| 19 জুন 2024
Categories
বিনোদন

আজ কিশোর দিন

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

গত ০৪ আগষ্ট ছিলো কিংবদন্তী গায়ক, গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক,চিত্রনাট্যকার এবং রেকর্ড প্রযোজক আভাস কুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মতিথি। আভাস কুমার গঙ্গোপাধ্যায় কে চিনতে পারছেন না? কিশোর কুমার কে চেনেন? হ্যাঁ কিশোর কুমার ই তো। ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। লেখাটি লিখেছেন লুৎফুর কবির।


 

তিনি নিজের বাড়ির সামনে লিখে রাখতেন ‘বি অ্যাওয়ার অফ কিশোর কুমার’(কিশোর কুমার থেকে সাবধান)। একবার এক পরিচালককে কামড়ে দিয়েছিলেন। আরেক পরিচালককে তিনি আলমারির ভিতর ঘণ্টা দুয়েক বন্ধ করে রাখেন। পারিশ্রমিকের অর্ধেক টাকা পাওয়ায় একবার সিনেমার সেটে অর্ধেক মেকআপ করে হাজির হন। আরেকবার এক নাছোড়বান্দা পরিচালককে বলেন যদি তিনি সকলের সামনে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করেন তবেই তার ছবিতে তিনি কাজ করবেন। তার বাড়িতে সাক্ষাৎকার নিতে আসা এক সাংবাদিককে তিনি বাগানে নিয়ে গিয়ে গাছদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন নিজের বন্ধু হিসেবে।

কিশোর কুমারের এই ধরনের ক্ষ্যাপা স্বভাবের দরুন ব্যতিব্যস্ত হয়ে একবার এক পরিচালক প্রযোজকের কাছে অনুরোধ করেন, কিশোর যেন শুটিংয়ের সময় পরিচালকের নির্দেশ অমান্য করে কিছু না করেন। তারপর ওই পরিচালকের একটি শুটিংয়ের গাড়ি চালানোর দৃশ্যে পরিচালক কাট বলতে ভুলে যাওয়ায় কিশোর সোজা গাড়ি চালিয়ে খান্ডোলা চলে যান।

১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ভারতে জরুরি অবস্থা চলাকালীন কিশোর কুমারকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ’২০ পয়েন্ট প্রোগ্রাম’-এর প্রচার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল, কিন্তু তাতে কিশোর রাজি হননি। ফলে তাঁকে অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং বিবিধ ভারতী থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

মাত্র ছয় বছর বয়সে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কণ্ঠস্বর হয়ে যায় খড়খড়ে। ওই শিশুর গলার আওয়াজ শুনলে মানুষ বিরক্ত হতো। আর ওই শিশুই যদি গলা ছেড়ে গান ধরত? অসহ্য ঠেকত অন্যদের কাছে। সবাই যেন বলতে চায়- থাক বাবা গান না অন্য কিছু করো। একদিন বাড়িতে রাখা বটিতে পা কেটে যায় ওই শিশুর। রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। বন্ধ হচ্ছে না শিশুর কান্না। পায়ে লাগল সেলাই। তাতে বাড়ল যন্ত্রণা আর কান্না দুটোই। কাঁদতে কাঁদতে ওই শিশু একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙার পর শিশুটি ডাকছে সবাইকে। একি? ওর গলার স্বরই গেছে বদলে। এও কি সম্ভব?

দাদা অশোক কুমারের বর্ণনায় এভাবেই এসেছেন কিশোর কুমার ।

শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল আভাস কুমার। যাকে সারা বিশ্ব চেনে কিশোর কুমার নামে। বাংলা ও হিন্দিগানে যুগের পর যুগ সব ধরনের শ্রোতাদের মন এখনো জয় করছেন তিনি। শুধু গান নয়, অভিনয়েও মাতিয়েছেন রুপালি পর্দা।

একদিনের ঘটনা, বছর তিনেকের শিশু কিশোরকে কাঁধে চাপিয়ে বাবা কুঞ্জলাল বের হতেন হাটে-বাজারে। রাস্তায় অসংখ্যবার থামতে হতো তাঁকে। সমাজের উঁচুতলার মানুষ বলে সবাই তাঁকে যথেষ্ট সমাদার করতেন। কিন্তু পথে বেরিয়ে বাবার কাঁধে চেপে যেতে যেতে শিশু কিশোর বাবার টাকে চাপড় মেরে তবলা বাজানোর স্বাদ পেতেন।

রেকর্ডিং মানেই এক অন্যরকম কিশোর কুমার। ইয়ার্কি, হই-হুল্লোড়। সবচেয়ে মজা হতো, দ্বৈত গানের সময়। রেকর্ডিংয়ের সময় সবাইকে হেডফোন পরতে হয়। এমনই একদিন কানে হেডফোন লাগিয়ে সবাই বসে আছেন স্টুডিওতে। কিশোর কুমারের সঙ্গে লতা মঙ্গেশকরের দ্বৈত গান। কিশোর কুমারের অংশ গাওয়া হয়ে গেছে। এবার লতা মঙ্গেশকরের পালা। কিন্তু কিশোর কুমার নাচের এমন সব ভঙ্গি করছেন যে, লতা মঙ্গেশকর গান গাইবেন কি, কিছুতেই হাসি চেপে রাখতে পারছেন না। হঠাৎ কিশোর কুমারের মজা করা থেমে গেলো। লতা মঙ্গেশকরকে গাইতে দিতে হবে তো! রেকর্ডিংয়ে এসে লতা মঙ্গেশকর খুব মনোযোগী থাকতেন। কিন্তু কিশোর কুমারের সামনে পড়লে কি আর সে উপায় আছে? লতা মঙ্গেশকর গান তুলছেন, কিশোর কুমার তার পেছনে লাগা শুরু করে দিলেন। নানান রকম হাসির কথা বলে লতা মঙ্গেশকরকে একটানা হাসিয়েই যাচ্ছেন। লতা মঙ্গেশকরকে কিশোর কুমার বোনের মতো ভালোবাসতেন।

কিশোরের সাফল্যেই পরে বলিউডের অন্য সুরকাররাও তাঁকে নিজেদের প্রধান গায়ক হিসাবে বেছে নিতে বাধ্য করে। এদের মধ্যে ছিলেন লক্ষ্মীকান্ত পেয়ারেলাল জুটি। গীতিকার আনন্দ বক্সী সুরকার লক্ষ্মীকান্ত পেয়ারেলাল ও কিশোরকুমার জুটি বেশ কিছু রাজেশ খান্নার সিনেমার জন্য অনবদ্য সঙ্গীত উপহার দেন। লক্ষ্মীকান্ত পেয়ারেলালের সুরেই কিশোর ও মোহাম্মদ রফি একসঙ্গে গান করেন এবং কিশোর ও লতা মঙ্গেশকরের বেশ কিছু ভাল ডুয়েট গান তৈরি হয়। তবে রাহুলের সুরেই তিনি সব থেকে বেশি হিট গান করেন। এ জুটির কিছু অনবদ্য সিনেমা হল— শোলে, ওয়ারেন্ট, হীরা পান্না, শরীফ বদমাশ, আঁধি, রকি, দ্য বার্নিং ট্রেন, আপকি কসম, আপনা দেশ, ধরম করম, টক্কর, সীতা আউর গীতা, জোশিলা, কসমে ভাদে, রামপুর কা লক্ষ্মণ, কালিয়া, গোলমাল প্রভৃতি। নতুন সুরকার রাজেশ রোশন এবং বাপী লাহিড়ী’র সুরেও তিনি বেশ কিছু হিট গান গেয়েছেন।

হিন্দির পাশাপাশি তিনি প্রচুর জনপ্রিয় বাংলা সিনেমাসহ বাংলা আধুনিক গানও গেয়েছেন। উত্তম কুমারের জন্য তার প্লেব্যাক করা উল্লেখযোগ্য সিনেমার ভিতর রয়েছে রাজকুমারী, অমানুষ, আনন্দ আশ্রম এবং ওগো বধূ সুন্দরী। বাংলা ছবি লুকোচুরিতে তিনি নায়কের অভিনয় এবং গান করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের দু’টি সিনেমা চারুলতা এবং ঘরে বাইরের জন্য তিনি রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়েছিলেন। বাংলা সিনেমার বিখ্যাত দুই নায়ক প্রসেনজিৎ এবং তাপস পালের কেরিয়ারের দুই উল্লেখযোগ্য হিট যথাক্রমে অমর সঙ্গী এবং গুরুদক্ষিণার জন্যও তিনি প্লেব্যাক করেছিলেন।

রিহার্সালের দিন কিশোর কুমারের কোনও পাত্তা নেই! মান্না দে, মহম্মদ রফি চিন্তায় পড়ে গেলেন। এ রকম করলে রেকর্ডিংয়ের কী হবে? তখন তো আর স্ট্রাক রেকর্ডিংয়ের সিস্টেম ছিল না। যা হবে প্রথম থেকে শেষ একেবারে লাইভ। খুব ভাল রিহার্সাল না থাকলে যেটা সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে এই গানটি গাইছেন হিন্দি গানের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। মান্না দে, মহম্মদ রফি এবং কিশোর কুমার।

ছবির নাম ‘চলতি কা নাম জিন্দেগি’। খুব খটোমটো গান। মান্না দে এবং মহম্মদ রফি নিয়মিত প্র্যাকটিস করছেন। রফিসাব একসময় বিরক্ত হয়ে বললেন, “কিশোর গানটা ঝুলিয়ে দেবে। গট আপ ছাড়া এ গান হয় নাকি?” মিউজিক ডিরেক্টরকে কমপ্লেন করে কোন লাভ নেই, কারণ সুরকারের নামও কিশোর কুমার।

রেকর্ডিংয়ের দিন যথাসময়ে কিশোর কুমার উপস্থিত। কোনও টেনশন নেই। হাসি মজা করছেন। যত টেনশন বাকি দু’জনের। ভাল ভাবে রেকর্ডিং হয়ে গেল ‘বন্ধ মুঠি লাখ কি।’ মান্না দে ও মহম্মদ রফি মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন, কি গানটাই না গাইল কিশোর কুমার! মনে মনে একটা কথাই ভাবছেন, বিনা রিহার্সালে এমন গান গাওয়া কেবল কিশোরের পক্ষেই সম্ভব!

শচীন দেব বর্মণ তখন হিন্দী ছবি ‘আরাধনা’র জন্য গান কম্পোজ করছিলেন। কিন্তু গানের সুর কোনো ভাবেই তার মনমত হচ্ছিল না। তিনি একটা গান রেকর্ডিং এর জন্য কয়েকবার গায়ক কিশোর কুমারকে ডেকেছিলেন, কিন্তু একবারও গানটি রেকর্ডিং করা সম্ভব হয় নি।

আরাধনার গান নিয়ে কাজ করতে করতে একদিন শচীন দেব এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে তার আর সময়ের দিকে খেয়াল ছিল না। সেদিন অনেক রাত হয়ে গেছে, কিন্তু তখনও তিনি স্টুডিওতে। এতটাই উত্তেজিত ছিলেন যে গভীর রাতেই শচীন কিশোর কুমারকে ফোন করে বললেন স্টুডিওতে এসে গানটা রেকর্ড করে দিতে।

এমনিতেই কিশোর কুমার ছিলেন বেশ মেজাজী মানুষ। এত রাতে ফোন করে ঘুম ভাঙানোর কারণে তিনি বিরক্ত হলেন। কিন্তু শচীন দেবের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। বর্মণকে তিনি দাদা ডাকতেন। তাই না করতে পারলেন না, বিরক্তি লুকিয়ে গভীর রাতেই স্টুডিওতে আসলেন গান রেকর্ডিং করতে।

কিন্তু স্টুডিওতে এসে গানের সুর শোনার সাথে সাথেই কিশোর শচীন দেবের ওপর ক্ষেপে গেলেন। শচীন দেব বর্মণকে তিনি বললেন, ধুর! দাদা এই বিরক্তিকর গান গাওয়ার জন্য আপনি আমাকে এত রাতে ফোন করে ডেকেছেন!

কিশোর কুমারের এই কথা শুনে শচীন দেব রাগ করে রেকর্ডিং রুম থেকে বের হয়ে গেলেন আর কিশোরকে বলে গেলেন গান যাতে ঠিকঠাকমত শেষ করা হয়। শচীন বের হয়ে যাওয়ার পর কিশোর বুঝলেন কাজটা তিনি ঠিক করেন নাই, দাদার সাথে তার উত্তেজিত হওয়া ঠিক হয় নাই।

তিনি তখন শচীনের দেবের একটা বিখ্যাত বাংলা ভাটিয়ালি গানের সুর ব্যবহার করে গানটি শেষ করেন। আর এই গানটিই কিশোর কুমারের গাওয়া জ্যাজ ফ্লেভারের বিখ্যাত হিন্দী গান ‘রূপ তেরা মাস্তানা’।

এই হলেন কিশোর কুমার। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হত ৯০ বছর। চলে গেছেন আজ থেকে প্রায় ৩২ বছর আগে। এখনও সমান চুম্বক কিশোর কুমারের গানে। এখনও আগের মতো সমান জনপ্রিয় তিনি। তাঁর নামে ভারতবর্ষের যে কোনও প্রান্তে অনুষ্ঠান হোক না কেন, সিট ফাঁকা পড়ে থাকে না! যত মাধ্যম আছে সব জায়গায় তাঁর গান হিট।

কিশোর কুমার তার কাছে ঈশ্বর। বাড়িতে কিশোর কুমারের জুতো রেখে পুজো করেন। নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে তার ঈশ্বরের একটি মূর্তি তৈরি করিয়েছেন তিনি। কিশোর কুমারের প্রয়াণ দিবসে তাকে শ্রদ্ধা জানালেন কিশোরকণ্ঠী শিল্পী গৌতম ঘোষ। বললেন-
‘‘আমার জীবনে বাবা-মায়ের পর যার জায়গা তিনি কিশোর কুমার। আমার ঈশ্বর। আমার ভগবান।

খুব কম লোকই হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে যাদের কিশোর কুমারের গান ভাল লাগে না। আমার, আমাদের শৈশব কৈশোরের অনেকটা সময় কিশোর কুমার শাসন করেছেন।

তার কাছেই প্রথম শোনা পৃথিবী বদলের গান, সুখজাগানিয়া প্রেম , কিংবা হতাশার অভিমানে নিজেকে খুঁজা ।এমনি করে আমাদের প্রেমে-দ্রোহে-আনন্দ-বেদনায় এই দরাজ গলা সাথে সাথে থেকেছে—–

কিশোর কুমার না জন্মালে পৃথিবীটা এত রোমান্টিক কখনোই হত না!

কিশোর কুমার পৃথিবীতে একবারই আসেন—তারপর জন্ম-জন্মান্তর ধরে চলে তাঁর স্তবগাঁথা।

আজ কিশোর দিন

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত