চুম্বন

 

ঘোরের মধ্যে এক মিনিট বার সেকেন্ড কাটলো মোবাইলে!

সম্পূর্ণ অপরিচিত কণ্ঠস্বরে কথা বলল বিশ বছরের পুরনো বন্ধু। সদ্য কৈশোর পেরুনো আমাদের মেয়েদের সবার গলা ছিল রিণরিণে। আর ওদের গলা ছিল কেমন বসে যাওয়া। কিন্তু আমাদের কোরাস গানে তাতে খুব একটা এসে যেত না। ঘাসের মখমলি গালিচার মতো মসৃণ উদ্দাম দিনগুলো। পড়াশোনার কেয়ার খুব একটা করতাম না। শুধু পরীক্ষার আগে রাত দুটোয় উঠে পড়তে বসতাম লোডশেডিং এর মধ্যে মশার অত্যাচার সহ্য করে। সারাদিন বাউন্ডুলেপনা। নির্ঝর চঞ্চলমুখর জীবন। দুশ্চিন্তাহীন। বিজয়ের গলা অনেকটা নিষ্পৃহ, অথচ একটা অন্তর্গত কাতরতা তাতে রয়েছে। কিন্তু এত বছর পরে আমার পিতামহের ভিটায় গিয়ে ফোন নাম্বার যোগাড় করেছে সে। এতসব করে ওর আমাকে ফোন করে রাজনের মৃত্যু সংবাদ দেবার কারণ কি আমাদের তিন জনের মধ্যে একদিন দুপুরে ঘটে যাওয়া একটি অসমাপ্ত ঘটনা? আমার খারাপ লাগল রাজনের কথা শুনে, কিন্তু ঐ দিনের ঐ অদ্ভুতূড়ে ঘটনার জন্য বিজয় যদি রাজনের হয়ে আমার কাছে পরোক্ষে ক্ষমা চেয়ে থাকে তবে আমিও বিজয়ের কাছে দুঃখিত। আমার ইহজীবনে কখনোই আমি রাজনকে ক্ষমা করতে পারব না।
আমাদের প্রোগ্রামের ডিরেক্টর জাহাঙ্গীর ভাই বলেছিলেন, মীরা, তুই আর রঞ্জন একটা ডুয়েট গা, রাজন চার-পাঁচটা গান করুক, ওর গলা তো সবচেয়ে ধারালো, অনুরোধ আসলে আরো করবে, আমার মনে হয়, ওই ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দিতে পারবে, রঞ্জন খান তিনেক, আর তুই দুটো, তুই বেশি করিস না, নাটকে তোর পার্ট আছে, নয়তো পুরো অনুষ্ঠানটাই তুই তুই হয়ে যাবে, কোরাস গান তো ছয়টা, শহীদুলের কৌতুক তিনটা, আরো যারা গান করবে একটা করে তারাও তো আছে জন দশেক। আমার তো মনে হয় চার ঘণ্টার একটা টাইট প্রোগ্রাম হবে। জমিয়ে দিতে পারবি মনে হয়।
আমারও মনে হচ্ছিল অনুষ্ঠানটা একটা স্মরণীয় অনুষ্ঠান হবে। গাঁটের টাকা খরচ করে কলেজের অনুষ্ঠানে নাচব, গাইব, অভিনয় করব, দর্শক ছাত্র-ছাত্রীদের নাস্তা খাওয়াব, অনুষ্ঠান জমবে না কেন? আমরা এ্যামেচার শিল্পী আছি পঞ্চাশ জন। নাটকে যে চাপরাশির অভিনয় করছে, একটা সংলাপ বলার সুযোগ নেই, শুধু থালা প্লেট আনা নেয়া করছে সেও প্রচুর টাকা চাঁদা দিয়েছে। তিন মাস ধরে কঠোর রিহার্সাল করেছি, প্রতিদিন তিনঘণ্টা। কোথাও একটু খুঁত না থাকে। হায়, অত করে আমরা যদি পড়াশোনাটা করতাম!
আমাদের অন্যতম প্রধান অভিনয়শিল্পী কামরুণের জ্বর এসেছে, ধুম জ্বর। খবর এনেছে বিজয়। কামরুণের বাড়ি শহর থেকে ছ’ কিলোমিটারের পথ। তবুও আমাদের সবার খবর আদান-প্রদানকারী বিজয় সাইকেল নিয়ে দিনে বহুবার বহু খবর ঠিকঠাক পৌঁছে দেয়। দু’দিন কামরুণ কলেজে তো আসেইনি এমন কি রির্হাসালেও আসেনি। অনেকেই কলেজে না এলেও রিহার্সাল কখনো মিস করেনি। বৃহস্পতিবার কলেজ শেষে বিজয় বললো, চল আমরা আজ রিহার্সাল বাদ দিয়ে কামরুণকে দেখে আসি। আমারও মনে হচ্ছিল সকাল থেকে, কামরুণকে দেখতে যাওয়া উচিত। কিন্তু সবার প্রস্তুতি কেমন কে জানে? সবাই যেতে চাইবে হয়তো, কিন্তু ছ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেকেরই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। বাড়িতে তো কেউ বলে আসেনি। এছাড়া হয়তো সবার কাছে রিক্সাভাড়াও নেই। বিশ বছর আগে ছোট্ট জেলা শহরে বাবা মায়ের কাছে দশ টাকার বেশি হাত খরচ মিলত না। তাও সকালের ক্লাস শুরুর আগেই হালিম ভাইয়ের ক্যান্টিনে চটপটি চা সিংগারাতেই উড়ে যেত। শেষ পর্যন্ত নয়জন যাব ঠিক হল। এর মধ্যে আমরা চারজন মেয়ে। দুটি রিক্সা নিলাম। ওরাও নিল দুটি। রাজন বিজয় আর বিপ্লব একটাতে। দীপেন আর সাগর একটাতে। বাকিতে সবাই কিছু কিছু জিনিস নিলাম সঙ্গে আমি আর নিলুফার কামরুণের জন্য নিয়ে যাচ্ছি হরলিক্স। বেলা আর সালমা নিয়েছে আপেল কমলা আর আঙুর। ওরা নিয়েছে রুটি বিস্কুট সিরাপ। কামরুণকে দেখে ফেরার পথেই বেলা আর নিলুফারের বাড়ি, ওরা আর রিক্সা নিল না। দীপেন সাগর আর বিপ্লবের বাড়িও কামরুণের বাড়ি আর কলেজের মাঝামাঝি। ওরাও হেঁটে ফিরে গেল। বিজয় বলল, মীরা আয়, আমাদের বাড়িতে পানি টানি খেয়ে যাবি। আমি সালমা আর রাজন বিজয়দের বাড়ি গেলাম। আগের দিনের বৈঠক খানার মত বাড়ির সামনে আলাদা একটা বড় কাঠের ঘর। সেখানে বিজয় আর তার বড় ভাই সাজ্জাদ পড়াশোনা করে। সাজ্জাদ কলেজ থেকে ফিরে ওদের বাবার দোকানে গেছে। সালমা, আমি আর রাজন বিজয়দের বাড়িতে সেই অপরাহ্নে নাস্তা করলাম। খইয়ের মোয়া, কাঁঠাল আর আম। খিদে পেটে সব ভালো লাগল। সালমাদের বাড়ি কাছেই, ও কয়েকবার অনুরোধ করল ওর বাড়িতে যাবার। কিন্তু আমার বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যাবে, না করলাম, আমি এবার উঠব। মা হয়তো এর মধ্যে আমাকে খুঁজতে বড় রাস্তায় চলে এসেছে। সালমা একটু মনঃক্ষুন্ন হয়ে চলে গেল। এবারে বিজয় আমাকে রিক্সা ধরে দেবে। হঠাৎ রাজন বলল, ‘আরেকটু পানি খাওয়াতো।’ আমি যথা অভ্যাস গুরুজনের মতো বললাম, ‘আম খেলি মাত্র, এখনই পানি খাবি। ফল খেয়ে তো জল খায় না। ফল খেয়ে জল খায়, যম বলে আয় আয়।’ রাজন এক অদ্ভূত চোখে তাকাল আমার দিকে। বিজয় বেরিয়ে গেল পানি আনতে। পানি থাকে পাকঘরে। বৈঠকখানার পরে মূলঘর, তার পিছনে রান্নাঘর। রাজন চট করে আমার কাছে চলে এল, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘তোকে আমি খুব পছন্দ করি মীরা …।’ আমি এরকম অবস্থার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। এসব ব্যাপার মৌখিক বলার আগে তখন চিঠি পাঠানোর রেওয়াজ ছিল। আমি রাজনের কাছ থেকে কোন চিঠি পাইনি। সামলে নিয়ে বললাম, ‘আমিও তো তোকে পছন্দ করি, বিজয়কেও, দীপেন, রাজু, সাগর, বিপ্লব, কামরুণ, বেলা, সালমা, অঞ্জনা, সায়েম সবাইকে। এটা আলাদা বলার কি আছে?’ রাজন এবার রেগে গেল, আমাদের সঙ্গে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়লেও রাজন আমাদের সবার চেয়েই বয়সে কমপক্ষে তিন বছরের বড়। সেটা ওকে দেখলেই বোঝা যেত। ওর হাবভাবেও সে ভাবটা ছিল। ও চট করে আমার বেণীটা ধরে বলল, ‘ফাজলামি করিস না মীরা, আমি তোকে সে ভালোলাগার কথা বলিনি। তুই ভালোই বুঝিস কী বলেছি আমি। তোকে আমি ভালোবাসি, আমি তোকে চুমু খাব, এখুনি।’ আমি তখন ষোল পার হয়ে সতেরোয় পা দিয়েছি। পৃথিবীর যাবতীয় সংস্কার আমার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত আমার পিতামাতা আমার মধ্যে রোপণ করে দিয়েছেন সেই সাত বছর বয়েস থেকেই। গান করি অথবা উপস্থাপনা বা অভিনয় করি অন্য আর সবার মতোই দর্শকের হাততালির জন্য। নিজের ভেতরের আমিকে উগড়ে দেবার জন্য। কিন্তু তাই বলে এই বয়সেই প্রেম! চুমু! আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। গায়ের জোরে ঠাস করে একটা থাপ্পড় মারলাম ওর গালে। বিজয় ততক্ষণে ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর হাতে জগটা আগের মতোই খালি। কিছু একটা অনুমান করে ও আর পাকঘর পর্যন্ত যায়নি, ফিরে এসেছে বৈঠকখানা ঘরে। ও হাত ধরে টেনে রাজনকে ঘরের বাইরে বার করল। আমিও চুল ঠিকঠাক করে নিলাম। ক্রোধে জ্বলতে জ্বলতে বিজয়কেও কিচ্ছু না বলে বাইরে বেরিয়ে এসে দ্বিগুণ ভাড়ায় রিক্সা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলাম।
এরপরে বিজয় আমাকে ছ’পাতার একটা দীর্ঘ চিঠি লিখেছিল, রাজনের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চেয়ে। সে চিঠির মধ্যে ওর নিজের জন্যও কোথায় একটা অপরাধবোধ ছিল। আমি সে চিঠির কোন উত্তর দেইনি। অনুষ্ঠান আমরা শেষ করেছিলাম। যদিও আমার ডুয়েটের পার্টনার রঞ্জনও একটা ঝামেলা বাঁধাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সালমা আর দীপেনের কৌশলে সে ঝামেলাটা পাকিয়ে তুলতে পারে নি। খুব চমৎকার অনুষ্ঠান হয়েছিল। প্রিন্সিপ্যাল স্যার নিজে আমাদের ছজন উদ্যোক্তাকে বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে বিশেষ পুরস্কার দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনের আচরণে আমি যে মানসিক কষ্ট পেয়েছিলাম তা এখনো আমাকে পীড়া দেয়। যদিও নিজের মনের এই আচরণে নিজেরই আশ্চর্য লাগে। আমি তো রাজনকে পছন্দই করতাম। অনেক বেশি, ছেলেদের মধ্যে বিজয় আর রাজন এই দুজনকেই আমি বেশি পছন্দ করতাম, নির্ভর করতাম। রাজনের আচরণ আমার কাছে বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হয়েছিল, আজও তাই মনে হয়। কেন যে এমন মনে হয় বুঝে উঠতে পারি না। উঠতে বয়সে আবেগের প্রাবল্য থাকে, থাকে অজানাকে জানার আগ্রহ, সে সময়ে কেউ এধরনের অপরাধ করতেই পারে। ও আমাকে গ্রাস করার আগেই তো আমি পাল্টা আঘাতে ওকে থমকে দিয়েছিলাম। কিন্তু কেন তাকে আজও ক্ষমা করতে পারছি না? আজ সে মৃত, তারপরেও? নিজেকে বুঝতে পারিনি তাই? ও আমাকে প্রস্তুতির সময় দেয়নি তাই? নাকি সংস্কার?
ইন্টার পাশ করার পর রাজনকে আমি দেখি ন বছর পরে, রেলস্টেশনে। কলেজ থেকে ফিরছি। আমাকে দেখেই রাজন আর দীপেন চায়ের স্টলের পাশে দাঁড়িয়ে কি গুজ গুজ ফুস ফুস করছিল। দীপেন এগিয়ে এসে বলেছিল, ‘মীরা কোথা থেকে এলি?’ আমি রাজহংসীর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘কোথা থেকে এলাম মানে? আমি প্রতিদিনই কলেজে পড়িয়ে এই পথ থেকে ফিরি, তুই কোত্থেকে এলি?’ আমার কথার মধ্যে তাচ্ছিল্য ষ্পষ্ট ছিল। রাজন, দীপেন, বিপ্লব, সোমা, বেলা, এদের সবাই কোনক্রমে ডিগ্রী পাশ করেছে কেউ কেউ কেউ বা শুধু ঐ ইন্টারমিডিয়েটই। ফজলুল তো পাশই করতে পারেনি। দীপেন একটা বাসন কোসনের দোকান দিয়েছে বাজারে। রাজন কী করে কে জানে! গান টান বোধ হয় চুলোয় গেছে। রাজন দীপেন দুজনের মুখই ততক্ষণে কালো হয়ে গেছে ভেজা ছাইয়ের মত। তাও দীপেন সাহস করে বলল, ‘রাজন তোর সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়, মাত্র পাঁচ মিনিট।’ আমি সেই একই ভঙ্গিতে ঘাড় ঘুরিয়ে বলেছিলাম, ‘আজ তো সময় নেই রে, পরে কোন দিন, কেমন?’ চলে এসেছিলাম। কী বলতে চেয়েছিল রাজন? ক্ষমা চাইতে চেয়েছিল? অথবা আবারও সেদিনের সেই কথা? অত সাহস কি সেই ন বছর পরেও বজায় ছিল ওর? এখন মনে হয়, কী হতো পাঁচ মিনিট কথা বললে, ঝগড়াই না হয় হতো। কিন্তু বাজে ছেলের যে চিত্র আমি নিজের মধ্যে এঁকে রেখেছি রাজনের জন্য, সেটা পেরিয়ে কথা বলা সম্ভব ছিল না তখন। কত সহজে আমরা ভাল বা মন্দের বিচার করে ফেলতাম তখন। এ ভাল, এ খারাপ। আর নিজেদের অহংকার, অহমিকা, শ্রেষ্ঠত্ববোধ সেটাই অধিকার করে রাখত আমাদের। এখন মনে হয়, কত তুচ্ছ, কত সামান্য, কত অর্থহীন সেসব। রাজন মরে গেছে। আমরাও এখন না হয় বিশ-পঁচিশ বছর পরে মরে যাব। হাওয়ার মধ্যে ব্যর্থ কান্নার মতো ঘুরে মরবে আমাদের যাবতীয় অহম। তাও তো এখনো ক্ষমা করতে পারছি না রাজনকে। প্রচলিত মূল্যবোধ, ভালোমন্দের সংজ্ঞা, অহম নাকি বিশ্বাসঘাতকতা কোনটা আমাকে বাঁধা দিচ্ছে?
বিজয় ফোনটা রাখার আগে বলেছে, মীরা তুই জানতিস না, আমাদের মধ্যে অর্ধেক ছেলেরাই তোর জন্য পাগল ছিলাম। আমি কী বুঝতাম সেটা? নিশ্চয়ই। আমাকে রক্তমাংসের মানুষ বানাতে চাইলে সে তো আমার সমান হয়ে গেল। সেজন্যই প্রেম করার মত অতি সাধারণ প্রস্তাব দেবার সাহস যে করবে সে তো আমার কাছে অপরাধী। আমি তো দেবী ছিলাম, পূজাই ছিল আমার উপভোগ্য, তার বেশি কিছু নয়। বিজয় রাজনেরা আমার সতের বছর বয়সের ফ্রেমে আটকে গেছে, তাই তারা ক্ষমার অযোগ্য। অথচ এখন আমি এখন একজন গড়পড়তা গৃহিনী মাত্র …

২৬-২৭ মে, ২০১৫

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত