| 2 মার্চ 2024
Categories
গদ্য নারী সাহিত্য

রামায়ণকে ‘সীতায়নে’ বদলে দিয়েছিলেন বাংলার প্রথম নারী কবি

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

বাসবদত্তা ঘোষ


“আমার দুঃখের কথা গো কহিতে কাহিনী।
 কহিতে কহিতে উঠে গো জ্বলন্ত আগুনী।।
 জনম-দুঃখিনী সীতা গো দুঃখে গেল কাল।
 রামের মতন পতি পাইয়া গো দুঃখেরি কপাল।।”

রাম নয়, সীতার বয়ানে বলা হচ্ছে রামায়ণের গল্প। প্রচলিত রামকাহিনীর ধারায় এই ঘটনা তো রীতিমতো ব্যতিক্রম। অথচ বহুকাল আগে, সেই সপ্তদশ শতকে দাঁড়িয়ে রামায়ণের পাঠকে এমনভাবেই ভেবেছিলেন বাংলার প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী। তাঁর সেই ভাবনারই ফসল ‘অন্য রামায়ণ’। একে রামায়ণ না বলে অবশ্য ‘সীতায়ন’ বলাই ভাল, নবনীতা দেবসেন‌ও তাই বলেছেন। মধ্যযুগের ধর্মীয় ঘেরাটোপে দাঁড়িয়ে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ভিতর থেকেই এক নারী রামায়ণ পাঠ করার গোটা দৃষ্টিকোণটাকেই বদলে দিলেন। তিনি তো যে-সে নারী নন। চন্দ্রাবতী সত্যিই যে-সে নারী ছিলেন না।

 

মনসামঙ্গল রচয়িতা দ্বিজ বংশীদাসের কন্যা ছিলেন চন্দ্রাবতী। অনুমান করা যায়, পাঠের পরিবেশেই ছেলেবেলা কেটেছিল তাঁর। তাই কাব্য-রচনার কথা ভাবা তাঁর পক্ষে নেহাত অসম্ভব ছিল না। তাছাড়া, চন্দ্রাবতীর বাসস্থান ময়মনসিংহ অঞ্চলটিও বেশ অন্যরকম ছিল সেইসময়। পার্বত্য ময়মনসিংহের মুক্ত, উদার পরিবেশে মেয়েরাও বেশ মুক্তভাবেই বাঁচত। ব্রাহ্মণ্যধর্মের অত তীব্র বাঁধুনি ছিল না। ময়মনসিংহ গীতিকায় তাই মহুয়া, মলুয়াদের দেখা মেলে। এই পরিবেশই চন্দ্রাবতীকে গড়ে তুলেছিল। মহুয়ার মতো চরিত্রের জন্ম যে মাটিতে, সেই মাটি থেকেই যে ‘সীতায়ণ’ লেখা হবে– এ আশ্চর্যের কথা নয়।

 

ময়মনসিংহের মৌখিক পরম্পরায় এমন অনেক লোককাহিনি ভেসে বেড়াত, যার কেন্দ্রে আছে সীতা। হতেও পারে, চন্দ্রাবতী এসব গল্পকথার ছায়া এড়াতে পারেননি। তবু, তাঁর লেখা রামায়ণের নিজস্বতাকে অস্বীকার করা যায় না। শুধু রামায়ণ নয়, ‘চন্দ্রাবতীর রামায়ণ’– কবির নামের সঙ্গে কাব্যের নাম মিলেমিশে যাওয়ার কারণ হয়তো এটিই। আর, রামায়ণের প্রচলিত কাঠামোর সঙ্গে অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে নতুন রামায়ণের রচয়িতা কবি নিজেও হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি। তাঁকে নিয়েও তাই ময়মনসিংহে বাঁধা হয়েছে পালাগান। সেই গল্পে কতখানি সত্য, কতখানি কল্পনা তা জানা নেই। কিন্তু, চন্দ্রাবতীর খ্যাতি যে দূর-দূরান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল তার প্রমাণ এই পালা।

 

জয়ানন্দ এবং চন্দ্রাবতী ছিলেন বাল্যসঙ্গী। এদের প্রণয়সম্পর্কের কথা জানার পর বংশীদাস তা সানন্দে মেনে নেন। দু’জনের বিয়ের আয়োজন চলছে. এমন সময় খবর এল– জয়ানন্দ এক মুসলমান রমণীকে বিয়ে করে ধর্মান্তরিত হয়েছে। প্রেমিকের বিশ্বাসঘাতকতায় শোকে পাথর হয়ে যান চন্দ্রাবতী। বিরহী প্রেমের স্মৃতি ভুলতে তিনি আজীবন কুমারী থেকে শিবপুজো করার সিদ্ধান্ত নেন। বংশীদাসও এই কথা মেনে নিয়েছিলেন। সেকালের সামাজিক পরিস্থিতিতে বিয়ে ভেঙে যাওয়া এক মেয়ের বাবা হিসেবে আর কীই-বা করতে পারতেন বংশীদাস? তবে মেয়েকে একটি আদেশ দিয়েছিলেন তিনি– “শিবপূজা কর আর লেখ রামায়ণে।”

চন্দ্রাবতীর স্মৃতিবিজড়িত সেই শিবমন্দিরটি আজো আছে কিশোরগঞ্জ শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে পাতোয়াইর গ্রামে ফুলেশ্বরী নদীর পাশে।

বাবা মঙ্গলকাব্য রচয়িতা, কিন্তু চন্দ্রাবতী লেখার জন্য বেছে নিলেন রামায়ণকে। তাও আবার প্রচলিত রামকাহিনী নয়। এ এক অন্য রামায়ণ, যেখানে সীতাই প্রধান, রাম এক ব্যক্তিত্বহীন পার্শ্বচরিত্রমাত্র। বিখ্যাত মহাকাব্যের প্রধান চরিত্রকে কেন ব্রাত্য করে রাখলেন চন্দ্রাবতী? ইতিহাস এর উত্তর দেয় না।  হতে পারে, যে প্রবল অভিমানে জয়ানন্দের ডাক শুনেও মন্দিরদ্বার খোলেননি চন্দ্রাবতী, সেই অভিমান থেকেই হয়তো তিনি রামকে উপেক্ষা করেছিলেন তাঁর লেখায়। সীতার ওপর ঘটে চলা অন্যায়কে মিলিয়ে নিয়েছিলেন নিজের সঙ্গে। আর, নিজের উপর ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে উপেক্ষা ছাড়া এই সমাজকে আর বোধহয় কিছুই দেওয়ার ছিল না তাঁর।

 

চন্দ্রাবতী ধর্মগ্রন্থ লেখেননি, এ যেন সাধারণ এক নারীর আনন্দ-বেদনার গল্প। ময়মনসিংহের মেয়েরা তাই এই রামায়ণ গায় বিবাহবাসরে, পুজোতে নয়। মধ্যযুগের প্রবল ঈশ্বরবিশ্বাসী পরিবেশের মধ্যে কোথা থেকে এমন দৃষ্টিকোণ পেলেন চন্দ্রাবতী? অনুমান ছাড়া এ প্রশ্নের উত্তর জানার অন্য উপায় নেই। চন্দ্রাবতীর অনেক পরে, উনিশ শতকে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রচলিত রামকথার একটি বিপ্রতীপ দৃষ্টিকোণ বুনেছিলেন ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’। যদিও নারীর ভাষ্য এতে ছিল না, তবে তাঁর ‘বীরাঙ্গনা কাব্যে’ সেই চেষ্টাটি আছে। রেনেসাঁ-প্রভাবিত মনন দিয়েও মধুসূদন যে কাজ করতে পারেননি, বহুবছর আগে সপ্তদশ শতকে সেই কাজটি করে ফেলেছিলেন চন্দ্রাবতী।
 

প্রচ্ছদে কোয়েল চক্রবর্তী রচিত ‘চন্দ্রাবতীর জীবন ও রামায়ণ’ গ্রন্থের প্রচ্ছদের অংশ ব্যবহৃত হয়েছে। 

 

 

কৃতজ্ঞতা: বঙ্গদর্শন

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত