| 15 জুলাই 2024
Categories
গীতরঙ্গ

গীতরঙ্গ: কলকাতার নাখোদা মসজিদ: স্থাপত্যের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

ব্যক্তিগত কাজে এক সপ্তাহ ধরে কলকাতায় ছিলাম। কলকাতা শহরের কিড স্ট্রিটে রাজ্য সরকারের এমএলএ হোস্টেলের কাছাকাছি একটা হোটেলে উঠেছিলাম। এর আগে কয়েকবার কলকাতা গিয়ে প্রায় প্রতিটি বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক জায়গা দেখেছি কিন্তু নাখোদা মসজিদ দেখা হয়নি। এবার একদিন গিয়েছিলাম বিখ্যাত নাখোদা মসজিদ দেখতে। 

“নাখোদা মসজিদ” পশ্চিম বাংলার সবচেয়ে বড় আর প্রাচীন মসজিদ। এটি কলকাতার বড়বাজারের চিৎপুর অঞ্চলে অবস্থিত। মসজিদটি মহাত্মা গান্ধী রোড থেকে রবীন্দ্র সরণি ধরে দক্ষিণমুখী ৪/৫ মিনিটের পথে জাকারিয়া স্ট্রিটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। অনেক দূর থেকেই লাল রঙের এই দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি যেকোনো মানুষের নজরে পড়ে। রবীন্দ্র সরণিতে ট্যাক্সি থেকে নেমে কিছুটা হেটে মসজিদের প্রবেশ পথের সামনে এসে দাঁড়ালাম। ১৯২৬ সালে তৈরি নাখোদা মসজিদ স্থাপত্যের দিক থেকে বিস্ময়কর এক সৃষ্টি। সাদা মার্বেলের দেয়াল, বেলজিয়াম কাচ, বিশাল নামায পড়ার জায়গা, দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো কাঠের ঘড়িসহ এর ভাজে ভাজে রয়েছে ইতিহাসের গন্ধ। তৎকালীন সময়ে মসজিদটি নির্মাণ করতে খরচ হয়েছিল ১৫ লাখের বেশি রুপি। যা এখনকার বাজার মূল্যে নিঃসন্দেহে কয়েকশো কোটি টাকা। মসজিদটি তৈরি করেছিলেন কচ্ছের নামক একটি ক্ষুদ্র সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায় “কাচ্ছি মেনন জামায়াত”। 

কচ্ছের মেনন সম্প্রদায় ছিল গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলের বাসিন্দা। এরা প্রথম কলকাতায় পা রেখেছিল ১৮২০ সালের দিকে। সম্প্রদায়ের বেশির ভাগই জাহাজ, চিনির ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। তারপর তারা মিশে যান এ শহরের সঙ্গে। তাদের সংস্কৃতি ক্রমশ এ শহরের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। এই সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে “নাখোদা মসজিদ”। আগ্রায় অবস্থিত মুঘল সম্রাট আকবরের সমাধির আদলে ইন্দো-সেরাসেনিক স্থাপত্য শৈলিতে লাল বেলে পাথরে বিখ্যাত এই মসজিদটি নির্মিত হয়। আর মসজিদটির প্রবেশ পথ বানানো হয়েছে আগ্রার ফতেহপুর সিক্রির বুলন্দ দরজার আদলে। কুচ্ছি মেনন জামায়াতের সার্বিক সহযোগিতায় এই মসজিদটি তৈরি হয়। এই দলের নেতা ছিলেন আব্দুর রহিম ওসমান। 

আব্দুর রহিম ওসমান পেশায় ছিলেন সমুদ্রের বিখ্যাত নাবিক। ফার্সি ভাষায় নাবিকের একটি সমার্থক শব্দ হলো “নাখোদা”। সেখান থেকেই মসজিদটির নাম হয় “নাখোদা মসজিদ”। মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৯২৬ সালে। আর পুরো নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৪২ সালে। তার আগে এখানে ছোট পরিসরে একটা মসজিদ ছিল। প্রবেশ পথ থেকে মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম স্থাপত্যের অনুপম সৌন্দর্য। মসজিদটিতে একটি গম্বুজ, দু’টো বড় মিনার ও ২৫টি ছোট মিনার রয়েছে। বড় মিনার দু’টোর উচ্চতা ১৫১ ফুট আর ছোট মিনারগুলোর উচ্চতা ১০০ ফুট থেকে ১১৭ ফুটের মতো। সুবৃহৎ চাতাল দু’টো নির্মিত হয়েছে দুর্লভ গ্রানাইট পাথর দিয়ে। পাথরগুলো বিহারের তোলেপুর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। মসজিদের ভিতরে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন অলঙ্করণ ও সৃজনশীলতা। রয়েছে অনেক ঝাড়বাতি। 

মসজিদে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা এতো সুন্দর আর পরিকল্পিত যে, বাইরের বাতাসে যখন আগুনের হল্কা, এখানে তখন অযান্ত্রিক শীতল আরামের ছোঁয়া। প্রাক-মাইকের যুগে মুয়াজ্জিনের আযান বা ইমামের নামায পড়ানোর আওয়াজ প্রতিটি তলায় স্বচ্ছন্দে পৌঁছে যেত। রমযান বা ঈদের চাঁদের বিষয়ে নাখোদা মসজিদের ঘোষণাকেই শেষ কথা বলে ধরে নেওয়া হয়। মসজিদের উচ্চতম মিনারে সবুজ আলো জ্বেলে বুঝানো হয় রমযান শুরু। আবার মিনারের সবুজ আলো দেখেই বুঝা যায় রমযানের রোযা শেষ হলো। আর রমযান মাসে ইফতারের খবর দিত মিনারের লালবাতি।  নাখোদা মসজিদ কলকাতার সবচেয়ে বড় মসজিদ। মসজিদের দ্বিতল চাতাল এতই বিশাল যে, এখানে একসঙ্গে দশ হাজার মুসল্লি নামায পড়তে পারে। ঈদের দিন এই মসজিদকে কেন্দ্র করে এক লাখের বেশি মানুষের ঈদের নামাযের জামায়াত হয় এখানে। প্রতি জুম্মাবারে এখানে ১০/১২ হাজার মানুষ একসঙ্গে জুম্মার নামায আদায় করেন। 

নাখোদা মসজিদ এক সময় অবিভক্ত ভারত তথা বাংলার মুসলমানদের অন্যতম মসজিদ ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন এখানে। শুধু ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা নামাযের উদ্দেশ্যে নয়, এই মসজিদ দেখতে আসতেন সব ধর্মের মানুষ। আজও মসজিদটি ধর্মীয় স্থানের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র। মসজিদ দেখা শেষ করে পাশেই বাজারের দিকে হাটতে লাগলাম। এই মসজিদকে কেন্দ্র করে এমন কিছু জিনিস পাওয়া যায়, যা কলকাতার অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এখানেই সবচেয়ে ভালো আতর ও খাবারে দেওয়া সুগন্ধি আতর পাওয়া যায়। এখানেই মিলে হরিণের কস্তুরি থেকে তৈরি আতর। মিষ্টি জর্দার বড় বাজারও এখানেই। তবে না চিনে এসব কিনলে ঠকে যাওয়ার ভয় থাকে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নকশা করা নামাযী টুপি, দেশি-বিদেশি পাঞ্জাবি, শেরওয়ানি, বোরকা ও লুঙ্গির পাইকারি বাজারও এখানে। 

সে কারণে এই মসজিদকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন এখানে প্রদক্ষিণ করে চলেছে হাজারো ক্রেতা-বিক্রেতা ও পর্যটকের দল। প্রতি ঈদের আগে নতুন ভাবে সেজে ওঠে নাখোদা মসজিদ। বাজারে ঘুরাঘুরি করে মসজিদের সামনে দিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম, পিছনে পড়ে থাকলো স্থাপত্যের অনুপম নিদর্শন “নাখোদা মসজিদ”।

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত