Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,kolkata irabotee gitoranga printing-press

গীতরঙ্গ: জ্ঞানপীঠ মহানগর । ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

Reading Time: 6 minutes

কলকাতা তখন সবেমাত্র গড়ে উঠছে। ইংরেজরা বসবাস করছে মনের আনন্দে। জনসংখ্যা বাড়ছে সেইসঙ্গে বাড়ছে বাজার হাট। নগর, বন্দর, গঞ্জ থেকে নতুন শহর যেমন ভাবে গড়ে ওঠে আর কি। কিন্তু সবার লক্ষ শহরের গঠন-গাঠনে। ছাত্রদের পঠনপাঠনে। 

তখনকার দিনে গ্রামে থাকত পড়াশোনা করার জন্য পাঠশালা। বামুন পন্ডিতদের থাকত চতুষ্পাঠী বা টোল। আমাদের দাদুরা তো সেসময় শুনেছি পাঠশালাতেই পড়েছেন। তবে ইংরেজ আমলে বেশিরভাগ পাঠশালাই পরবর্তীকালে প্রাইমারী স্কুলে রূপান্তরিত হয়েছিল।  

এখনো বড়বাজারের গলিঘুঁজিতে কিম্বা উত্তর কলকাতার অলিগলিতে দু’একটা এমন প্রাচীন পাঠশালা হয়ত থাকলেও থাকতে পারে। সেসময় পাঠশালার শিক্ষকদের গুরুমশাই বলা হত। সেকালের পণ্ডিতরা চতুষ্পাঠী বা টোল স্থাপন করে অধ্যাপনা করতেন। তাঁদের উৎসাহ দানের জন্য রাজা মহারাজা শাস্ত্রীয় “বিচার” এর আয়োজন করে বিজয়ী পণ্ডিতদের পুরস্কৃত করতেন। ওয়ারেন হেস্টিংস সেকালের এমন এগারো জন পণ্ডিত ব্যাক্তিদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রাচীন শাস্ত্রসমূহ থেকে কার্যোপযোগী একটি “ব্যাবস্থাপুস্তক” সংকলন করতে। এই পুস্তক প্রথমে ফার্সিতে ও তা থেকে ইংরেজীতে অনুবাদ করে ফেলেন নাথ্যানিয়াল ব্রাসি হ্যালহেড সাহেব। 

ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের খুঁটি বেশ শক্তপোক্ত ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি শিক্ষার অনুরাগী ছিলেন। খুব লেখাপড়া পছন্দ করতেন।  বিশেষতঃ ইষ্টার্ণ ইন্ডিয়ার এই কলকাতার সম্বন্ধে ওনার জানার খুব আগ্রহ  ছিল। তিনি  নাথানিয়াল ব্রাসি হ্যালহেড সাহেব কে দিয়ে ইংরেজিতে বাংলা ভাষার গ্রামার ব‌ই লিখিয়েছিলেন। সেটা ছিল ১৭৭৮ সাল। কেন লেখালেন? নিজেদের সুবিধে হবে তাই। বাংলা লিখতে পড়তে পারলে ওদেরই শাসনকার্যে সুবিধে তখন। আর হ্যালহেড সাহেব কি সুন্দর বাংলাভাষাটা সে যুগে রপ্ত করেছিলেন!  তাই তরতর করে বাংলা গ্রামারের ব‌ইখানি লিখে ফেলার সাহসও দেখিয়েছিলেন। ব‌ই তো লেখা হল। কিন্তু ছাপা হবে কি করে? বাংলা হরফ ক‌ই? হেস্টিংস অর্ডার করলেন উইলকিনস সাহেবকে। বাংলা হরফ বানাতে। প্রিন্টিং প্রেসে বাংলা ব‌ই ছাপা হবে। ব্যাস! এবার হ্যালহেডের সেই গ্রামার ব‌ইয়ের পান্ডুলিপি চার্লস উইলকিনস প্রিন্ট করিয়েছিলেন বাংলা হরফে। বাংলাদেশের প্রথম ছাপাখানা এই হেস্টিংসের ইচ্ছেতেই হয়েছিল। শুধু তাই নয় উইলকিনসকে দিয়ে তিনি প্রথম ইংরেজীতে অনুবাদ করিয়েছিলেন শ্রীমদ্ভাগবত্গীতা । 

কলকাতার কাছেই হুগলীতে ছাপাখানাটি খুললেন চার্লস উইলকিনস। তাঁকে সাহায্য  করলেন একজন বাঙ্গালী পন্ডিত মানুষ। নাম পঞ্চানন কর্মকার। এদের দুজনের প্রচেষ্টায় জন্ম নিল প্রথম বাংলা ব‌ইয়ের ছাপার হরফ। 

হেস্টিংসের আমলে আরেকজন বিখ্যাত স্কলার ছিলেন। নাম স্যার উইলিয়াম জোন্স। এমনিতে তিনি ছিলেন সুপ্রীম কোর্টের জজ। তবে ব্রিটিশ হলে কি হবে? এশিয়ার আর্ট, কালচার, লিটারেচারে খুব ইন্টারেস্ট ছিল তাঁর। স্যান্সক্রিট আর অ্যারেবিক এই দুই ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। কলকাতার এশিয়াটিক সোশ্যাইটির ফাউন্ডার মেম্বার ছিলেন এই উইলিয়াম জোন্স। জোনস সাহেব বোধহয় এখানকার নেটিভ বাঙালীদের থেকেও কলকাতাকে বেশী ভালোবাসতেন। শহরের সমস্ত শিক্ষিত মানুষেরা তাঁকে খুব পছন্দ করতেন। ১৭৯৮ সালে যখন তিনি মারা গেলেন  কলকাতায় তাঁর ফিউনারাল প্রোসেশনে এত ভীড় হয়েছিল যে সে বলার কথা নয়। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ থেকে কামানের তোপধ্বনি করা হয়েছিল তাঁর সম্মানে।   

হেস্টিংসের পর গভর্নর জেনারেল কর্নওয়ালিস ও তারপর ওয়েলেসলির আমল হল ১৭৯৮ সাল। তাঁর দুবছরের মধ্যেই ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের জোয়ারে ভেসে গেল কলকাতা। ১৮০০ সালে ওয়েলেসলির উদ্যোগেই কলকাতায় ব্রিটিশ কোম্পানির সিভিলিয়ানদের লেখাপড়ার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ তৈরী হল। ১৭৯৯ সালের ৪ঠা মে ওয়েলেসলি দাক্ষিণাত্য জয় করে ১৮০০ সালের ৪ঠা মে কে বিজয়তিথি স্মরণ করে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের জন্মদিন ঘোষণা করেছিলেন। 

১৭৯৩ সালে পাদরি উইলিয়াম কেরী এদেশে আসেন। খৃষ্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে। অথচ বাংলাভাষার প্রেমে পড়ে যান অনায়াসেই। কারণ ভাষা আয়ত্ত্বে না এলে ধর্ম প্রচার করা যাবে না। একদা নিন্দুক হলেও নিজের স্বার্থেই তিনি একসময় আচারে ব্যাবহারে পুরোদস্তুর বাঙালি হয়ে উঠলেন। 

তারপর একদিন এই কেরী সাহেব শ্রীরামপুর থেকে কলকাতায় এসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হলেন। তাঁর সহযোগী হলেন বাঙালি পণ্ডিত রামরাম বসু। কেরী সাহেবের মুন্সী ছিলেন এই বাঙালি পণ্ডিত। এই কলেজ থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছিল বাংলা গদ্য সাহিত্য। 

পড়ানো হত লিটারেচার, ল্যাঙ্গুয়েজ। তখন সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজী ছাড়াও অ্যারেবিক, ফ্রেঞ্চ সব পড়ানো হত। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্কলাররা এসে ক্লাস নিতেন। এরপর ১৮২৪ সালে তৈরী হল কলকাতার গোলদিঘির উত্তরে সংস্কৃত কলেজ। ১৮৫১ সালে পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপ্যাল হন।  শুধু তাই নয়। সাহেবরা বাংলা গ্রামার শিখছে, তাদের সুবিধার্থে বাংলা ব‌ই ছাপা হচ্ছে। নেটিভ ভারতীয়দের তরফ থেকে খবরের কাগজে এক বিজ্ঞাপন ছাপা হল। কেউ যদি ভারতীয়দের সুবিধার্থে ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজের গ্রামার আর ডিকশনারির ব‌ই প্রকাশ করে জানান তাঁকে প্রাইজ দেওয়া হবে। কারণ নেটিভরা তখন ব্রিটিশদের কোম্পানিতে কাজ করছে। তাদের ইংরেজীটা জানা খুব দরকার। নয়ত তারা ইংরেজদের সঙ্গে  বাক্যালাপ  করবে কিভাবে? এর আগে অবিশ্যি ১৭৭৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হবার পরেই নেটিভদের মধ্যে ইংলিশ জানার, বলার আর লেখার ইচ্ছেটা জেগে উঠেছিল। সাহেবদের কাছে ইন্ডিয়ানরা হাত-পা নেড়ে, কাজ চালাবার জন্য অবিশ্যি ঠিক বুঝিয়েই ছাড়ত তাঁদের বাংলা ওয়ার্ড সর্বস্ব ইংলিশ কে। মনে মনে সাহেবরা হয়ত হেসেও ফেলত। 

সেই যে একবার একজন বাঙালি রথের ছুটি চাইবেন কি করে সাহেবের কাছে?  রথকে কি করে বোঝাবেন? বললেন, চার্চো চার্চো উডেন চার্চো, নট চার্চো বাট লাইক চার্চো। অলমাইটি গড স্ট্যান্ড্স, দে টান, দে টান। আমাদের রথকে অনেকটাই ইংরেজদের চার্চের মতই দেখতে। আর উডেন বা কাঠের তো বটেই। মধ্যে জগন্নাথ বসে থাকেন। সকলে মিলে দড়ি ধরে টানে। তবে টান্, টান না বলে পুল, পুল বললেই পারত। কি ভেবেছিলেন  সাহেবরা কে জানে!


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


সাহেবদের মত ভাল ইংরেজী শিখতে গেলে তো ভাল স্কুল দরকার। কত মাথা ঘামাতেন তাঁরা সমাজের শিক্ষা ব্যাবস্থা নিয়ে। তার উত্তরণ নিয়ে। ছাত্রদের পড়াশুনো নিয়ে। তখন আর তেমন ইস্কুল কোথায় এই কলকাতায়? ১৮০০সালে শ্রীরামপুর মিশন তৈরী হল। তারপর আবার গ্রামেগঞ্জেও স্কুল তৈরী হতে থাকল। ১৮১৪ সালে ভূকৈলাসের মহারাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল নিজের বাড়িতে একটি স্কুল খুললেন। এসব স্কুলে যেটা ছিল না তা হল টেকস্ট বুক। এই জন্য ১৮১৭ সালে “কলিকাতা স্কুল বুক সোশ্যাইটি’  তৈরী হল। এরা কলকাতায় যত স্কুল আছে সেগুলিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকল। আরো আরো নতুন নতুন স্কুলের সঙ্গে তৈরী করল নতুন নতুন অনেক পাঠশালা।  সেগুলির তদারকির ভার দেওয়া হল নামকরা পন্ডিত গৌরমোহন তর্কালঙ্কারের ওপর।  হিন্দু ছাত্রদের মিশনারি প্রচারিত ধর্মের প্রভাব মুক্ত করার জন্য ১৮২৯ সালে গৌরমোহন আঢ্য খুলেছিলেন ধর্ম প্রভাব মুক্ত এক ইংরেজী বিদ্যালয় যার নাম ওরিয়েন্টাল সেমিনারি স্কুল। 

এর মধ্যে ১৮১৭ সালে স্থাপিত হয়েছে হিন্দু কলেজ। প্রতিষ্ঠাকালে রামদুলাল সে সরকার অনেক অর্থ দান করেন। কলেজের পরীক্ষার সময় ভূ কৈলাসের কালীশঙ্কর ঘোষাল শিক্ষার উপকারে সে যুগে ২০০০০ টাকা দান করেন। অনেক পরে ১৮৫৪ তে হিন্দু কলেজ প্রেসিডেন্সী কলেজে ট্রান্সফর্মড হয়। এর প্রধান উদ্যোক্তার নাম ডেভিড হেয়ার যিনি ছিলেন স্কুল সোশ্যাটির ইউরোপিয়ান সেক্রেটারি আর তাঁর নেটিভ কাউন্টার পার্ট ছিলেন খাস কলকাতার বাঙালি রাধাকান্ত দেব। এই স্কুল সোশ্যাইটির আন্ডারে যে স্কুলগুলো ছিল তাদের পরীক্ষা নেওয়া হত শোভাবাজারে দেব বাড়িতে। আর এই স্কুল সোশ্যাইটির জন্য‌ই আজকের প্রেসিডেন্সি কলেজের কাছে দুটো বড় বড় নামকরা স্কুল হিন্দু আর হেয়ার স্কুল। 

১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজী শিক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে রাজা রামমোহন রায় নিজের খরচায় অ্যাংলো হিন্দু স্কুল নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। 

এরপর মনে পড়ে হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর নাম। নামকরা এংলো ইন্ডিয়ান এডুকেশনিষ্ট ছিলেন। হিষ্ট্রি আর ইংলিশ লিটারেচার পড়াতেন। স্টুডৈন্টদের খুব ফেবারিট ছিলেন ডিরোজিও। তাঁর ফেবারিট  আটজন ছাত্রদের নিয়ে ডিরোজিও গড়েছিলেন ইয়ং বেঙ্গল সোশ্যাইটি। এঁদের মধ্যে ছিলেন কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, রামগোপাল ঘোষ, রামতনু লাহিড়ী, রাধানাথ শিকদার, প্যারীচাঁদ মিত্র, শিবচন্দ্র দেব, দক্ষিণারঞ্জন  মুখোপাধ্যায়। এই ইয়ং বেঙ্গলই ভারতে নবজাগরণের প্রগতিমূলক আন্দোলনের পুরোধা হয়ে দাঁড়ান। 

কোম্পানির কর্মচারী জেনারেল ক্লড মার্টিনের কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশ কোম্পানির এই ক্লার্ক স্টুডেন্টদের ফ্রি তে পড়াশুনোর জন্য সে যুগে তেত্রিশ লক্ষ  টাকা উইল করে রেখে যান । সেই টাকা থেকে ১৮২৯ সালে চৌরঙ্গীতে লা মার্টিনিয়র কলেজ তৈরীর ডিসিশন হয়। অনেক ধনী বাঙালীরাও স্কুলের উন্নতির জন্য সেসময় প্রচুর টাকা পয়সা দিতেন। এরপর সেসময়ের এক ধনকুবের মতিলাল শীল শীলস ফ্রি কলেজ গড়েছিলেন নিজের বসতবাড়িতেই। ১৮৪৩ সালের ১লা মার্চ। প্রথমে এটি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের আন্ডারে ছিল।  এরপর ১৮৫৭ তে তা ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির অধীনে যায়।

ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মিশনারিদের উদ্যোগে কলকাতায় প্রথম মেয়েদের স্কুল স্থাপিত হয়। এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা ছিল জন এলিয়েট ড্রিংক ওয়াটার বেথুন সাহেবের। কাউন্সিল অফ এডুকেশনের সদস্য রামগোপাল ঘোষের সঙ্গে পরিচিত হবার পর স্ত্রীশিক্ষা প্রসারের জন্য স্কুল খোলার পরিকল্পনা তাঁর মাথায় আসে। রামগোপালের বন্ধু পাথুরিয়াঘাটার সূর্যকুমার ঠাকুরের দৌহিত্র দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের আনুকূল্যে বিদ্যালয়টি ” নেটিভ ফিমেল স্কুল” নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণারঞ্জন সিমলা স্ট্রীটের বৈঠকখানার বাড়িটি, ৫০০০ টাকা মূল্যের একটি গ্রন্থাগার এবং আধবিঘা জমি সহ ১০০০টাকা দান করেন। যার ফলস্বরূপ ১৮৫০ সালে হেদুয়ার পশ্চিমপাড়ে এখনও জ্বলজ্বল করছে বেথুন স্কুল। ১৮৫০ থেকে ১৮৬৯ পর্যন্ত এই স্কুলের সম্পাদক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ১৮৭৯ সালে বেথুন স্কুলে কলেজ বিভাগ খোলা হয়।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


 

সে যুগে শিক্ষার প্রসারে সবচেয়ে বেশী সহায়ক হয়েছিল মুদ্রা যন্ত্র বা প্রিন্টিং প্রেস। তখন কলকাতা শহর মুদ্রণের পীঠস্থান হয়ে ওঠে। সমাজের ওপর ছাপাখানার প্রভাব পড়ার শুরু তখন থেকেই। ছাপাখানা থেকে স্রোতের মত বই বেরুতে লাগল। ছাপা বই বেরিয়েছিল বলেই এদেশে শিক্ষার প্রসার সুগম হয়েছিল। 

যদিও আগেই বলেছি কলকাতা ও হুগলী তে ছাপাখানার জন্ম ১৭৭৮ সালেই। কিন্তু সেখানে যেসব বই ছাপা হত তা সবই সাহেবসুবোর শাসন কাজের সুবিধার্থে, সাধারণ মানুষের পাঠোপযোগী বই ছাপা হতে থাকল ঊণবিংশ শতকে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে কাশীরাম দাসের মহাভারত, ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দরের সঙ্গে মৌলিক গ্রন্থও ছাপা হতে থাকল। শ্রীরামপুর থেকে রামরাম বসুর “রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র” এবং রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়ের “মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং” ছেপে বের হল। এরপর আর শ্রীরামপুর নয় খোদ কলকাতাই যেন জ্ঞানকাণ্ডের অন্যতম জ্ঞানপীঠ হয়ে দাঁড়াল। স্কুল বুক সোসাইটি পাঠ্যপুস্তক রচনা ও প্রকাশনার ব্যাপারটির দায়িত্ব নিল। তাঁদের উদ্যোগে রাধাকান্ত দেব, তারিণী চরণ মিত্র এবং নীলকমল সেন যৌথভাবে “নীতিসার” নামক এক গ্রন্থ লিখলেন। 

এরপর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং মদনমোহন তর্কালঙ্কার পাঠ্যপুস্তক রচনা এবং মুদ্রণের ব্যাপারে বিপ্লব আনলেন। ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে এঁরা যৌথ উদ্যোগে “সংস্কৃত যন্ত্র” নামে এক ছাপাখানা চালু করেন। এখান থেকেই একে একে প্রকাশিত হতে থাকে ঈশ্বরচন্দ্রের বর্ণ পরিচয়, কথামালা, আখ্যানমঞ্জরী, সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা, ব্যাকরণকৌমুদী এবং মদনমোহন প্রণীত তিনখন্ডে “শিশুশিক্ষা”। ইতিমধ্যে মেয়েদের লেখালেখিও বাড়তে থাকে। ১৮৫৬ সালে কৃষ্ণকামিনী দাসী “চিত্তবিলাসিনী” কাব্যগ্রন্থ আর ১৮৭৬ সালে রাসসুন্দরী দেবীর আত্মজীবনী 

“আমার জীবন” ছেপে বের হয়। এমনকি আজও “বটতলার উপন্যাস” বলে একটি কথা চালু আছে। সে যুগে এই বটতলার প্রকাশন সংস্থা সমূহ সত্যি সত্যি সস্তার বই ছেপে বের করে ফিরিওয়ালা মারফত পাঠকের হাতে তুলে দিত।শুধু বাংলাভাষার প্রসার আর পাঠকমনের ক্ষুধা মেটাতে।  উত্তর কলকাতার নিমু গোস্বামী লেন এবং আহিরিটোলার জাংশনে  এক প্রকাণ্ড বটগাছ ছিল। তার নীচেই এই বটতলা প্রকাশনার জন্ম। বিশ্বনাথ দেব, বাণেশ্বর ঘোষ ছিলেন এর রূপকার। এভাবেই আমাদের কলকাতা যাবতীয় জ্ঞানজনিত কর্ম কাণ্ডের সাক্ষী তথা বইপোকা বাঙালির জ্ঞানার্জনের পীঠস্থান হয়ে দাঁড়ায়। 

 

তথ্যসূত্র

কী করে কলকাতা হল/পূর্ণেন্দু পত্রী 

কলকাতা/অতুল সুর 

কলিকাতা দর্পণ/রাধারমণ মিত্র 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>