Irabotee.com,শৌনক দত্ত,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,iraboti,irabotee.com in

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কয়টি কবিতা

Reading Time: 7 minutes
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে যুগে যুগে রচিত হয়েছে বহু কবিতা। বঙ্গবন্ধুর ৯৯ তম জন্মদিনে তাকে নিয়ে রচিত বিখ্যাত কয়টি কবিতা ইরাবতীর নতুন সময়ের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।  
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে অন্নদাশঙ্কর রায় নরহত্যা মহাপাপ, তার চেয়ে পাপ আরো বড়ো করে যদি যারা তাঁর পুত্রসম বিশ্বাসভাজন জাতির জনক যিনি অতর্কিত তাঁরেই নিধন। নিধন সবংশে হলে সেই পাপ আরো গুরুতর, সারাদেশ ভাগী হয় পিতৃঘাতী সে ঘোর পাপের যদি দেয় সাধুবাদ, যদি করে অপরাধ ক্ষমা। কর্মফল দিনে দিনে বর্ষে বর্ষে হয় এর জমা একদা বর্ষণ বজ্ররূপে সে অভিশাপের। রক্ত ডেকে আনে রক্ত, হানাহানি হয়ে যায় রীত। পাশবিক শক্তি দিয়ে রোধ করা মিথ্যা মরীচিকা। পাপ দিয়ে শুরু যার নিজেই সে নিত্য বিভীষিকা। ছিন্নমস্তা দেবী যেন পান করে আপন শোণিত। বাংলাদেশ! বাংলাদেশ! থেকে নাকো নীরব দর্শক ধিক্কারে মুখর হও। হাত ধুয়ে এড়াও নরক। অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়া যত দিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান তত দিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান। দিকে দিকে আজ অশ্র“গঙ্গা রক্তগঙ্গা বহমান নাই নাই ভয়, হবে হবে জয় জয় মুজিবুর রহমান।     বঙ্গবন্ধু পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীন মুজিবর রহমান। ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উগারী বান। বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে, জ্বালায় জ্বলিছে মহা-কালানল ঝঞ্ঝা-অশনি বেয়ে । বিগত দিনের যত অন্যায় অবিচার ভরা-মার। হৃদয়ে হৃদয়ে সঞ্চিত হয়ে সহ্যে অঙ্গার; দিনে দিনে হয়ে বর্ধিত স্ফীত শত মজলুম বুকে, দগ্ধিত হয়ে শত লেলিহান ছিল প্রকাশের মুখে; তাহাই যেন বা প্রমূর্ত হয়ে জ্বলন্ত শিখা ধরি ওই নামে আজ অশনি দাপটে ফিরিছে ধরণী ভরি। মুজিবর রহমান। তব অশ্বেরে মোদের রক্তে করায়েছি পূত-স্নান। পীড়িত-জনের নিশ্বাস তারে দিয়েছে চলার গতি, বুলেটে নিহত শহীদেরা তার অঙ্গে দিয়েছে জ্যেতি। দুর্ভিক্ষের দানব তাহারে অদম্য বল, জঠরে জঠরে অনাহার-জ্বালা করে তারে চঞ্চল। শত ক্ষতে লেখা অমর কাব্য হাসপাতালের ঘরে, মুর্হুমুহু যে ধ্বনিত হইছে তোমার পথের পরে। মায়ের বুকের ভায়ের বুকের বোনের বুকের জ্বালা, তব সম্মুখ পথে পথে আজ দেখায়ে চলিছে আলা। জীবন দানের প্রতিজ্ঞা লয়ে লক্ষ সেনানী পাছে, তোমার হুকুম তামিলের লাগি সাথে তব চলিয়াছে। রাজভয় আর কারাশৃঙ্কল হেলায় করেছ জয়। ফাঁসির মঞ্চে-মহত্ব তব কখনো হয়নি ক্ষয়। বাঙলাদেশের মুকুটবিহীন তুমি প্রমুর্ত রাজ, প্রতি বাঙালীর হৃদয়ে হৃদয়ে তোমার তক্ত-তাজ। তোমার একটি আঙ্গুল হেলনে অচল যে সরকার। অফিসে অফিসে তালা লেগে গেছে-স্তব্ধ হুকুমদার। এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ, সন্ন্যাসী বেশে দেশ-বন্ধুর শান্ত-মধুর ডাক। শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী-জীবন করিয়া দান, মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান। তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর, জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার। সেনাবাহিনীর অশ্বে চড়িয়া দম্ভ-স্ফীত ত্রাস, কামান গোলার বুলেটের জোরে হানে বিষাক্ত শ্বাস। তোমার হুকুমে তুচ্ছ করিয়া শাসন ত্রাসন ভয়, আমরা বাঙালীর মৃত্যুর পথে চলেছি আনিতে জয়। ধন্য এ কবি ধন্য এ যুগে রয়েছে জীবন লয়ে, সম্মুখে তার মহাগৌরবে ইতিহাস চলে বয়ে। ভুলিব না সেই মহিমার দিন, ভাষার আন্দোলনে । বুরেটের ভয় তুচ্ছ করিয়া ছেলেরা দাঁড়াল রণে । বরকত আর জব্বার আর সালাম পথের মাঝে, পড়ে বলে গেলো, “আমরা চলিনু ভাইরা আসিও পাছে।” উত্তর তার দিয়েছে বাঙালী, জানুয়ারী সত্তরে, ঘরের বাহির হইল ছেলেরা বুলেটের মহা-ঝড়ে। পথে পথে তারা লিখিল লেখন বুকের রক্ত দিয়ে, লক্ষ লক্ষ ছুটিল বাঙালী সেই বাণী ফুকারিয়ে। মরিবার সে কি উন্মাদনা যে, ভয় পালাইল ভয়ে, পাগলের মত ছোট নর-নারী মৃত্যুরে হাতে লয়ে। আরো একদিন ধন্য হইনু সে মহাদৃশ্য হেরি, দিকে দিগনে- বাজিল যেদিন বাঙালীর জয়ভেরী। মহাহুঙ্কারে কংস-কারার ভাঙিয়া পাষাণ দ্বার, বঙ্গ-বঙ্গ শেখ মুজিবেরে করিয়া আনিল বার। আরো একদিন ধন্য হইব, ধন-ধান্যেতে ভরা, জ্ঞানে-গরিমায় হাসিবে এদেশ সীমিত-বসুন্ধরা। মাঠের পাত্রে ফসলেরা আসি ঋতুর বসনে শোভি, বরণে সুবাসে আঁকিয়া যাইবে নকসী-কাঁথার ছবি। মানুষ মানুষ রহিবে না ভেদ, সকলে সকলকার, এক সাথে ভাগ করিয়া খাইবে সম্পদ যত মার। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর রুপালীর তার পরে, পরাণ ভুলানো ভাটিয়ালী সুর বাজিবে বিশ্বভরে। আম-কাঁঠালের ছায়ায় শীতল কুটিরগুলির তলে, সুখ যে আসিয়া গড়াগড়ি করি খেলাইবে কুতুহলে। আরো একদিন ধন্য হইব চির-নির্ভীকভাবে, আমাদরে জাতি নেতার পাগড়ি ধরিয়া জবাব চাবে, “কোন অধিকারে জাতির স্বার্থ করিয়াছ বিক্রয়?” আমার এদেশ হয় যেন সদা সেইরুপ নির্ভয়।       আমি কিংবদন্তির কথা বলছি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ   আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল। তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন। জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা, কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা। যে কবিতা শুনতে জানে না সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে। যে কবিতা শুনতে জানে না সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। যে কবিতা শুনতে জানে না।       ধন্য সেই পুরুষ শামসুর রাহমান ধন্য সেই পুরুষ, নদীর সাঁতার পানি থেকে যে উঠে আসে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে; ধন্য সেই পুরুষ, নীল পাহাড়ের চূড়া থেকে যে নেমে আসে প্রজাপতিময় সবুজ গালিচার মতো উপত্যকায়; ধন্য সেই পুরুষ, হৈমন্তিক বিল থেকে সে উঠে আসে রঙ-বেরঙের পাখি ওড়াতে ওড়াতে। ধন্য সেই পুরুষ, কাহাতের পর মই-দেয়া ক্ষেত থেকে যে ছুটে আসে ফসলের স্বপ্ন দেখতে দেখতে। ধন্য আমরা, দেখতে পাই দূর দিগন্ত থেকে এখনো তুমি আসো আর তোমারই প্রতীক্ষায় ব্যাকুল আমাদের প্রাণ, যেন গ্রীষ্মকাতর হরিণ জলধারার জন্যে। তোমার বুক ফুঁড়ে অহঙ্কারের মতো ফুটে আছে রক্তজবা, আর আমরা সেই পুষ্পের দিকে চেয়ে থাকি, আমাদের চোখের পলক পড়তে চায় না, অপরাধে নত হয়ে আসে আমাদের দুঃস্বপ্নময় মাথা। দেখ, একে একে সকলেই যাচ্ছে বিপথে অধঃপাত মোহিনী নর্তকীর মতো জুড়ে দিয়েছে বিবেক-ভোলানো নাচ মনীষার মিনারে, বিশ্বস্ততা চোরা গর্ত খুঁড়ছে সুহৃদের জন্যে সত্য খান খান হয়ে যাচ্ছে যখন তখন কুমোরের ভাঙা পাত্রের মতো, চাটুকারদের ঠোঁটে অষ্টপ্রহর ছোটে কথার তুবড়ি, দেখ, যে কোন ফলের গাছ সময়ে-অসময়ে ভরে উঠেছে শুধু মাকাল ফলে। ঝল্সে-যাওয়া ঘাসের মতো শুকিয়ে যাচ্ছে মমতা দেখ, এখানে আজ কাক আর কোকিলের মধ্যে কোন ভেদ নেই। নানা ছল-ছুতোয় স্বৈরাচারের মাথায় মুকুট পরাচ্ছে ফেরেবক্ষাজের দল। দেখ, প্রত্যেকটি মানুষের মাথা তোমার হাঁটুর চেয়ে এক তিল উঁচুতে উঠতে পারছে না কিছুতেই। তোমাকে হারিয়ে আমরা সন্ধ্যায় হারিয়ে যাওয়া ছায়ারই মতো হয়ে যাচ্ছিলাম, আমাদের দিনগুলি ঢেকে যাচ্ছিলো শোকের পোশাকে, তোমার বিচ্ছেদের সঙ্কটের দিনে আমরা নিজেদের ধক্ষংসস্তূপে ব’সে বিলাপে ক্রন্দনে আকাশকে ব্যথিত করে তুলেছিলাম ক্রমাগত; তুমি সেই বিলাপকে রূপান্তরিত করেছো জীবনের স্তুতিগানে, কেঁননা জেনেছি জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত তুমি। ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর রৌদ্র ঝরে চিরকাল, গান হয়ে নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা; যাঁর নামের ওপর কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া, ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পাখা মেলে দেয় জ্যোৎস্নার সারস, ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পতাকার মতো দুলতে থাকে স্বাধীনতা, ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধক্ষনি। স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত       স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো নির্মলেন্দু গুণ একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে- কখন আসবে কবি? এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না, এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না, এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না। অথচ তখন প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেছে যখন গম্ভীর মুখে কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন। তা’হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি? তা’হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে-বৃক্ষে, ফুলের বাগানে ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি? জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত কালো হাত। তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ কবির বিরুদ্ধে কবি, মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ, বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান, মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ….। হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি শিশুপার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি একদিন সব জানতে পারবে-আমি তোমাদের কথা ভেবে লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প। সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর, না পার্ক না ফুলের বাগান-এসবের কিছুই ছিল না, শুধু একখণ্ড অখণ্ড আকাশ যে-রকম, সে-রকম দিগন্ত প্লাবিত ধু-ধু মাঠ ছিল দুর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়। আমাদের স্বাধীনতাপ্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল এই ধু-ধু মাঠের সবুজে। কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক, পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক, হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত, নিন্ম-মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানি, নারী বৃদ্ধ বেশ্যা ভবঘুরে আর তোমাদের মতো শিশু পাতা কুড়ানিরা দল বেঁধে। একটি কবিতা পড়া হবে তার জন্য কী ব্যাকুল প্রতীক্ষা মানুষের। ‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?’ শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন। তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল, হৃদয়ে লাগিল দোলা জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা- কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী? গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি: “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”       পনেরো আগস্ট সৈয়দ শামসুল হক এখনও রক্তের রঙ ভোরের আকাশে। পৃথিবীও বিশাল পাখায় গাঢ় রক্ত মেখে কবে থেকে ভাসছে বাতাসে। অপেক্ষায়- শব্দের- শব্দেই হবে সে মুখর- আরো একবার জয় বাংলা ধ্বনি লয়ে যখন সূর্যের আলো তার পাখায় পড়বে এসে ইতিহাস থেকে আরো কিছুক্ষণ পরে। মানুষ তো ভয় পায় বাক্হীন মৃত্যুকেই, তাই ওঠে নড়ে থেকে থেকে গাছের সবুজ ডাল পাতার ভেতরে। পাতাগুলো হাওয়া পায়, শব্দ করে ওঠে আর খাতার পাতাও ধরে ওঠে অস্থিরতা- কখন সে পাবে স্বর- জয় বাংলা ঝড়- তাকে দাও জন্মনাভি! বোঁটা থেকে দ্যাখো আজও অভিভূত রক্ত যায় ঝরে বাঙালির কলমের নিবের ভেতরে। স্তব্ধ নয় ইতিহাস! বাংলাও সুদূরগামী তেরোশত নদীর ওপরে ওই আজও তো নৌকোয় রক্তমাখা জনকের উত্থান বিস্ময়! টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে কামাল চৌধুরী কবরের নির্জন প্রবাসে তোমার আত্মার মাগফেরাতের জন্য যেসব বৃদ্ধেরা কাঁদে আমাদের যেসব বোনেরা পিতা, ভাই, সন্তানের মতো তোমার পবিত্র নাম ভালোবেসে হৃদয়ে রেখেছে যেসব সাহসী লোক বঙ্গোপসাগরের সব দুরন্ত মাঝির মতো শোষিতের বৈঠা ধরে আছে হে আমার স্বাধীনতার মহান স্থপতি মহান প্রভুর নামে আমার শপথ সেই সব বৃদ্ধদের প্রতি আমার শপথ সেই সব ভাই বোন লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি আমার শপথ আমি প্রতিশোধ নেব আমার রক্ত ও শ্রম দিয়ে এই বিশ্বের মাটি ও মানুষের দেখা সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জঘন্য হত্যার আমি প্রতিশোধ নেব। মাক্কুর ক্ষিপ্রতা ছেড়ে যে শ্রমিক এইমাত্র বেরিয়ে এসেছে কালো চামড়ায় তার অসহায় ঘামগুলো সাদা হয়ে আছে আমি তার দেহ থেকে ক্লান্তিগুলো খুলে নিতে চাই আমি তার দুই চোখে প্রশান্তির অশ্রুজল চাই। তিনদিন খাইনি বলে যাকে আমি চিৎকার করতে দেখেছি হাড্ডিসার সেই কৃষকের প্রতি আমার কামনা আমার বিদ্রোহ যেন জন্মজন্মান্তরে তাকে ভাই বলে ডাকে। যে পথ নিয়েছি বেছে, জানি, সে পথে তোরণ নেই ফুল কিংবা জীবনের পুষ্পশয্যা নেই সে পথে রক্তের দাগ মৃত্যুর আর প্রলোভন মাখানো রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মতোন তুমি হও আমাদের দুরন্ত প্রেরণা আমি সব অতিক্রম করে তোমার নৌকোকে নেব আকাক্সিক্ষত নদীর কিনারে। মহান মানব ছিলে তুমি- দেবতা তো কখনো ছিলে না দেবতা বানিয়ে যারা স্তুতি করেছে তোমার জনসভা সেমিনারে বহুবার জীবন দিয়েছে তোমার মৃত্যুর পরে তারা কেউ আমাদের সাথে নেই আজ সেবাদাসীদের মতো তারা সব ঘিরে আছে নতুন মনিব হায়, এ রকম অপকর্ম শুধু বুঝি বাঙালির সাজে। তোমার নিকটে ছিল যারা সেইসব তোমার খুনিরা তারা কি বাঙালি ছিল? না কি কোন ষড়যন্ত্রী দেশের সেবক? সাম্রাজ্যবাদের কাছে নিজেদের বিকিয়েছে যারা আমাদের ভাই নয় তারা আমাদের জাতিসত্তা প্রেম আর ঐতিহ্যের হাজারো কাহিনী ভুলে গিয়ে তারা সব বিদেশের সেবক হয়েছে! আমার সমস্ত ঘৃণা থুথু আর বুকের আগুন বাঙালি নামক সেই ঘৃণ্য সব খুনিদের প্রতি। তীব্র প্রতিশোধ আমি ছুড়ে দেই খুনিদের মুখে দ্যাখো, আগুন জ্বলছে আজ শুদ্ধ সব বাঙালির বুকে এখন স্বদেশে চাই, শুধু চাই তোমার সৈনিক কিছু সবল গোলাপ। যেখানে ঘুমিয়ে আছো, শুয়ে থাকো বাঙালির মহান জনক তোমার সৌরভ দাও, দাও শুধু প্রিয়কণ্ঠ শৌর্য আর অমিত সাহস টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামগুলো তোমার সাহস নেবে। নেবে ফের বিপ্লবের দুরন্ত প্রেরণা।       এই সিঁড়ি রফিক আজাদ এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে, সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছে- বত্রিশ নম্বর থেকে সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে অমল রক্তের ধারা ব’য়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে। মাঠময় শস্য তিনি ভালোবাসতেন, আয়ত দু’চোখ ছিল পাখির পিয়াসী পাখি তার খুব প্রিয় ছিলো- গাছ-গাছালির দিকে প্রিয় তামাকের গন্ধ ভুলে চোখ তুলে একটুখানি তাকিয়ে নিতেন, পাখিদের শব্দে তার, খুব ভোরে, ঘুম ভেঙে যেতো। স্বপ্ন তার বুক ভ’রে ছিল, পিতার হৃদয় ছিল, স্নেহে-আর্দ্র চোখ- এদেশের যা কিছু তা হোক না নগণ্য, ক্ষুদ্র তার চোখে মূল্যবান ছিল- নিজের জীবনই শুধু তার কাছে খুব তুচ্ছ ছিল : স্বদেশের মানচিত্র জুড়ে প’ড়ে আছে বিশাল শরীর… তার রক্তে এই মাটি উর্বর হয়েছে, সবচেয়ে রূপবান দীর্ঘাঙ্গ পুরুষ : তার ছায়া দীর্ঘ হতে-হ’তে মানিচিত্র ঢেকে দ্যায় সস্নেহে, আদরে! তার রক্তে প্রিয় মাটি উর্বর হয়েছে- তার রক্তে সবকিছু সবুজ হয়েছে। এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে, সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছে- স্বপ্নের স্বদেশ ব্যেপে সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে অমল রক্তের ধারা ব’য়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে ॥  

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>