| 24 মে 2024
Categories
নারী

সুচিত্রা মিত্র: অনন্যসাধারণ প্রতিভা

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

কৃষ্ণকলি তারেই বলি

কৈশোরেই দেশপ্রেম দানা বেঁধেছিল রামকিঙ্করের মনে।বাঁকুড়ায় বসে বসে দেখতেন পরাধীন ভারতবর্ষ স্বাধীন করার স্বপ্ন।চাইলেও তো ওই বয়সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া যায় না, তাই মোটামুটি স্বপ্ন দেখাই সার। এর বাইরে একটা কাজই করার ছিল মনপ্রাণ ঢেলে—প্রকাশ্যে বীরবন্দনা। রামকিঙ্কর সেটা করতেন ছবি এঁকে। তাঁর তুলির আঁচড়ে আঁচড়ে ফুটে উঠত ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের নায়কদের মুখ। একসময় সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের নজরে পড়লেন। বাকিটা অনেকেরই জানা। পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে বিকশিত হয় ভাস্কর হিসেবে তাঁর অনন্যসাধারণ প্রতিভা। অনেক অমর ভাস্কর্যের স্রষ্টা রামকিঙ্কর। বিখ্যাত লোকদের মূর্তিও গড়েছেন। তবে তাঁদের সংখ্যা হাতে গোনা যাবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁদেরই একজন। রবি ঠাকুরের গানের ঝরনাতলায় আসন পেতেছিলেন এমন একজনও পেয়েছেন সেই সম্মান। সুচিত্রা মিত্র! রবীন্দ্রসঙ্গীতের বড় আপন এই মানুষটিও তাই বেঁচে আছেন রামকিঙ্করের হাতের ছোঁয়ায়।

ইন্দিরা গান্ধীর বিখ্যাত একটা কথা আছে সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলতেন, ‘‘সুচিত্রার  কন্ঠে ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলরে’ শুনে আমি একলা চলার প্রেরণা পাই।’’ ইন্দিরা গান্ধী রবীন্দ্র সঙ্গীত বুঝতেন না-কেউ আবার এ কথা ভেবে বসবেন না যেন! জওহরলার নেহরুর সুযোগ্যা কন্যা যে শান্তিনিকেতনেও শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তা ভুলে গেলে চলবে কী করে! ইন্দিরা গান্ধীর ‘প্রিয়দর্শিনী’ নামটা রবীন্দ্রনাথেরই দেয়া। দেখতে ভীষণ সুন্দর ছিলেন বলে ইন্দিরাকে এ নামে ডাকতেন রবীন্দ্রনাথ।

ইন্দিরা গান্ধীর মতো সুচিত্রা মিত্রও ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। তবে রূপে তিনি জগৎ ভোলাননি, ভুলিয়েছেন সুরের জাদুতে। তাঁর গান প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল জওহরলাল নেহরুর ক্ষেত্রে। নেহরু তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সংক্ষিপ্ত সফরে কোলকাতায় গেলেন। দলীয় সমর্থকরা আনন্দ মিছিল করে বরণ করলেন তাঁকে। কিন্তু বিরোধীরা রাস্তায় নামলেন কালো পতাকা হাতে; আনন্দ নয়, বিক্ষোভ জানাতে। সেদিনই আকাশবাণীতে সুচিত্রা মিত্রের প্রোগ্রাম। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাল্মিকী প্রতিভা থেকে গাইলেন, ‘কাজের বেলায় উনি কোথা যে ভাগেন, ভাগের বেলায় আসেন আগে।’ কারো বুঝতে বাকি রইলনা, আইপিটিএ-র সক্রিয় সদস্য সুচিত্রা মিত্র ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করেই এ গান গেয়েছেন। পরিণতি যা হবার তা-ই  হয়েছিল। টানা ছয় বছর ’আকাশবাণী’তে নিষিদ্ধ ছিলেন সুচিত্রা মিত্র। কিন্তু মজার ব্যাপার, তাবেদাররা এভাবে এক হাত নিলেও স্বয়ং নেহরু কিন্তু প্রায় মেয়ের বয়সী শিল্পী সুচিত্রার ওপর ক্ষেপে যাননি, বরং গান শুনে একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন তাঁর! গান দিয়ে মন জয় করার এর চেয়ে ভালো উদাহরণ খুঁজলেও বোধহয় খুব বেশি পাওয়া যাবে না, তাই না?

 

গানের সঙ্গে সুচিত্রা মিত্রের সখ্য একেবারে ছোটবেলা থেকে। প্রতি সন্ধ্যায় মা যখন ‘সন্ধ্যা হলো গো ও মা’ গাইতেন, ভালো তো লাগতই, কেন যেন খুব কান্নাও পেতো! বাবা সৌরিন্দ্র মোহন মুখার্জি ছিলেন উকিল। তবে ওকালতিটা পেশা, তাঁর আসল টান ছিল সাহিত্যচর্চায়। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে সে আমলে বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। তাঁর লেখা ‘চালিয়াত চন্দর’, ‘মা কালীর খাঁড়া’, ‘পাঠান মুল্লুকে’ পড়েনি এমন পড়ুয়া কিশোর নাকি কমই ছিল তখন। আদালত থেকে বাড়ি ফিরলে হয় প্রমথেশ বড়ুয়া, দেবকি কুমার বসু, শিশির কুমার ভাদুড়িদের সঙ্গে আড্ডা, নয়তো লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন সৌরিন্দ্র মোহন। লেখায় ডুবে গেলে জগৎ ভুলে যেতেন। লিখতে সবসময় চেয়ার-টেবিলেরও দরকার পড়ত না, কাগজ-কলম পেলেই হলো, সৌরিন্দ্র বাবু এক ঘরের চৌকাঠে বুক পেতে শুয়ে পড়তেন, অন্য ঘরের মেঝেতে থাকত খাতা, ওভাবেই লেখালেখি চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা! এমন মানুষ কতটাই আর সংসারী হবেন? সংসারের কাজ-কর্মে এতটাই উদাসীন ছিলেন যে মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর কথাও নাকি ভুলে গিয়েছিলেন! অবশেষে স্ত্রীর মৃদু ভর্ৎসনায় তড়িঘড়ি সুচিত্রাকে নিয়ে ছুটলেন বেথুন কলেজিয়েট স্কুলে। ততদিনে বয়স ১০ পেরিয়েছে সুচিত্রার। ঘরে বসে যতটুকু লেখা-পড়া করেছে তাতে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি করানো যেতেই পারে। সৌরিন্দ্র বাবু তা-ই চেয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষায় তাঁর মেয়ে ভগ্নাংশের অঙ্ক পারল না। অগত্যা কী আর করা, চতুর্থ শ্রেণীতেই ভর্তি করিয়ে দিলেন সুচিত্রাকে।

স্কুলে গান শেখাতেন অনাদি কুমার দস্তিদার আর অমিতা সেন। তাঁদের কাছেই সঙ্গীত শিক্ষার শুরু। তার আগে অবশ্য রেডিওতে প্রতি রোববার পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সঙ্গীত শিক্ষার আসরও শুনতেন মন দিয়ে। সুতরাং মায়ের মতো পঙ্কজ মল্লিককেও সুচিত্রা মিত্রের পরোক্ষ শিক্ষক বলা যেতেই পারে। সঙ্গীত শিক্ষার আসর শুনে শুনে অসংখ্য গান শেখা হয়ে গিয়েছিল। নাচটাও জানা ছিল ভালো। ফলে দেরিতে স্কুলজীবন শুরু করলেও সেখানে সবার প্রিয় হয়ে উঠতে সময় লাগেনি। শান্তিনিকেতনেও তাই। ম্যাট্রিক পরীক্ষার কিছুদিন আগে হঠাৎই একটা সুখবর আসে—শান্তিনিকেতনে সঙ্গীতে ডিপ্লোমা করার স্কলারশিপ পেয়েছেন সুচিত্রা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংস্পর্শে সঙ্গীত শিক্ষার সুযোগ! সামনে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণের দ্বার এভাবে খুলে যেতে দেখে যেমন আনন্দে আত্মহারা হলেন, ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাটাও তেমনি পেয়ে বসল তাঁকে। বয়স মাত্র ১৭ তখন। এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেবেন কী করে? দ্বিধা-দ্বন্দ্বে একটু বেশি সময়  কেটে গেল। তাতে জীবনে প্রথমবারের মতো জানা হলো, আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-হতাশা প্রায় হাত ধরাধরি করেই চলে। নইলে স্কলারশিপ পাবার কয়েক দিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু-সংবাদ শোনার আঘাত সইতে হয়! ভেবেছিলেন যাবেনই না শান্তিনিকেতনে। রবি ঠাকুরই নেই, গিয়ে কী হবে সেখানে! আগে থেকেই মন বলছিল, পড়ালেখা বন্ধ করলে লোকে একসময় হয়তো বলবে, ‘আর কিছু পারে না তাই শিল্পী হয়েছে।’ শান্তিনিকেতনে না গিয়ে বেথুন কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষাটা দিলে আর সে অবস্থায় পড়তে হবে না। শুরুতে এমন ভাবলেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকবির মৃত্যুর ২০ দিন পর ঠিকই পা রাখলেন শান্তিনিকেতনে। রবি ঠাকুরকে নাইবা পেলেন, তাঁর গান শেখার সুযোগও পেয়ে হারাবেন, তা কি হয়!

শান্তিনিকেতনে গিয়ে প্রথম প্রথম কিন্তু পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূলে পাননি। সুন্দরী এবং স্মার্ট বলে সহপাঠীরা একটু এড়িয়েই চলত তাঁকে। সবার মন জয় করতে সেখানেও বেশি দিন লাগেনি। সঙ্গীত শিক্ষার পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়েছেন। ম্যাট্রিক পাশ করেছেন প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে। গানের জন্য লেখাপড়া বন্ধ হতে দেবেন না—এ প্রতিজ্ঞায় অবিচল থেকে বিশ্বভারতীর সঙ্গীত বিভাগে শিক্ষকতা শুরুর অনেক পরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও নিয়েছিলেন।

শান্তিনিকেতনে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, শান্তিদেব ঘোষ এবং শৈলজানন্দ মজুমদার, ভিভি ভাঝালভাড়ে খুব যত্ন করেই গড়ে তুলেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রকে। তবে সুচিত্রা ছিলেন শান্তিদেব ঘোষের মানসকন্যা। খুব শুদ্ধতাবাদী। সে কারণে আইপিটিএ-র প্রিয় সহশিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গেও রবীন্দ্রসঙ্গীতে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারের প্রশ্নে বিরোধ দেখা দেয়। এমনিতে দেবব্রত বিশ্বাসকে শিল্পী হিসেবে খুবই পছন্দ করতেন। একমাত্র ছেলে কুনাল সঙ্গীত শিল্পী হতে চাইলে সুচিত্রা তাঁকে বলেছিলেন, ‘হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা দেবব্রত বিশ্বাসের মতো শিল্পী হতে পারবে মনে করলে চেষ্টা করে দেখ, নইলে পড়ালেখায় মন দাও।’  কুনাল আর শিল্পী হওয়ার চেষ্টা করেননি, লেখাপড়া করে প্রকৌশলী হয়েছেন।

তো শিল্পী হিসেবে যাঁকে এত সম্মান করতেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে সেই দেবব্রত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেও পিছপা হননি সুচিত্রা মিত্র।

উল্টো দৃষ্টান্তও আছে। উৎসব ছবিতে ‘অমল ধবল…’ রবীন্দ্রসঙ্গীতটি গেয়েছিলেন শ্রাবণী সেন। বিশ্বভারতী সাফ জানিয়ে দিল, পরিবেশনা ঠিক হয়নি, সুতরাং এ গান ছবিতে ব্যবহার করা যাবে না। অর্ঘ্য সেন বিষয়টি সুচিত্রা মিত্রকে জানালেন। গানটা খুব ভালো করে শুনলেন সবার প্রিয় ‘দিদিমনি’। শুনে লিখে দিলেন, ‘এই গান এর চেয়ে ভালোভাবে কেউ গাইতে পারবে না।’ ব্যস, ওই একটি বাক্য পড়েই গানটি ছবিতে ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে দিল বিশ্বভারতী।


suchitra-mitra-debabrata-biswas-middle-and-hemanta-mukhopadhyay.jpg
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে সুচিত্রা মিত্র


দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে মনোমালিন্য বা শ্রাবণী সেনের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানো—সুচিত্রা মিত্র যখন যা করেছেন সঙ্গীতকে ভালোবাসতেন বলে, উচিত মনে করতেন বলেই করেছেন। এ নিয়ে তাঁর সমালোচনা হতেই পারে, কিন্তু তাঁর জায়গায় যুক্তির দিক থেকে একশভাগ স্বচ্ছ ছিলেন তিনি। মনে তাই জোরও ছিল প্রবল। সমর্থন বা বিরোধিতায় তাই ছিলেন অকুতোভয়। এমনকি যে পরিস্থিতিতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিল্পী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন সেখানেও নিঃসংকোচে এগিয়ে হাসি মুখেই ফিরেছেন সুচিত্রা মিত্র।

কলকাতার রবীন্দ্র সদনে বিশ্বভারতীর শিল্পীদের অনুষ্ঠান। সহশিল্পীদের নিয়ে একটু দেরিতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নিলীমা সেন সেখানে গিয়ে বিপদজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি। শিল্পীদের দেরি দেখে দর্শকরা ভীষণ উত্তেজিত। কেউ কেউ মঞ্চের দিকে এটা-ওটা ছুড়ে মারতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় গাইতে যাওয়া মানেই মানসম্মান খোয়ানোর আশঙ্কা। সবার পরে গাইতে হবে বলে সুচিত্রা মিত্র এলেন আরো পরে। এসেই দুই বান্ধবী মোহর (কণিকা), আর বাচ্চু (নিলীমা)কে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে দেখে উইংস থেকে সোজা মঞ্চে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘কিছু ভাবিস না। আমি দেখছি।’ মঞ্চে গিয়ে একটা চেয়ারের ওপর হারমোনিয়াম তুলে শুরু করলেন গান। গান তো নয় যেন ম্যাজিক! মুহূর্তেই থেমে গেল সব চিৎকার। একটানা বেশ কিছু গান গেয়ে সুচিত্রা বিদায় নিলেন শ্রোতাদের কাছ থেকে, নিরাপদ পরিস্থিতিতে কণিকা, নিলীমাও পেলেন শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করার সুযোগ।

সবার মাঝে থেকেও সুচিত্রা মিত্র এভাবেই সবার চেয়ে আলাদা। অনেকটা একলাও। একলা চলার গান গেয়ে গেছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন অন্যদের। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, শেষ জীবনে নিজেই হয়ে পড়েছিলেন একা! বিয়ের সাত বছর পরই বিচ্ছেদ। ছোট বোন অকালে মারা যাওয়ায় তাঁর মেয়েটিকেও নিয়ে এসেছিলেন নিজের ঘরে। ছেলে কুনালের সঙ্গে তাঁকেও পেলে-পুষে মানুষ করেছেন নিজের সন্তানের মতো। প্রকৌশলী ছেলে জীবিকার টানে চলে গেল দেশের বাইরে। মেয়ে স্বামীর সংসারে। ব্যক্তিজীবনে সেই থেকে সুচিত্রা মিত্রের সত্যিকার অর্থেই একলা চলার শুরু।

বয়স শরীর কাহিল করার পাশাপাশি কণ্ঠকেও কাবু করে ফেলছিল। প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যুর পথে যাত্রা তো সেখান থেকেই শুরু। একটা ঘটনা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এখনো স্পষ্ট মনে আছে। আশাপূর্ণা দেবীর জন্মদিনে গান গাইতে বসেছেন সুচিত্রা মিত্র। গান শুরু করেছেন। কণ্ঠ কেমন যেন ম্রিয়মান। সুনীল চেয়ে দেখেন, সুচিত্রা মিত্র কাঁদছেন! ‘এ কি! দিদি, আপনি কাঁদছেন কেন?’ জবাবটা শোনালো আর্তনাদের মতো, ‘গলায় সুর লাগছে না। তাহলে আর বেঁচে থেকে লাভ কী?’

তারপর খুব বেশিদিন আর ওই কষ্টকে সঙ্গী করে থাকেননি। রোগযন্ত্রণা, হাসপাতাল—এসব একেবারে বরদাশত করতে পারতেন না। বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছের বহুতল ভবনটির দশতলায় তাঁর একমাত্র সঙ্গী ছিলেন সোমনাথ ঘোষ। গাড়ি চালানোর পাশাপাশি ‘দিদিমনি’র দেখভালও করতেন। সেদিন সকালটাকে নাকি একটু বেশিই সুন্দর  মনে হয়েছিল। খুশি খুশি মন নিয়েই খেতে বসেছিলেন দুপুরে। তারপর? সুরহারা হওয়ার ভয়কে জয় করে চিরবিদায়!

আবেগ

মুড ভালো থাকলে কেউ বললেই গান শুনিয়ে দিতেন সুচিত্রা মিত্র। কিন্তু মেজাজ বিগড়ে গেলে শত অনুরোধেও গাইতেন না। যখন-তখন, যে কোনো পরিবেশে গাওয়ার লোক একেবারেই ছিলেন না। তাঁর এই রূপটা কাছ থেকে দেখেছেন উস্তাদ আমজাদ আলি খান। তাঁর সরোদ আর সুচিত্রা মিত্রের রবীন্দ্রসঙ্গীতের যুগলবন্দির একটা ক্যাসেট প্রকাশ করেছিল এইচএমভি (এখন সারেগামা)। কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের কাছে এইচএমভির একটা স্টুডিও ছিল। সেখানেই হয়েছিল অসাধারণ সেই সাঙ্গীতিক যুগলবন্দি। রাতের পর রাত রিহার্সেল হয়েছে। রেকর্ডিং তো হয়েছেই। আমজাদ আলি খান তখন দেখেছেন গানের সঙ্গে সুচিত্রার সম্পর্ক কতটা আবেগের। এমনও হয়েছে, গানের সময় একটা বিমান উড়ে গেল শব্দ করে, সেই শব্দেই মুড খারাপ সুচিত্রা মিত্রের। সঙ্গে সঙ্গে গান বন্ধ। আর গাইলেনই না!  সে অবস্থায় সারাদিনের জন্য রেকর্ডিং বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় থাকত না। আবার এমনও হয়েছে, মুড যখন চাঙ্গা তখন চারদিকে কী ঘটছে, কে কী ভাবছে তার তোয়াক্কা না করে গলা ছেড়ে গেয়ে চলেছেন সুচিত্রা মিত্র।


04suchitrasepia.jpg

 

 

 

 

 

কৈশোরে সুচিত্রা মিত্র


 

 

 

ছড়ায় আত্মকথন

নিজেকে নিয়ে সুচিত্রা মিত্রের ছড়া

শুনেছি রেলগাড়িতে জন্মেছিলাম

দুই পায়ে তাই চাকা

সারাজীবন ছুটেই গেলাম

হয়নি বসে থাকা।

যাই যদি আজ উত্তরে ভাই

কালকে যাবো দক্ষিণে

পশ্চিমে যাই দিনের বেলা

রাত্তিরে ঘুরি পুবকে চিনে।

হিল্লী-দিল্লী স্বদেশ-বিদেশ

চক্করের আর নাইরে শেষ

প্রাণটা বাঁচে চাকা দুটো

কেউ যদি ভাই নেয় কিনে।

প্রায়ই ভাবি আপনমনে

ফুরোবে পথ কোন বিজনে

ছোটা ফেলে ছুটির আশায়

রই চেয়ে তাই নির্ণিমেষ।

 

ভক্তভাগ্য

বলা হয়ে থাকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাসের মতো তিনিও রবীন্দ্রসঙ্গীতকে সাধারণ শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেয়ায় খুব বড় ভূমিকা রেখেছেন। এ নিয়ে খুব একটা বিতর্কের সুযোগ নেই। সুচিত্রা মিত্রও যে চাপা গলার সাবেকি ঢং ছেড়ে উদাত্ত কন্ঠে, স্পষ্ট উচ্চারণে গাইতেন, তা কে না জানে! তো এভাবে গেয়ে যে শুধু সাধারণের কাছেই প্রিয় হয়েছিলেন তা কিন্তু নয়। তাঁর ভক্তের তালিকায় এমন বিখ্যাত সব ব্যক্তিরা রয়েছেন যা দেখলে অবাকই হতে হয়। মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, বার্ট্রান্ড রাসেল, ইন্দিরা গান্ধীর মতো জগদ্বিখ্যাতরাও আছেন সেখানে! ভক্তদের কেউ কেউ আবার প্রিয় শিল্পীকে মুখে প্রশংসা করেই থেমে থাকেননি। কবি বিষ্ণু দে লিখেছেন কবিতা। রামকিঙ্কর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামনে বসিয়ে রেখেছেন সুচিত্রা মিত্রকে, গড়েছেন তাঁর আবক্ষ মূর্তি।

 

গজু থেকে সুচিত্রা

পেশায় উকিল হলেও বাবা সৌরিন্দ্র মোহন মুখোপাধ্যায়ের ধ্যান-জ্ঞান ছিল সাহিত্য চর্চা। মা সুবর্ণলতা দেবী ভালো গাইতেন। ঘটনাক্রমে তাঁদের চতুর্থ সন্তানটির জন্ম হয়ে যায় ট্রেনে। ট্রেনটা তখন বিহারের ছোট্ট গ্রাম গুঝুন্ডিতে। স্বাভাবিক সময়ের বেশ আগেই জন্ম। প্রিম্যাচিওর বেবি। দেখতে ছোট্ট ফুটফুটে একটা পুতুলের মতো। গুঝুন্ডির কথা মনে রাখতে বাবা আদরের মেয়ের নাম রেখে দিলেন গজু। সেটা ডাকনাম। কিন্তু এমন  নামতো সব জায়গায় চলে না, তাই রবীন্দ্রভক্ত সৌরিন্দ্র মোহন রক্তকরবী থেকে নিয়ে মেয়ের আরেকটা নাম দিলেন নন্দিনী। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ওই নামও টেকেনি। গজু থেকে নন্দিনী, তারপর নন্দিনী থেকে সুচিত্রা এবং ধ্রুব মিত্রকে বিয়ে করায় হয়ে যান সুচিত্রা মিত্র। তবে শান্তিনিকেতনের সহপাঠী-সমসাময়িক আর আপনজনদের কাছে গজু নামটা এখনো আগের মতোই প্রিয়।

মমত্ববোধ

দরাজ কণ্ঠ। চোখে চশমা। বয়কাট চুল। প্রয়োজনের বাইরে খুব একটা কথা বলেন না। বাইরে থেকে দেখে অনেকেই কঠিন মনের ভেবেছেন তাঁকে। কিন্তু ভুল ভেঙেছে কাছে গেলে। কারো বিপদ দেখলে ছুটে না গিয়ে পারতেন না। সঙ্গীতশিল্পী সুমিত্রা সেন হঠাৎ স্বামী হারিয়ে দিশেহারা। কম বয়সে বিধবা! এমন দুঃসময়ে সুচিত্রা মিত্রকে পাশে পেয়েছিলেন সুমিত্রা। রোজ রাতে ফোন করে জানতে চাইতেন, ‘কী রে খেয়েছিস? মেয়ে দুটো ভালো আছে তো? তোর শরীর কেমন?’

হৃদয়ে বাংলাদেশ

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীন হতে চলেছে বাংলাদেশ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ স্রেফ সময়ের ব্যাপার। কলকাতায় পাকিস্তান দূতাবাসের সামনে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। সেদিন পতাকার নিচে সার বেঁধে দাঁড়িয়েছেন কয়েকজন।  সবাই গাইছেন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন সুচিত্রা মিত্র। ১৭ বছর পরের কথা। বাংলাদেশ সেবার বন্যায় বিপর্যস্ত।  লক্ষ লক্ষ মানুষের দিন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে। সেবারও ঘরে বসে থাকতে পারেননি সুচিত্রা মিত্র। দুর্গতদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে কলকাতার রাস্তায় নেমেছিলেন অসংখ্য মানবতাবাদী। সেখানেও ছিলেন ‘দিদিমনি’।

নিরহঙ্কারী

স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত তখনো বড় শিল্পী হয়ে ওঠেননি, হওয়ার সিঁড়ি খুঁজছেন। আকাশবাণী দিল্লিতে একটা সঙ্গীত প্রতিযোগিতা হচ্ছে। স্বাগতা সেখানে প্রতিযোগী আর সুচিত্রা মিত্র বিচারক। এখন মূলত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী  হলেও ওই প্রতিযোগিতায় স্বাগতালক্ষ্মী কিন্তু প্রথম হয়েছিলেন ভজনে। তাঁর ভজন অভিভূত করেছিল সবাইকে। সুচিত্রা মিত্র ডেকে বলেছিলেন, ‘তুমি আমার কাছে এসো। আমি তোমার কাছে ভজন শিখবো, তোমায় আমি রবীন্দ্র সঙ্গীত শেখাবো।’

 

 

‘আসল গান’

সবাই জানেন শান্তিনিকেতনে যাবার আগে-পরে অনেক ধরনের গান গাইলেও সুচিত্রা মিত্র আসলে রবীন্দ্র সঙ্গীতেরই শিল্পী। কথাটা ঠিক নয়। সুচিত্রা মিত্র কখনোই শুধু রবীন্দ্র সঙ্গীতের ছিলেন না। মনের কোণে গণসঙ্গীতেরও খুব বড় একটা জায়গা ছিল। সবসময় গাইতে পারতেন না বলে একটা কষ্টবোধও হয়তো কাজ করতো। ডিপ্লোমা শেষে শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতা চলে এলেও সুযোগ পেলে মাঝে মাঝে সেখানে যেতেন। উঠতেন বান্ধবী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশ্রম আনন্দধারায়। জমজমাট আড্ডা হতো। বসতো গানের আসর। গভীর রাত পর্যন্ত চলত সুচিত্রা আর কণিকার গান। মুগ্ধ হয়ে শুনতেন সবাই। এক রাতে সবাই যখন বাড়ি ফেরার জন্য উঠি উঠি করছেন তখনি সুচিত্রা বলে উঠলেন, ‘যেয়ো না, এবার শোনো আসল গান।’ শুরু হলো গণসঙ্গীত। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরিমণ্ডলে এ গান? অনেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না। সুচিত্রা মিত্র তাঁদের পাত্তা দিলে তো!

 

রসিকতা

যখন-তখন যা খুশি গেয়ে দেয়া তাঁর ধাতে ছিল না। সবাই জানতেন, তিনি খুব মেজাজি, চাইলেই যে কোনো গান তাঁকে দিয়ে গাওয়ানো যায় না। শ্রোতাদের অনুরোধ রাখা উচিত—এ কথার জবাবে উপদেশদাতাকে সরাসরি বলে দিতেন, ‘আমি তো বিনোদিনী নই। শুধু লোকজনের বিনোদনের জন্য আমি আসিনি।  রবীন্দ্রনাথের গানের যা বৈশিষ্ট্য, তা তো আমাকে দেখাতে হবে।’ গানের ব্যাপারে আপোসহীন হলেও, শ্রোতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল দারুণ। মঞ্চে উঠলে একের পর এক গান গেয়ে কীভাবে যে আসর মাতিয়ে রাখতেন সেটা সত্যিই বিস্ময়ের। প্রয়োজনে রসিকতাও করতেন। তাঁর কণ্ঠে ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ গানটা যে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তা তো সবারই জানা। যেখানে যেতেন সেখানেই এই গান গাওয়ার অনুরোধ আসতো। এক বসন্তে কলকাতার বাইরে একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছেন। স্টেজে উঠতেই দর্শক সারি থেকে উঠল ‘কৃষ্ণকলি, কৃষ্ণকলি’ চিৎকার। অথচ গানটা তখন একেবারেই গাইতে ইচ্ছে করছে না। তাই বলে শুরুতেই সবার মন খারাপ করে দেবেন? তা পারলেন না, বরং দু’কুল রক্ষা করতে বললেন, ‘মুশকিল কী হয়েছে জানেন, কৃষ্ণকলি ট্রেনের রিজার্ভেশন পায়নি। সুতরাং তাঁকে রেখে আসতে হয়েছে। বসন্তকালে আপনারা বসন্তের গানই শুনুন।’

 

কমিউনিজম্ ক্ষতি করেনি…

সুচিত্রা মিত্রের জীবনে গণ নাট্য সংস্থা (আইপিটিএ)র প্রভাব খুব চোখে পড়ার মতো। পরিবারের সাংস্কৃতিক আবহ তাঁকে সততা, উদারতা, মনের স্বচ্ছতা দিয়েছিল তা হয়তো ঠিক, তবে আইপিটিএ যে মনে সমাজতান্ত্রিক চেতনা প্রোথিত করেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর কণ্ঠেও যে আইপিটিএ-র প্রভাব নেই তা-ই বা বলি কী করে! চিরকাল গণসঙ্গীতের মতো করে উদাত্ত কণ্ঠেই তো রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে গেলেন। তো একটা সময় আইপিটিএ-র সক্রিয় কর্মী ছিলেন বলে অনেকে ‘কমিউনিস্ট শিল্পী’ হিসেবেই দেখতেন সুচিত্রা মিত্রকে। কারো কারো ধারণা গণসঙ্গীত গাইলে কণ্ঠ নষ্ট হয়ে যায়। সুচিত্রারও তাই হয়েছে বলে ভেবেছিলেন ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তো একবার ডেকার্স লেনে রবীন্দ্র জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সুচিত্রা মিত্র গাইলেন, ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।’ শুনে ধূর্জটি বাবু স্তম্ভিত! সেদিনের অভিজ্ঞতার কথা সবিস্তারে লিখেওছিলেন তিনি, সে লেখার একটা বাক্য খুবই স্মরণীয়, ‘শুনেছি মেয়েটি কমিউনিস্ট, কিন্তু কমিউনিজম ওর গলার কোনো ক্ষতি করেনি।’

বহুমুখী প্রতিভা

অভিনেত্রী সুচিত্রা বললেই তো সবার সুচিত্রা সেনের কথাই মনে পড়ে, তাই না? কিন্তু গানের মানুষ সুচিত্রা মিত্রও কিন্তু অভিনয় একেবারে কম করেননি। ১৫ বছর বয়সেই চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যে অভিনয় করেছিলেন। পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে শান্তিদেব ঘোষের পরিচালনায় নাচ, গান অভিনয় সবই করেছেন বাল্মিকী প্রতিভায়। পরে মৃনাল সেনের পদাতিক ও ঋতুপর্ণ ঘোষের দহন ছবিতে অভিনয় করেছেন। তবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে সুচিত্রা মিত্র বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন জয় বাংলা নামের একটি ছবির কারণে। উমাপ্রসাদ মৈত্র পরিচালিত ওই ছবিতে বেগম সুফিয়া কামালের চরিত্র রূপায়ণ করেছিলেন সুচিত্রা মিত্র। গান, নাচ আর অভিনয়ের বাইরেও বিচরণ ছিল সুচিত্রা মিত্রের। লিখতেন ভালো। ছোটদের জন্য গদ্য, পদ্য, স্মৃতিকথা লিখেছেন। অনুবাদ করেছেন খলিল জিব্রানের কবিতা। এখানেই শেষ নয়। সুচিত্রা মিত্র ছবিও আঁকতেন দুর্দান্ত। তাঁর আঁকা ছবির প্রদর্শনীও হয়েছে!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত