| 2 মার্চ 2024
Categories
কবিতা সম্পাদকের পছন্দ সাহিত্য

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

 

জন্মভূমি আজ 

একবার মাটির দিকে তাকাও
একবার মানুষের দিকে।

এখনো রাত শেষ হয় নি;
অন্ধকার এখনো তোমার বুকের ওপর
কঠিণ পাথরের মত, তুমি নি:শ্বাস নিতে পারছ না।
মাথার ওপর একটা ভয়ঙ্কর কালো আকাশ
এখনো বাঘের মত থাবা উঁচিয়ে বসে আছে।
তুমি যেভাবে পারো এই পাথরটাকে সরিয়ে দাও
আর আকাশের ভয়ঙ্করকে শান্ত গলায় এই কথাটা জানিয়ে দাও
তুমি ভয় পাও নি।

মাটি তো আগুনের মত হবেই
যদি তুমি ফসল ফলাতে না জানো
যদি তুমি বৃষ্টি আনার মন্ত্র ভুলে যাও
তোমার স্বদেশ তাহলে মরুভূমি।
যে মানুষ গান গাইতে জানে না
যখন প্রলয় আসে, সে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়।
তুমি মাটির দিকে তাকাও, সে প্রতীক্ষা করছে,
তুমি মানুষের হাত ধরো, সে কিছু বলতে চায়।

 

 

 

মানুষ

তার ঘর পুড়ে গেছে
অকাল অনলে,
তার মন ভেসে গেছে
প্রলয়ের জলে।
তবু সে এখনও মুখ
দেখে চমকায়,
এখনও সে মাটি পেলে
প্রতিমা বানায়।

 

 

 

মুখে যদি রক্ত ওঠে

 

মুখে যদি রক্ত ওঠে
সেকথা এখন বলা পাপ।
এখন চারদিকে শত্রু, মন্ত্রীদের চোখে ঘুম নেই।
এ সময়ে রক্তবমি করা পাপ ; যন্ত্রণায় ধনুকের মতো
বেঁকে যাওয়া পাপ ; নিজের বুকের রক্তে স্থির হয়ে শুয়ে
থাকা পাপ।

 

 

ভিসা অফিসের সামনে

 

দুটি মানুষ দুই পথে চলে গেল
যতক্ষণ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়
ওরা অপেক্ষা করছিল।
একজন অস্ফুট কন্ঠে বলেছিল
আসি !
আরেকজন অপেক্ষা করছিল সৎভাইয়ের যন্ত্রণা।

দুটি কঠিন পাথরের মুখ,
খোদাই করা নিষ্প্রাণ দুই জোড়া ঘোলাটে চোখ,
অদৃশ্য রক্তের তোলপাড়ে একই অধিকারে মৃত পিতাকে
স্মরণ করেছিল।

আর এখন, এমন দিনে
যদি সে-মুখ আবার মনে পড়ে, রক্তে বাজে না-দেখার
কঠিন ব্যর্থতা,
তখন কোথায় কোন রাস্তায় এসে দাঁড়াবে
দুই সৎভাই, সমস্ত আকাশটাই যেখানে দেয়াল দিয়ে
আপাদমস্তক ঢাকা ?

 

 

 

 

লং মার্চ : বন্দী জীবনের গান

 

পাথরে পাথরে নাচে আগুন। আগুন হাতে
দ্যাখো রে, মানুষ নাচে। নাচে রাত, শীত নাচে
পাথরে পাথরে নাচে— শীতের পাহার নাচে
রাতের পাহার নাচে। আগুনের মতো লাল

হাজার হাজার লাল পতাকা রাত শেষের
বন্দীর চোখে নাচে। নাচে রে, স্বপ্ন নাচে।

 

 

 

মায়াকভ্স্কি

 

কন্ঠে ছিল আগুন, তাই সে
মিছিলে বুক মিলিয়েছিল ;
বুকে ছিল আগুন, তাই সে
সূর্য-কে ডাক দিয়েছিল।
সূর্যে ছিল আগুন, তাই সে
আগুন নিয়ে খেলেছিল।

 

 

ছত্রিশ হাজার লাইন কবিতা

 

ছত্রিশ হাজার লাইন কবিতা না লিখে
যদি আমি সমস্ত জীবন ধ’রে
একটা বীজ মাটিতে পুঁততাম
একটা গাছ জন্মাতে পারতাম
যেই গাছ ফুল হয়, ছায়া দেয়
যার ফুলে প্রজাপতি আসে, যার ফলে পাখিদের
ক্ষুধা মেটে ;

ছত্রিশ হাজার লাইন কবিতা না লিখে
যদি আমি মাটিকে জানতাম !

 

 

আশ্চর্য ভাতের গন্ধ

 

আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে
কারা যেন আজও ভাত রাঁধে
ভাত বাড়ে, ভাত খায়।

আর, আমরা সারা রাত জেগে থাকি
আশ্চর্য ভাতের গন্ধে
প্রার্থনায়, সারা রাত।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত