চলে গেলেন কলকাতাপ্রেমী ইংরেজ

Reading Time: 3 minutes

কলকাতাকে ভালোবেসেছিলেন যে সব বিদেশি, নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে বাস করেছিলেন কলকাতায়, তাঁদের মধ্যে নিবেদিতা আর মাদার টেরেসার নামই আমাদের প্রথম মনে পড়ে। নানা কারণে কলকাতা তথা বাংলার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে তাঁদের নাম। সেদিক থেকে জ্যাক প্রেজারের নাম তেমন উল্লেখযোগ্য বা বহুল প্রচারিত নয়। তাঁকে ভিসা দেবার টালবাহানার সময় কিংবা তাঁকে এদেশ থেকে চলে যাবার সরকারি নির্দেশের সময় সংবাদমাধ্যমে সে খবর ছোট আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। ৪০ বছর কলকাতায় বাস করার পরে তিনি যখন নিজের দেশে ফিরে গেলেন তখন সে খবর প্রকাশিত হল একমাত্র টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। জানি না যে কয়েক হাজার মানুষ তাঁর দ্বারা উপকৃত হয়েছেন, তাঁরা তাঁকে মনে রাখবেন কিনা। যে ত্যাগের মহিমা আমরা কীর্তন করি, সেই ত্যাগের তিনি যে জীবন্ত বিগ্রহ, সে ব্যাপারটি কিন্তু আমরা, কলকাতা তথা বঙ্গবাসীরা, উপেক্ষা করেছি।

ইংল্যান্ডের ম্যাঞ্চেস্টারে জ্যাক প্রেজারের জন্ম । ১৯৩০ সালে। অক্সফোর্ডের সেন্ট এডমন্ড হল থেকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার পর ডাক্তারি পড়ার বাসনা হল জ্যাক প্রেজারের। ১৯৬৫ সালে ৩৫ বছর বয়েসে ডাবলিনের রোয়্যাল কলেজ অফ সার্জেনসে ভর্তি হলেন। সবেমাত্র ইনটার্নশিপ শেষ হয়েছে এই সময় একটি বেতারবার্তা মোড় ঘুরিয়ে দিল তাঁর জীবনের। বাংলাদেশ তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে। ডাক্তারের বড় প্রয়োজন সেখানে। কোনদিকে না তাকিয়ে প্রেজার ছুটলেন বাংলাদেশ। ৯০-শয্যার ক্লিনিক খুললেন সেখানে, গরিব মানুষের চিকিৎসা শুরু করলেন। চিকিৎসা সফল হবে কি করে যদি না জীবনে জীবন যোগ করা যায়! তাই প্রেজার বাংলা ও উর্দু ভাষা শিখলেন, মানুষ হিসেবে অন্তরঙ্গভাবে মিশলেন সেখানকার মানুষদের সঙ্গে। কিন্তু শেষপর্যন্ত থাকতে পারলেন না বাংলাদেশে। যে কারণে থাকতে পারলেন না সেটা তাঁর চরিত্রের আর একটা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। হল্যান্ডের এক বেসরকারি সংগঠন ছিল ঢাকায়। প্রেজার জানতে পারলেন তারা আন্তর্জাতিক শিশুপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। সরকারের নিষেধ অগ্রাহ্য করে সে খবর ফাঁস করে দিলেন তিনি। ফলে সে দেশ ত্যাগ করতে হল।

১৯৭৯ সালে কলকাতায় এলেন প্রেজার। মাস ছয়েক মাদার টেরেসার মিশনে কাজ করলেন। ভালো লাগল না । এদেশের গরিব-গুর্বোরা চিকিৎসা পরিষেবার সুযোগ পায় না ঠিকমতো। একজন চিকিৎসক হিসেবে এটা সহ্য করতে পারেন না তিনি। তাঁকে নিজেকেই কিছু করতে হবে। নাই বা থাকুক পরিকাঠামো, নাই বা থাকুক পর্যাপ্ত অর্থ, শুন্য দিয়েই শুরু করবেন তিনি। হয়তো বা চিনের ‘বেয়ারফুট’ ডাক্তারদের ভাবনাটা উদ্বুদ্ধ করেছিল তাঁকেহাওড়া ব্রিজের কাছে ছোট একটা ক্লিনিক দিয়ে শুরু হল যাত্রা। তারপর ধীরে ধীরে গড়ে উঠল ক্যালকাটা রেসকিউ। এখন এই সংগঠন কলকাতায় ৩টি ক্লিনিক, ২টি স্কুল, ২টি বৃত্তিশিক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা করে। সংগঠনের সঙ্গে কর্মসূত্রে জড়িয়ে আছে প্রায় ১৫০জন মানুষ। তাঁর কাজে আর্থিক সাহায্যের জন্য ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে, নেদারল্যান্ড, কানাডা, আমেরিকায় গড়ে উঠেছে সাপোর্ট গ্রুপ। ১৯৯১ সালে ক্যালকাটা রেসকিউর রেজিস্ট্রেশন হব চ্যারিটি হিসেবে।

কিন্তু এদেশে থাকতে গিয়েও বেগ পেতে হয়েছে প্রেজারকে। ১৯৮০ সালে এফ আর ও অর্থাৎ ফরিনার্স রেজিস্ট্রেশন অফিস তাঁকে মিশনারি বলে ঘোযণা করতে বলে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে জানিয়ে দেন যে তিনি মিশনারি নন, ক্যালকাটা রেসকিউ একটি ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন।তার মানে ধর্মের নাম ভাঙিয়ে যশ বা অর্থপ্রাপ্তির আকাঙ্খা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে নি । ১৯৮১ সালে  মিশনারি ভিসা ছাড়া ভারতে প্রবেশের জন্য ভারত সরকার অভিযুক্ত করেন তাঁকে। নিউজিল্যান্ডের হাইকমিশনার স্যার এডমন্ড হিলারির হস্তক্ষেপে সরকার সে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন। আবার ১৯৯৯ সালে তাঁকে ৭দিনের মধ্যে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, বলা হয় তাঁর ফিরে আসার ভিসা দেওয়া হবে না। কলকাতা হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে রেহাই পান প্রেজার। বিদেশি অনুদানের ব্যাপারে সরকারের আপত্তি নাকচ করে দেন মহামান্য আদালত।

এত আপত্তি, এত অপমান সত্বেও কলকাতা ছেড়ে যান নি প্রেজার। ইংল্যান্ডে আপনজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন কয়েকদিনের জন্য । তারপর ফিরে এসেছেন কলকাতায় ক্ষুধিত পাষাণের দুর্বার আকর্ষণে। কাটিয়ে দিয়েছেন কখনও ব্রিজের তলায়, কখনও রেলের প্ল্যাটফর্মে, কখনও ড্রেনেজ পাইপের ভিতর গরিব মানুষের চিকিৎসা করে। পরোয়া করেন নি ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের।

৮৮ বছর বয়েসে সেই কলকাতাপ্রেমী মানুষটি চলে গেলেন স্বদেশে। এখন বৃদ্ধ হয়েছেন। হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা । তাছাড়া সব কিছুর তো শেষ আছে।নাই বা পেলেন প্রচার, নাই বা পেলেন বড় কোন পুরস্কার, তবু  দুঃখ নেই তাঁর । নিঃসন্তান হয়ে তো যাচ্ছেন না তিনি । রইল তো তাঁর সন্তান। যার নাম ক্যালকাটা রেসকিউ। আর সার্থক করে গেলেন রবীন্দ্রনাথের সেই বাণী : সব ঠাঁই মোর ঘর আছে…..।

    .      

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>