কল্পজগতের জাদুকর উপেন্দ্রকিশোর রায়

‘টুনটুনির গল্প’ ‘হাসিখুশি’ ‘আবোল তাবোল’ ইত্যাদি শিশুসাহিত্য গুলো হাতে নিলে আজও দূরে সরে যাওয়া আমাদের শৈশব টুক করে পাশে এসে বসে! অপার আনন্দে ফিকফিকিয়ে হাসে। এমন গল্পগুলোর শরীরে সময় যেন দাঁত বসাতে পারেনা। গল্পগুলো চির সবুজ। কালোত্তীর্ণ এসব গল্প নিরন্তর আনন্দের ঘন্টাধ্বনি হয়ে আমাদের বুকে বেজে উঠতে সময় নেয় না খুব একটা। ১৯১০ সালে প্রকাশিত গল্প ২০১৯’ও কেমন সতেজ!

খানিকটা এমন কিছুই বলে গেছেন খ্যাতনামা ইংরেজ সাহিত্যিক উইলিয়াম সমারসেট মম্। তাঁর মতে, ‘গদ্যের জীবন চল্লিশ বছরের, তারপর তা সেকেলে হয়ে যায়। কিন্তু কবিতা চিরকাল বেঁচে থাকে, কেননা তার কারবার চিরন্তন ব্যাপার কে নিয়ে। এমনটা শিশুসাহিত্যের জন্যেও বলা যায়। কবিতার সঙ্গে শিশুসাহিত্যও অমরত্বের স্বাদ ভাগ করে নেয়।’ বলাই বাহুল্য একথা উৎকৃষ্ট কাব্য ও শিশুসাহিত্য সম্পর্কেই বলা হয়েছে। প্রখ্যাত লেখক প্রমেন্দ্র মিত্র এই ধারণার সাথে আরেকটি মাত্রা যোগ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ‘সবচেয়ে ভালো শিশুসাহিত্য এমন হবে যা পড়ে সংবেদনশীল বয়ষ্ক পাঠকও আনন্দ পাবেন।’

কালোত্তীর্ণ শিশুসাহিত্যগুলো আজও তাই বাংলাভাষী ছেলেবুড়ো পাঠককের আনন্দের সঙ্গী। একথা সত্যি, বড়রা নিছক বিনোদন কিংবা কোনো বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বই পড়েন। কিন্তু ছোটোরা যে বই পড়ে তা দিয়ে তাদের পুরো চিন্তাপ্রবাহ তৈরি হয়ে যায়। তাদের রুচিবোধ তৈরি হয় এবং এই বই থেকে তারা তাদের সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে চেষ্টা করে। সবচেয়ে ভালো জিনিসটা হলো, একটি উৎকৃষ্ট শিশুসাহিত্য শিশুকে অপার আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারে। কী করে প্রকৃতির জগৎ ও দৈনন্দিন সাধারণ জিনিসগুলো থেকে আনন্দ খুঁজে নিতে হয় তা এসব শিশুসাহিত্য দেখিয়ে দিতে পারে। শিশুদের চিন্তার জগৎ কে সুন্দরের পথ দেখাতে, আর আনন্দে ভরিয়ে দেবার মহৎ ইচ্ছে নিয়ে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়ের মত প্রমুখ কালোত্তীর্ণ শিশু সাহিত্যিকেরা। শিশুসাহিত্যের পথ প্রদর্শক যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সুযোগ্য সারথী উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। রঙ আর সুরে শিশুমনকে ভুলিয়ে রাখার জাদুকর উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জীবনের গল্পেও রয়েছে দারুণ সব বাঁক, দারুণ সব মানুষের কাছাকাছি হবার আখ্যান।  বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের একজন ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তাঁর পরিণত জীবনের গোটাটাই এবং কর্মজীবনের কেন্দ্র কলকাতা হলেও তাঁর আদিভিত্তি ছিল পূর্ববঙ্গ, আধুনা ময়মনসিংহ জেলায়, যেখানে তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে সাহসী কোন একজন বৈষ্ণবধর্মের প্রাণকেন্দ্র নদীয়া থেকে চারশ’ বছর আগে সেখানে চলে গিয়েছিলেন। তারও আগে এই পরিবারটি আসে বিহার থেকে। তখন এদের পদবী ছিল, ‘দেও’ বা ‘দেব’।

এ বংশের নথিপত্র মারফৎ জানা যায় যে, পনের শতকের শেষ কিংবা ষোল শতকের শুরুর দিকে রামসুন্দর দেব পূর্ব দেশে আগমণ করেন। সম্ভবত তিনি আর্থিক উন্নয়ন কিংবা দেশ দেখার আগ্রহে পূর্বদেশে আসেন। রামসুন্দর দেব কেবল মাত্র সুপুরুষই ছিলেন না, ছিলেন বুদ্ধিমান ও সাহসী। নতুন এলাকা সেরপুরের এক বর্ধিষ্ণু গ্রামে যখন তিনি পৌঁছান, তখনও ময়মনসিংহের গোড়াপত্তন ঘটেনি। সেখানে পৌঁছে তিনি বুদ্ধি খাটিয়ে জমিদারের কাছে গিয়ে হাজির হন। জমিদার তার বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, আচরণ এবং জ্ঞানে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দায়িত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পদ দান করেন। নিষ্ঠার সাথে রামসুন্দর জমিদারের সে উদার পৃষ্ঠপোষকতার মর্যাদা রাখেন। পরে তিনি যশোদলের রাজা গুণীরামের কন্যাকে বিয়ে করেন এবং যশোদলে স্হায়ী হন। বলাবাহুল্য, এই রামসুন্দর দেব ই হলেন আধুনা ময়মনসিংহের মসূয়া গ্রামের প্রতিভাধর রায় পরিবারের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। মসূয়া গ্রামে রায় পরিবারের যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। সেটা যতটা না সম্পদের কারণে,  তারচে’ বেশি শিক্ষা-দীক্ষার কারণে। রায় পরিবারের লোকজন জ্ঞানচর্চায় খুব এগিয়ে ছিলেন। তাঁরা ছিলেন জাত ভাষাবিদ। তাঁদের আরবি ফারসি জ্ঞান ছিল ঈর্ষণীয় পর্যায়ের। মুসলিম আইন ছিল নখদর্পণে। এই আইন বিষয়ে আইনজ্ঞরা পর্যন্ত তাঁদের স্মরণাপন্ন হতেন।

বলা প্রয়োজন, ইতিপূর্বে পরিবারের এক পূর্বসূরী ‘দেব’ উপাধি ত্যাগ করে ‘রায়’ উপাধি নেন। এদেরই এক ছোটো শরিক, ছোটো এক জমিদারি কিনে নাম নিয়েছিলেন ‘রায় চৌধুরী’। রায় চৌধুরী সম্পর্কে পাঠকের কৌতূহল মেটাতে লেখকের ভাষ্য, ‘এ সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ দেখানোর কারণ হলো এদেরই এক বংশধর চারবছর বয়সের উপেন্দ্রকিশোর কে দত্তক নিয়েছিলেন। উপেন্দ্রকিশোরও সর্বদা এই ‘রায়চৌধুরী’ নামেই পরিচিত হয়েছেন(সন্দেশে প্রকাশিত বহু লেখায় উপেন্দ্রকিশোরও কেবল ‘রায়’ পদবী ব্যবহার করেছেন/ সূত্র: উপেন্দ্রকিশোর সমগ্র)। যদিও তাঁর পুত্র ও পৌত্র আর ‘চৌধুরী’ ব্যবহার করেননি’। উপেন্দ্রকিশোরের পারিবারিক ইতিহাস বেশ চিত্তাকর্ষক।

উপেন্দ্রকিশোরের জন্মদাতা কালীনাথ রায়, তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য মুন্সী শ্যামসুন্দর নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। মায়ের নাম জয়তারা। তাঁর দত্তকপূর্ব নাম (পিতৃপ্রদত্ত) কামদারঞ্জন। যা তাঁর বড়ভাই সারদারঞ্জনের সাথে মিল রেখেই রাখা হয়েছিল। শ্যামসুন্দরের জমিদারী কেনা জ্ঞাতি হরিকিশোর রায়চৌধুরীর কন্যা সন্তান থাকলেও(মতান্তরে নিঃসন্তান। উৎস: ‘উপেন্দ্রকিশোর সমগ্র’/দে’জ পাবলিশিং) পুত্রসন্তান ছিল না বলে সদাশয় শ্যামসুন্দরের কাছে এই ছেলেটিকে দত্তক নেবার আব্দার করলে তাঁকে বিমুখ করেননি, ফলে হরিকিশোর রায়চৌধুরী শ্যামসুন্দরের দ্বিতীয় ছেলেটিকে দত্তক নেন। তার নতুন নামকরণ করা হয় উপেন্দ্রকিশোর। তবে ভাগ্যের পরিহাস পরের বছরই হরিকিশোরের স্ত্রী একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। নরেন্দ্রকিশোর নামের সে ছেলে উপেন্দ্রকিশোরের ছোট ভাই হিসেবেই বড় হন।

হরিকিশোর তাঁর দত্তক পুত্র উপেন্দ্রকিশোরের উপর গ্রামীণ প্রচলিত রীতিনীতি চাপিয়ে দেবার পক্ষপাতি ছিলেন না। ফলে উপেন্দ্রকিশোর তাঁর খেয়ালি স্বভাব নিয়ে বেড়ে উঠেছেন আপন মনে। তিনি একজন শিল্পী মন নিয়েই জন্মে ছিলেন যেন। পাঠ্যবইয়ের পাতায় পাতায় নানান চিত্রের অলংকারে সে সাক্ষর ফুটে ওঠতে সময় লাগে না। শুধু আঁকাআঁকিতে নয়, গানেও ছিল তাঁর দারুণ দক্ষতা। সহজেই সুর তৈরি করতে পারতেন। বাঁশি ও বেহালায় তুলতেন অসাধারণ সব সুর। এই খেয়ালি বালকটিকে পালক পিতা হরিকিশোর যথাযথভাবে চিনে উঠতে না পারলেও তার মেধা বিকাশে সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতার ব্যবস্থায়  কোনো ত্রুটি রাখেননি। ময়মনসিংহ বয়েজ স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন তাকে নিয়ে শিক্ষকদের অভিযোগের অন্ত ছিল না।  কেননা, ছাত্রটির পড়ার চেয়ে আঁকাআঁকি আর বাঁশি-বেহালা’র প্রতিই অধিক মনোযোগ। অথচ তাদের অভিযোগও খুব একটা ধোপে টিকতো না, ছাত্রের তীক্ষ্ণ মেধার কাছে। কারণ পরীক্ষার ফলাফল তিনি বরাবরই ভালো করতেন। ক্লাসে শিক্ষকদের প্রশ্নের উত্তরে কোনো ভুল ধরবার সুযোগই ছিল না। এহেন পাঠবিমুখ ছাত্রের দারুণ ফলাফলে কৌতূহলি শিক্ষকের বিস্মিত প্রশ্ন ছিল, ‘ পরিস টড়িস না, শুধু তো বাঁশি বাজিয়ে দিন কাটাস, কিন্তু ঠিক উত্তর দিস কী করে?’ সপ্রতিভ ছাত্রের সটান জবাব, ‘অন্য ছেলেরা যখন চিৎকার করে পড়ে, তখন আমি শুনি। তাতেই হয়ে যায়।’

ছেলে সম্পর্কে হরিকিশোরের কাছে যেসব অভিযোগ আসতো, সেসব নিয়ে তিনি প্রায় ভাবতেন ছেলেকে সাবধান করে দেয়া দরকার। নিজের খেয়াল খুশি মত চলাফেলার অভ্যেস থাকলেও ছেলেটির ছিল শিল্পীসুলভ অনুভূতি ও স্পর্শকাতরতা। ফলে কিছু বললেই, সে বাঁশি ছুঁড়ে ফেলে দিতো, বেহালা ভেঙে ফেলতো। তারপর শুধুই বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতো। যার ফলে ক্লাসের পরীক্ষায় প্রথম স্হানটি নিশ্চিত হতো ঠিকই, কিন্তু রঙ আর সুর বিনা তাঁর প্রাণ ঠিকই ছটফট করতো। ছেলের এমন যাতনা হরিকিশোর রায়চৌধুরী মোটেও উপভোগ করতেন না। ফলে স্পর্শকাতর এই ছেলেটির সংশ্লিষ্ট বিষয় আলোকপাতের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে পা ফেলতেন।

ছেলের এসব আচরণে অভিভাবক হিসেবে তিনি হয়ত খানিক বিচলিত হতেন, তবে তার শঙ্কার কারণ ঘটে অন্য একটি বিষয়কে ঘিরে। রায় চৌধুরী পরিবারের মতই আরেকটি সম্মানীয় পরিবারের ছেলে গগনচন্দ্রের সাথে উপেন্দ্রকিশোরের মিলামেশাটা ঠিক ভালো চোখে দেখতেন না। গগনচন্দ্র কলকাতার স্কুলে পড়াশোনা করতেন এবং রাজা রামমোহন রায়ের ভক্ত-অনুসারী, অনেকের সাথে তার আলাপ পরিচয় ছিল। তাদের সবাই ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের লোক। ব্রাহ্ম সমাজের নানান সাহসী ধ্যান ধারণা জেনে/শিখে এসে গগনচন্দ্র মুক্ত হস্তে উপেন্দ্রকিশোরকে বিলাতেন। তরুণ উপেন্দ্রকিশোরের মনে তার ছাপ পড়তো। তাছাড়া তাঁর মনেও নানান উদারনৈতিক চিন্তার স্হান ছিল। যে কারণে অভিভাবক হিসেবে হরিকিশোরের শঙ্কা ছিল ছেলে না আবার ব্রাহ্মত্ব গ্রহণে আগ্রহী হয়ে পড়ে। কালক্রমে সে আশঙ্কা সত্যি হয়েছিল বটে। তাঁর ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আগ্রহ অধিক হয় জড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারটির সান্নিধ্যে এসে। তাঁর চেয়ে বয়সে কিছু বড় রবীন্দ্রনাথের সাথে উপেন্দ্রকিশোরের নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় লাগেনি। সে বন্ধুত্ব আজীবন অম্লান থেকেছে।

ব্রাহ্মরা মূর্তিপূজায় বিশ্বাস করতেন না। বর্ণভেদ মানতেন না। তাঁদের বাড়ির মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাঁধা ছিল না, এবং তারা কোনোরকম পর্দাপ্রথা মানতেন না। বালবিধবার পূর্ণবিবাহে হিন্দুশাস্ত্রে যে সায় আছে সেসব দেখিয়ে দিতে তাঁরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সাথে কাজ করতেন। বাড়ন্ত বালকের মনে এসব উপযোগী চিন্তার খোরাক হিসেবে কাজ করে। এসব কারণে গগনচন্দ্রের সাথে উপেন্দ্রকিশোরের মেলামেশায় রক্ষণশীল হরিকিশোর মর্মাহত হন। কিন্তু সেটা ছেলের জন্মদাতা পিতা শ্যামসুন্দরের কানে তুললে যে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে, সেটি নিয়েও তিনি যথেষ্ট সন্দিহান ছিলেন। একে তো হরিকিশোর শ্যামসুন্দরের অগাধ পাণ্ডত্য ও বুদ্ধির প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাবনত, অন্যদিকে শ্যামসুন্দর নিজেই তাঁর এলাকায় এক বালবিধবার পূর্ণবিবাহে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

সম্ভবত জন্মদাতার এসব গুণই ছেলে উপেন্দ্রকিশোরের মধ্যে প্রবাহিত ছিল। সেকারণে হরিকিশোর নিজেই একদিন ছেলেকে ডেকে বলেন, সে যেন আর গগনচন্দ্রের বাড়ি না যায়, কিংবা গগনচন্দ্রকেও বাড়িতে না ডাকা হয়। পিতার এমন কথার অবাধ্য হননি উপেন্দ্রকিশোর। তিনি গগনচন্দ্রকে তাদের বাড়ি ডাকা এবং গগনচন্দ্রের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেন। পরস্পরের বাড়ি আসা যাওয়া বন্ধ হলেও, তাঁরা নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে ঠিকই একে অন্যের সাথে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। এক্ষেত্রে গগনচন্দ্র, কাছেরই এক আম বাগান থেকে বাঁশিতে ফুঁ দিতেন, বন্ধুর ইঙ্গিত বুঝে উপেন্দ্রকিশোর সেখানে গিয়ে তার সাথে দেখা করতেন। এটা বাড়ির কেউ ই জানতে পারেনি। তাদের এহেন যোগাযোগ প্রবেশিকা পরিক্ষা পাশ এবং আরো পড়াশোনার জন্য কলকাতা আসা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

নানান বিষয়ে জড়িত থেকেও উপেন্দ্রকিশোর প্রবেশিকা পরিক্ষায় দারুণ ভালো ফল করে বৃত্তি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি পড়াশোনার জন্য ময়মনসিংহ ছেড়ে কলিকাতা চলে আসবার পর  কার্যত সেখানকার পাট তাঁর চুকে যায়। কলকাতাকেই তিনি নিজের অবস্হানের ভিত্তি হিসেবে আঁকড়ে ধরেন। প্রেসিডেন্সী কলেজের বিজ্ঞানের ক্লাস ও বিভিন্ন পণ্ডিত শিক্ষকের সান্নিধ্যে তাঁর বিজ্ঞানমনষ্কতা হাতেপায়ে বাড়ে। পরবর্তীতে তিনি বহু বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ রচনা করেন, যা দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কলকাতা তাঁর নানান কর্মকাজের ভিত্তিমূল হিসেবে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে নিজেকে তিনি কখনই কক্ষচ্যুত মনে করেননি। রক্ষণশীল ও সম্পদশালী হরিকিশোরের অগাধ প্রচুর্য আর স্নেহে মানুষ হলেও আদতে তিনি ছিলেন জন্মদাতা শ্যামসুন্দরের মত বিষয় সম্পদের প্রতি উদাসীন এবং বিদ্যাচর্চায় উৎসাহী। মসূয়া ছেড়ে কলকাতায় স্হায়ী হলেও, হরিকিশোর এবং শ্যামসুন্দর উভয় পরিবারের প্রতি উপেক্ষার আচরণ করেননি উপেন্দ্রকিশোর , বরং শ্রদ্ধা ও স্নেহানুভূতি আজীবন অটুট ছিল।

উপমহাদেশের নবজাগরণের পথপ্রদর্শক রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর প্রায় সত্তর বছর পর তাঁর রেখে যাওয়া পথের চিহ্ন ধরেই হেঁটেছেন উপেন্দ্রকিশোর। এক্ষেত্রে সমাজ সংস্কারের চেয়ে বাংলা সাহিত্যের এমন এক শাখার প্রতি আলো ফেলতে চেষ্টা করেন, যা পূর্বে  নিছক অনুকরণ বৈ তেমন কিছু ছিল না। উপেন্দ্রকিশোর এবং তাঁর সুযোগ্য সারথীরা শিশুসাহিত্য, বইয়ের অলংকরণ,ফটোগ্রাফি, এবং আধুনিক পদ্ধতির সাহায্যে বই মুদ্রণ ও প্রকাশনার বিষয়ে মনোযোগী হন।

লেখক ও শিল্পী, সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে উপেন্দ্রকিশোরের সমপর্যায়ে পৌঁছানো যে কারো জন্যেই কঠিন সাধ্য। বিদ্যা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পৃথিবীতে উন্নত দেশগুলির মধ্যে অগ্রসর ইংল্যাণ্ডে সেসময় যে সব পদ্ধতি ব্যবহার হতো, সেসব পদ্ধতিগুলিকে আরো উন্নত করতে এবং নতুন পদ্ধতি নিরীক্ষার নানা ধরনের সাহস দেখিয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। যা ইউরোপে সমাদৃত এবং প্রশংসিত হয়েছিল এবং ‘পেনরোজেস্ এ্যানুয়াল’এর মত ফটোগ্রাফি এবং প্রযুক্তিবিষয়ক পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছিল।

বিজ্ঞান বিষয়ক ব্যাপারে উপেন্দ্রকিশোরকে পকেটের পয়সা খরচ করে কাজ চালাতে হলেও, শিশুসাহিত্য বিষয়ে সাহায্যের জন্য বন্ধুদের যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা পান। বইয়ের অলঙ্করণের কাজে পূর্বের অনুকরণ প্রীতি বাদ দিয়ে নিজস্ব রীতিতে কাজ করার পক্ষপাতী ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর, এবং সেভাবেই কাজকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর সুযোগ্য সাথী ছিলেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার। যে কারণে বাংলার শিশুদের জন্য আধুনিক গ্রন্থপ্রকাশের সম্মান উপেন্দ্রকিশোর রায়ের সাথে সাথে যোগীন্দ্রনাথ সরকারেরও প্রাপ্য। শুধু তাই নয়, বাংলা শিশুসাহিত্যের জগতে পথপ্রদর্শক হিসেবেও তিনি স্মরণযোগ্য।

স্কুল শিক্ষক যোগীন্দ্রনাথ সরকার, উপেন্দ্রকিশোরের দু’বছর আগেই শিশুসাহিত্যকে উন্নত পর্যায়ে নেবার ব্রতে নেমেছিলেন, এবং তাঁর প্রায় সারাটা জীবনেই একাজেই ব্যয় করেছেন। যোগীন্দ্রনাথ সরকারের নিজস্ব প্রকাশনী সংস্হা ‘সিটি বুক সোসাইটি’ থেকে উপেন্দ্রকিশোরের প্রথম দুটি বই ‘ছেলেদের রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু উপেন্দ্রকিশোর যখন তাঁর দারুণ দারুণ আঁকা ছবির মুদ্রণ দেখেন, তখন তাঁর মন খারাপ হয়ে যায়। অবশ্য তিনি বুঝতে পারেন যোগীন্দ্রনাথের মুদ্রক ও ব্লকমেকারদের দিয়ে ওরচে বেশি আশা করা ভুল। পরে উপেন্দ্রকিশোর আর কাউকে দিয়েই বই প্রকাশ করেননি। তিনি নিজেই প্রকাশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং নিজের বই প্রকাশ করেন। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করে বাংলায় মুদ্রণ ও ফটো এনগ্রেভিং-এর কাহিনিতে নতুন পরিচ্ছেদের সূচনা করেন।

১৮৮৫ সালে একুশ বছর বয়সে উপেন্দ্রকিশোর, বিখ্যাত সমাজ সেবক, তেজস্বী পুরুষ দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি দ্বারিকা বাবু হিসেবেই পরিচিত ছিলেন; তাঁর প্রথম পক্ষের কন্যা বিধুমুখীকে বিয়ে করেন। দ্বারিকানাথের দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রী বিদুষী কাদম্বিনী বসু ছিলেন সেই সময়ের গ্র্যাজুয়েট(চন্দ্রমুখী বসু এবং কাদম্বিনী বসু এই দু’জন ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট), যখন বিলেতেও নারীদের গ্র্যাজুয়েট হবার সুযোগ ছিল না ; আরো উল্লেখ্য, এশিয়ান প্রথম নারী চিকিৎসকের সম্মানটিও এই বিদুষীর। বস্তুত, দ্বারিকা বাবুর উৎসাহেই কাদম্বিনীর পক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সহজসাধ্য হয়। বিয়ের পর স্ত্রী কাদম্বিনীকে চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়াশোনার জন্য তিনি বিলেতে পাঠান। এহেন গুণীমানুষদের সহচার্যে ১৩ নং কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে উপেন্দ্রকিশোর এবং বিধুমুখী সংসার জীবন শুরু করেন। তাঁরা তিন ছেলে, দুই মেয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন।

ইতিপূর্বে নিজের প্রকাশিত বইয়ে তাঁর আঁকা ছবির যথাযথরূপ ফুটে না ওঠার আক্ষেপটিও তাঁকে স্বপ্নের প্রকাশনী সংস্হার ব্যাপারে দ্বিগুণ উৎসাহী হতে সাহস দেয়।  ফলশ্রুতিতে, বিলেত থেকে বিভিন্ন কলকব্জা আনিয়ে ১৮৯৫ সালে উপেন্দ্রকিশোর তাঁর ৭নং শিবনারায়ণ দাস লেনের ভাড়া বাড়িতে একটি ছোটো প্রকাশনী সংস্হা প্রতিষ্ঠা করেন। নামকরণ করা হয় ‘ইউ রে এণ্ড সন্স’। ‘সেকালের কথা’ নামের লুপ্তপ্রায় জীবজন্তু সম্পর্কীয় অলংকরণ সমৃদ্ধ একটি ছোটো বই তিনি তাঁর নিজের প্রকাশনী থেকে প্রথম প্রকাশ করেন। পরিবারসহ ‘ইউ রে এণ্ড সন্স’ পরে ২২ নং সুকিয়া স্ট্রিট হয়ে ১০০ নং গড়পার রোডের কেনা জমিতে থিতু হয়। এ বাড়িতেই ঘটে বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা, ১৯১৩ সালে ‘সন্দেশ’ পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করে। যার সম্পাদক, প্রকাশক, মুদ্রক, লেখক ও চিত্রকর স্বয়ং উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী নিজে। ‘সন্দেশ’এর হাত ধরে শিশুদের জন্য যে আলোকময় কল্পজগতের দরজা খুলে দেয়া হলো, তার রেশ আজো অমলিন, ঝলমলে। সন্দেশে তিনি শুধু নিজেই লিখেছেন তা নয়, এ পত্রিকা ঘিরে তৈরি করেন ছোটোদের জন্যে নতুন ধারার নতুন লেখক গোষ্ঠী। উপেন্দ্রকিশোরের অনুপ্রেরণায় অনেক খ্যাতনামা লেখক যেমন কলম ধরলেন সন্দেশকে ঋদ্ধ করতে, তেমনি তাঁর বড় ছেলে সুকুমার রায়, বড়মেয়ে সুখলতা, ছোটো মেয়ে পূণ্যলতা, ভাই কুলদারঞ্জন, প্রমদারঞ্জন ও অন্যান্য সদস্যেরা এবং জড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সদস্যরাও লেখালিখিতে এগিয়ে আসেন। ১০০ নং গড়পারের এই বাড়িটির দিকে ভবিষ্যতে বাঙ্গালি বহুবার মুগ্ধ চিত্তে তাকাবে তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী, পুত্র সুকুমার রায় এবং সুকুমার পুত্র সত্যজিৎ রায়ের কারণে। সে ভিন্ন আলোকময় ইতিহাস।

এক অপার আনন্দ জগতের সন্ধানদাতা উপেন্দ্রকিশোর আজীবন সাহিত্য চর্চায় মগ্ন থেকেছেন। বড়ভাই সারদারঞ্জনের মত শরীরচর্চার প্রতি তেমন আগ্রহ পাননি। উপরন্ত, তাঁর অভ্যস্হ কাজের ধারাটি যেহেতু বসা অবস্হাতেই করতে হতো বেশির ভাগ সময়ে, হয়ত সেকারণে ডায়াবেটিস নামের নীরব ঘাতক ব্যাধিটি সহজে বাসা বাঁধে তার শরীরে। যুদ্ধ চলায়, এবং ভারতে তখন পর্যন্ত এরোগে ব্যবহৃত ওষুধ না থাকায়, জার্মান থেকে তাঁর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধটি আনানো অসম্ভব হবার কারণে একরকম বিনা চিকিৎসায়, ১৯১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে রঙিন মানুষটার জীবন ক্যানভাস বর্ণ হারায়। মৃত্যুর একদিন আগে উপেন্দ্রকিশোরের ঘরের জানালায় একটি পাখি এসে বসলো এবং কিছু শব্দ করে উড়ে গেল। উপেন্দ্রকিশোর হাসি মুখে তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘কি বলে গেল শুনেছো?’ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্ত্রী বিধুমুখী জানতে চাইলেন, ‘কি বলে গেল?’ উত্তরে চিত্রকর বললেন, ‘বললো, এই পথে, এই পথে, তারপর উড়ে গেল।’ যেতে যেতেও উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী নামের গল্পরাজ যেন অনন্ত অম্বরে একটি দৃশ্যকল্পের গল্প রেখে গেলেন। যে গল্পে রংতুলির হুল্লোড় নেই।

ঋণ স্বীকার:


ক) ‘উপেন্দ্রকিশোর সমগ্র’ / উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

খ) ‘উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী’ / মূল: লীলা মজুমদার, অনুবাদ: সৈয়দ কওসর জামাল

গ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী- উইকিপিডিয়া

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত