| 16 জুলাই 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

নিশির ডাক

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

সবুজের মামার বাড়ির দেশ পুরুলিয়ার আনাড়া বলে ছোটো একটি জায়গায়।একটা সিনেমা হল ছিলো। একটা সাহেব বাঁধ ছিলো।বর্ষায় জলে জলে ছেপে উঠতো। শীতে জল শুকিয়ে এলেও জল টলমল করতো। কতো বড় বড় মাছ সেখানে রুই কাতলা শোল আরও কত কি! উঁচু নীচু ভূমি।একটা রেল স্টেশন আর সেটাই আনাড়ার প্রাণ। সাহেব বাঁধের পাড়ে ঘন জঙ্গল ছিলো।সমাজ ভিত্তিক বন সৃজন প্রকল্প বলতো বোধহয় ঐ সময়। তার অবদানের ঐ জঙ্গল।টাটানগর যাওয়া যেতো। কালো পিচ রাস্তা চিড়ে গাড়ি করে বা ট্রেন ধরে। পুরুলিয়া সদর শহরেও গিয়েছে। আজ সে মামাবাড়ি ওখানে নেই, তার স্মৃতি সবুজের মনে এখনো টাটকা।

সবুজ ফিরে চলে আপন খেয়ালে সেই স্মৃতির দেশে। বড় মামা তখনো ওখানে হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করেন। আশপাশে কোনো ডাক্তার নেই। উনি একমাত্র ভরসা তখন। শীতের ক্লাস এইটের পরীক্ষা শেষে সবুজ আর ওর বোন মিলি মায়ের সাথে গেলো মামাবাড়ি। কি মজা! কি মজা! বাবার সঙ্গে থেকে গেলো ওর দিদি বনী। নইলে বাবাকে অফিস যাবার সময় টিফিন কৌটো খাবার দাবার গুছিয়ে দেবে কে? ঠাম্মা তো রেঁধে বেড়ে সব কাজ করে পারবে না।মা গিয়েও নিজেও এক অশান্তিতে পড়বে। আর আরও থাকলো এক পারুলের মা পিসী। সে ঠিকে কাজ করে।তখনকার দিনে মনে হতো পারুলের মা পিসী সবুজদের ঘরের লোক।বাবা একবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো পারুলের মা পিসী তিনদিন রাতে সবুজদের বাড়িতেই ছিলেন। রাতে পিসী কি সুন্দর করে রূপবান কন্যার রুপকথার গল্প বলতেন। সে গল্প এখনো সবুজের মনে গেঁথে আছে।

হাওড়া থেকে বিকেলে পুরুলিয়া এক্সপ্রেসে উঠেছিলো সবুজ মায়ের সাথে। বাবা ছাড়তে এসেছিলেন ষ্টেশনে। রাতে মেজোমামা এসে আনাড়া ষ্টেশন থেকে ওদের নিয়ে বাড়িতে হাজির হয়। সেই শীতের রাতে কতোই বা রাত তখন, নটা হবে। আনাড়া স্টেশনের পুরো রেল কলোনী ঘুমোচ্ছিলো।

সবুজের দাদু রেলে চাকরী করতেন।মালগাড়ির গার্ড ছিলেন। আনাড়াতে বহুবছর থাকতে থাকতে এখানেই বাড়ি করে নেয়।দাদু ছিলেন গল্পের জাহাজ। সবুজের আনাড়া আকর্ষণ এর অন্যতম কারণ।

একদিন ছুটির দিন দেখে ঠিক হলো জয়চন্ডী পাহাড়ে রঘুনাথপুরে সবাই পিকনিক করতে যাবে। সবুজের ঐ জয়চন্ডী পাহাড় খুব প্রিয় একটা জায়গা। দূরে আদ্রা স্টেশন। তারপর যে বারে হীরক রাজার দেশের শ্যূটিং হলো এখানে তারপর থেকে সবাই চিনতে শুরু করলো এই পাহাড়।আদ্রা রেলস্টেশন থেকে দেখা যায় ঐ পাহাড়ের চূড়ো।

সারাদিন হৈহৈ করে কাটলো তাদের। সবুজ মিলি বড়ো মামার ছেলে তোতন টুকাই জয়া সবাই মিলে আনন্দ করে ফিরলো। গুপী বাঘার গুহায় লুকোচুরি। গুপী বাঘার পুকুর ধারে বসে মাছ মাংস ভাত মিষ্টি চাটনী ওরা খুব মজাসে খেয়েছিলো।

ফিরে এলো সন্ধ্যা রাতে।সবুজ ক্লান্ত।এইসময় দাদু রাতে ঘরে ঢুকে বললেন, দাদাভাই আজ সেই নিশির গল্প বলবো।আজ রাতেই সেই দিন, যে রাতে নিশি ডাক দেয়।মাহাতো পাড়ার মাঠঘাট পেরিয়ে আমাদের এই পাড়া দিয়ে কালীমন্দির ডানহাতে রেখে বরাকর রোড পেরিয়ে সাহেব বাঁধে হারিয়ে যায়।

মা বললেন-বাবা তুমি আর নাতি নাতনীর সারাদিন হৈ হুজ্জোতি করার পর মাথা খেয়ো না তো!
আমরা মা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বললাম-দাদু তুমি শুরু করো।
দাদুতো তো আর তাদের সাথে পিকনিকে যায়নি। ডিউটি সেরে আদ্রা থেকে আনাড়া আসে সবুজের দাদু তাদের পিকনিক থেকে বাড়ি আসবার কিছুটা সময় পরে। সবুজের ক্লান্তি ঘুমটুম নিশির গল্পে উবে গেলো।টানটান হয়ে দাদুর মুখোমুখি বসলো।

দাদু শুরু করলেন। অমাবস্যার একাদশী তিথিতে মাহাতো পাড়ার জংলীচন্ডীর বাড়ির পুব কোনে যে ভাঙ্গা মন্দির আছে তার গোড়ায় আছে খান কয়েক বাবলা গাছ।সেখান থেকে ঠিক রাত বারোটায় নিশি বেরোয়। সাদা কাপড়ে মুখ ঢেকে এই হেঁটে হেঁটে আমাদের পাড়ার রাস্তা দিয়ে গিয়ে ওঠে বরাকর রোডে, ও রাস্তা পেরিয়ে আবার সাহেব বাঁধ ধরে হারিয়ে যায়। অনেকেই দেখেছে। ধীরেন মাহাতোর বড়বেটার বৌটা তো ঐ নিশির হাতে মারা গেল কিনা!

তো দাদু তুমিও তো মাঝে মাঝে অনেক রাতে ডিউটি সেরে ফেরো। তোমার ভয় করে না?

আরে সব রাত তো আর অমাবস্যার একাদশীর রাত নয় যে নিশির দেখা পাবো?তারপর একটা সময়ের ব্যাপার তো আছে।

আজ দেখ সেই  একাদশীর রাত। কিছুটা পর সমস্ত পাড়া শুনশান হয়ে যাবে। একটু দুরের মাহাতো পাড়ার কুকুর গুলিও দেখবি কেমন চুপটি মেরে থাকবে। কেউ যদি জানালায় উঁকি মেরেও দেখে, নিশি তাকে ঐ মূহূর্তে তার নামটি ধরে ডাকবে। সেই ডাক অমান্য করা কারো সাধ্যি নেই। দরজা খুলে সে বেরিয়ে যাবেই। নিশির কাছে।

সবুজ যখন ঘুমোতে গেলো ঠিক তখন রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। বিছানায় ঘাপটি মেরে জেগে আছে চোখটি বন্ধ করে। পুরুলিয়ায় ডিসেম্বরে ঘনশীত পড়তো তখন।মা ওদের দু ভাইবোনকে নিয়ে ঠিক দাদুর পাশের রুমটায় শুয়েছে। অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা সারা পাড়া এলাকা জুড়ে।বরাকর রোডের গাড়ি চলাচলের আওয়াজ ও নেই।কুকুর বেড়াল পেঁচা বা রাত পাখী লোকজনেরও। সবুজ ঘাপটি মেরে বিছানায় শুয়ে আছে।মা একবার ঘুম জড়ানো চোখে জিগ্গেস করলেন অস্ফূট স্বরে, কি রে ঘুমিয়েছিস? সবুজ কিছু বলবার আগেই দেখলো মা জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।মা তাহলে ঘুমিয়ে পড়েছে। কান খাড়া করে সবুজ শোনবার চেষ্টা করলো দূর থেকে কোনো পায়ের আওয়াজ পায় কিনা। একটা আওয়াজ পেলো খানিক বাদে।এবারে আবার। আওয়াজটা যেন দ্রুত আসছে এদিকে। আস্তে আস্তে সবুজ পা টিপে টিপে জানালার কাছে গেলো ঐ শীত রাতে।তারপর খানিক বাদে দেখলো সাদা সাদা ও কি এদিকে আসছে! জানলার কাঁচে স্বচ্ছতা ছিলোনা কিন্তু কে যেন স্পষ্ট মেয়েলী গলায় ডাকছে, সবুজ সবুজ! সবুজের মুখ দিয়ে সবে বেরোচ্ছিলো সাড়া। এইসময় পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে তার মা।
তুই কি করছিস এই হাল্কা একটা গেঞ্জি পড়ে শীতের রাতে জানলায় দাঁড়িয়ে?
মা, আমি নিশিকে দেখবো বলে দাঁড়িয়েছি।তারপর সবুজ দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে ভয়ে।

আজ এতোটা এতোটা দিন পরে সেই নিশির ডাকের কথা সবুজ কিছুতেই ভুলতে পারে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত