| 3 মার্চ 2024
Categories
এই দিনে কবিতা সাহিত্য

জাহানারা পারভীনের কবিতাগুচ্ছ

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

আজ ৩০ মে কবি ও সাংবাদিক জাহানারা পারভীনের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


অপরাধ

এক চিলতে বারান্দার দোতলা বাড়ি
বাড়িতে আসা-যাওয়া দখিন হাওয়ার
আর আসতো চড়ুই
ছানাপোনাসহ চড়ুই মা শিকার করতেন কখনও কখনও

বন্ধ দরোজা, জানালা, ঘুলঘুলি,
পাখিদের ছুটোছুটি, আর্তচিৎকার
এখনও মনে আছে মায়ের নিষ্ঠুরতা

শিশু সন্তানের পাতে মা তুলে দিতেন পাখি মায়ের ডানা, পা, কলিজা
যার সন্তানেরা তার জন্য অপেক্ষায়,

বাড়ির গ্রিলে বসা চড়ুইয়ের কাছে তাই ক্ষমা চাই
আমার মায়ের অপরাধের

কাকতাড়ুয়ার মুখ

উঠোনে উঠোনে শুধুই প্রস্থান;
ছাপ রেখে যাওয়া পায়ের প্রতিভা
চৌকাঠে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি
কথা ছিল, কলাপাতায় আঁকব পিকাসোর মুখ;
তাহিতির মেয়েদের হলুদ হাতের নমুনা…

উঠোনে এঁকে রাখি কাকতাড়ুয়ার মুখ
            হলুদ ধানক্ষেতে দাঁড়িয়ে থাকে, একা…

 

মসলার গান

আমার মুঠোতে কোনও ঈশ্বর নেই
একটা পিঁপড়ে ছিল, সেও চলে গেছে
দাদির সিন্দুক থেকে যে সবুজ মার্বেল
এনেছিলাম, সেও ছিল কিছুদিন..
সেও জানে,  মুগ্ধতাও অনুতাপের মা

অথচ একটি এলাচ আমাকে বলেছিল,
মসলার বন তার ভালো লাগে না
সে চায় অভিশপ্ত হাতের মুঠোবন্দি জীবন…
কাচের বয়ামে ভরে রাখি মুঠোভর্তি এলাচের ইচ্ছে

 

প্রহসন

পাল তোলা জাহাজে ধানের বীজ জড়ো করে
ভেবেছি চলে যাব কোথাও
কৃষকেরা নিশ্চিত নয় এগুলো বীজধান, নাকি চিটেধান…
অথচ ফসল ফসল করে সারা আশ্বিন দাঁড়িয়ে থেকেছি মাঠে
অপেক্ষা এমনই…
মেঘের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাখে বৈশাখের পর্বত
কখনও কখনও উচ্চতাও অপরাধ এক
গজ ফিতায় মেপে রাখে সব অসুখের দৈর্ঘ্য
চিটেধানসহ জাহাজ ডুবে গেলে নদীতে
আকাশ থেকে ঝরে পড়ে বীজধানের বৃষ্টি…
হুদহুদ পাখির পালক

 

 

গণক

টিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করা সেই পাখি,
নাকি সে নিজেই টিয়া?
ফুটপাতের খাম ঠোঁটে তুলে নেয় গণকের ইশারায়।

গণকের ভূমিকায় অভিনয় করা সেই মানুষ,
নাকি সে সত্যিই গণক?
বেলাশেষে গুনে যায় দিনান্তের আয়।

নিজেকে কী মনে হয় তার? নিছক কথক এক,
শূন্য খাম যে ভরিয়ে তুলতে চায় কথায় কথায়।

গণকের মুখের দিকে চেয়ে থাকা মানুষের সারল্যে
পাখির মনে পড়ে ফেলে আসা বন, বন সংলগ্ন গ্রাম।
সবুজ উড়াল ভাবনার পাখি সম্প্রদায়।

পূর্বোক্ত মালিকের চোখের মণিতে দেখা নিজের ছবি;
প্রিয় কিশোরীর আলতা রাঙা পায়ের পদাবলি

ইচ্ছে হয় একটি খাম সে নিজেই তুলে দেয় গণকের হাতে।
নাকি ঠোঁটের কাগজের মতই শূন্য মনিব ও সহকারীর ভাগ্য!

এইসব ভাবতে ভাবতে পাখিটি দেখে
ফুটপাতে হেঁটে যাচ্ছে জনৈক পা।
হাতের খাঁচায় বন্দি তরুণ টিয়ে।
কাছাকাছি আসতেই বলে–
ভালোই তো আছো, উচ্চপদে চাকরি;
আমাকে দেখ, নিয়ে যাচ্ছে বেশ্যাবাড়ি
পড়ে থাকব এককোণে;
দূষিত কারাগারের নিরপরাধ আসামি।

কাঠ, কয়লা, ভস্মীভূত ছাই

যেসব কয়লা জ্বলতে জ্বলতে
ভুলে গেছে কাঠজন্মের ইতিহাস
তাদের বিস্মৃতি একান্নবর্তী ছাই হয়ে যায়।

পোড়া ছাইয়ে পড়ে থাকা কয়লায় দেখি বাবা, ভাই,
বন্ধুর মুখ; আগুনের হল্কায় এক একটি সুপ্ত ক্রোধ
থেকে থেকে জ্বলে ওঠে,
জ্বলে উঠতে উঠতে নিভে যায়।

এক একটি কয়লা আমাদের মিত্রতার স্মারক,
শত্রুতার প্রতীক, সহাবস্থানে থাকা বৈপরীত্য।
এক একটি কয়লা তো আমি নিজেই,
পরিবার সংঘের মাঝেও এক আলাদা একক।
বিস্তীর্ণ জলে জেগে ওঠা নির্বান্ধব চর।

ও ছাই, তুমি কি সেই ডালের ভগ্নি?
যেখানে ফাঁসি নিয়েছে প্রতারিত প্রেমিক।
সেই পাতার অনুজ, কয়েকটি হলুদ বিছে
যার অধিকাংশই কামড়ে খেয়েছে।
যার নিচে সদ্যোজাত শিশুকে
ফেলে গেছেন মা! সেই বৃক্ষের বংশধর?
পরিত্যক্ত নবজাতকের কান্না মাটিছোঁয়া
ঝুড়ি বেয়ে উঠে ওপরে ছড়িয়েছে নিষ্ফল অভিশাপ।

শ্মশান ফেরত কাঠ ও মানুষের ছাই, একাকার মিশে যায়
জলে। বৃক্ষ ও মানুষ যেমন চিরকাল পাশাপাশি থাকে।
জীবিত স্বজনের মুখ এসব ছাইয়ের বেদনার্ত মুখোশ হয়ে জ্বলে।

প্রকৃত মানুষ বাড়ে মনে, গোপনে

আদর্শিক এক নদী ডোবাপুকুরের সঙ্গে সন্ধি করতে করতে
ভুলে গেছে স্বচ্ছ জলের মানে। স্বচ্ছতা, তুমি কোন পুকুরের বউ?
গাছের ছায়ার ঘোমটায় কোন গাঁয়ে থাকো? তোমারও কি পেকেছে
একটি দুটি চুল, অকালে। অকালে মরে যাওয়া নদী, অকালে
ঝরে যাওয়া ফুলের শোকে আমাদের শোভাযাত্রা শেষ পর্যন্ত
পণ্ড করে দেয় বুনো মৌমাছি, সীমান্তের পাহাড়ি হাতির পাল।

অতঃপর গতিপথ পাল্টে হাঁটতে থাকা মরূদ্যানের দিকে;
গভীর নলকূপ, দিঘি এমনকি মজা পুকুরের গল্পও যেখানে
ভীষণ অচেনা। অচেনা ঠেকে স্ত্রীর কাছে স্বামী, পিতার চোখে
পুত্র, চেনা বন্ধুর মুখ; আর প্রেমিকার কাছে প্রেমিকের
হাত। বন্ধন ছেড়ে যাওয়া হাতেরা ফিরে না এলে পাশে
থাকে আহত প্রাতরাশ, এক পশলা বৃষ্টির মতো মুখ।

মুখের কি দোষ? মুখের নকশায় থাকে না সম্পর্কের নির্দেশনা।
বিশ্বস্ত গতিপথ। গতিপথ পাল্টানো নদীতে ভাসতে ভয় পায়
পেন্সিলে আঁকা কাগজের নাও। তাহলে তো কাগজই ভালো। তার
কাছেই অবমুক্ত করা ভালো গোপন বিস্ময়, আপসের আদালত।
তবে তো আপসই ভালো; সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের সালিশে…

ভালোও তো আপেক্ষিক। সকালের ভালো সন্ধ্যায় পাল্টে যায়।
রাতের ভালো দিনের অপরিচিত। অচেনা কিছু মুখ তবু চেনা ঠেকে
দৃষ্টির আয়নায়। কিছু কথা, মুগ্ধতা কুয়াশায় আলো হয়ে জ্বলে
ডুবন্ত জাহাজের মাস্তুলে। কিছু মুদ্রাদোষ, তিক্ততা, ঘৃণা, অপমান
আলো হয়ে পিঁপড়ের মতো পায়ে পায়ে থাকে।
মুখোশের নৈকট্য ছেড়ে চলে যাই অন্য গোলার্ধে, যেখানে
প্রকৃত
মানুষ
বাড়ে
মনে,
গোপনে…

 

 

কদমতলার প্রার্থনা

মাঠের মাঝামাঝি একটি কবর
কদমের ছায়ায় অপেক্ষায় থাকে
জীবিত স্বজন এসে তুলবে প্রার্থনার হাত

বাতাস ও বৃষ্টিরাও যোগ দেবে তাতে
অদ্ভুত স্বস্তির যৌথ মোনাজাত

সমগ্র ছায়া মাটিতে পড়ে ভেঙে ভেঙে যায়
ঘাসের ফাঁকে পড়ে থাকে রোদ ও ছায়ার ইশারা
আলো-ছায়ার ভগ্নাংশে পড়ে থাকা ধান খুঁটে খেতে
খেতে আবাসিক চড়–ই ঠুকরে দেয় রোদের আলো
কখনো কখনো ছায়াকেও। জলে ভাসা খড়কুটোকেও
যেমন ঠুকরে দেয় ক্ষুধার্ত মাছ, খাদ্যের ভ্রমে।

নিজেকে এই আলো-ছায়ার শুভার্থী ভাবি,
সেখানে খুঁজি বহুকাল আগের বিচ্ছিন্ন মুখ
দেশভাগের শিকার মানুষ যেমন নতুন মানচিত্রে
করে ফেলে আসা শেকড়ের সন্ধান

কবরের ধার ঘেঁষে
পায়ে চলা পথ
গেছে গ্রামের দিকে

ও গ্রাম তুমিও কি বৃদ্ধাশ্রমে থাকো?
কবরের অধিবাসীর মতো অপেক্ষায়
পরবাসী সন্ততির?

দূরবর্তী বিমান,
পাখির উড়াল
দূর পথিকের হেঁটে আসা দেখলেই
মনে হয়– প্রতীক্ষার বুঝি শেষ!

বৃদ্ধাশ্রমের সহযোদ্ধারা জানেন,
বিশেষ দিনেও তার কোনো সাক্ষাৎপ্রার্থী ছিল না।
প্রবল শীতেও ছিল না, ফোন বা চিঠির উষ্ণতা।
ছিল একটি ছবি, রুপার ফ্রেমে বাঁধানো,
চোখের জলে ভেজা, পারিবারিক।

অশ্র“র দাগ বুকে নিয়ে ছবিটিও প্রতীক্ষমাণ
একটি ছায়ার।
দীর্ঘ সে ছায়াটি
আজো আসেনি,
না আশ্রম
না কদমতলায়।

এবং ছায়া…

মুখের ভাপে পরিষ্কার করা চশমার কাচে
মরা শালিক হয়ে পড়ে থাকে গোটা জীবনের ছায়া;

ঝুলে থাকা বাদুড়ের উল্টো চোখে স্থাপন করি নিজেকে
দেখি– স্থির কম্পাসে কাঁপে দিক হারানো নাবিকের দ্বিধা।

বালতির জলে ভাসা সূর্যগ্রহণের আকাশে মাতৃভক্ত পাখির উড়াল
তার সঙ্গে যাই পশুমেলায়। সেখানে সুদর্শন পশুর চোখের মণিতে
ওঠানামা করে সম্ভাব্য ক্রেতার কোলাজ, সই করা মৃত্যু পরোয়ানা।
আর আমার চোখে ভাসে কনের আসরে
পাত্রের চোখে স্থির কনের মুখ,
গুমোট অস্বস্তিতে ঘেমে ওঠা মুখের প্রসাধন।

হন্তারকের চোখে নিজের ছায়া দেখা মানুষের আতঙ্ক
ডিঙিয়ে ফিরি বর্ষার জলমগ্ন গলিতে। সতর্ক অভ্যস্ততায়
ইটের সাঁকো পেরোতে গিয়ে পায়ের কাছাকাছি সেই
শালিকের ছায়া। ওপরের বৈদ্যুতিক খুঁটিতে
যে বসে আছে, যার মৃতদেহ গেছে নাগরিক ডাস্টবিনে।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত