Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,kobi Shoaib Shadab An unfinished chapter

শোয়েব শাদাব : একটি অসমাপ্ত অধ্যায় । জিললুর রহমান

Reading Time: 4 minutes

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comআশির দশকে কবিতার নতুন স্বরের সন্ধান যারা করেছিলেন তাদের মধ্যে একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল নাম শোয়েব শাদাব। সেকালের লিটল ম্যাগাজিনে এই নতুন কাব্যভাষার সন্ধানী কবিতাগুলো খুঁজতে গিয়ে বারংবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল শোয়েবের সংহত বাক্যের মেদহীন কবিতার পংক্তিগুলো। শোয়েব শাদাব নামটি মাথায় এলেই মাটি, নৃতত্ত্ব, সভ্যতা, প্রস্তরযুগ ইত্যাকার নানা অনুষঙ্গ মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে অবিরত। শোয়েবের কাব্যচিন্তা মানুষকে নিয়ে যায় শেকড় ও প্রাগৈতিহাসিকতার দিকে। তাঁর কবিতার ঋজুতা এবং সংক্ষিপ্ত শব্দ প্রয়োগ কবিতাকে করে তোলে টান টান।

তাঁর একটি চমৎকার কবিতার নাম ‘পুনর্জন্ম’। পুনর্জন্ম এই ভূমিতে নতুন কোনো শব্দ নয়। ভারতবর্ষের সনাতন ধর্মে যারা বিশ্বাসী তারা বিশ্বাস করেন যে মানুষ মৃত্যুর পরে আবার জন্মলাভ করে, এবং যার যার কর্মফল ভেদে নানান রকম জীব বা প্রাণীর রূপ লাভ করে থাকে। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে জাতিস্মর জাতীয় কিছু মানুষের কথা সমাজে প্রচলিত আছে। কিন্তু আমাদের আলোচ্য কবি শোয়েব শাদাব তেমন কোনো প্রাণীর জন্মের কথা বলেননি। তবে কেমন এই পুনর্জন্ম?

কবি পাতার আড়ালে চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকবেন একটি মৃত্যুর পর, সেই সময় কোনো অমর অসীম কেউ সারা দুপুর শূন্যতায় কেঁদে কেঁদে নদী কিংবা ঝরনার মতো গলে গলে পৃথিবীতে জলজীবনের সূত্রপাত ঘটাবে।এই জলজীবনের জন্ম পর্বতের স্তন চিরে ঘটে। আর সেই জন্মের নাভিমূলেই কবির নতুন বিকাশ। মূলত জলই জীবনের প্রকৃত সত্য, কবি সেই জলের ভেতরে তাঁর পূনর্জন্মের সংবাদ আমাদের উপস্থাপন করেন। জীবনের শুরু যেখানে, সেখান থেকেই পুনর্জন্ম নেবেন কবি এটাই তো প্রকৃতির গভীর সত্য।

“পাতার আড়ালে গিয়ে চুপচাপ থাকবো ঘুমিয়ে

একটি মৃত্যুর পরে জমে হিম করুণ বরফ

অসীম অমর তুমি শূন্যতায় সারাটি দুপুর

পৃথিবীতে কেঁদে কেঁদে জলে জলে জাগাবে জীবন

              নদী কি ঝরনার মতো গলে-গলে

পর্বতের স্তন বেয়ে চিরে-চিরে জন্মের নাভিতে আমি”  (পুনর্জন্ম)

শোয়েব শাদাবের কবিতা নির্মেদ, কিন্তু ভেতরে বহমান অন্তঃসলিলা আবেগের খরস্রোতা ধারা। তাঁর ‘বোধ’ শীর্ষক কবিতায় কবি ‘বোধ’ ব্যাপারটাকে ত্রিভূবনে একাকার দেখতে পান এবং এই বোধের যেমন কোনো শুরু বা সূচনা নেই, তেমনি তা অনন্ত বা অন্তবিহীন, যার প্রেক্ষাপটকে বিভাজন বা আলাদা করাও সম্ভব নয়। আবার এই বোধ কখনও পরিত্রাণ আর কখনওবা ডানাঅলা আত্মা বিশেষ। এই যে এতো উপমায় বোধের উপস্থাপন করা হলো, তার প্রতিটির জন্যে একের পর এক গাঁথা হয়েছে একক ও অমুখাপেক্ষী শব্দ দিয়ে। যেমন “অন্তশীল ঘুণপোকা কুচি কুচি জলছবি”—— এই ঠাসবুনট শব্দের মহিমায় আমরা কিছু একটা বোধের সামনে উপনীত হই, কিন্তু তা ঠিকঠাক বুঝিয়ে বলতে পারি না। আবার এই বোধের জন্যে দৃশ্যকল্প তৈরি হয় পরের পংক্তিতে——“বীভৎস আদিম রাত দীনহীন জংলি”——কিছুটা ধরা যায় যায় মনে হয়, আবার অনেকটাই অধরা। তবে তাকে দৃশ্যমান করে যখন তা প্রতীকায়িত হয় দৃশ্যাতীত বলবান হাতের মতো মুক্তির সাথে, যা কিনা ডানাঅলা। এই ডানা আমাদের পরিচিত, বাকিটা কপোলকল্পনায় মনের ভেতরে ছবি হয়ে ধরা দিতে চায়।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


“অন্তশীল ঘুণপোকা কুচি কুচি জলছবি

বীভৎস আদিম রাত দীপহীন জংলি

           দৃশ্যাতীত হাত

              বলবান

              মুক্তি

              ডানাঅলা

অনাদিকাল একক বোধ একাকার ত্রিজগৎ

অন্তহীন প্রেক্ষপট অবিভাজ্য পরিত্রাণ

              আত্মা

            ডানাঅলা”

এই কবিতা পাঠ করতে করতে মনে পড়ে যায় জীবনানন্দের “বোধ” শীর্ষক কবিতার কথা। যেখানে মাথার ভেতরে স্বপ্ন কোনো এক বোধ কাজ করে।

“আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে

স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;

স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,

হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়” (বোধ/জীবনানন্দ)

কিন্তু জীবনানন্দের বোধের সাথে শোয়েব শাদাবের বোধের পার্থক্য কোথায়? জীবনানন্দের বোধ যেখানে তুচ্ছ করে তুলছে, শূন্য করে দিচ্ছে সব কিছু, সেখানে শোয়েবের বোধ গাইছে ডানাঅলা মুক্তির গান। জীবনানন্দের বোধ রচিত হতে অনেক দীর্ঘ বিস্তারের প্রয়োজন পড়ে, শোয়েব শাদাবের বোধ অল্প শব্দে নির্মেদ গাঁথুনীতে উদ্ধৃত হয়।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


শোয়েব শাদাবের মাইলস্টোন কবিতা সম্ভবত ‘অশেষ প্রস্তরযুগ’, অন্ত আমার কাছে। পাঁচটি পর্বে বিবৃত এই অসামান্য কবিতাটি। এখানে সূচনায় কবি গুহা পুরুষকে বর্ণিত করেন “গুহা পুরুষের ছায়া বিস্ময়ের মুদ্রায় স্তম্ভিত”। বিস্ময়ের যে একটি মুদ্রা বা ভঙ্গি আছে তা এখানে ভাবনার জালিকা বিস্তার করে। আবার দেখি “লোমশ শরীর যেন দেবতার বলিষ্ঠ প্রতীক / সৌর প্রতিভার প্রণীত ভাস্বর”। এখানে দেবতার সবল প্রতীকরূপে গুহা মানবের লোমশ শরীর যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা পূর্বাপর দেবতা বিষয়ক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক ও বিপ্রতীপ, তবুও যেন চমৎকার বিম্বিত।

শোয়েব শাদাবের বর্ণনায় হিমরাত্রি গুটিগুটি ভল্লুকের মতো এগিয়ে আসে, তখন ডিমের কুসুম ধীরে জলে ডুবে যায়। এই ডিমের কুসুম তো অস্তগামী সূর্য! পাঠের সাথে সাথেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাগরতীরে সূর্যাস্ত অবলোকনের দৃশ্য। এই অন্ধকার পাতাল সদৃশ দেশে তবু পুরুষ ভাস্কর্য স্তম্ভের মতো স্থির, কেবল হাত থেকে খসে পড়ে ক্ষুধার বল্লম, প্রাচীন পাথরের হাতিয়ার। দ্বিতীয় পর্বে কবি বর্ণনা করেন প্রস্তর যুগে জুম পাহাড়ে আগুন জ্বালিয়ে মাংস পুড়িয়ে মেতে ওঠা উৎসবের রাত্রির। যেখানে একটি অসামান্য দৃশ্যকল্প বর্ণিত——

“আখের পাতার মতো ধারালো শরীর

দুলিয়ে দুলিয়ে নাচে পাহাড়িয়া নারী

পুড়িয়ে পশুর মাংস পুড়িয়ে আগুনে

অবিরাম ঘুরে ঘুরে উড়ে উড়ে

অরণ্যের মাতাল জ্যোৎস্নায়

বাতাস আনছে বয়ে ভয়ংকর যৌবনের গন্ধ

মাথার ওপর বানরের ভীষণ আওয়াজ

মাথার ওপর পাখীদের করুণ কীর্তন

মুখরিত আখবন, শেয়ালের শীৎকার

আত্মার চুল্লীতে ছারখার ধ্বংসের অঙ্গার”

এখানে নারীর শরীরের সাথে আখের পাতার মিল খুঁজে পাওয়া এবং বাতাসে ভেসে আসা ভয়ংকর যৌবনের গন্ধ নতুন ভাবনার জাল বুনতে থাকে। এই পর্বের শেষে এসে দেখি আমাদের কবি সেই স্বপ্নময় মানবীর সন্ধান করছেন যার অনার্য দর্পিত স্তন ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব। পরের পর্বে বিরূপ প্রকৃতি ও বরফাচ্ছাদিত সময়ের সুতীব্র অন্তর্ভেদী চিত্র অঙ্কিত হয়। তাতে মানুষের পূর্বজ এপদের প্রতীতি এবং গুহায় অঙ্কিত সিংহের শিকার ও প্রস্তরযুগের বল্লম সব মিলিয়ে একটি সামগ্রিক চিত্র ফুটে ওঠে। অবশেষে মানুষের পরাজয় এবং তার পরও ধ্বংসের ভেতর থেকে সৃষ্টির সম্ভাবনা কবির প্রতীতিতে লক্ষ্যণীয়। বরফ যুগের সূচনা হয়তো কবি এই কবিতার ভেতরে চিত্রিত করতে চেয়েছেন। যার বাহুতে ছিল সূর্যদেবতার শক্তি, সেই মানুষ আজ নিঃস্ব অসহায়। উজ্জ্বল নকশাময় চিত্রিত শহর, রৌদ্রের বন্দর আজ অমালোকে সমুদ্রের তীরে নিভে গেল। প্রকৃতির এই নির্মোহ অত্যাচারের কাছে সংগ্রামী লোমশ পুরুষ অবশেষে পরাজয় বরণ করে। তা ছাড়া তার কোন বিকল্প হয়তো নেই।

“বরফের হিমবাহ

আর ছিন্ন কঙ্কালরাশি

হাড়ের পর্বত।

এখন কোথায় যাবে?

কে নেবে তিক্ততা?

অরণ্যে দাবাগ্নি

হোমাগ্নির হোলি খেলা শানিত

শিকারিরা বরফের নিচে চাপা

চাপা, পাথরের নিচে

পাথরে স্তব্ধতা

পাথরের গায়ে বর্শাবিদ্ধ ভালুকের ছবি

ছবির স্তব্ধতা

স্তব্ধতা সেবন করে বিলুপ্ত চিন্তার কাটা-জিহ্বা

জিহ্বার শিকার তুমি

কে নেবে তিক্ততা?

পাখিও পুড়েছে স্বয়ংক্রিয় পাখার আগুনে

আগুনের বিশ্বাস হন্তায়।

কোথায় নকশাময় চিত্রিত শহর?

রৌদ্রের বন্দর

তা কি সেই অমালোক সমুদ্রের পাড়ে?

সূর্যদেবতার শক্তি ছিলো তোমার বাহুতে

রোমশ শরীরে।

আজ নিঃশেষ

আজ পরাজয়।”

এই অসামান্য কবিতার মতো আমাদের কবি শোয়েব শাদাব যেন সেই লোমশ পুরুষ যিনি একদিন এঁকেছেন গুহামানবের তথা অশেষ প্রস্তর যুগের কাব্যিক ছবি, সেই তিনিই আজ অমালোকে নিপতিত। দীর্ঘজীবন তিনি রোগাক্রান্ত, জীবন থেকে নির্বাসিত এক ভিন্ন জগতে ভিন্ন জীবনে বাস করছেন, যেখানে কবি আছেন থেকেও না থাকার মতো, জীবন্ত ছবির মতোন, কবিতা তার অতীত আকাশে বিলীয়মান।

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>