কবি হবার গল্প

আমি খুবই কম কবিতা লিখি , সেটুকুও  যে সব জায়গায় প্রকাশিত হবার জন্য পাঠাই তা নয়।কবি প্রসঙ্গে পুরোনো স্মৃতি মনের কুঠুরি ভেদ করে,এক্সপ্রেসের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে । তখন আমি সদ্য অনুবাদ পত্রিকা দপ্তরে যোগ দিয়েছি ,একবারেই নবীশ। নিয়ম করে দপ্তরে যাই, পুরোনো অনুবাদ পত্রিকার পাতা উলটে পালটে দেখি। কারা লিখতেন, কোন কোন ভাষা নিয়ে লিখতেন, এসব. . . । কয়েকটি নাম প্রায় প্রতিটি সংখ্যায়। উর্দুতে পুষ্পিত মুখোপাধ্যায়, রাজস্থানী -জ্যোতির্ময় দাশ, এবং সাঁওতালী -মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায়। একটি খাতায় অনুবাদ পত্রিকার অনুবাদক ও লেখকদের ঠিকানা লেখা থাকত। সেখান থেকে প্রত্যেককেই চিঠি দিতাম ।এঁদের ও দিলাম। এবং অদ্ভুত ভাবে প্রথম উত্তর গুলোও এরাই দিলেন। জ্যোতির্ময় কাকু অফিসে এলেন, বাকি ২ জন চিঠিতে। মোহিনী জ্যেঠু প্রচুর চিঠি লিখতেন। এবং তার সঙ্গে একগুচ্ছ অনুবাদ কবিতা। আর একটি বিষয় আমাকে মুগ্ধ করত, আমাকে একবারেই না চিনেও, শুধু মাত্র বৈশম্পায়ন বাবুর কন্যা বলে উনি মনে করতেন আমি পারব অনুবাদ পত্রিকা সামলাতে। সেই সব দিন গুলোতে, বাবা যখন স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন, কিভাবে পত্রিকা সামলাতে হয়, হবে জানিনা ,  তখন এই চিঠি আমার মনবল বৃদ্ধি করত।তবে এ গল্প তো নেহাতই এক সাধারণ মেয়ের সংসার সামলে পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবার গল্প নয়, এর পিছনে লুকিয়ে কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাবার গল্প।মোহিনী জ্যেঠু বাংলা আকাদেমিতে আসছেন লিটল ম্যাগাজিন উৎসবে , চিঠি এল আমার কাছে ।তোমাকে আসতে হবে।তোমাকে দেখার জন্য মন ছটফট করছে । আজ মোবাইল কম্পিউটারের যুগে বিষয়টা এতসহজ, একটা অচেনা মানুষকে চেনা যত সহজ,২০০৩-০৪ সালে ততটা ছিল না। একটা অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হচ্ছিল, বাবাকে গিয়ে বললাম। বাবা অনুবাদ পত্রিকা নিয়ে একটি পরামর্শও দিতেন না।এমনকি কাদের কাছে লেখা চাইব, সে বিষয়েও কিছু বলতেন না। অথচ জ্যেঠুর নাম শুনে  বললেন-গুনী মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া ভাল ।

আমি দেখা করলাম শীতের দুপুরে, রোগা, ধুতিপাঞ্জাবি পরা,  আপাত মস্তক সোয়েটার, শালে মোড়া এক প্রবীণ মানুষের সঙ্গে , যিনি প্রথম দর্শনেই বললেন, তুমি পারবে পত্রিকা ও কবিতার সঙ্গে পাশাপাশি সহবাস করতে।কবিতা! সে লেখা কী কম কথা ! একটা লাইন কবিতাও কোনোদিন তার আগে লিখিনি।সত্যি বলতে কী কিছুই লিখি নি।সাহিত্য জগতে এসে বহু মানুষের মুখে শুনেছি কবিতা দিয়েই তাঁদের সাহিত্য জগতে প্রবেশ, আমার পুরোটাই উল্টো।

নাচের নাটকের স্ক্রিপ্ট আর খুব মন খারাপে চিঠি ও ডায়েরি লেখা ছাড়া লিখিনি। কবিতা তো কখনোই না। আর ইনি বলেন, কবিতা! বয়স্ক পিতৃপ্রতীম মানুষ বলছেন, তাই হাসি পেলেও চুপ রইলাম।এরপরে উনি কবিতা চাইলেন কেতকীর জন্য।আজ বলতে দ্বিধা নেই, আমি কেতকী কেন, কোনো ম্যাগাজিন সম্পর্কে কিছু জানতাম না।বাড়িতে যেকটি পত্র পত্রিকা আসত, তার বাইরে যে এক পত্রিকা আছে সেটাও জানা ছিল না। হয়তো কোনোদিন লেখার জগতে, সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হব এই ইচ্ছা ছিল না বলেই, এই নিয়ে কোনো উৎসাহ ছিল না। তবু জ্যেঠু কবিতা চাইলেন।আমি লিখতে পারি না,জেনেও আমার বাড়ির ল্যান্ডফোনে দুদিন অন্তর ফোন করতেন কবিতা চেয়ে। আমার হাসি পেত, উনি বলতেন, তুমি বৈশম্পায়ন বাবুর মেয়ে, কবিতা তোমার রক্তে । হে ঈশ্বর! কবিতা কিভাবে রক্তে বয়! এর আগে স্কুল ম্যাগাজিনে একটি মাত্র কবিতা লিখেছি, তাও বাবার সাহায্য নিয়ে। কবিতাটা হল-ভাদুরে বাতাসে ভাসে তালের গন্ধ / অদূরে আকাশ কাঁপে / নবীন জীবন ছন্দ/ বুকের ভিতর অজানা আবেগ/ কথাগুলো সব বন্ধ/ ক্ষণে ক্ষণে তাই হৃদয়ে আমার হরেক রকম দ্বন্ধ।।কিন্তু জ্যেঠুর কথা শুনে আমি হাসতাম নিজের মনেই। অথচ একটা মানুষ আমার কাছে কিছু চাইছেন,একবার নয়, দুবার নয়, বারবার. . ।

কোথাও একটা কুণ্ঠা কাজ করছিল।একদিন বাধ্য হয়ে কয়েকটি লাইন লিখলাম।এবং জানতাম তা কোনোভাবেই প্রকাশ পাবে না।কারণ কবিতা বলতে যা বোঝায় তার একটি লাইন ও হয়নি সেটি।মাস চারেক বাদে আমাকে লজ্জা বলুন, আশ্চর্য বলুন, আশির্বাদ বলুন, কেতকী পত্রিকা বাড়ির ঠিকানায় হাজির। আমি খুলেও দেখিনি।কারণ নিশ্চিত ছিলাম ছাপা হবে না। অফিস চলে গেলাম না দেখেই, বিছানায় রেখে।

বিকেলে ফিরলে আমার শ্বশুর মশাই প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে বললেন, তুমি কবিতা লেখ, জানতাম না।তোমার কবিতা এই পত্রিকায় ছাপা হয়েছে , কতবড় বড় লেখক লিখেছেন। তাঁদের সঙ্গে . . কবিতার নাম ছিল ভাঙন।কেবল কি ভাঙার জন্য ভাঙা/ অন্য কিছু নয়?/ ভাঙছে সকালের রোদ, ভাঙছে গোধূলিবেলা,/ তার সাথে তাল দিয়ে ভাঙছে/ পৃথিবীর মানচিত্রে নানা রঙের খেলা/ অন্য কিছুই নয়?/ কেবল ভাঙার জন্যই ভাঙা?/ ভাঙছে বিষন্ন মানবতা, ভাঙছে বুকের পাঁজর/ তার সাথে পাল্লা দিয়ে ভাঙছে সবুজের মেলা।/ কেবল ভাঙার জন্যেই ভাঙা?/অন্য কিছু নয়?/ ভাঙছে ভালোবাসার রঙ।ভাঙছে বিশ্বাসের আয়না,/ তার সাথে ছন্দবিহীন ভাবে ভাঙছে / তোমার আমার মনের বালুকা বেলা।( নির্বাচিত কেতকীতে আমার লেখা এই প্রথম কবিতাটি স্থান পেয়েছে)    আমার প্রথম লেখা কবিতার পত্রিকা নিয়ে এক ছুটে বাবার কাছে। খুব রাগ হচ্ছিল জ্যেঠুর উপর। শুধু বৈশম্পায়ন বাবুর মেয়ে বলে কবিতা না হলেও ছেপে দিলেন উনি! বাবা হেসেছিলেন সেদিন।কিন্তু মোহিনী জ্যেঠু আমাকে নিস্তার দিলেন না। আমি অবশেষে কবি হবার ফাঁদে,কিংবা রহস্যময় এক জগতের সন্ধানে পা বাড়ালাম।আর তারপর চড়াই উৎরাই খাদ গিরিপথ গলি উপগলি সব পেরিয়ে সেই একটি মনের মতো কবিতা লিখব বলে হেঁটে চলেছি আজও।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত