| 16 এপ্রিল 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

পুতুলের বিয়ে

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

আজ পুঁটির বড়োই আনন্দের দিন। সেই সকাল থেকে খাওয়া-দাওয়া না করে পুতুলের বিয়ে দিচ্ছে। এই বিয়েটা দেওয়ার জন্য সে সকাল থেকে কত কাণ্ডই না করল।সামান্য পুতুলের বিয়ের জন্য যে এতো কিছু করতে পারে, তা বোধহয় আগে কেউই জানত না। সে এমন করছিল যেন, তার নিজের মেয়ের বিয়ে দিচ্ছে। এমন অভিনয় করছিল যেন আজ বিয়ে না হলে হয়তো লগ্নভ্রষ্টা হয়ে যাবে। তবে একথা বলতেই হয় যে, মেয়েটার জোর আছে। এতোটুকু মেয়েটা একাই একশো। সবাইকে সে রাজি করিয়েই ছেড়েছে, যে আজকেই পুতুলের বিয়ে হবে।

সেই কোন কাকভোরে উঠেছে পুঁটি। এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে যখন ঘরে ফিরল, তখন সূর্য পৃথিবীর বুকে আগুন ছড়াচ্ছে।মাটিতে পা দিলেই যেন ফসকা পড়ে যাবে।কিন্তু পুঁটি? সে ওসব পরোয়া করে না। খালি পায়ে চারদিকে ছোটাছুটি করে যখন ঘরে এল, তখন ওর মা উনুনে ভাত চড়িয়ে বঁটিতে সবজি কাটছিল। পুঁটিকে ঘরে ঢুকতে দেখে ঝাঁঝালো গলায় বলল, এই যে মহারানী, এতক্ষণ কুথায় ছিলে শুনি? গোটা গাঁ-টা ঘুরেও তুমার টিকিটি পাওয়া গেলেক নাই? বলি এত বিলা হল তুমার কী খিদে পায় না?

রোদে ছোটাছুটি করার জন্য পুঁটির সারা শরীরে ঘাম ঝড়ছে আর সেই নোনা ঘামের জলে পিঠের ঘামাচিগুলো চিড়-বিড় করছে। বাম হাতে পিঠ চুলকাতে চুলকাতে পুঁটি জলের বালতিতে গ্লাস ডুবিয়ে  ঢক-ঢক করে খেয়ে বলল, আমি দোয়েলদের ঘরে ছিলাম।

তার মা সবজি কাটা বন্ধ করে এক থালা পান্তা ভাত ও ভাজা চুঁনোমাছ বেড়ে বলে, আই, তাড়াতাড়ি আমার সঙ্গে খাবোল কতোক খেয়েনে দিকি!

পুঁটি লক্ষ্মী মেয়ের মতো তার মায়ের সাথে পান্তা ভাত খেতে বসে পড়ল। খুবই ব্যস্ত ভাবে ভাতগুলো খেয়ে এঁটো হাতটা ধুতে যাবে, এমন সময় দেখে দিশা তার দিকে ছুটে আসছে। তার হাতে রয়েছে একটি চটের বস্তা ও পুতুলের বাক্স। পুঁটি হাত তুলে বলে, তেঁতুলতলায় চো! আমি এখুনি আসচি।

পুঁটি তাড়াতাড়ি হাতটা ধুয়ে, ঘর থেকে পুতুলের পলিথিনটা বের করল। উঠোনে পড়ে থাকা চটের বস্তাটা নিয়ে তেঁতুল গাছের দিকে রওনা হল।

প্রকাণ্ড তেঁতুল গাছটা শাখা-প্রশাখা মেলে একাই দাঁড়িয়ে আছে বহু বছর ধরে। তার ছোট ছোট পাতার ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের কিরণ ঠিকরে পড়ছে মাটিতে। মনে হচ্ছে যেন একসাথে হাজারটা র্টচের আলো সারিবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

পুঁটি ও দিশা তেঁতুল গাছের পাশে চটের বস্তা পেতেছে। তারা নিজের নিজের পুতুলগুলো যত্নসহকারে বের করে  নতুন পোশাক পরাচ্ছে। এমন সময় নয়ন দৌড়ে এসে তার নির্দিষ্ট বসার জায়গায় বস্তা পেতে বসে পড়ল। তার বসার জায়গাটা হল, ঐ যে তেঁতুল গাছের এবড়ো-খেবড়ো  শিকড় বেরিয়ে রয়েছে, ঐ শিকড়ের গা-ঘেঁষে।পুঁটি নয়নকে বলল, এ নয়ন, দোয়েলকে দেখলি?

নয়ন এক কথায় না বলাতে পুঁটির মনটি খারাপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকার পর আবার পুতুল সাজানোয় মন দিল। দিশার পুতুল সাজানো হয়ে যাওয়ায় পুঁটিকে বলল, তুর এখনো সাজানো হল নাই? চো, শাগ তুলতে যাবি নাই?

পুঁটি হাসি মুখে বলল, একটু দাঁড়া! এই তো আমার সাজানো হয়েই গেইচে। আর মাত্ত একটা পুতুল আচে!

সাজাতে সাজাতে দু’জনে সুর করে ছড়া বলতে আরম্ভ করল-

                                                    “মা দিল মাথা বেঁধে বাবা দিল শাড়ি,

                                               সেই শাড়িটা পড়ে যাব বান্ধবীর বাড়ি।

                                               বান্ধবীর বাড়িতে পাকা পাকা আম,

                                               সেই আম খেয়ে বলবো জয়… শ্রীরাম।”

কিছুক্ষণ পর পুঁটি বলল, কুনদিগে শাগ তুলতে যাবি দিশা?

-হই দ্যাখ, ঐ পুকুর পাড়ের দিগে অনেক শাগ আচে, ওখানকেই যাব চো।

দু’জনে পুকুর পাড়ে শাক তুলতে চলে গেল। এদিকে নয়ন হল দোকানদার। সে ধুলোবালি  দিয়ে নানারকম মশলা বানায়, ইট ঘঁষে ঘঁষে গুড়ি করে লঙ্কা গুড়ো, হলুদ গুড়ো তৈরি করে। সবকিছু গুছিয়ে সামনে রেখে খদ্দেরের আশায় বসে রইল। খদ্দের বলতে পুঁটি, দিশা, দোয়েল ও কোয়েল। ওরাই আঁকোড় পাতার পয়সা দিয়ে জিনিস কিনল।

পুঁটি ও দিশা শাক তুলে এনে নারকেল খোলায় ভাত চাপিয়েছে। তাদেরকে আজ অনেক কিছু রান্না করতে হবে। ভাত, ডাল, মাছ, মাংস, লুচি, পায়েস আরও কত কি। পুঁটি আঁকোড় পাতা নিয়ে নয়নের দোকান থেকে হাট-মশলা কিনে আনল। তারপর সে দিশাকে বলেল, এ দিশা, এখনো দোয়েল এলেক নাই যে? উ-তো আরও আগেই চলে আসে !

দিশা শাক কাটতে কাটতেই বলল, উ আজকে আসবেক নাই মনে হয়।

-নাঃ! উ আমাকে সুকালে বললেক যে আজকেই আমার পুতুলের সঙ্গে উয়ার পুতুলের বিয়ে দিবেক?

-তাহলে উদের ঘরকে একবার যা!

পুঁটি আর কোনো কথা না বলে সোজা চলে গেল দোয়েলদের ঘর। দোয়েলকে ডাকতেই দেখে, সে পায়ে আলতা ও নতুন জামা পড়ছে। পুঁটি খুব তাড়াতাড়ি দোয়েলের কাছে গিয়ে বলল, নতুন জামা পড়ে কুথা যাবি?

দোয়েল হাসি মুখে বলল, মামাঘর যাচ্চি। আজকে আমার ছোট মামার বিয়ে।

দোয়েলের কথা শুনে পুঁটির রাঙা মুখটা ফ্যাঁকাসে হয়ে গেল। তারপর কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, আর আমার পুতুলের বিয়েটার কী হবেক?

-আমি মামাঘর থেকে আসি, তারপর পুতুলের বিয়ে দুবো।

-তাইলে তু আমাকে বল্লি কেনে যে আজকেই তুর পুতুলের সঙ্গে বিয়ে দুবো? তু আমাকে অমন করে মিছে কুথা বললি কেনে?

-আমি জানি না যে আজকে মামার বিয়ে। তাইলে তুকে বলতাম নাই।

পুঁটি দোয়েলদের ঘরে আর এক মূহূর্তও দাঁড়াল না। একছুটে সে তার মায়ের কাছে গিয়ে, আঁচলে মুখ ঢেকে হাঁপুশ নয়নে কাঁদতে লাগল। তার মা তখন কড়াইয়ের গরম তেলে শুকনো লঙ্কা দিয়ে বলে, এইসময় তুকে আবার এখানে কে আসতে বললেক?

পুঁটি কোনো কথা না বলে এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। পুঁটির মা জানতে চান ওমা! কাঁদচিস কেনে? কার সঙ্গে আবার মারামারি করে এলি? আমায় বলতো কে তুকে মারল?

পুঁটি কিন্তু কোনো কথা বলল না। তার চোখ দিয়ে দর-দর করে জল গড়িয়ে পড়ছে মায়ের আঁচলে। তার মা যখন আবার তাকে জিজ্ঞেস করল, তখন সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, দোয়েল মামা ঘর চলে যাচ্চে!

-ও বাবা, এই জন্যে কাঁদছে আমার পুঁটু মা। তা উ মামাঘর যাবেক নাই? আজ যে উয়ার মামার বিয়ে?

পুঁটি আরও জোরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, তাইলে আমার পুতুলের বিয়েটার কী হবেক?

-দোয়েল মামা ঘর থেকে আসুক, তারপর বিয়ে দিবি।

-নাঃ! আমি আজকেই বিয়ে দুবো!

পুঁটি এমন হাত-পা মেলে কান্নাকাটি আরম্ভ করল, যে তার মায়ের ভাত রান্নার বারোটা বাজল। মেয়েকে ভুলানোর জন্য আরও নানা রকম খেলার জিনিস, খাবারের জিনিস হাতে ধরিয়ে দিল। কিন্তু কে কার কথা শোনে। তার মুখে শুধু একটাই কথা, দোয়েল বললেক কেনে, আজকেই পুতুলের বিয়ে দুবো!

পুঁটির তার মা যখন দেখলো, যে মেয়েকে কোনো কিছুতেই ভোলানো যাচ্ছে না। তখন দিশাকে ডেকে বলল, এই দিশা, তু পুঁটির পুতুলের সঙ্গে তুর পুতুলের বিয়ে দে তো।

দিশাকে অনেক বোঝানোর পর অবশেষে রাজি হল। পুঁটি চোখের জল মুছে আবার বিয়ের সাজগোছের কাজ শুরু করল। রান্না-বান্নার দিক থেকে তারা আগের থেকেই সবকিছু তৈরি করে রেখেছিল, নতুন করে আরও কিছু ব্যঞ্জন তৈরি করে। সবকিছু তৈরি হবার পর পুঁটি বলল, এ দিশা, আমরাও শাড়ি পড়বো চো!

দিশাও এক কথায় রাজি হয়ে যায়। তাদের কথা শুনে নয়ন বলল, তাইলে আমি একটা গামছা পড়ে আসি, আমি বামুন হয়ে তুদের পুতুলের বিয়ে দুবো।

সূর্যটা দক্ষিণ দিক থেকে সরে গিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে হেলে গেছে। এবার সূর্যের আলো তেঁতুল গাছে তির্যক ভাবে পড়ছে। মাঝে মাঝে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘগুলো সূর্যকে ক্ষণিকের জন্য ঢেকে রাখছে। আবার পরমূহূর্তেই কোথায় যেন ছুটে চলেছে দূরে… বহুদূরে।

নয়ন গামছাটাকে ধূতির মতো পড়ে, হাতে একটা ঘটি নিয়ে বলেল, নাও গো, তুমরা এবার বর-কনেকে নিয়ে এসো।

পুঁটি ও দিশা সব পুতুলগুলো এক জায়গায় সারি-সারি রেখে, যে দুটি পুতুলের বিয়ে হবে, সেই দুটি পুতুল নয়নের দিকে এগিয়ে দেয়। নয়নও বামুন বেসে ছড়া কেটে মন্তর বলতে থাকে…

                                             হোং নম ঢোং নম, কুলাইয়ের শরি,

                                             আর দুটি দাও মা, পকেটেতে ভরি।

                                            পুতুল রানি এবার তুমি ঘুমটা তুলো,

                                            পুতুলের বিয়ে এবার শেষ হল।

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত