Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,kolkata-irabotee-gitoranga-bangla-natok

কলকাতার নাট্য ইতিহাসের বুকে দুটি আগ্নেয় নাট্য প্রযোজনা

Reading Time: 8 minutes   

জব চার্নক কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা, এমনটা মোটেই মনে করতেন না, সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটককার-নাট্যকার-অভিনেতা উৎপল দত্ত। তাঁর স্পষ্ট অভিমত ছিল “সে (কলকাতা) ধীরে ধীরে, স্তরে স্তরে বিকশিত হয়েছে। শহর বিকশিত হয়, শহর কেউ প্রতিষ্ঠা করে না। “[“রাজনৈতিক থিয়েটার ও সাধারণ দর্শক”: উৎপল দত্ত দুরন্ত সত্যি কথা, গভীর গভীরতর ঐতিহাসিক বাস্তব সত্যই নিহিত আছে তাঁর কথায়। কলকাতার এই ধীরে ধীরে পর্ব-পর্বান্তরে বিকশিত হওয়ার ইতিহাসের ভেতর তার সাংস্কৃতিক ইতিহাসও গভীরভাবে অন্বিত হয়ে আছে। সেই সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক ঘনিষ্ঠ অঙ্গ হল, নাটক ও রঙ্গমঞ্চের ইতিহাস। এক কথায় থিয়েটারের ইতিহাস। এ এক দীর্ঘ ও বিচিত্র ইতিহাস! এই ইতিহাসের দুই প্রবাদপ্রতিম স্রষ্টা, উৎপল দত্ত ও শম্ভু মিত্র। উৎপল দত্ত রচিত ও নির্দেশিত “টিনের তলোয়ার” এবং শম্ভু মিত্র নির্দেশিত রবীন্দ্র নাটক “রক্তকরবীর” প্রযোজনা নির্মাণ, কলকাতা তথা বাংলার থিয়েটারী ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে যে নতুন সৃজনস্পৃহা জাগিয়ে তুলল, সেই সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ভাষ্য নির্মাণ করাই আমার উদ্দেশ্য।

নাটক মিশ্র শিল্প।এ কারণে নাটকের সাথে মঞ্চ ভাবনার সম্পর্ক গভীর ও ব্যাপক। অবিচ্ছেদ্য অন্বয়ে জড়িত। মঞ্চের তুলনায় নাটক অবশ্যই অনেক প্রচীন। নাটকের প্রয়োজনেই মঞ্চের আবির্ভাব। বিকশিত হয়ে ওঠার পথে মঞ্চ যখন নিজস্ব চরিত্র পেল,তখন মঞ্চ প্রভাবিত করল নাটককে। প্রাচীনতর সভ্যতার প্রেক্ষিতে গ্রিস বা ভারতবর্ষ নয়, মিশরকেই নাট্যাভিনয়ের আদি উৎসস্থল হিসাবে ঐতিহাসিকেরা চিহ্নিত করেছেন। ম্যাক্সমুলারের অনুসন্ধানে ঋগ্বেদের  সূক্তগুলোর মধ্যে নাটকীয় উপাদানের হদিশ মিলেছে।প্রাচীন ভারতবর্ষে সে অর্থে Public theatre এর অস্তিত্বের চিহ্ন না পাওয়া গেলেও ভরতের নাট্যশাস্ত্রের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদটি রঙ্গালয় সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছে। এক্ষেত্রে রঙ্গালয় রূপে মন্দির প্রাঙ্গণ, রাজ প্রাসাদের সঙ্গীতশালা এবং নাটমন্দিরের অস্তিত্বের খবর আমরা পাই। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাগীতি পদাবলির বীণাপাদের একটি পদে বুদ্ধনাটক অভিনয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে।

পলাশীর যুদ্ধ শুরু হতে তখন ও বছর চারেক বাকি। সময়টা ১৭৫৩। কলকাতার লালবাজারের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে ব্রিটিশ অভিনেতা ডেভিড গ্যারিকের প্রচেষ্টায়- “The Old Play House” -এর উদ্বোধন হল। এরপর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীদের বিনোদনের উদ্দেশ্যে কলকাতার বুকে একের পর এক বিদেশি পরিচালিত রঙ্গমঞ্চ তৈরি হতে থাকে। রাশিয়ার ইউক্রেনের অধিবাসী গেরাসিম স্টেপানোভিচ লেবেডফ হলেন সেই ব্যক্তি যার, যাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রথম বাংলা নাটক অভিনিত হচ্ছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গলি থিয়েটারে (১৭৯৫)। প্রসন্নকুমার ঠাকুরের উদ্যোগে তাঁর নারকেল ডাঙার বাগান বাড়িতে বাঙালির তৈরি প্রথম রঙ্গালয় হিসেবে ১৮৩১এ ‘হিন্দু থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সকল শ্রেণির দর্শক সাধারণের জন্য সাধারণ রঙ্গালয় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ১৮৭২ এ ‘ন্যাশানাল থিয়েটার’। এরপর বাঙালি রঙ্গমঞ্চের কেবলই এগিয়ে চলার ইতিহাস। বাংলা থিয়েটারের চরিত্রে সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক বদল  ঘটে যাচ্ছে বিংশ শতকের গণনাট্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।আশ্চর্য সমাপতন এটাই যে, উৎপল দত্ত ‘টিনের তলোয়ার’ লিখছেন বাংলার সাধারণ রঙ্গালয়ের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে। শম্ভু মিত্র রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছেন গণনাট্য সংঘ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নবনাট্যের সন্ধানে নবনাট্যের বিশেষ পর্বে। সবটাই ঘটেছে কলকাতার বুকে।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


‘বহুরূপীর ‘রক্তকরবী’ প্রযোজনা সম্পর্কে ‘বহুরূপী’ ও ‘রক্তকরবী’ প্রবন্ধে উৎপল দত্ত বলেছেন, “…শম্ভু বাবুর সূক্ষ্ম রসবোধ ও প্রয়োগ কৌশলের অভিনবত্ব এমন এক নাটক সৃষ্টি করেছে যা বাংলা রঙ্গমঞ্চের প্রকৃত ঐতিহ্যকে ধরে তাকে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। বিগত ২৫বছরে বাংলাদেশে কোনো নাটক এ করতে পেরেছে বলে জানা নেই। “রবীন্দ্র নাটক চিরায়ত মুক্তি চেতনার নাটক।রবীন্দ্র নাটক বাংলা নাটককে বিশ্ব নাটকের ব্যাপ্ত পরিসরে উন্নীত করেছে।একদিকে যন্ত্রের সর্বগ্রাসী আধিপত্য, অন্যদিকে ধনতন্ত্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদের ক্রম প্রসারণ, এই বৈশ্বিক বাস্তবতাকে ধারণ করে আছে ১৯২৪ সালে প্রকাশিত ‘রক্তকরবী’। নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে এক সুগভীর শৃঙ্খলাবোধ এবং যতিহীন নাট্যসাধনা যাপনে বিশ্বাসী ছিলেন একদা গণনাট্য আন্দোলনের কাণ্ডারী ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী ‘নবান্ন’ নাটকের অন্যতম কারিগর শম্ভু মিত্র। শম্ভু মিত্র এই নামের সঙ্গে যেন ‘আন্দোলন’ শব্দটি গভীর অন্বয়ে গেঁথে থাকে। প্রথানুগত্যে আটকে পড়া নাট্য-প্রবাহকে নতুন প্রাণশক্তিতে প্রাণিত করতে তিনি দর্শক সাধারণকে এমন এক নাট্যদর্শনের অভিজ্ঞতা দান করতে চেয়েছিলেন যেখানে দর্শক এক বুদ্ধিদীপ্ত আবেগ অনুভূতিতে উজ্জীবিত হতে পারবে। ‘রক্তকরবী’র প্রয়োগ শৈলী এমনই এক উজ্জীবনের ইতিহাস নির্মাণ করল।

যে রক্তকরবী দুর্বোধ্য নাটকের তকমা পেয়েছিল তাকে উপযুক্ত নাট্যভাবনায় শম্ভু মিত্র এমন এক নাট্যভাষায় মুক্তি দিলেন যাকে শুধু বাংলা বা ভারতবর্ষ নয়, আন্তর্জাতিক নাট্য জগতেও আলোচনার বিষয় করে তুললেন। ঐতিহাসিক ভাবেই রবীন্দ্র নাট্যচর্চায় জোয়ার এল! বহুরূপীর প্রযোজনার ১৯৫৪ সালের ১০-ই মে; শিয়ালদহের ই.বি.আর ম্যানসন ইনস্টিটিউটে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘রক্তকরবী’। অবশ্য প্রবেশাধিকার ছিল নিয়ন্ত্রিত। ১৪-ই মে ২য় অভিনয় অনুষ্ঠিত হয় ২য় নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজনে মহাজাতি সদনে। শম্ভু মিত্রের ব্যতিক্রমী প্রয়োগ শৈলীর সঙ্গে খালেদ চৌধুরীর প্রথাভাঙা মঞ্চসজ্জা এবং তাপস সেনের অসীম ও অন্তর্গূঢ় ব্যঞ্জনাবহ আলোক সম্পাত  ‘রক্তকরবীর’ প্রযোজনাকে এক উচ্চমার্গীয় দর্শনে পৌঁছে দেয়। প্রথম অভিনয়ের পর থেকেই কলকাতার বুকে প্রবাহমান থিয়েটারী সংস্কৃতি ‘রক্তকরবীর’ প্রযোজনা নিয়ে ভিতরে বাইরে তুমুলভাবে আলোড়িত হল। যেন এক অনাবিষ্কৃত বিস্ময়ের ঘোর লাগল নবনাট্য কেন্দ্রিক চেতনা বিশ্বে!


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,kolkata-irabotee-gitoranga-bangla-natok


যক্ষপুরীর অন্ধকার গর্ভে কর্ষণজীবী ও আকর্ষণজীবী সভ্যতার মধ্যে ঘনীভূত হয়ে ওঠা দ্বান্দ্বিক অভিঘাতকে মূর্ত ও বিমূর্ততার টানা পোড়েনের মধ্যে ফেলে সর্বকালের উপযোগী করে চলমানতার ভাষায় অনূদিত করতে শম্ভু মিত্র মঞ্চকে কয়েকটি স্তরে ভেঙে নিয়েছিলেন। আর এই নিরীক্ষামূলক উপস্থাপন শৈলীকে হজম করতে পারল না বেশকিছু সবজান্তা ও ভুঁইফোড় রবীন্দ্র অনুরাগী। শুরু হল ব্যাপক বিতর্ক। দিনে দিনে বাতাস ক্রমশই ভারী হয়ে উঠল। এই প্রযোজনার পক্ষে-বিপক্ষে রবীন্দ্রানুরাগীদের মধ্যে স্পষ্ট দুটো দল তৈরি হয়ে গেল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিরোধিতার সুর ও তাপ ক্রমশই চড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতি দাঁড়াল যে, ‘রক্তকরবী’-র প্রযোজনা প্রায় বন্ধ হয়! হয়!

বিতর্কের আবর্তের জটে আটকে পড়া এই প্রযোজনাকে মুক্ত করতে অন্নদাশংকর রায়ের পরামর্শ মেনে শম্ভু মিত্র, খালেদ চৌধুরী ও অমর গঙ্গোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে শান্তিনিকেতনে গিয়ে নন্দলাল বসুর সঙ্গে দেখা করলেন। নাটকের মাঝখানে বারবার রবীন্দ্রগানের প্রবেশে নাটকের গতি ব্যাহত হয়, এমনটাই মনে হয়েছিল শম্ভু মিত্রের। খালেদ চৌধুরী ও অমর গঙ্গোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে শান্তিনিকেতনে গিয়ে নন্দলাল বসুর সঙ্গে দেখা করলেন। নাটকের মাঝখানে বারবার রবীন্দ্রগানের প্রবেশে নাটকের গতি ব্যহত হয়, এমনটাই মনে হয়েছিল শম্ভু মিত্রের। এক্ষেত্রে রামকিঙ্করের সহজ পরামর্শ ছিল, “এক লাইনের বেশি গাইবে না।” (“বহুরূপীর রক্তকরবী: বিরোধিতা বন্দনার পারম্পর্য: প্রভাতকুমার দাস) নাট্যদৃশ্যের শেষ অংশ নিয়ে আরো তুমুল বিতর্ক তৈরি হল।’ যুগান্তর’রের পাশাপাশি আনন্দবাজারও থেমে থাকেনি। বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠীকে কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রচারক হিসাবে ধরে নিয়ে একমুখী আক্রমণ ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হল। ‘সচিত্র ভারত’ পত্রিকায় ব্রহ্মানন্দ সেন রক্তকরবী প্রযোজনার যথেষ্ট প্রশংসা করলেন। বিশ্বভারতীর সঙ্গীত সমিতির অনুমোদন সাপেক্ষে রক্তকরবীর তৃতীয় প্রযোজনার শেষে শম্ভু মিত্র দর্শকদের জানালেন যে, এটাই ‘রক্তকরবী’-র শেষ অভিনয়! সেদিন দর্শক সম্প্রদায় যা বলেছিল তার মর্মার্থ হ’ল- কোন অনুমতি বা আপত্তিই তারা মানবে না। তাঁরা আন্তরিক ভাবে চান বহুরূপী এ প্রযোজনা চালিয়ে যাক।

না, বহুরূপী প্রযোজিত রক্তকরবীকে আটকে রাখা যায়নি। আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। বিশ্বভারতীর সংগীত সমিতি আপাতত ২০শে সেপ্টেম্বর মাত্র একদিনের অনুমতি দিলেন; স্বাভাবিক ভাবেই নিউ এম্পায়ার মঞ্চে ঐ অভিনয়ের শেষে বহুরূপী কর্তৃপক্ষ দর্শক সম্প্রদায়কে জানাতে বাধ্য হল যে, এটাই রক্তকরবীর শেষ অভিনয়!কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পাশা উল্টে গেল, সংগীত নাটক আকাদেমির ব্যবস্থাপনায় এবং ভারত সরকারের পক্ষে থেকে সর্বভারতীয় জাতীয় নাট্য উৎসবে বহুরূপী আমন্ত্রিত হবার পর। ২১ ও ২৩শে ডিসেম্বর বহুরূপী মঞ্চস্থ  করল- ‘রক্তকরবী’ ও ‘ছেঁড়াতার’। রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদের হাত থেকে শম্ভু মিত্র গ্রহণ করলেন ভারতবর্ষীয় থিয়েটার চর্চার ইতিহাসে বিরল ও সর্বোচ্চ সম্মান। ১৯৫৬-এর ১৮-ই ফেব্রুয়ারী দিল্লীর মডার্ণ স্কুল কাব্যকলাঙ্গমের আমন্ত্রণে রক্তকরবীর অভিনয় দেখে অভিভূত হলেন, প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু। সঙ্গে ইন্দিরাও ছিলেন। ‘বহুরূপী’র রক্তকরবীর হাত ধরে দিল্লীতে বাংলা নাটকের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেল। এরপরও ‘বহুরূপী’ রক্তকরবী নিয়ে দিল্লী সফর করেছে। ইউনেস্কোর ইন্টারন্যাশানাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট ১৯৫৬ সালের ৩০শে অক্টোবর থেকে ২রা নভেম্বর বোম্বাইয়ের রঙ্গভবনে বিশ্বনাট্য সম্মেলনের আয়োজন করে। বহুরূপী আমন্ত্রিত হয়। ২ রা নভেম্বর, মঞ্চস্থ হয় রক্তকরবী। সেদিন প্রায় চারহাজারের কাছাকাছি দেশি-বিদেশি দর্শক রক্তকরবীকেই শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এরপর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বহুরূপী পাকিস্তান সফর করল। ঢাকার নিউ পিকচার্স হাউসে বহুরূপী প্রযোজিত- ‘ছেঁড়াতার’ (১৮-১৯মার্চ) ও ‘রক্তকরবী’ (২০-২১) মঞ্চস্থ হয়। সেই দিন ঢাকার মানুষ রক্তকরবীকে মন ও মননের গভীরে স্থান দিল। ১৯৭৫- এর ২৬শে নভেম্বর কলামন্দির প্রেক্ষাগৃহে   বহুরূপী প্রযোজিত রক্তকরবীর শেষতম  অভিনয় অভিনীত হয়।আজ পর্যন্ত রক্তকরবী নাটকটি অসংখ্য নাট্যদল মঞ্চস্থ করেছে, কিন্তু বহুরূপীর প্রযোজনায় রক্তকরবী যে ইতিহাস নির্মাণ করেছে বোধহয় তার মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। রক্তকরবী শুধু বহুরূপীর খ্যাতি বা জনপ্রিয়তা এনে দেয়নি, সেই সঙ্গে বাংলা থিয়েটারের দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে এই প্রযোজনা নানা গুণ ও মাত্রায় সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি রবীন্দ্র নাটক যে সর্বকালের,সর্বযুগের আধুনিক নাটক সেটাও বহুরূপীর রক্তকরবী প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল। তাই শঙ্খ ঘোষ বলেছেন:”আজ আমরা যে রক্তকরবী পড়ি…তা আজ অনেকাংশেই বহুরূপীর চোখে দেখা ‘রক্তকরবী’।”

বিশ্ব নাট্য আন্দোলন, বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক নাট্য আন্দোলনের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক রেখে চলা বিপ্লবী থিয়েটারের প্রবক্তা ও রূপকার হিসেবে উৎপল দত্ত নিজেকে শিল্পী নয়, বরং প্রোপাগাণ্ডিস্ট বলতেন। ভারতসহ আন্তর্জাতিক ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি বিপ্লবী ঘটনার গভীর মূল্যায়ন থেকে নির্যাস আত্মীকৃত করে উৎপল দত্ত সারাজীবন যে নাট্যচর্চা করেছেন সেই নাটক ও নাট্যের মৌল উপজীব্য ছিল মানুষের মুক্তি সংগ্রাম। ‘টিনের তলোয়া’র এর ব্যতিক্রম নয়। কলকাতাসহ বাংলার থিয়েটারী ইতিহাসে ‘টিনের তলোয়ার’ এক আন্দোলনের নাম।

উৎপল দত্ত জীবন ও জগতকে অবলোকন করেছেন মার্ক্সীয় দর্শনের  জগত বীক্ষণ জনিত দৃষ্টির আলোয়। এই আলোয় আলোকিত উৎপল সর্বহারার সংস্কৃতি ও সমাজ বিপ্লবের মধ্যকার সম্পর্কেকে তাঁর নাটক ও নাট্যচর্চার ভেতর সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন। এই বৈপ্লবিক প্রাণনাতেই তিনি নির্মাণ করেছেন ‘টিনের তলোয়ার’। এই নাটকে প্রতিফলিত হয়েছে উনিশ শতকের পেশাদারি থিয়েটারের অন্দর মহলের নানা খুঁটিনাটি দিক, নাট্য আন্দোলনের ইতিহাস, নাট্য নিয়ন্ত্রণের কালা কানুন; মুখোশ খুলে দেওয়া হয়েছে ক্ষয়িষ্ণু বাবু শ্রেণির।

টিনের তলোয়ারের নির্মাণ পর্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। রয়েছে কলকাতার থিয়েটারি সংস্কৃতির নানা রঙবেরঙ আবহ। এই নির্মাণ পর্বটি তাই উৎপল দত্তের জীবনের পক্ষে যেমন বিতর্কিত পর্ব,তেমনই এক সন্ধি মুহূর্তও বটে। এই সময়ে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রকর্তৃক গ্রেপ্তার হচ্ছেন। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিখণ্ডিত হয়। পার্টি সদস্য না হলেও উৎপল দত্ত মতাদর্শগত সংগ্রামের জায়গা থেকে  চিনাপন্থী। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে তাঁর বৌদ্ধিক অবস্থান জারি রাখেন। পরবর্তীকালে তিনি নকশালবাড়ি আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান।

‘তীর’ নাটক রচনা এবং প্রযোজনার মাধ্যমে তিনি নিজের সমর্থনের জায়গাটিকে সোচ্চারে প্রতিষ্ঠা করেন। এই ঘটনার তীব্র অভিঘাত বাংলা থিয়েটারী দর্শকসমূহের একটা বড় অংশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) দ্বারা প্রভাবিত জনসাধারণের একটা বিপুল অংশ তাঁর থিয়েটারের পাশ থেকে সরে আসেন। ‘তীর’ নাটক মঞ্চস্থ হলে তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকার বেশ অস্বস্তির মধ্যে পড়ে। এরপর ‘গুরু’ ছবির কাজ শেষ করে ফেরার পথে তিনি গ্রেফতার হন এবং বিতর্কিত মুচলেকা (যার সত্যতা উন্মোচিত হয়নি) প্রদানের পর তিনি মুক্তি পান। এই ঘটনায় নকশালপন্থী নেতারা ঘোরতর উৎপল বিরোধী হয়ে পড়েন। এই বিপন্ন সময় পর্বেই বিশেষ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে  উৎপল দত্ত মিনার্ভা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। মিনার্ভা ও এল.টি.জির উথ্থান পতনের বিশেষ সন্ধিপর্বেই নির্মিত হয় ‘টিনের তলোয়ার’। কিছুদিন আগে যে বিপুল পরিমাণ দর্শক উৎপল দত্তের থিয়েটার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আজ তাঁরাই ‘টিনের তলোয়ারে’র চুম্বকশক্তিতে আকৃষ্ট হয়ে উৎপল দত্তের থিয়েটারে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এ সবই কলকাতাসহ বাংলার থিয়েটারকে ইতিহাস ও রাজনীতিগতভাবে এক অদম্য প্রাণশক্তি জোগালো। পি.এল.টি প্রযোজিত ‘টিনের তলোয়ার’-এর প্রথম মঞ্চায়ন, ১৯৭১-এর ১২-ই আগস্ট, রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহে। প্রথম অভিনয় থেকেই ‘টিনের তলোয়ার’ ব্যাপক সাড়া জাগালো। পরদিন ১৩-ই আগস্ট আকাডেমিতে ‘টিনের তলোয়ার’ দর্শক সাধারণের মনে বিপুল আলোড়ন জাগলো। ১৯৭২-এ ১-লা জুলাই রবীন্দ্রসদনে ‘টিনের তলোয়ার’ এক নজিরবিহীন ইতিহাস গড়ল। এদিন অভিনয় শুরুর আগেই রবীন্দ্রসদন কর্তৃপক্ষ ‘অশ্লীলতার অভিযোগে’ ‘টিনের তলোয়ার’-কে অভিযুক্ত করল। সেদিন কলকাতা সহ বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নাট্যমোদী দর্শক এই প্রযোজনা দেখতে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেছিল। প্রেক্ষাগৃহের চারপাশে অসংখ্য পুলিশভ্যান দেখা গিয়েছিল। পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ হয়ে গেল রবীন্দ্রসদন চত্বর।পুলিশ লেলিয়ে বন্ধ করা গেল’না “টিনের তলোয়ারে’র” অপ্রতিরোধ্য অভিনয়।শেষ পর্যন্ত অগণিত দর্শকের চাপের মুখে রবীন্দ্রসদন কর্তৃপক্ষ বাধ্য হল দর্শক সাধারণকে এই নাটক দেখার সুযোগ করে দিতে। দর্শক তো নিছক দর্শক নয়, তা হলো দুর্দমনীয় গণশক্তি,সরকার এটা টের পেয়েছি’ল। ১৯৭৩-এর দিল্লীর আইফ্যাকস থিয়েটারে পি.এল.টি আয়োজিত নাট্য উৎসবে ৯-ই থেকে ১৩-ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ‘টিনের তলোয়ার’ অভিনীত হয়। সার্বিকভাবে সফল হয়েছিল সবকটি প্রযোজনা ও এই নাট্যৎসবের প্রতিটি শো ছিল হাউসফুল। বোম্বাইতে একাধিক প্রেক্ষাগৃহে পি.এল.টি ১৯৭৮ এর ১১ই থেকে ১৭ই ডিসেম্বর আয়োজন করল নাট্যোৎসবের। এখানেও ‘টিনের তলোয়ার’ অভিনিত হল। মনে রাখতে হবে, এর আগে ১৯৭৫-এর ২৫ শে জুন থেকে ১৯৭৭-এর ২১ শে মার্চ, এই দীর্ঘ সময় জুড়ে ভারতে জরুরী অবস্থা ঘোষিত হয়েছিল। এর প্রধান রূপকার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। বাক্ স্বাধীনতা সহ সমস্ত রকম গণতান্ত্রিক অধিকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হল। শিল্প-সংস্কৃতির উপর নেমে এল স্বৈরতান্ত্রিক বুলডোজার। ফ্যাসিবাদ যেন নতুন ভাবে অক্সিজেন পেল। রবীন্দ্র সাহিত্যও সেন্সরের বাইরে থাকল না।

ভাবুন একবার, উৎপল দত্তের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা জরুরী অবস্থার মতো ‘একটা রাতের চেয়ে অন্ধকার’ দিন যে আসছে  এটা আগাম টের পেয়েছিল। কেননা টিনের তলোয়ারের বিষয় বস্তুত তা প্রমাণ  দেয়। বস্তুত নাট্যাভিনয়ের টুঁটি টিপে ধরার জন্য সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার ১৮৭৬-এর ১৬-ই ডিসেম্বর অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন তথা dramatic performances  act বিধিবদ্ধ হয়। আর ‘টিনের তলোয়াররের ভূমিকায় উৎপল দত্ত বলেছেন, “১৮৭৬ সনই সাম্রাজ্যবাদের নিজ মুখে মসী লেপনের কুখ্যাত বছর। ঐ বৎসর বাংলা নাট্যশালায় টিনের তলোয়ার দেখিয়া ব্রিটিশ সরকার…নাট্যশালার কন্ঠরোধ করিবার ব্যবস্থা করে।”টিনের তলোয়ারের পটভূমি ১৮৭২ সালের ৭ই ডিসেম্বর জাতীয় রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার সময়পর্ব থেকে অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন চালু হওয়া পর্যন্ত। এ যেন এক অদ্ভুত সমাপতন। প্রায় একশ বছর আগের বাস্তবতার সঙ্গে সুদীর্ঘ একুশ মাস ব্যাপী জরুরী অবস্থার কালো দিনগুলোর চরম অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারীতাকে টিনের তলোয়ারের দর্শক খুঁজে পেল উৎপল দত্তের এই সৃজনের ভেতর। অতএব কলকাতার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অনেকটাই জুড়ে আছে তার থিয়েটারী সংস্কৃতি ও থিয়েটারী যাপনের ইতিহাস। এই ইতিহাসের সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আজও বহুরূপীর রক্তকরবী এবং পি.এল.টির টিনের তলোয়ার কলকাতা সহ বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্বর্ণোজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে আমাদের পথ দেখাচ্ছে।

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>