষ্টি দেখে আবার ঘুমিয়ে পড়াটাকে শ্রেয়তর মনে করেছে। উঠে দেখে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভেজা একটা সন্ধ্যা, ঝিপঝিপ বৃষ্টি হচ্ছে।
কফি?
কফি।
সিগারেট?
সিগারেট।
ডন মুস্তফা স্টার্ট দিল সন্ধ্যাটা। সন্ধ্যা রাত হলো। ক্ষুধা লেগে গেছে। কাপ নুডলস আছে ঘরে। ডন মুস্তফা পৃথিবীর সেরা আবিষ্কার মনে করে কাপ নুডলসকে। ঝুট ঝােেমলা ছাড়া একটা ব্যাপার।
ফোন বাজল।
কে? এসময় ডন মুস্তফাকে কল দেয় কে?
ডন রার্লিয়নি? ডন দাউদ?
তা না প্যাঁচা সহিদুল। শরৎগুপ্ত রোড নিবাসী।
ইনসমনিয়া আছে সহিদুলের। টানা বহু রাত ধরে ঘুমায় না। রোজ রাত বারটা একটায কল দেয়। মাত্র সন্ধ্যায় কী সমস্যা তার? ডন মুস্তফা দায়িত্ব নিয়ে ধরল। বলল, ‘হ্যালো।’
সহিদুল এক নিঃশ্বাসে বলল, ‘শোন একটা সমস্যা হইছে। আজ একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হইছে সে ড বলতে পারে না ডাকাতকে বলে ধাকাত।’
বলে ফোনের লাইন কেটে দিল সহিদুল। অর্বাচীন শিশু। ডন মুস্তফা মাইন্ড করল না। অর্বাচীন শব্দটার অর্থ জানে সে। সহিদুল একটা প্রকৃত অর্বাচীন।
আবার কল দিল সহিদুল।
‘সে ছেলে না, মেয়ে।’
বলে আবার লাইন কেটে দিল সহিদুল।
ছেলে না মেয়ে। ড-কে ধ বলে, তাতে কী হলো? ডন মুস্তফা ধরেও ধরল না। সহিদুল একটা ছিটগ্রস্ত। মেষশাবক। বিয়ে করেছিল। ডিভোর্স হয়ে গেছে। বউ তাকে মারধোর করত। গলা টিপে ধরেছিল একদিন।
পানি গরম করে নুডলস বানাল। বৃষ্টি ঠান্ডা এই সন্ধ্যার তুলনা হয় না।
ভাস্করদা কল দিল।
ডন মুস্তফা নিজেকে যখন দাউদ ইব্রাহিম মনে করে, ভাস্করদাকে মনে করে ছোটা সাকিল। ভাস্করদা সামান্য সিনিয়র হলেও।
‘ও ভাস্করদা?’
‘ইয়া মাবুদ! তুমি উঠছ? একশ তিনবার কল দিছি মিয়া তোমারে! হিসাব আছে। কী করছ তুমি? ঘুমের বড়ি খাইছ? ঘুমের বড়ি খাওয়া কিন্তু ভালো না। তুমি এমনেই আধা পাগল। পুরা পাগল হইতে সময় লাগব না।’
‘আমারে ফ্লোরে কেন, ও ভাস্কর বাবু। ডন মুস্তফা দিনে ঘুমায়, ফোন অফ করে ঘুমায়, এটা আপনি জানেন না বলেন? দিনে ফোন করলেন কেন তাহলে? একশ তিন বার! এক কোটি তিন লক্ষ বার কল দিলে কী, ডন মুস্তফা ফোন অফ করে ঘুমায়। আর খবর নাই! আমি তো ভাবতেছি হইলটা কী? মরে গেল নাকি? ইয়া মাবুদ!’
‘এখন হাসতে পারতেছি না, পরে এইটা নিয়া হেসে নেব ভাস্করবাবু। ডন মুস্তফা এভাবে মরবে না। একে ফরটি সেভেনের গুল্লি না খেয়ে পৃথিবীর ডনদের কেউ আজো মরে নাই। এ কে ফরটি সেভেন আবিস্কারের পর থেকে। এ কে ফরটি সেভেনের আবিস্কারক আবার আফ্রিকা পাড়ার আবদুল কাইয়ুমরে ভাববেন না, ভাস্করবাবু। আলেক্সান্দার কালাশনিকভ। মনে রাখতে পারবেন? আরও দুইবার বলি। আলেক্সান্দার কালাশনিক। আলেক্সান্দার কালাশনিকভ।’
‘ইয়া মাবুদ! তোমার মাথা দেখি পুরাই গেছে মিয়া। রাইত দুইটার এনসব কী বলো তুমি!
‘রাইত দুইটা! মাথা কার গেছে ভাস্করবাবু? এশা আজানের পর আমার ঘুম ভাঙল।’
‘মশার আজান তুমি শুনছ?’
‘শুনি নাই। উঠার পরে এশার আজানও হয় নাই।’
‘তোমার মোবাইলের টাইম ঠিক আছে তো? না তোমার মাথার মতোই গেছে? না গিয়া থাকলে কয়টা বাজে দেখো। আমি রাখি। পেশাব করতে উঠছিলাম। কল দিয়া দেখলাম। মনে করছিলাম তুমি ধরবা না। ধরছ, ধরছ আবার আবোল তাবোল বকতেছ। তোমার মাথা পুরা ঠিক অইব না কোনোদিনই। বুঝছি রাখো।’
‘ডন মুস্তফার সালাম নিন, বোতল মার্কায় ভোট দিন।’
বলে ফোন কেটে দিয়ে ডন মুস্তফা এগার সেকেন্ড নিঃশব্দে হাসল। হা করে হাসে। বন্ধু মহলে এজন্য একদা তার নাম হয়েছিল হা-করা মুস্তফা। বাপি তেমন মনে রেখেছে এবং ডাকে এখনও, ‘ও হা-করা, কী করো তুমি?’
ভাস্করদার কথা তেঁতুল পাতা। ডন মুস্তফা সময় দেখল তার স্মার্ট ফোনে। এ কী ঘটনা। ০২:০২ এএম। সত্যি সত্যি রাত দুটো বেজে গেছে! কী করে? কখন? মাত্র না সে ঘুম থেকে উঠল! সন্ধ্যা হতে দেখল! ভুল দেখেছে। এত ঘুম ধরেছিল তার! বৃষ্টি কুক্ষণ ধরে হচ্ছে? ধরেনি এশবারও?
টাউনের নদী ঠিক আছে কি না দেখে আসতে হবে যত রাত হোক। রাতে নদী আরেক নদী হয়ে যায়। দেখে রাখতে হয়। টাউনের ডন, দায়িত্ব কম না।
ঝিপঝিপ বৃষ্টি সহজে ধরবে না। তাও ছাতা না নিয়েই বের হয়ে পড়ল ডন মুস্তফা। ঝিপঝিপ বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে তার। ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভ লাগে। রাস্তায় তার সঙ্গ নিল টাউনের বিখ্যাত কুকুর কালু। নেড়ী। তার সঙ্গে যখন হাঁটে সে মনে করে কালু বিদেশি কুকুর। ব্ল্যাড হাউন্ড জাতীয়। কালুও তখন ব্ল্যাক হয়ে যায়।
ডন মুস্তফা হাঁটছে।
কালু হাঁটছে।
খ্রিস্টান মিশনের রাস্তার দিকে একটা টহল গাড়ি চলে গেল পুলিশের। বেমক্কা নিঃশব্দ হয়ে গেল রাস্তা। বাবা ডংকাশার মোকাম পার হচ্ছে তারা। মেজাজ মর্জির ঠিক থাকতে নেই ডনদের। ডন মুস্তফা এজন্য খেপল। হাঁটতে হাঁটতে কোনো কারণ ছাড়াই খেপল। দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘ব্ল্যাক আমি এই রাস্তায় কারফিউ দিলাম। আমি। আমি। আমি ডন মুস্তফা এই রাস্তায় কারফিউ দিলাম। তোর কোনো আপত্তি আছে?’
ব্ল্যাক বলল, ‘না, বস।’
‘গুড। কেউ যেন কারফিউ না ভাঙে!’
‘ভাঙবে না, বস্।’
‘তাও কিছু বেয়াদব তো আছে, যদি ভাঙে তুই তোর কর্তব্য করবি।’
‘শিওর বস।’
‘কী করবি?’
‘খ্যাঁক করে পায়ে কামড়ে দেব বস।’
‘ভেরি গুড। তোরে আমি নোবেল পুরস্কার দিব শান্তিতে। কেউ যদি না দেয় আমি দিব। এই আমি। ডন মুস্তফা। কথা দিলাম তোরে।’
‘থ্যাংক ইউ বস।’
কারফিউ জারি থাকবে কতক্ষণ? সিদ্ধান্ত নিল না কারণ সিদ্ধান্ত নিতে ভুলে গেল ডন মুস্তফা। সে একটা বিড়ি ধরাল। ঝিপঝিপ বৃষ্টি এখনও হচ্ছে। বৃষ্টি। যাক কেউ ফুটে উঠল রাস্তায়? কারফিউ লঙ্ঘনকারী! রাস্তার মাথায় দেখা গেল তাকে। ছাতাঅলা বেয়াদব। ক্রুদ্ধ ডন মুস্তফা হাঁক দিল, ‘কে রে?’
বেয়াদব বলল, ‘তুই কে রে?’
ওরে সর্বনাশ! এ তো অংশুদা।
টাউনের ত্রাস
অংশুমান দাস।
ডন মুস্তফা বলল, ‘অংশুদা! আদাব।’
অংশুমান দাস বলল, ‘কে? মুস্তফা?’
‘জি, দাদা।’
‘কেমন আছিস ভাই?’
‘জি দাদা ভালো। রামার ঘর থেকে ফিরলেন দাদা?’
‘না রে। রামারে পুলিশ ধরে নিয়া গেছে। এইটা তারা কোনো কাজ করছে বল? ভালো কাজ হইছে? কেউ বলবে? আমি তো বলব না। আমি এই অংশুমান দাস, শহরের ত্রাস। সন্ধ্যায় সামান্য পরিমাণ ধেনো খাই, এটা তারা বরদাস্ত করতে পারল না!’
‘দুঃখজনক কথা অংশুদা। তুমি তাইলে আজ কিছু খাও নাই?’
‘খাই নাই মানে? আমি কে তোর কি বিস্মরণ হইছে? আমি তোর দাদা, অংশুমান দাসতারা বরদাস্ত করতে পারল না!’
‘দুঃখজনক কথা অংশুদা। তুমি তাইলে আজ কিছু খাও নাই?’
‘খাই নাই মানে? আমি কে তোর কি বিস্মরণ হইছে? আমি তোর দাদা, অংশুমান দাস।’
ডন মুস্তফা বলল, ‘টাউনের ত্রাস।’
অংশুমান দাস প্রসন্ন হলেন, ‘টাউনে টাউনের মানুষ নাই আর। পুরান মানুষ কমতেছে দিন দিন। মরতেছে, টাউন ছাড়তেছে। তোমরা যে কয়জন আছ পুরান, তোমরা বুঝবা এই অংশুমান দাসের মর্ম। রামারে তারা ধরে নিয়া গেছে, রামার ভাই গঙ্গা আছে। সে আরও পদের জিনিস বানায়। মরা মানুষের কাছে সত্য কী মিথ্যা কী, তোমরা তাই কই যাও না যাও, সব খবর আমি রাখি। গোপন করার কিছু নাই আর। তোমার অভ্যাস আছে আমি জানি। গঙ্গা জিনিস ট্রাই করে দেখো এশবার। বিশুদ্ধ গঙ্গাজল। খিক! খিক! খিক! দুই গ্লাস আর আধ গ্লাস, আড়াই গ্লাস খাইছি, রামার আট গøাসের ধরা ধরছে। আচ্ছা ভাই, আমি ঘর লই।’
ডন মুস্তফা বলল, ‘জি, দাদা। ঘুমান গিয়া।’
‘কী করবো? ঘুমাবো? খিক! খিক! খিক! তোমার কি মনে হইতেছে আমি সজাগ? এই পৃথিবীর কেউ সজাগ নাই ভাই, ঘুমন্ত অবস্থায় সব ঘটনা ঘটতেছে। যাই, আচ্ছা। বলো।’
‘জি বলো।’
‘বলো ভাই, অংশুমান দাস।’
‘টাউনের ত্রাস।’
‘বেঁচে থাকো ভাই। পাগল হয়ে বেঁচে থাকাও থাকা।’
বাকা ডংকাশার মোকামের ধার দিয়ে নেমে গেলেন অংশুমান দাস। টাউনের কিংবদন্তী। দাদাকে একসময় তার আদর্শ মনে করত ডন মুস্তফা। এইম ইন লাইফ ঠিক করেছিল অংশুমান দাস হবে। হতে পারে নি। ডন হয়ে গেছে। এখন অংশুমান দাসকে সম্মানসূচক পল এসকোবার উপাধি দিল সে। ড্রাগ ডিলার পল এসকোবার। খক খক করে কেউ কাশল কোনো ঘরে। যক্ষা রোগীর কাশি। নসর কাকার বেমাত্রেয় ভাই বশর কাকা হতে পারে, কৃপেশ ভট কাকাও হতে পারেন। এরা দুজনই যক্ষা আক্রান্ত। ডন মুস্তফা বিড়বিড় করে বলল,
অংশুমান দাস
টাউনের ত্রাস।
কখনও একটা মাছি মারেননি মানুষটা। তাকে উপযুক্ত শ্রদ্ধা জানিয়ে ডন মুস্তফা আরও একটা জনহিতকর সিদ্ধান্ত নিল। কারফিউ শিথিল করে দিল। আর টাউন টহল দিল না। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাবে।
‘ব্ল্যাক তুই কেন ভিজতেছিস?’
‘ছাতা নাই, বস।’
‘ভালো উত্তর দিছিস। তোরে আমি একটা ছাতা কিনে দিব। শরীফ ছাতা। কাঠের ডান্ডাঅলা।’
‘থ্যাংক ইউ, বস।’
‘অ। অংশু-দারে আদাব সালাম দিলি না, দেখলাম।’
‘বেয়াদবি মনে করে দেই নাই, বস। আদাব সালাম দিলে যদি দাদার তপস্যা ভঙ্গ হয়ে যায়।’
‘কিহ! তুই একটা জিনিয়াস বø্যাক। জিনিয়াস অফ দি সেঞ্চুরি। তোর মতো আদব লেহাজ আর টাউনের মানুষের মধ্যে দেখি না। আমারে না হয় ডরায়। ডন মুস্তফা! কী করি না করি! তারা জানে আমার পিস্তল বন্দুক। এ কে ফরটি সেভেন রাইফেল আছে দুইটা। বিভু কাকার একটা রাইফেলও নাই। উকিল পাড়ার বিভু কাকা এমন একটা মানুষের গায়ে তারা হাত তুলল কিভাবে?
তারা আফ্রিকায় জন্ম নিছে বলে? আফ্রিকা পাড়ায়?’
ব্ল্যাক বলল, ‘বস, আপনে মানুষরে নিয়া দিন রাইত ভাবেন। টাউনের মেয়র সাহেবের উচিত আপনারে তার প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেওয়া। জ্ঞানী মানুষের উপযুক্ত সম্মান আর সমাজে নাই।’
‘আবদুর রহিম স্যারের কথা মনে পড়ে রে। পাক্কা একশ বছর বাঁচলেন। টাউনের একটা মানুষ নাই, স্যারের মৃত্যুকে যে চোখে জল মুছে নাই। আবদুর রহিম স্যার কি টাউনের শেষ ভালো মানুষ ছিলেন?’
‘বস! চুপ!’
‘কী হইছে ব্ল্যাক?’
ব্ল্যাক ফিসফিস করে বলল, ‘রিকশা বস!’
‘রিকশা!’
অন্ধকার থেকে ফুটে উঠল রিকশাটা। হুড নামানো, আরোহিনী আছে। রিকশাঅলা সাধু। আদাব সালাম দেয় দেখলে। তবে সে রাতকানা মানুষ। আন্দাজে রিকশা চালায় রাতে। রাস্তার ধারেই ডোকায় রিকশা নিয়ে পড়েছে বহুবার।
‘ডন মুস্তফার ধারে রিকশা রাখল সাধু। কেন? রিকশার আরোহিনী বলল, ‘মুস্তফাভাই!’
ডন মুস্তফা বলল, ‘কে?’
‘মুস্তফাভাই, আমি আফরিন।’
আফরিন। জামতলার হায়াত উকিলের মেয়ে। টাউনের সেরা রূপবতী। কম ছেলেপান লাইন দেয়নি। পৃথিবীর কেউ পায়নি আফরিনকে।
আফরিন বলল, ‘মুস্তফাভাই, রিকশায় ঘুরবেন?’
ডন মুস্তফা বলল, ‘না গো। ঘুম পাইছে।’
‘হুম পাইছে? হি! হি! হি! আমি আফরিন মুস্তফাভাই। হায়াত ডাক্তারের ছোটোমেয়ে আফরিন। আপনি না ঘুড্ডিতে আই লাভ ইউ আফরিন লিখে আমাদের বাসার দিকে ছাড়ছিলেন।’
কথা সত্য। ডন মুস্তফার মন সামান্য চনমন করে উঠল। তখন তারা কলেজে উঠেছে। আফরিন নাইনে। সেরা রূপবতী এবং কবিতা আবৃত্তি করে। টাউনের ছেলেপান লাইন ধরে আফরিনের প্রেমে পড়েছিল। ডন মুস্তফা তখনও ডন হয়নি। ভাই হয়েছে। সে কেন প্রেমে পড়বে না আফরিনের? তার কি রাইট নেই? ঘুড্ডিতে আই লাভ ইউ আফরিন লিখে হায়াত উকিলের বাসার দিকে ছেড়েছিল সে। প্রায় নিখুঁত নিশানা। মুশকিল হলো উঠাতে না পড়ে আফরিনদের পুকুরে পড়ে গিয়েছিল ঘুড্ডিটা।
ডন মুস্তফার একবার মনে হলো সে আফরিনের সঙ্গে রিকশায় উঠে যায়। তবে সে উঠল না। আফরিনকে বলল, ‘না গো, তুমি যাও। আমি ঘুমাব।’
আফরিন হাসল, ‘আচ্ছা গো ঘুমান। স্বপ্নে আমার লগে রিকশায় ঘুরবেন।’
সাধু রিকশা টান দিল। চলে গেল তারা।
ডন মুস্তফা বলল, ‘ ব্ল্যাক’
ব্ল্যাক বলল, ‘বস্?’
‘কিছু বুঝলি?’
ব্ল্যাক বোঝার চেষ্টা করল না এবং ব্ল্যাকও থাকল না আর। কালু হয়ে গেল। ডন মুস্তফা বিরক্ত হলো। তুই ডন মুস্তফার সঙ্গে ঘুরছিস তুই কেন কালু যাবি? কালু কি ডন মুস্তফার কথা বোঝে?
প্রভু মরে গেলে কুকুররা বোঝে, টাউনের কেউ মরে গেলে বোঝে, মৃত ব্যক্তি যদি তার প্রভু না হয়?
অংশুমান দাস চার বছর আগে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। আফরিনের মৃত্যু রহস্যের কিছু সুরাহা এখনও হয়নি। নিউজ হয়েছিল স্থানীয় পত্রিকায়। আত্মহত্যা নাকি হত্যা? সে সুরাহা আর হবে না কখনও। রবভাই এখন কানাডার স্থানীয় বাসিন্দা। বিয়ে করেছেন, ছেলেমেয়ে হয়েছে। কুরিয়ার পাড়ের কবি রবভাই। কবিতা লিখে প্রেম করেছিল এবং বিয়ে করেছিল আফরিনকে। কার্তিকের রাতে আফরিন গলায় দড়ি দেয়।
কিছুর কোনো সুরাহা হয় না।
কিছুর কোনো সুরাহা হয় না।
কালুকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে ডন মুস্তফা তাদের বাসার টিনের গেট পার হয়ে ঢুকল। তাদের উঠানে কিছু গাছ আছে। ফুলগাছ, ঝোপঝাপড়। কিছু জোনাকি জ্বলছে নিভছে। ঘুম ধরছে না জোনাকি মেয়েদের? ডন মুস্তফা আকাশ দেখল। কিছু তারা মুখ দেখাতে লেগেছে। অবরোধ উঠিয়ে নিচ্ছে মেঘদল। আচ্ছা আকাশের তারারা কি জোনাকি মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করে নাকি?
শিকল টেনে বেরিয়ে গিয়েছিল, ডন মুস্তফা ঘরে ঢুকল তার। অন্ধকারে হাতড়ে লাইটের সুইচ টিপল। বাতি জ্বলল না। বাল্ব গেছে। মোম আছে ঘরে? দরকার নাই। চেয়ার টেবিল খাট আবছা বোঝা যাচ্ছে। ডন মুস্তফা চেয়ারে বসল। অংশুমান দাসের কথা আর মনে নেই তার। আফরিনের কথা মনে নেই। সে একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেট না, মনে করল সিগার। হাভানা চুরুট। সে হলো ডন মুস্তফা। সে কি আর গোল্ড লিফ, বেনসন, কি হলিউড টানবে?
চুরুটের ধোঁয়া উঠল কুন্ডলী পাকিয়ে। অন্ধকারের মধ্যেও আরও এক পরত ঢেকে দিল ডন মুস্তফার মুন্ডটা।
আচ্ছা, সে পাগল হয়ে গেল কিভাবে? তারা কেন বলে সে পাগল?
টাউনের মানুষজন?
সে কী করেছে?
কামড়ে দিয়েছে কখনও টাউনের কাউকে?
তবে?
ডন মুস্তফা মায়া বোধ করল টাউনের নির্বোধ মানুষজনের জন্য। এবং হাসল। উচ্চৈঃস্বরে হাসল।
পড়শি দম্পতি সাদেক হালিমা। ঠান্ডা রাত বলে দ্বিতীয়বারের মতো তারা পরস্পরের অন্তর্গত ছিল। রেশ কিছু কাটল ডন মুস্তফার হাসিতে। আঁতকে উঠে সালেককে আরও জাপটে ধরল হালিমা। নৈত্তিত্তিক হালও ভয় পেয়ে গেছে। বলল, ‘পাগলটা হাসতেছে।’
সালেকও হাসল। তবে নিঃশব্দে। কিছু কিছু ভয় আরও জমে।
ডন মুস্তফা কী শুনল না শুনল, ভাবল চলবেই, তাকে নিয়ে এরকম ফিসফাসফিস টাউনে চলবেই। হাভানা চুরুটে টান দিল সে।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত