| 24 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

দাহ

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

অ্যাপ বাইকে উঠে বসেছে সুলগ্না, এটাই ওর সস্তার সফর রোজ। গন্তব্য টালিগঞ্জের ভিতরের একটা ঠিকানা। জায়গাটা ঠিক চেনে না। চারিদিকে একটা অস্থিরতা চলছে। গোটা ভারতবর্ষ যেন ধর্ষকদের নিরাপদ বাসভূমি হয়ে গেছে। মাথার মধ্যে যেন আগুন জ্বলছে সুলগ্নার। একটার পর একটা ঘটনা। উন্নাওয়ের রেপ ভিক্টিম একটি মেয়ে, যাকে গ্রাম প্রধানের ছেলে অত্যাচার করেছিল, সেই মেয়েটি আইনের কাছে বিচার চেয়েছিল বলে জামিনে মুক্ত হওয়া আসামীরা তাকে জ্যান্ত জ্বালিয়েছে। সেই মেয়েটি এক কিলোমিটার গায়ে আগুন নিয়ে দৌড়েছে সাহায্যের আশায়। তারপর একজনের থেকে নিজেই ফোন নিয়ে পুলিশকে ফোন করেছে। সুলগ্নার খালি চোখে ভাসছে একটা মেয়ে গায়ে আগুন নিয়ে দৌড়াচ্ছে। আর শিউড়ে উঠছে ও। মনে হচ্ছে ভারতবর্ষের সবকটা মেয়ের গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্র। সুলগ্নার মনে হয় কোনকাল থেকে মেয়েরা শুধু জ্বলছে আর ছুটছে। চোখ বন্ধ করলে অর্ধদগ্ধ সব মুখের ছবি তাড়া করে। সুলগ্নার খুব অস্বস্তি হতে থাকে। পৌছে গেছে লোকেশানে। বাইক থেকে নেমে টাকা মিটিয়ে দেয় ও। শুভ্রাদিকে ফোন করলো। “নেতাজি সঙ্ঘ ময়দানের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। তোমার বাড়ি কোথায়?” শুভ্রাদির পথনির্দেশ ফলো করে পৌঁছে গেল ওনার বাড়ি। শুভ্রাদি তো খুব খুশি। সুলগ্না আসছে বলে আনন্দে একটা ফেসবুকে পোস্ট ও দিয়েছে। আসলে সুলগ্নাকে সবাই ভালবাসে। সুলগ্না একটি স্কুলে পড়ায়। তার সঙ্গে সমাজসেবামূলক কাজ করে। আর মেয়েদের কথা লেখে। তাদের ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার হওয়ার কথা। তাদের ঘাম-রক্ত-গ্লানির কথা লেখে সুলগ্না। সুলগ্না শুধু দিনরাত কাউন্সেলিং করে ফোনে,নানারকম স্তরের মেয়েদের ফোন আসে।বিভিন্নভাবে নির্যাতিতা, কেউ শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতিতা, কেউ অফিসে, কেউ একটি ভার্চুয়াল সম্পর্কে ফেঁসে গেছে এবং এখন ব্ল্যাকমেলের শিকার, কাউকে তার বর মারছে, ছেলে মারছে, কেউ ভয়ংকর ম্যারাইটাল রেপের শিকার।নিজের চাকরি, সংসার, অন্যান্য কাজের বাইরে এই সব মেয়েদের কথা ধৈর্য্য ধরে শোনে, তাদের মানসিক শক্তি যোগায়, পরামর্শ দেয়, আইনি পরামর্শ চাইলে উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়।নিজে সঙ্গে গিয়ে কারো সঙ্গে থানায় বসে থাকে, কারো বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলে তাদের কাউন্সেলিং করে।ও রোজ কাঁদে একা, আর চোয়াল শক্ত করে।এই এতজনের কন্ঠস্বর হতে হবে ওকে। ক্লান্ত হলে চলবে না।কিছুতেই না। সুলগ্না রেইকি হিলারও। শুভ্রাদিকে যিনি দেখাশোনা করেন তিনি ছোটবেলা থেকেই শুভ্রাদির বাপের বাড়িতে ওদের দুই বোনের ও ভাইয়ের দেখাশোনা করতেন তিনি। এখনো বয়স বাড়লেও শুভ্রাদির দেখাশোনা করেন উনিই। “শঙ্কর কাকা ওকে মিষ্টি দাও। “শঙ্কর কাকা এসে চারটি মিষ্টি ও জল দেন।” এত মিষ্টি খাইনা আমি, কার্বোহাইড্রেট বাদ দিয়েছি।” “তুমি প্রথমবার এলে, প্লিজ খাও। “
“একটাই খাচ্ছি।”
তারপর বলল,”বলুন, কোথায় ব্যাথা?”
“দেখোনা কোমরে সবসময় একটা টান লেগে থাকে। হাঁটুর ব্যাথায় আমার হাঁটাচলা পুরো বন্ধ। আজ দুবছর আমি শয্যাশায়ী। কিচ্ছুটি করতে পারিনা।গলগ্রহ হয়ে পড়ে আছি। সুলগ্না প্লিজ কিছু করো। আমাকে শুধু দাঁড় করিয়ে দাও।”
সুলগ্নার দুটো হাত চেপে ধরেন শুভ্রাদি। এরকম অবস্থায় সুলগ্নার খুব কান্না পায় সবসময় কিন্তু ওকে তো শক্তি দেখাতেই হবে। ও যে হিলার। বলল, “আচ্ছা, আমি রোজ রেইকি দেবো। পুরো কমবে কিনা জানিনা, তবে খানিকটা আরাম পাবেন। দাঁড়ান দেখি, আমার সঙ্গে হাঁটুন, সোজা হন।”
“সোজা হলেই কোমরে এমন টান লাগে!”
“তবুও সোজা হন। হাঁটুন আমার সঙ্গে।”
সুলগ্না ওনাকে রান্নাঘর অবধি নিয়ে গিয়ে ফিরে আসে।
“এই তো হাঁটলেন, কথা দিন রোজ হাঁটবেন এরকম শঙ্কর কাকাকে ধরে। থালার উপরে হাত ধোবেন না, বেসিনে হাত ধোবেন। কী হলো, কথা দিন।”
“আচ্ছা, দিলাম।”
“আমি এখনই একবার আপনাকে রেইকি দিচ্ছি,দেখুন ভালো ফিল করেন কিনা।”
“এখন কেমন লাগছে।”
“একটু রিলিফ হল জানো।”
“বেশ।”
কিছু সিম্পল এক্সারসাইজ দেখায় সুলগ্না।বলে
“রেইকি যখন দেবো তারপর এগুলো করবেন।এবার বলুন শুনি।ঠিক কবে শুরু হল যন্ত্রণা?”
“এই দু বছর আগে থেকে। নিউরোসায়েন্সের ডাক্তার দেখালাম, তারা বলল নার্ভের কোন সমস্যা নেই।”
“অর্থপেডিক দেখান নি কেন?”
তারপরে তো লোক টা আমাকে হঠাৎ একটা সামান্য কথায় গায়ে হাত তুললো।আমার বয়স ষাট। একুশে বিয়ে হয়েছে। উনচল্লিশ বছর সংসার করে এসে এই বয়সে মার খেলাম তাও অতি সামান্য কথায়।হয়তো আর সহ্য করতে পারছে না। তার তিন দিন পরে ছেলে কে বললাম “বাবু এত মদ খাস না।জীবন টা নষ্ট হয়ে যাবে।” ছেলেও গায়ে হাত তুললো। অনেক গুলো ঘুমের ওষুধ খেলাম।ওরা ওয়াশ করিয়ে আনলো জানো, মরতে দিলনা।” শুভ্রাদির চোখে জল এলো। সুলগ্না হাত টা ধরে চোখ সরিয়ে রাখে।
“উনি এত বছরে কখনো করেন নি, এখন হঠাৎ এমন করলেন?”
“লোকটা তো কামুক,এখন আমি তো ওনাকে দিতে পারবো না কিছু। তাই সহ্য করতে পারছে না।”
“কী বলছেন? উনি,কত বড় আপনার চেয়ে?”
“সাত বছরের।”
“মানে সাতষট্টি বছর, এই বয়সে এটা শুনে একটু অবাক হলাম।”
“জানো,vতোমাকে কেন ভালোবাসি,তুমি যে মেয়েদের উপরে অত্যাচারের কথা লেখো। আমি রিলেট করতে পারি। আমি যখন কলেজে ভর্তি হই,আমি ইকনমিক্স নিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম।আমি কিন্তু স্কুলে সবসময় স্কলারশিপ পেয়ে এসেছি।রেজাল্ট খুব ভালো ছিল। দিদির খুব দাপট ছিল আমাদের বাড়িতে। ও নিজে ইকনমিক্স পড়েছে, তখন ভালো চাকরি করে। ও কিছুতেই আমাকে ইকনমিক্স পড়তে দিল না। কেমিস্ট্রি অনার্সে ভর্তি করে দিল।কোন টিচারেরও ব্যবস্থা করল না।কেমিস্ট্রি ভালোবাসতাম না একদম। অথৈ জলে পড়লাম।” একটু হাঁপান শুভ্রাদি। জল খান। তারপর একটু দরজার দিকে তাকিয়ে দেখেন কেউ দেখছে কিনা বা শুনছে কিনা। যদিও এ বাড়িতে ঢোকা ইস্তক সুলগ্না দেখেছে খুব একটা কারো যায় আসে না ওনাকে নিয়ে।কেউ মাথাও ঘামায় না।ছেলে ছেলের ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকে। মেয়ে মেয়ের ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকে। শাশুড়ি সারাদিনই প্রায় পুজো আচ্চা নিয়ে থাকেন। উনি বৈষ্ণব।
“আচ্ছা আপনার শাশুড়ির ব্যবহার কেমন?”
“উনি কখনো আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন নি। পার্টিশনের সময় ছেলে মেয়েদের নিয়ে কোনক্রমে এদেশে আসা। তখনই উনি বিধবা।অসীম সংগ্রাম করে ছেলে মেয়েদের বড় করা।তারপর এখন যেন উনি অবহেলিত। তাই শ্রীচৈতন্যকে নিয়ে ভুলে আছেন।”
“ও,আচ্ছা।”
“ওই লোকটা ছিল দিদির বন্ধু। দিদির অফিসে অডিট ফার্ম থেকে অডিট করতে আসতো। দিদির বন্ধু হিসেবে আমাদের বাড়িতে আসা। আমার বাবার ওকে দেখে সহানুভূতির ঢেউ উথলে উঠলো।আহা, ব্রিলিয়ান্ট ছেলে।পার্টিশনের পরে চালচুলোহীন পরিবেশে বড় হয়ে ও এতদূর এগিয়েছে। ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো লোকটা তিনদিন অন্তর আমাদের বাড়ি আসতোই। বাড়ির ছেলেই হয়ে গেল। বাবা মাঝেমাঝে রাতেও থেকে যেতে বলতেন।”
“তারপর?”
“একদিন আমি তিনতলার ঘরে অঙ্ক করছি, লোকটা হঠাৎ এসে আমার মুখ চেপে ধরল আর সটান ঢুকিয়ে দিল তার উত্থিত লিঙ্গ আমার যোনিতে।আমার দম আটকে আসছিল। ব্যথায় কষ্টে গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরোচ্ছিলো। আর জানো..আমি প্রেগনেন্ট হয়ে গেলাম। এতই কম অভিজ্ঞতা ছিল তিনমাস অবধি বুঝিইনি। কাউকে বলিনি ভয়ে, লজ্জায়।cযখন বুঝলাম, লোকটাকে ফোন করলাম।লোকটা বলল, অ্যাবরশন করাতে হবে। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিতে আরো কিছুদিন দেরি হয়ে গেল। তারপর ও নিয়ে গেল গাইনিকোলজিস্ট চেম্বারে। তিনি অ্যাবরশন করলেন। কিন্তু ফিটাস বেশ বড় হয়ে গিয়েছিল। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম খুব। আমার এক বান্ধবী শুধু সঙ্গে ছিল। সে বলল তোর নার্ভ টার্ভ সব ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে আজকাল ঐ সময়টা মনে পড়ে।শিউরে উঠি।”
এবার সুলগ্না বুঝল, যে ওই যে ওনার মাথায় গেঁথে আছে ওনার নার্ভ ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে সেটা এতদিন পরে অবচেতনে সেটাই ট্রিগার করছে। উনি আর হাঁটতে পারছেন না। এদিকে নিউরোলজিস্ট কোন নার্ভের সমস্যা দেখতে পাচ্ছেন না। “তারপর লোকটা অবশ্য আরো এক বছর পরে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে বিয়ে করে। বিট্রে করেনি সেক্ষেত্রে। তারপর এতগুলো বছর…।”
সুলগ্না বলল “আপনি সেরে উঠবেন। চিন্তা করবেন না। রোজ রেইকি দেবো আমি। আর যা বললাম হাঁটতে হবে। আপনি পারবেন। আমি আপনাকে পাওয়ার পাঠাবো।”
“হ্যাঁ গো, তুমিই আমার শেষ ভরসা। ওদের পয়সায় আমি আর ট্রিটমেন্ট করাবো না।”
“বোকামি করবেন না। দেখিয়ে নিন অরথোপেডিক ডাক্তার।ওদের পয়সা বলে কিছু হয় না। আপনি এতো বছর সার্ভিস দিয়েছেন, তারও তো একটা পারিশ্রমিক হয়। তাই ভাবুন।”
শুভ্রাদি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকেন।
“জানো আমি একদম ফেইলিওর। কত সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছি। কোনদিন একটা ও পেলাম না! একটা জায়গা থেকেও কল এলো না।” মনে মনে ভাবছে সুলগ্না, হয়তো এলেও আসতে পারে,চিঠি কেউ লুকিয়ে রেখেছে, আবার না আসতেও পারে। শুভ্রাদি বলে যাচ্ছেন, তারপর ও বেশ কিছু জিনিস ট্রাই করেছি কিন্তু লোকটা করতে দেয়নি। আর আমিও ঠিক ভালো করে কোন কাজই করতে পারি নি। একটা জীবন বৃথা চলে গেল।আজকাল খুব মনে হয় আমি কেন তোমার মতো হতে পারলাম না সুলগ্না? তোমার মতো শক্তি কেন আমার হলনা?”
“এখন শক্তি সঞ্চয় করুন। বাকি জীবন টা ভালো করে কাটাতে হবে তো। বিছানার চাদর, বালিশ এমন মলিন কেন? পাল্টাবেন। আছে তো?”
“আছে।”
“ওকে।”
“অথচ লোকটাকে সবাই শুনলে ভালো বলবে, বলবে বিয়ে তো করেছে, বিট্রে তো করেনি।”
“আচ্ছা আসি। ভালো থাকবেন। হাঁটবেন কিন্তু।”
“কী খুশি যে হলাম, তুমি এলে।”
“আমিও খুশি হয়েছি। বাই দ্য ওয়ে অ্যাবরশন করলে কারো নার্ভ ছিঁড়ে বেরিয়ে যায় না। ভালো থাকবেন।” একবার জড়িয়ে ধরে বেরিয়ে আসে সুলগ্না। ওর শুধু কানে বাজছে “অথচ লোকটাকে সবাই শুনলে ভালোই বলবে…..” ভালো, নিজের রেপিস্টের সঙ্গে এত বছর সংসার, তারই ঔরসে দুটি বাচ্চা জন্ম দেওয়ার গ্লানি এতবছর ধরে সওয়া কী দুঃসহ হতে পারে! লোকটা গায়ে স্পর্শ করলেই নিশ্চয়ই পোকা হাঁটছে মন হতো! উফফ্। আজ এত বছর ধরে বয়ে চলা অপমান হয়তো ওনাকে আজ পঙ্গু করে দিয়েছে। প্রতিটি সঙ্গমের সময় মনে পড়েছে ওনার যে এই লোকটা আমার রেপিস্ট। তাই একবারের জন্য ও ‘আমার স্বামী’ কথাটি উনি ব্যবহার করেন নি।বারবার ‘লোকটা’ বলেছেন। এতদিন ঘর সংসারের পরে “লোকটা ” শুধুই রেপিস্ট! শুধুই !

সুলগ্না চোখ মুছে হাঁটতে থাকে। আরো অনেক কিশোরী শুভ্রা, যুবতী শুভ্রা এই ভারতবর্ষে অপেক্ষা করছে ওর জন্য। যারা অন্তহীন দৌড়ে চলেছে একটু সাহায্যে র আশায়, শুধু তাদের গায়ের আগুনটা কেউ দেখতে পাচ্ছেনা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত