Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,kolkata irabotee gitoranga bose phukur

গীতরঙ্গ: পুকুর কলকাতা । প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

Reading Time: 6 minutes

                                            

কোনো এক সময়ে খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। জনপদ সৃষ্টির সঙ্গে পুকুর-পোখ্‌রি-পুষ্করিণী অতি অপরিহার্য মনে করা হতো।আর পুকুরের নাম দিয়ে পরিচিত হত এলাকা। শ্যামপুকুর-বেনেপুকুর-ফড়িয়াপুকুর-নোনাপুকুর ইত্যাদি অজস্র স্থাননামের মধ্যে শুধু তাদের প্রাচীন অস্তিত্বটুকু বেঁচেবুচে রয়েছে। পুকুরগুলো অনুপস্থিত।শুধু শহর কলকাতাতেই নয়, অন্যত্র—এমনকি বাংলার বাইরেও সেই ট্র্যাডিশনের বোলবালা ছিল। যেমন দার্জিলিং সন্নিহিত সুখিয়াপোখরি, কিম্বা মজঃফরপুরের শাহুপোখর ইত্যাদি।বস্তুত, আদিম সেই গ্রাম্যঠিকানায় পুকুর ছিল এক অভিন্ন সহচর।মানুষের কল্পনাতেও নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছিল। তাই হয়তো “পুকুরচুরি” শব্দবন্ধটির উদ্ভব হয়েছে। বস্তুত, ‘পুকুর’ নামক জলাশয়টির উল্লেখ এতোই জরুরি ছিল যে কলকাতার প্রথম সেন্সাস অফিসার/ ঐতিহাসিক অতুলকৃষ্ণ রায় মহাশয় ষোড়শ–সপ্তদশের কলকাতা জনপদের পরিচিতি দেওয়ার সময় অতি গুরুত্বপূর্ণ সাতটি সংখ্যাতাত্ত্বিক আইটেমের মধ্যে পুকুর-কেও স্থান দিয়েছিলেন। আর সেই অতি অফ্‌ট-কোটেড সারণিটির উদ্ধৃতি দিয়েছেন পিথঙ্কপ্পন নায়ার, রাধারমণ মিত্র প্রভৃতি কলকাতা-বিশারদ। সেইসূত্রেই প্রাচীন কলকাতার জনজীবন নিয়ে আমারও আগ্রহ জন্মায়। কিন্তু, ২০২১-র কলকাতায় চাইলেও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না ১৭০০-র সেই ’গ্রামীণ’ কলকাতার ধানমাঠ-ডোবা-জলাভূমির এলায়িত জগত। কলকাতার বদল ঘটেছে।আর এই মেটামরফোর্সড ‘বিজ্ঞানাশ্রয়ী’ কলকাতায় এই লেখার একমাত্র উদ্দিষ্টবস্তু পুকুর-পোখরি-পুষ্করিণী ইতিমধ্যেই অপাংক্তেয় ঘোষিত হয়েছে।   

মনোহরপুকুরে পুকুর নেই নিশ্চিত। বোসপুকুরে দেখা মেলে না লম্বা-চওড়া ঝিল-য়ের, যার পাড় ধরে নিত্যদিনের প্রাতঃভ্রমণের রুটিন ছিল আমার মতো অনেক নাগরিকের। ১৯৭০-এও তার অস্তিত্ব ছিল। মনোহরদাস তড়াগের পাশে রং ও তুলির প্রয়োগে শিল্পকর্মের আস্তানা খুঁজে পেয়েছিলেন শিল্পী অসিত দাস। পুকুর তো কোন ছার, কলকাতার পুবে  রয়েছে রামসর প্রকল্পভুক্ত ১২৫০০ হেক্টর এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বিস্তীর্ণ জলাভূমি। বস্তুত, বিশ্বের সামান্য কয়েকটি অস্তিত্বময় জলাভূমির অন্যতম হল পূর্ব কলিকাতা জলাভূমি, যা বহুদেশের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেওয়া পরিবেশগত চুক্তির (১৯৭১) অংশ বিশেষ। অর্থাৎ, আন্তজার্তিক গুরুত্বসম্পূর্ণ জলাশয়। কিন্তু, নব্য-উপনিবেশবাদ গ্রাস করেছে পূর্ব কলকাতার সেই রামসর জলাভূমি। ১৯৭১-এর রামসর চুক্তির মুখ্য বিষয় হল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগের মাধ্যমে জলাভূমির সংরক্ষণ ও জলজ প্রাণীদের সুরক্ষা প্রতিবিধান। পরিবেশ বিজ্ঞানী সানা হক জানাচ্ছেন যে পূর্ব কলকাতার এই জলাভূমিকে কেন্দ্র করে বেড়ে উঠেছে প্রায় তিন হাজার (৩০০০)আদিবাসী পরিবারের জীবন-জীবিকা-জলহাওয়ার দৈনন্দিনতা। ঠিক যেরকম ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় রয়েছে যে আদি কলকাতা ছিল দশবারো ঘর জেলে-জোলা-কৈবর্ত-পক্ষিমার-মচ্ছিমারের বাসভূমি। এই জলাশয় এখন প্রায় এক লাখ লোকের রুজি-রোজগারের বীজতলা। সারা কলকাতার জলজ প্রাণী যেমন মাছ ইত্যাদির যোগান দেয় পূর্ব কলকাতার এই ভেড়িগুলো। প্রকৃতপ্রস্তাবে, সারা পৃথিবীর কাছেই দৃষ্টান্তস্বরূপ হয়ে ঊঠেছে জলাভূমি কেন্দ্রিক বর্জ্য জলের ট্রিটমেণ্ট, শোধনাগার। 


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


     

শহর যে হারে বাড়ছে, তাতে এই জলাশয়গুলো যে কতদিন সুরক্ষিত থাকবে, তা কেবলই অনুমান সাপেক্ষ। সল্টলেক  এখন টিকে আছে নামমাত্র হয়ে। কুঁড়ে আর খুপরি আর বিশাল লবণহ্রদ সরে গেছে গভীর প্রত্যন্তে।কোথায় জঙ্গল,কোথায় পাঁক-চোরাবালির খাদ, পেট উল্টে মরা মাছের পড়ে থাকা, শুঁটকিমাছের ভাগাড়, দুর্গন্ধ তার? বাটির মতোন উলটে নিজেকে জাহির করছে নিও-কলোনিয়ালিজমের আকাশ, সেখানে জুনের বর্ষা, হেমন্তের কুয়াশাকাঙ্ক্ষা, গ্রীষ্মের নান্যপন্থা। সরু বা ছুঁচালো হয়ে উঠেছে সত্যজিতের সিনেমায় দেখা টাটা সেন্টারের মাথায় সাঁটা একচিলতে আকাশ। নব্য-উপনিবেশবাদের ধাক্কায় ইট-কাঠ-গ্লোসাইনের বিলবোর্ডের আড়ালে চলে গেছে।

লণ্ডনের সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপিকা এরিকা বার্বিয়ানি লিখেছেন (২০০২ যে—ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রবন্ধক জোব চার্ণক কলকাতার ভিত্তিস্থাপনের জন্য বেছে নেওয়া জায়গাটি ছিল আদতে bog, jungle and quicksand। ২০০২ সালে, তথ্যপ্রযুক্তির ভরপুর দ্বিপ্রহরে, শ্রীমতী বার্বিয়ানির এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল। বার্বিয়ানি লিখেছেন বটে যে ‘জল-জঙ্গল-চোরাবালির ঢের ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না কলকাতা… কিন্তু এ.কে.রায়ের দেওয়া ১৯০১-এর তালিকা  অনুযায়ী খোদ ব্রিটিশ শাসনকালেই, (বিশেষত ১৭৫৬-১৭৯৪ কালখন্ডের ৩৮টি বছরে) বাড়তি আরো ৬১টি পুকুর খোঁড়া হয়েছিল। কেননা, পুকুর ছিল তখন জীবন-যাপনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

কলকাতার প্রাচীন ইতিহাসের অন্যতম আকরগ্রন্থ ‘এ শর্ট হিস্ট্রি অব ক্যালকাটা’-য় ১৭০৬-এর ব্রিটিশ জরিপ অনুযায়ী ঘরবাড়ির সংখ্যার পাশাপাশি ব্রিটিশের প্রভাবাধীন তিনটি গ্রামে সেসময়ে কয়টি পুকুর ছিল তারও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই তালিকাটি অনুসারে ১৭০৬ সালে যদি ১৭টি পুকুর থেকে থাকে, ১৭৯৪-এ বাড়তি আরো ৬১টি পুকুরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, জল জীবনদায়ী। সেইসূত্রেই জল-জঙ্গল-বাদা-চোরাবালির কলকাতায় পুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটেছিল। টাউন বাড়ার সঙ্গে গ্রাম্যতা (?) উপে যায়নি মোটেও। বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে জনবসতি বেড়েছিল। স্বভাবতই-পাল্লা দিয়ে বেড়েছিল পুকুরের সংখ্যা।

 

                টাউন কলকাতার  গ্রামীণ  

সাল   এলাকা (একর)উপকণ্ঠ মোট এলাকা পাকা বাড়িকাঁচাবাড়ি পুষ্করিণী

১৭০৬ ২১৬ ১৪৭৬ ১৬৯২ ৮ ৮০০০ ১৭
১৭২৬ ৩৩২ ২০১৮ ২৩৫০ ৪০ ১৩৩০০ ২৭
১৭৪২ ৪৪৮ ২৭৮১ ৩২২৯ ১২১ ১৪৭৪৭ ২৭
১৭৫৬ ৭০৪ ২৫২৫ ৩২২৯ ৪৯৮ ১৪৪৫০ ১৩
১৭৯৪ ৩৭১৪ ১২৮৩ ৪৯৯৭ ১১১৪   ১৩৬৫৭ ৬১

প্রাক-ব্রিটিশ যুগে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে জমিদারের তত্ত্বাবধানে পুকুর খোড়া হত।বাংলার বাইরে, বিশেষত মজঃফরপুর, দ্বারভাঙ্গায় দেখেছি পুকুরের নাম দিয়ে অনেক এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়; যেমন, সাহু পোখর, মহারাজপোখরি। কলকাতাতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য ঢের ঢের নাম—শ্যামপুকুর, ফড়েপুকুর, বোসপুকুর, হেদুয়া, মনোহরপুকুর, ঠাকুরপুকুর, আহিরিপুকুর, কাটাপুকুর (কসবা), রেলপুকুর, বেনিয়াপুকুর, পদ্মপুকুর, নোনাপুকুর প্রভৃতি। গুগল সূত্রে জেনেছি যে কলকাতা করপোরেশন এলাকায় ৬১ টি রাস্তা আছে যেগুলোর নামের সঙ্গে ‘পুকুর’ শব্দটি যুক্ত। বানিয়াদের বসবাসের সূত্রে বেনিয়াপুকুর। পদ্ম পাওয়া যেত গুচ্ছের, তাই হয়তো পদ্মপুকুর। ব্রিটিশদের আসার আগেই ট্যাঙ্ক স্কোয়ার বা লালদিঘি গড়ে উঠেছিল। ট্রিস্টাম হান্টের লেখায় পেয়েছি যে লালদিঘিকে ঘিরেই ব্রিটিশ হোয়াইট টাউন বেড়ে ওঠে এবং মাঝ অষ্টাদশে ডালহৌসি এলাকায় লাখ খানেকের বেশি লোকের বসবাস ছিল, যার ফলে কেবলমাত্র লন্ডন ছাড়া আর যে কোনো ব্রিটিশ শহরের থেকে কলকাতা দীর্ঘকায় ছিল। কলেজ স্কোয়ারে গোলদিঘি। আরো খানিক এগোলে বিডনের হেদুয়া। তেমনই কিছু প্রাচীন এলাকার নাম হল তিলজলা, জলা কলিঙ্গা  ইত্যাদি। কসবার শুঁড়িপুকুরে ছটপুজোর আয়োজন হতে দেখেছি ১৯৬০-৭০য়ে। বেশ জমজমাট ছিল সেই উৎসবের আয়োজন। মনে পড়ল প্রিয় কবি মণীন্দ্র গুপ্তের একটি কবিতার কয়টি লাইন—

“ আজ ভোরবেলা ঘুম ভেঙে জানলার পর্দা সরিয়ে

চমকে উঠলাম।

সামনের বোজা পুকুরের পাড়ে জমিটার ওপারে

সোমদত্তাদের বাড়ির টিউকলের সামনে

চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ডাহুক।

পুকুরে যখন জল ছিল তখন প্রতিবেশির মতোন থাকত ওখানে,

তারপর, তিন বছর আগে ওরা উদ্বাস্তু হয়ে চলে গিয়েছিল।

আজেই খটখটে ডাঙ্গায় কি ভেবে ফিরে এল সে!”

                                  (কবিতাংশ—‘ডাহুক’)

পুকুর- যেখানে পল্লিসমাজ জড়ো হয় নিত্যদিন। সেই অর্থে তো এও এক ধরণের হাটবাজার। স্নানার্থী কারো জন্যে তা মহেঞ্জোদড়োর গ্রেটবাথ, কারো বা বাসনমাজা, কাপড়কাচা, ধোয়াধুয়ির কলতলা। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হল সবার জন্যই টইটম্বুর জল। টাইমকলের বাঁধা সময়, লাইনের ঝক্কিঝামেলা,কর্কশ চিল চিৎকারের প্রয়োজন নেই কোনো। জল সর্বত্র প্রাপ্তব্য, পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য। পরিবেশ বিজ্ঞানী মোহিত রায় জানিয়েছেন যে,  কলকাতার  প্রায় ৩৬টি পুকুর দেড়শো বছরের পুরনো। সানা হক লিখেছেন যে ব্রিটিশযুগের শুরু হওয়ার সঙ্গে কলকাতায় ভিড় জমাতে শুরু করে রাঁচি-ঝাড়খণ্ড এলাকা থেকে চলে আসা শুরু করেন কর্মঠ মুণ্ডা-ওঁরাও গোষ্ঠীর  আদিবাসীজন। পূর্ব কলকাতার জলাভূমি সংলগ্ন এলাকায় তাঁরা বসবাস করতে শুরু করেন। কিন্তু শহরের বৃদ্ধি ক্রমশ এই সব জলাভূমি এলাকাকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠার জন্য বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব বেশ বিপন্ন।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
কালীঘাট

  

বস্তুত, দু-তিন দশক আগেও কলকাতায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ৮৭৩১। গুগল তথ্য অনুযায়ী ২০০৬-এ সেই সংখ্যা  নেমে আসে ৪৮৮৯-য়ে। ১৯৫০ নাগাদ কলকাতার লাগোয়া জলাভূমি ৮০০০ হেক্টর এলাকায় ব্যাপ্ত ছিল। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই জলকে ঘিরেই বেড়ে উঠেছে মানুষের জীবন। জলের অভাব দেখা দেওয়ায় পাঁচ হাজার বছর আগের বর্ধিষ্ণু শহর কালিবাঙ্গান ছেড়ে অন্যত্র বসবাস শুরু করে মানুষ। ঠিক উলটো চিত্রটাই পাই কলকাতায়। বলা হচ্ছে যে স্রেফ বাস্তভিটে গড়ার প্রয়োজনে প্রায় ৪৪ শতাংশ পুকুর বুজিয়ে আমাদের শহরে রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা উর্দ্ধমুখী হয়েছে। শহরের পুবদিকে বিদ্যাধরী নদী ছিল। কিন্তু সেই নদী এখন মজে গেছে। নীচু জলা জমি হওয়ার কারণে এই এলাকাটিকে অধিগ্রহণ করে ১৮৬৮-তে ধাপা বা ডাম্পিং গ্রাউন্ড গড়ে ওঠে। ১৯৮০ নাগাদ এই এলাকার ২২০০ হেক্টর পুকুরকে চাষাবাদের উপযোগী করে তোলা হয়েছে। সে প্রসঙ্গ বারান্তরে। পুকুর ও কলকাতার  পারস্পরিক বোঝাপড়া হৃদয়ঙ্গম করার জন্য কবি মণীন্দ্র গুপ্তের ‘ডাহুক’ কবিতাটি নিবিড়পাঠের চেষ্টা করি বরং।   

একটি বোজা পুকুরের অনুষঙ্গে কবি কথাবার্তা শুরু করেছেন। বোজা –অর্থাৎ, অনস্তিত্বের আভাস। বলেছেন জল ব্যবহারের নতুন কৌশলের কথা। সর্বজনীন (মধ্যযুগীয়)পুকুরের বদলে শানবাঁধানো সীমানাঘেরা টিউকলের নব্য-হাল-হালাতের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে ডাহুক, যে এ কবিতায় একজন উদ্বাস্তু। আর আমার চোখে সে বাদা-পুকুর-জলাশয় চষে বেড়ানো পাখি নয়, বরং একজন কাজ হারানো মানুষ আর পুকুরটি হল হিন্টারল্যাণ্ড হারানো আমাদের ‘দেশভাগোত্তর’ কলকাতা। এই পথ ধরে খানিক এগোলে, বস্তুত, কবিতাটির এক অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা সম্ভব। লক্ষণীয় যে কবিতাটিতে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, একটি জনবসতি ছিল। বাসিন্দাদের জলের যোগান দেওয়ার জন্য একটি পুকুর হাজির ছিল।সেটি বুজে গেছে প্রথম লাইনেই। ‘জল’-কে যদি অর্থনৈতিক পরিভাষা দেওয়া যায়, তবে পুকুরের অর্থ হতেই পারে প্রযুক্তিবিহীন (নন্‌-টেকনিক্যাল) কাজের বাজার। বোজা পুকুরের জায়গা নিয়েছে শান বাঁধানো টিউকল= গভীর নলকূপ বসানো উন্নত ফ্ল্যাটজীবনের (আপাত-সামাজিক) ব্যক্তিগত পরিসর। যেখানে জল আছে বটে, তবে গভীরে; তাকে আহরণ করতে হয় যান্ত্রিক উপায়েঃ অর্থাৎ, কৌশলগত পরিবর্তন। আর এই উচ্চবিত্ত হাল-হকিকতের প্রায় একশো আশি ডিগ্রি বিপরীতে সামূহিক পুষ্করিণী, সাধারণ শ্রমিকের ভিড়,তাঁদের বৃত্তাকার অবস্থিতি।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
অঠারো উনিশ দশকের গড়ের মাঠ

অনুভবী চোখের পর্দায় কবি প্রতিফলিত হতে দেখেছিলেন কীভাবে বুজে যাচ্ছিল একের পর মহল্লার পোখরি–পুষ্করিণী-পুকুর। (পড়ুন কাজের বাজার/কলকারখানা/অফিস)। কালো মেঘ, জোলো বাতাস নিয়ে আষাঢ় ফিরে এলেছে প্রাকৃতিক নিয়মেই। কিন্তু লক-আউট, ছাঁটাই-লে অফ। কোম্পানিগুলো পাততাড়ি গুটিয়েছে। কই আর সেই সতেরোশো-আঠেরোশোর কাজের বাজার। জলের অভাবে (অথবা শ্রম-সৃজনের অভাবে) সস্তায় শ্রম বেচে কোনোক্রমে বেঁচেবুঁচে থাকা মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। জোলো জমির রূপান্তর ঘটছে ডাঙা জমিতে।ডাঙ্গা শুকনো খটখট্রে। ডাঙ্গা জমি- অতএব, চাষাবাদ নয়। বাস্তুভিটে-কণ্ডোভিল। নগরায়ণ। জয় ইঞ্জিনিয়ারং লুপ্ত,বাটানগর অবসৃত। চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় বন্ধ ঢেরগুচ্ছের কলকারখানা–হয়তো অন্যত্র চলে গেছে নয়তো বোরওয়েল/টিউকল বসেছে (প্রযুক্তির বদল)। অটোমেশন। কবির নজরে যা খটখটে বিশুষ্ক ডাঙাজমি। অথচ, জন্মাবধি কলকাতার পরিচয় একটাই, ভুঁইফোড়ের শহর। শুরু থেকেই কতো পরিযায়ী ভাগ্যসন্ধানী মানুষের ভিড়। জোলো বাতাসের গন্ধে গন্ধে (জল = কাজের বাজার) হাজির কর্মপ্রার্থী অসংখ্য শ্রমিক-ডাহুক।জীবিকার সন্ধানে,মানসিক উৎকর্ষের  খোঁজে‘ চারিদিকে জীবনের সমুদ্র–সফেন’, সেই ডোডো কলকাতা—হারিয়ে গেছে, বুজে গেছে নিও-কলোনিয়ালিজমের প্রয়োজনে। পুকুরগুলোর বুকে যেভাবে চাপানো হয়েছে, হচ্ছে- কংক্রীটের বোঝা, স্টিল। বন্ধ  দরোজার পাশে মাথা কুটে মরে শরণাপন্ন ডাহুক-মানুষ। শ্রমিক-বান্ধব সেই চেনা কলকাতার বদল ঘটে গেছে। কলকারখানা নেই, তার লোহার গেটও নেই।  ইউনিয়ন নেই , জমায়েতও নেই। কারখানার জমিতে এখন ঢালাও রিয়াল এস্টেটের ব্যবসা। পুকুর বুজে যাচ্ছে। বহুতল উঠছে।

    

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>