নিউজিল্যাণ্ডের ক্রাইস্টচার্চে সন্ত্রাসী আক্রমণ – আমরা কী শিখলাম?

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় আমেরিকায় তিরিশ বছর আছেন। বর্তমানে নিউ ইয়র্ক শহরে শ্রমিক-শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী। সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পকলার জগতে তিনি বহু বছর ধরে কাজ করছেন। তাঁর অনেক রচনা ভারত এবং আমেরিকার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। লেখার বাইরে শখের মধ্যে পড়ে গান গাওয়া ও শোনা। ইরাবতীর পাঠকদের জন্য এখন নিয়মিত লিখবেন তিনি। নিউজিল্যাণ্ডের ক্রাইস্টচার্চে সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখার প্রথম পর্ব থাকছে আজ।

(১)

শুক্রবার ১৫ই মার্চ নিউজিল্যাণ্ডের ক্রাইস্টচার্চে এক সন্ত্রাসী আক্রমণ হলো। বন্দুকধারীরা ৪৯জন মানুষকে হত্যা করলো। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে আরো অনেকে।
এখন, শুধু যদি এই পর্যন্ত কেউ পড়ে, আর ব্যাপারটা আগে না শুনে থাকে, তাহলে সে ধরেই নেবে, ওঃ আবার একটা ইসলামী জঙ্গি সন্ত্রাস! ওঃ আবার শুরু হলো। এর শেষ কোথায়? এই “ইসলামী সন্ত্রাসীদের” কি কেউ রুখতে পারবেনা কোথাও?
অনেকে ভাববে, ওঃ এখন আবার নিউজিল্যাণ্ডেও ওরা বিষ ছড়াচ্ছে? ওখানে তো আগে কখনো এসব হয়নি।
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
অর্থাৎ, মুনাফা ও রেটিং-সর্বস্ব মিডিয়া ও ট্রাম্প বা মোদী-জাতীয় রাজনৈতিক নেতাদের কল্যাণে আমরা ধরেই নিয়েছি, সন্ত্রাস মানেই তথাকথিত “ইসলামী সন্ত্রাস।” যদিও তার অর্থ যে কী, কেউ ভালো করে বলতে পারবেনা। যাই হোক। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, ইসলামী সন্ত্রাস বলতে মানুষ বোঝে জঙ্গি প্রজাতির চরমপন্থী মুসলমানদের সন্ত্রাস। অর্থাৎ, আই এস, তালিবান, মুজাহিদীন, আল কায়েদা — এইসব ভয়ংকর গোষ্ঠী। যারা সত্যিই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ মারার খেলা শুরু করেছে ধর্মের নামে। যার এক বিরাট বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি এই আমেরিকায় এগারোই সেপ্টেম্বর, দুহাজার এক সালে।

(২)

কিন্তু, এই চিন্তার জগতে একটু মুশকিল হয়ে গেলো নিউজিল্যাণ্ডের হামলায়। ওঃ, কী মুশকিল! এখানে খুন হয়েছে কমবেশি পঞ্চাশজন মুসলমান, যারা শুক্রবার মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলো। আর খুনি হলো শ্বেতাঙ্গ যুবক, যে বা যারা অস্ট্রেলিয়া থেকে নিউজিল্যাণ্ডে গিয়েছিলো অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করে, ঠাণ্ডা মাথায় গণহত্যা করতে। আমেরিকায় থাকলে অবশ্য পুলিশ অথবা মিলিটারি তাদের ভবলীলা সাঙ্গ করে দিতো সঙ্গে সঙ্গেই, কারণ এখানে এই ল্যাণ্ড অফ ফ্রীডমে সেটাই রেওয়াজ। এরা বাঁচিয়ে রাখেনা। কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়না।
কিন্তু ওখানে ওই হত্যাকারীদের ধরে ফেলা হয়েছে। এবং তারা বলেছে, তারা হোয়াইট ন্যাশনালিস্ট বা উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী, বর্ণবৈষম্যবাদী, এবং ফ্যাসিবাদী। এসব কথা তারা নিজের মুখেই বলেছে। তারা বলেছে, মুসলমান এবং অভিবাসী (ইমিগ্র্যান্ট) মানেই শত্রু, আগ্রাসক। তারা তাদের দেশকে অধিকার করে ফেলছে। এই গণহত্যা তারা করেছে সেই শত্রুদের মধ্যে ভীষণ ভয় সৃষ্টি করার জন্যে। এবং তাই তারা মেশিন গানের গুলিতে পঞ্চাশজন নিরীহ মানুষকে মেরে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে দিয়েছে। আমিও সে ভিডিও দেখেছি। সে এক ভয়ংকর দৃশ্য!
তাহলে দেখা যাচ্ছে, সন্ত্রাসী আক্রমণ কেবলমাত্র জঙ্গি ইসলামীদের একচেটিয়া নয়। মুনাফা ও রেটিং-মিডিয়ার দিবারাত্র প্রচার — ট্রাম্পের আমেরিকাতে, মোদির ভারতে, এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও — প্রোপাগাণ্ডা মাত্র। তার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই।

(বাকী অংশ পরের পর্বে…)

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত