| 2 মার্চ 2024
Categories
গীতরঙ্গ

সাপ্তাহিক গীতরঙ্গ মহানগর কলকাতা’র সম্পাদকীয়

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

মহানগর কলকাতা নিয়ে আয়োজন কেন? কলকাতা নিয়ে কি লেখা কম হয়েছে বা হচ্ছে তাহলে কেন কলকাতা নিয়ে মাতামাতি ইরাবতীর? কলকাতা নিয়ে বলতে গেলে সেই পালরাজ্যের যুবরাজ যিনি সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছিলেন সেই চৌরঙ্গীনাথের সময় থেকে শুরু করতে হবে, যার নামে আজকের চৌরঙ্গী। মধ্যযুগে ১৪১৫ সালে মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কলকাতার উল্লেখ করছে। ১৫৯৬ সালে আইন-ই আকবরিতে কলকাতার উল্লেখ আছে। এই কলকাতা বাঙালির মধ্যযুগের অস্তিত্বে মহীরুহের সুপ্ত বীজ। ১৪৯৯ থেকে ১৫০৬ সালের মধ্যে কোনও এক সময় নানক এসেছিলেন কলকাতায় ধর্মপ্রচার করতে, এখানে বেশ কিছুদিন ছিলেন।

কলকাতা যে আগামী দিনে বাণিজ্যকেন্দ্র সপ্তগ্রামের স্থান নেবে, তা সেদিনই স্থির হয়ে গেছিল যেদিন শেঠ বসাকরা এখানে এসেছিলেন সপ্তগ্রাম ছেড়ে ১৫৩৭ সালে। ৬৩২ সালে শেঠ বসাকদের গোবিন্দপুরের টেক্সটাইল ওয়ার্কশপে ২৫০০ শ্রমিক কাজ করত, জানা যাচ্ছে। কলকাতায় আর্মেনীয়রা এসেছিল, এবং রেজা বিবি নামে এক আর্মেনিয়ান মহিলার সমাধি পাওয়া যাচ্ছে কলকাতায়, সময়কাল ১৬৩০ সাল। এই রেজা বিবির বর ছিলেন সুকিয়াস, তারই নামে সুকিয়া স্ট্রিট, এরকম একটা মত আছে। সঞ্জীব সান্যালের সাম্প্রতিক বই, ওশেন অভ চার্ন বলছে, সেযুগে প্রধান আন্তর্জাতিক পণ্য ছিল টেক্সটাইল।

ইংরেজরা নাকি নিতান্তই অ্যাক্সিডেন্টর ফলে হুগলি নদীর তীরে পা রেখেছিল, এখানে না এসে মহানদীতে গেলে উড়িষ্যাতেই রেনেসাঁস হয়ে যেত, তথাগত রায় বলেছিলেন। ইতিহাস একদল বাঙালি আজও জানে না। বঙ্কিমের সেই বিখ্যাত উক্তি “বাঙালির ইতিহাস চাই, নইলে বাঙালি মানুষ হবে না”-র এত বছর পরেও যে অনেক বাঙালি নিজের ইতিহাস জানে না, তথাগত রায়রা তারই প্রমাণ দেন বারবার। সুতানুটী নামটাও এসেছে ওই টেক্সটাইল শিল্পের বাড়বাড়ন্ত থেকেই। বাঙালির কলকাতার শ্রী ইংরেজ আসার আগে কিরকম ছিল, সেটা ইংরেজরা যে দিল্লির বাদশাকে ১৬০০০ টাকা দিয়েছিল এই তিনটে গ্রাম সুতানুটী, কলকাতা, গোবিন্দপুরের প্রজাসত্ত্ব কেনার জন্য ১৬৯৮ সালে, তা দেখলে টের পাওয়া যায়। সাবর্ণদের ১৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সাবর্ণরা তো দেওয়ার মালিক নয়, মোগল আমলে সমস্ত জমিই বাদশার, লোকে প্রজাসত্ত্ব (রেভেনিউ রাইট) কিনতে পারে কেবল, তো কলকাতার সেই প্রজাসত্ত্ব কিনতে বাদশার ফরমান আনতে হয়েছিল। এঁদো জমির জন্য কে ১৬০০০ টাকা দেয়? কলকাতা যদি গণ্ডগ্রাম হত, সে যুগে এই পরিমাণ টাকার ঝুলি হাতে নিয়ে বাদশার দ্বারস্থ হত না ইংরেজ।

বাঙালির কলকাতা অনেক পুরোনো। ইংরেজ জব চার্নক যে কলকাতার স্রষ্টা নন, সেটা কলকাতা হাইকোর্ট ২০০৩ সালে একটা রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছিল। ইংরেজ শাসনের শুরুর দিকে ১৭৮৩ সালে কালীঘাটে অনেকগুলি গুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রা মিলেছিল। এই অঞ্চলে সভ্যতা বহু প্রাচীন। মহাশক্তিশালী যশোর রাজ্যের অংশ তো বটেই। তারও আগে পালযুগে দক্ষিণবঙ্গের এই অঞ্চল ছিল ব্যাঘ্রতটীমণ্ডল নামে খ্যাত, কলকাতা তার অংশ। আর গঙ্গারিডিদের সময়ে কলকাতার সামান্য উত্তরে চন্দ্রকেতুগড়ে ছিল গঙ্গারিডি সাম্রাজ্যের রাজধানী। সেনযুগেও বল্লাল সেনের একটি দানপত্রে কালীক্ষেত্রর উল্লেখ আছে, তা যে কলকাতা, সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই।

ইংরেজরা বাংলা দখল করে ১৭৫৭ সালে। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ১৭৬০ সালে। এ দুয়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। বাঙালির সমৃদ্ধি বরাবরই ছিল, ইংরেজ আমাদের ছিবড়ে করতে এসেছিল, আমাদের আলাদিনের প্রদীপ দেখিয়ে রাতারাতি সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় নগরী বানাতে নয়। মধ্যযুগে সপ্তগ্রামের সমৃদ্ধি যা ছিল, তার কাছে লণ্ডন শহর ম্লান।

বাঙালির ইতিহাসকে আরো একবার আউরে নিতেই ইরাবতীর সাপ্তাহিক গীতরঙ্গের আজকের আয়োজন মহানগর কলকাতা। নতুন করে দেখার চেষ্টা করেছেন লেখকরা। তাদের লেখায় উঠে এসেছে কলকাতার নানা ইতিহাস। হুতোমি দৃষ্টিতে হুজুগে কলকেতা লেখায়  দিলীপ মজুমদার অন্য এক কলকাতার কথা বলেছেন, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় যেমন বটতলা থেকে কলেজস্ট্রীট হয়ে উঠার ইতিহাস লিখেছেন তেমনি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখায় কলকাতার পুকুরগুলোর অজানা ইতিহাস যেমন উঠে এসেছে, তেমনি রাস্তাগুলোর নাম, থিয়েটার নিয়ে নতুন আলো ফেলতে চেষ্টা করেছেন শ্যামলী আচার্য্য ও অ্যাঞ্জিলিকা ভট্টাচার্য। নাটক নিয়ে লিখেছেন ইন্দ্রজিৎ ঘোষ, দুটি কালজয়ী সিনেমা মহানগর ও কলকাতা ৭১ নিয়ে লিখেছেন শৌনক দত্ত, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের কলমে ধরা পড়েছে এক অন্য কলকাতা। কলকাতার ছাপাখানার ইতিহাস লিখেছেন প্রশান্ত দত্ত, পারমিতা চক্রবর্তীর লেখায় কলকাতার কুটির শিল্প ও শুভময় পালের লেখায় উঠে এসেছে প্রাসাদ ঘেরা জায়গার কথা যা আজ বিস্মৃতির অতলে। সৌরভ দত্তের চোখে কলকাতার কবিতা ও কবিতার কলকাতা যেন সাহিত্যকে অন্যমাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। এছাড়াও আরো অনেক জানা ইতিহাসকে অন্য আলোয় দেখা লেখাও থাকছে এই সংখ্যায়।

কতটা পারলাম জানি না। তার বিচার করবেন পাঠক। এই আয়োজন যাদের জন্য সম্ভব হয়েছে তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। বিশেষ কৃতজ্ঞতা শতানীক রায়’সহ গীতরঙ্গ’র বিভাগীয় সম্পাদক সৈকত দে-র প্রতি, ০২ আগষ্ট তার জন্মতিথিতে শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা। অন্য দুজন বিভাগীয় সম্পাদক সকাল রয় ও সৌরভ দত্ত’সহ কৃতজ্ঞতা ইরাবতী টিমের প্রতিটি সদস্যের প্রতি।

 

 

অলকানন্দা রায়

সম্পাদক, ইরাবতী

০১ আগষ্ট, ২০২১

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত