কোনো একদিন

তিনদিন ধরে একটা অস্বস্তি বুকের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তুলির।কেন এই অস্বস্তি সেটা বুঝতে পারছে না সে নিজেও।অথচ কী যেন নিঃশব্দে ঘটে যাচ্ছে ।

কলেজ থেকে ফিরে ভ্রমর অনেকক্ষণ ধরে মা মা বলে ডেকে যাচ্ছে। তুলির কানে সে ডাক পৌঁছালেও উঠে গিয়ে শুনতে ইচ্ছে করল না মেয়ের কথা ।

ভ্রমর নিজেই এবার কলেজের জামা প্যান্ট  ছেড়ে হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে ডাইনিং রুমে এল।

ওমা তোমার কী হল? কখন থেকে ডাকছি, উত্তর দিচ্ছ না কেন?

তুলি একটা শূন্য দৃষ্টি নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

কিগো!  কী দেখছ? খেতে দেবে? খুব খিদে পেয়েছে তো!

তুলি , হ্যাঁ দিচ্ছি -বলে চেয়ার ছেড়ে উঠল।কিন্তু রান্নাঘরে না ঢুকে শোবার ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। সেখান থেকেই সে বুঝতে পারল ভ্রমর খাবার বেড়ে নিয়ে টিভির সুইচ অন করল। সকালে কলেজ যাবার সময়ও সে নিজেই চা বানিয়ে খেয়ে চলে যায়।প্রায় দিনই তুলি দেরিতে উঠে খালি মেয়ের কপালে আলতো চুমু দিয়ে দরজার সামনে গিয়ে দুগ্গা দুগ্গা বলে টাটা করে ফিরে আসে।এইটুকুই কেবল তার কাজ। তুলি চলে যাবার পর শুরু হয় সংসারের অন্যান্য দায়িত্ব। রান্না,জামাকাপড় কাচা,গোছানো… সবকিছু দশটার মধ্যে সেরে অফিসের দিকে যাত্রা করে সে।

টিভি প্রোগ্রামের শব্দ কানে আসছে। এই সময় খেতে খেতে মেয়েটা এম টিভিতে ফ্যাসন শো দেখে। তার ইচ্ছে মডেল হবার। এর মধ্যেই সে বেশ কিছু প্রোডাক্টের মডেল হয়ে কাজ করছে। বেশির ভাগই বুটিকের কিংবা কসমেটিক জুয়েলারির।ভবিষ্যতে সে চায় আন্তর্জাতিক স্তরের মডেল হতে।গ্ল্যামার দুনিয়ার হাতছানি তার দুচোখে।এই নিয়ে মেয়ে আর বাপে সারাক্ষণ ঝামেলা লেগেই থাকে। বাবা চায় মেয়ে তার মত ম্যানেজমেন্ট পড়ে তার নিজের হাতে গড়া ইন্ড্রাস্টির দায়িত্ব বুঝে নিক।কিন্তু মেয়ে চায় না।

দু’পক্ষই এ সংঘাতে তুলিকে নিজের দলে টানতে চায়।তুলি কখনো মেয়েকে বোঝায় মা রে, তুই বাবার কথাটা তো শুনতে পারিস।যা করছিস কর।তার পাশাপাশি পড়াশোনাটাও করে নে। বাবা যেটা চাইছে সেটা করে নিলে অসুবিধা তো কিছু নেই।বরং যখন মডেল হিসেবে আর কাজ করতে ভালো লাগবে না,  তখন বাবার ব্যবসা সামলাতে পারবি।আফটার অল তুই ছাড়া বাবার এত বড় ব্যবসা কেই বা আছে সামলাবার মতো আছে!

মেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে, তোমার যখন ব্যবসা নিয়ে এত চিন্তা তখন চাকরীটা ছেড়ে দিয়ে বাবাকে সাহায্য করলেই তো পারো মা। আমাকে শুধু শুধু ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল না করলেই খুশি হব।

মেয়ের কথায় দুঃখ পায় তুলি। আজকাল এদের মনের হদিশ পাওয়া সত্যিই দুষ্কর।নিজের মনেই বিড়বিড় করে সে। অথচ এই মেয়েই আবার অন্য একটা ইন্টারন্যাশানাল কোম্পানিতে ইন্টারন্সিপ করতে চলে যায় দুমাসের জন্য। তখন তার কাছে কাজের অভিজ্ঞতাটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।

ভ্রমরের এই দুমাসের ইন্টার্নশিপ নিয়ে অবশ্য রিনিত খুব খুশি হয়।যদিও মুখে বলে,এত বড় কোম্পানির মালিকের মেয়ে অন্য জায়গায় চাকরী করছে, কষ্ট করে বাসে মেট্রটে যাচ্ছে… এসব বারণ করলেই আমি খারাপ। তারপরেই বলে, অবশ্য আজকের দিনে নিজের যোগ্যতায় চাকরী পাওয়া কী মুখের কথা! মেয়ের আমার এলাম আছে।তবে ওকে বোলো গাড়িতে যাতায়াত করতে।

তখন তুলি রিনিতকে বোঝায়, মেয়ে এখন যা করছে করতে দাও। বাসে ট্রামে চড়লে সাধারন মানুষের জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হবে।বাস্তবের পৃথিবীটা কেমন উপলব্ধি করবে। তাছাড়া মেয়ের শখ যখন মডেল হবার হোক না।আমাদের তো কোনো কিছুই নিজের ইচ্ছে মতো হয় নি।বাবা মা যা বলেছেন,তাই শুনতে বাধ্য ছিলাম।এরা এখনকার প্রজন্মের।নিজের ইচ্ছায় বাঁচুক।বাঁধা দিও না।জোর করলে কথা তো শুনবেই না, উপরন্তু আরো দূরে সরে যাবে। তার চেয়ে সময় দাও, দেখো ঠিক নিজেই ধীরে ধীরে দায়িত্ব বুঝে নেবে।

রিনিত বিরক্তি নিয়ে বলে, তোমার আস্কারা পেয়েই মেয়েটা গোল্লায় গেল। মডেল আবার কোনও ভদ্র প্রফেশন হল! এতে কোনো সম্মান আছে নাকি! যত সব লো ক্যাটাগরির রুচি।মেয়ের যদি কোনও ক্ষতি হয় তোমাকে আমি ছাড়ব না।

শান্ত গলায় তুলি বলে, কোন প্রফেশনটা পুরো ফেয়ার বলতে পারো? সব পেশাতেই ভালো মন্দ আছে। যে যেভাবে দেখে জীবনটা তাকে সেভাবেই দেখতে দিতে হয়।ওপর থেকে চাপিয়ে না দিয়ে ভেতর থেকে যেটা গ্রহন করা হয় সেটাতেই সফলতা আসে।দাও না ওকে ওর মতো ছেড়ে।

বাকবিতন্ডা চলতেই থাকে।

এই মুহূর্তে তুলির অবশ্য এসব কোনো কিছুই মাথায় নেই। সে চুপ করে শুয়ে আছে। বুকের মাঝখানটায় কেমন একটা চিনচিনে ভাব।শীত শীত করছে। কদিন ধরে লাগাতার বৃষ্টি। আবহাওয়াটা হঠাৎ করেই পালটে গেছে। তার মনে হচ্ছে একটা চাদর গায়ে দিলে ভালো হত।কিন্তু উঠে গিয়ে যে নেবে সে শক্তিটুকুও তার এই মুহূর্তে নেই।সে গুটিসুটি মেরে শুয়ে রইল।

ভ্রমর খাওয়া শেষ করে রান্নাঘরে বাসন নামিয়ে বেসিনে হাত ধুলো।তারপর ঘরে এসে আলো জ্বালল।

ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, মা তুমি কী কোনো কারণে আফসেট? দুদিন  ধরেই দেখছি তুমি কোনো কথা বলছ না।কিছু বললে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছ।এমনকি রাতে ঠিক করে ঘুমচ্ছোও না।কী হয়েছে তোমার? অফিসে কোনো সমস্যা?

একটা শ্বাস নিয়ে তুলি বলল, না।

বাবা কী কিছু বলেছে?

তুলি মাথা নেড়ে জানালো,নারে মা।

তবে কী শরীর ঠিক নেই? ডাক্তারের কাছে যাবে? বাবাকে বলব এপয়েন্টমেন্ট নিতে ডাক্তারের?

আরে না।তেমন কিছু হয়নি।একটু ক্লান্ত লাগছে ।

মা ক্লান্ত তো তুমি কখনো হও না।তাছাড়া তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি ভেতরে কিছু চলছে। সেটা তুমি বলতে চাইছ না।

তুলি মেয়ের হাতটা নিজের বুকে টেনে নিল। দিয়ে হালকা স্বরে বলল, কই নাতো।

মা, তোমার হাতের চেটোর চামড়া ফেটে যাচ্ছে। একমাত্র ভয়ঙ্কর কোনো টেনসন হলে তবেই তোমার এটা হয়।কী হয়েছে মা, আমাকে বলো।

তুলি ভেবে পায় না কী বলবে। তিনদিন আগে অফিস থেকে ফেরার সময় রাস্তায় পুজো প্যান্ডেলের সামনে একটা মানুষকে পড়ে থাকতে দেখে সামনে এগিয়ে গেছিল সে।মানুষটার কপাল বেয়ে রক্তের ধারা মাটিতে চুঁইয়ে পড়ছে।বেহুঁশ হয়ে সে মাটিতে আশেপাশের লোকজন ঘাড় বেঁকিয়ে দেখে নিজেদের কাজে চলে যাচ্ছে ।

সে খানিকক্ষণ হতভম্ব হয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রক্তের ধারা দেখে তার শরীরে তীব্র অস্বস্তি শুরু হল।পুজো মন্ডপের সামনে যারা বসেছিল, তাদের কাছে গেল।দাদা লোকটা ওভাবে পড়ে আছে।রক্ত গড়িয়ে যাচ্ছে কপাল থেকে।একটু দেখুন যদি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায়, নইলে মরে যাবে তো!

লোকগুলো ঘাড় ঘুরিয়ে লোকটাকে দেখল।তারপর নির্লিপ্ত ভাবে বলল, দারু খেয়ে সামলাতে না পেরে পড়েছে।বেশ হয়েছে মাথা ফেটেছে।একটা লোক মরলে কোনো ক্ষতি নেই।এসব মানুষ সমাজের বোজ।যত কমবে তত মঙ্গল ।

এ কী বলছেন! তুলি অবাক হয়ে যায় এমন কথা শুনে।

ঠিকই বলছি। একে হাসপাতালে নিয়ে  গেলে পুলিসের, ডাক্তারের হাজার জেরার সামনে পড়তে হবে। বেকার বেকার ঝামেলা। আপনি খামোকা চিন্তা করছেন।

কিন্তু. .

তাকে থামিয়ে দিয়ে আরেকজন বলে, দিদি আপনার ইচ্ছা হলে নিজে নিয়ে যান।নইলে পার্টির লোককে খবর দিন।তারা এসে যা করার করবে।

তুলি বুঝতে পারে না , পার্টি এখানে কিভাবে আসছে। সে আরো একবার বোঝাবার চেষ্টা করে, চোখের সামনে একজন মানুষ এভাবে পড়ে আছে দেখেও আপনাদের কোনো প্রতিক্রিয়া জাগছে না? আপনাদের মধ্যে কী কোনো মনুষ্যত্ববোধ নেই?

লোকগুলো এবার রূঢ় স্বরে বলে ওঠে , আপনার তো অফিস এখানে।বাড়ি তো নয়! বাড়ি যান। বেকার বেকার আমাদের মাথা না খেয়ে আসুন এখন। আমাদের অঞ্চলে ঘটেছে।আমরা বুঝে নেব।

তুলি নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছাস্বত্বেও বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু পড়ে থাকা লোকটার রক্তাক্ত মুখটা তার চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠে। সেদিন বাড়ি ফেরার পর থেকেই তার অস্বস্তিটা সারা শরীর জুড়ে ঘুরতে থাকে।তার মনে হয় রক্ত মাখা একটা মুখ তার সামনে পেছনে পাশে কাছে দূরে সর্বত্র দাঁড়িয়ে। সে তাকালেই বলছে, কিরে পালিয়ে গেলি তুইও! তুই যখন সামনে এসে দেখলি, মনে হল একজন মানুষ এসেছে। কিন্তু তুই তো মানুষ নোস।

তুলি চিৎকার করে বলার চেষ্টা করল, বিশ্বাস করুন আমি খুব চেষ্টা করেছিলাম আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে, কিন্তু. . .

লোকটা- কিন্তু কী . . বলে হাসতে হাসতে হাওয়ায় ভাসতে থাকে।তুলি চোখটা বন্ধ করে নেয় অজানা  এক আশংকায়। সে চোখ বন্ধ করেই বলে ওঠে , বিশ্বাস করুন. . .

তার চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসে যতক্ষণ না ভ্রমর তাকে সজোরে নাড়িয়ে চিৎকার করে বলে, মা আমাকে বলো কী হয়েছে তোমার। কোন চিন্তা নেই , আমি তো আছি।সব ঠিক করে দেব।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত