| 28 মে 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

হঠাৎ একটা সার্কাসের বল

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

দেশে হঠাৎ করেই একটা সার্কাসের বল এসে এদিক ওদিক লাফাতে লাগলো। বড় বড় লোকেরা টেলিভিশন ফাটিয়ে ফেলছে সেই বল নিয়ে। হাবলু কিছুতে বুঝতে পারছে না- এ কেমন বল! সারাজীবন তারা দেখেছে মানুষ বল নিয়ে খেলে। মানে, এ মারে, ও ছোঁড়ে! লাথি খেতে খেতে বলের সে কি ত্রাহি অবস্থা! আর এখন নাকি এই বল মানুষকে নিয়ে খেলছে। একে মারে ওকে কাত করে ফেলে রাখে। বলের ধাক্কায় লক্ষ লোক হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে। মরে পড়ে আছে হাজার মানুষ।

টেলিভিশনে হাবলু বলটি দেখেছে। একটা বেশ বড়সড় গোলাকার লাল বল। কিন্তু বলটির সারা গায়ে কাঁটা দেওয়া। হাবলু আরও খেয়াল করে দেখেছে এই বলের ভয়ে শহরের রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে গেছে। জনমানুষহীন গাড়িঘোড়াহীন সড়কের ঠিক মাঝখান দিয়ে যেন দৌঁড়াচ্ছে বলটি কী অবলীলায়; আর একে ওকে তাকে মেরে কাত করে শুইয়ে দিচ্ছে। হাবলুকে তার বাবা-মা বাসা থেকে বেরোতে দেয় না। আজ কতোদিন, সে খেলতে যায়নি মাঠে। শুধু জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে বাইরে চোখ দুটোকে যতোদূর পারে ছড়িয়ে দিতে চায়।

এদিকে বাবা মা যখন বের হয়, গরুর মুখে যেমন নাফা লাগায়, তেমনি করে নাক মুখ বন্ধ করার পট্টি লাগিয়ে তারপর যায়। হাবলু জানালা দিয়ে দেখেছে রাস্তায় যারা হাঁটছে সবার মুখ ঢাকা। বাবলুর মা বলে, মানুষ এতোদিন সমস্ত জীবজগতের সাথে ট, সারা পৃথিবীর সাথে এতো এতো অন্যায় অত্যাচার করেছে যে, এখন আর সে কারও সামনে মুখ দেখাতে পারছে না। সবাই মুখোশে ঢেকেছে মুখ। হাবলুর বাবা বলে, মানুষের মুখ তো আগেও দেখিনি। সব মানুষই মুখোশ পরা। ওরা যা বলে, তার সাথে যা করে তার কোনো মিল থাকে না। মানুষই একমাত্র জীব যে শান্তির জন্যে যুদ্ধ করে, অস্ত্র বানায়…বিনা প্রয়োজনে মানুষ মারে।

হাবলু এতো কথা বুঝতে পারে না। সে মা’কে বলে, “আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। আমাকে তবে বেরোতে দাও। আমার মুখ দেখাতে কোনো লজ্জা হবে না। আমার কোনো মুখোশও নেই। দেখো দেখো, আমি যা বলি তা-ই তো করি, তাই না মা?” এমন সব প্রশ্ন হাবলু করে মা প্রায়শই উত্তর দিতে পারে না। তখন বলে, “বড়ো হলে বুঝবে আমার কথার মানে”। কথার আবার আরও কোনো মানে হয় নাকি! হাবলুর স্কুলে শিখেছিলো, কবিতায় এক কথা বলে অন্য কথা বুঝায়। মা কি তবে কবিতায় কথা বলে?

এমনভাবে দিন কেটে যায়। একদিন জানা গেলো হাবলুর নানার ভাই মারা গিয়েছেন। মায়ের কান্না সইতে না পেরে হাবলুও মা’কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলো। এ কান্না যেন অনন্ত কালের বর্ষণের মতো। এ যেন হৃদয়ের শ্রাবণ। হাবলু মা’কে শুধায়, নানাভাইকে দেখতে যাবে না। মা’র কান্না যেন দ্বিগুন হেগো প্রবাহিত হতে থাকে। বাবা ডেকে বুঝায় ওই যে সূর্যের মতো বলটির আঘাতে তোমার নানাভাই মারা গিয়েছেন। ওখানে বেশি লোক সমাগম নিষেধ। ওখানে গেলে আমাদেরও এই রোগ আক্রমণ করবে।

এইভাবে হাবলু নিজেকে দেখতে পায় একটা অথর্ব জড় পদার্থের মতো। দিন সপ্তাহ মাস চলে গেলো, মাসের পরে মাস যায়, বন্দী জীবনে হাঁসফাঁস করতে থাকে হাবলু। জানালা দিয়ে দেখতে পায়, একটা কাক আরেকটা কাকের সাথে বসে কতো কথা বলে যায়, দল বেঁধে উড়ে আসে কতো কাক, কতো চড়ুই পাখি। এমনকি গাছগুলো হেলেদুলে একে অপরের সাথে ভাবের বিনিময় করে চলে। কেবল মানুষ ক্রমশ একা থেকে আরও আরও একা হয়ে গর্তে সেঁধিয়ে যায়। মনে হচ্ছে যেন এখন মানুষের চিড়িয়াখানায় বন্দী প্রাণী। আর অন্যরা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখে যায় হিংস্র মানুষ প্রজাতিকে।

হাবলু বাবাকে জিজ্ঞেস করে, মানুষের অপরাধটা কী? বাবা বলেন, পাহাড় কাটা, নদী ভরিয়ে ফেলা, কারখানার বর্জ্য দিয়ে জল দূষিত করা, পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, আসমানের ওজনের ঢাকনা ফুটো করে দেওয়া, এমন অনেক অনেক অপরাধ। কিন্তু সেই সার্কাসের বলের সাথে এসবের কী সম্পর্ক বাবা? বাবা বলেন, সরাসরি হয়তো নেই, তবে প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা ধারণা আছে। আসলে এই গোলকটা তুমি টেলিভিশনে যতো বড় দেখেছো, তত বড়ো নয়। এটা এতো ক্ষুদ্র যে সাধারণ মাইক্রোস্কোপেও দেখা যায় না। এটাকে বলে ভাইরাস। হাবলু জানতে চায় ত্রি ইডিয়টস সিনেমার ভাইরাস? বাবা বললেন, না না, সেটা তো শিক্ষককে দুষ্টুমি করে নাম দিয়েছে। এটা একটা ক্ষতিকর অতিক্ষুদ্র জীব। মানুষের শ্বাসের ভেতর দিয়ে ঢুকে মানুষকে অসুস্থ করে ফেলে, অনেকে মরেও যায়।

হাবলু এতোদিনে তারিখ বার এসব ভুলে গেছে। বাবা মসজিদে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, তাই বুঝে না শুক্রবার কোন দিন এসেছিলো। স্কুল খোলা থাকলেও জানতে পারতো। বাবা মা এই ভয়ঙ্কর বিপদের কথা জেনেও বের হয় কাজে। যেতে হয় চাকরি বাঁচানোর জন্যে। প্রতিদিন ঘরে ঢুকার সময় স্যানিটাইজার স্প্রে করে হাতে পায়ে গায়ে। তারপর গোসল না করা পর্যন্ত হাবলুকে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। এতো সাবধানতার পরও একদিন বিকেলে বাবার জ্বর এলো, মায়েরও গলা ব্যথা। হাবলুকে বলা হলো আলাদা কক্ষে একা থাকতে হবে। প্রতিদিন হাবলু কাঁদে। মার কাছে যাবে, বাবার কাছে যাবে। কিন্তু ওরা দরজা খোলে না। এই ভাবে একদিন জানলো বাবার অসুখ আরও বেড়েছে মা তার বাবাকে নিয়ে হাসপাতাল গেলো, ছোটখালা এসে হাবলুর সাথে থাকতে শুরু করেছে। মা’কে ফোনে হাবলু বাবার সাথে কথা বলতে দিকে বলে। মা ওদিকে কাঁদে। বাবা কথা বলার অবস্থায় নেই। নাকে মুখে কতো নল। ছোটখালা ওকে মায়ের পাঠানো একটি ছবি দেখায়। ও বাবার ছবিটা বার বার গেখে আর কাঁদে। আরও ক’দিন চলে গেলো। খুব ভোরে হঠাৎ ছোটখালা হাবলুকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো। বললো, হাসপাতালে যেতে হবে। হাবলু জানতে চায় কেন। ছোট খালা কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল কাঁদতে থাকে, কাঁদতেই থাকে। হাসপাতালে যখন দিয়ে দেখলো সাদা চাদরে ঢেকে রাখা বাবার শরীরের পাশে বসে মা হাউহাউ করে কাঁদছে, তখন হাবলু টের পেলো বাড়ির বটগাছটি পড়ে গেছে। মাথার ওপরে খুব রোগের উত্তাপ অনুভব করতে লাগলো হাবলু। স্তব্ধ প্রস্তরের মতো বাহার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললো, এতো কিছু ব্যবস্থা নিয়েও তো বাঁচলে না বাবা? তুমিও কি কোনো অপরাধ করেছো? এতোটা মাস নন্দলালের মতো বেঁচে সেইতো মৃত্যু তোমাকে ডেকে নিয়ে গেলো। আমি আর তবে ঘরে থাকবো না। আমি ছুটে যাবো মাঠের মধ্যিখান দিয়ে, আমি দৌঁড়ে যাবো নদীর কিনারে, আমি যাই বাবা, আমি যাই… বলতে বলতে হাবলু দৌঁড়ে বেরিয়ে যায় পৃথিবীর দিকে, অনন্তের আহ্বানে…।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত