| 22 জুন 2024
Categories
ধারাবাহিক প্রবন্ধ সাহিত্য

ধারাবাহিক: কৃষ্ণকথা সপ্তম তরঙ্গ। দিলীপ মজুমদার

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

[আমাদের পুরাণগুলিতে, মহাভারতে, কৃষ্ণকথা আছে। রাধাকথা এসেছে আরও অনেক পরে। তবে কী কৃষ্ণ নিছক পৌরাণিক চরিত্র? সম্পূর্ণ কাল্পনিক? আমার তা মনে হয় না। রামায়ণের উপর কাজ করতে গিয়ে আমার সে কথা মনে হয়েছে। ময়মনসিংহের গৌরব, ‘সৌরভ’ পত্রিকা সম্পাদক কেদারনাথ মজুমদারের ‘রামায়ণের সমাজ’ বইটি সম্পাদনা করতে গিয়ে সে দিকে আমার দৃষ্টি পড়ে। কলকাতার এডুকেশন ফোরাম আমার সে বই প্রকাশ করেছেন। কেদারনাথই বলেছেন, তিন/চার হাজার বছর আগে মানুষের মৌলিক কল্পনাশক্তি এত প্রখর ছিল না, যাতে পূর্ণাঙ্গ রামকাহিনি লেখা যায়। অন্যদিকে প্রত্নতাত্ত্বিক শ্লীম্যান প্রমাণ করেছেন যে হোমারের লেখা মহাকাব্যের বস্তুভিত্তি আছে, যখন ট্রয়ের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেল। নিরপেক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা হলে রামকথা ও কৃষ্ণকথারও বস্তুভিত্তি পাওয়া যেত বলে আমাদের ধারণা। দুঃখের বিষয়, আমাদের গবেষণাক্ষেত্রেও ঢুকে গেল রাজনীতি; বাল্মীকির ‘পুরুষোত্তম রাম’ হয়ে গেলেন বিষ্ণুর অবতার, তারপর তিনি হয়ে গেলেন হিন্দুত্ব প্রচারের হাতিয়ার। কৃষ্ণকথাও একদিন রাজনীতির হাতিয়ার হবে। আমরা শুনেছি সমুদ্রগর্ভ থেকে দ্বারাবতীর ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেছে। তারপরের কাজ আর এগোয় নি। যাঁরা রামচন্দ্রকে মানুষ হিসেবে দেখতে দেবেন না, তাঁরাই এরপরে কৃষ্ণকে নিয়ে পড়বেন, তাঁর মানবত্বকে আড়াল করে দেবত্ব প্রচার করবেন।

আমাদের এই কৃষ্ণকথায় আমরা মানুষ কৃষ্ণকে খোঁজার চেষ্টা করেছি। তাই পরে পরে গড়ে ওঠা নানা অলোকিক প্রসঙ্গের লৌকিক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছি সাধ্যমতো। ‘ইরাবতী’র পাঠকরা লেখাটি পড়ে মতামত দিলে খুব ভালো লাগবে। নিন্দা বা প্রশংসা নয়, আমি সমালোচনার ভক্ত বরাবর।]


হস্তিনাপুরে এক দূত পাঠালেন কৃষ্ণ। বিদূরের কাছে।  পাণ্ডবদের বিবাহ এবং  কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁদের  হস্তিনাপুরে আগমনের কথা শুনে আনন্দিত হলেন বিদূর। ধৃতরাষ্ট্রকে এ কথা জানানো প্রয়োজন। তবে ধৃতরাষ্ট্রকে এ কথা জানাবার সময় বিদূর একটু চাতুর্য অবলম্বন করলেন।

বিদূর তাঁকে বললেন যে জতুগৃহের  ঘটনাটি জনসাধারণ আবগত হয়েছে। তারা কৌরবদের ধিক্কার দিচ্ছে। এ ভাবে কৌরবদের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত হয়েছে । ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে   ধৃতরাষ্ট্রকেই। ধৃতরাষ্ট্র এ কথা শুনে চিন্তিত হন। বিদূরের কাছে তিনি জানতে চান ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের পথ। বিদূর তখন জানান যে তিনি শুনেছেন পাণ্ডবরা হস্তিনাপুরে আসছেন । ধৃতরাষ্ট্র যদি  রাজ্যের অর্ধাংশের  অধিকার তাঁদের প্রদান করেন, তাহলে ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল হবে।

ধৃতরাষ্ট্র  বিদূরের  কথার  সারবত্তা  উপলব্ধি  করে  সমূহ ব্যাপার আলোচনার জন্য  ভীষ্ম, দ্রোণ,  কৃপ,  শকুনি  ও আপন  পুত্রদের  আহ্বান  করলেন। ধৃতরাষ্ট্রের বক্তব্যে  দুর্যোধন প্রমুখেরা অসন্তুষ্ট হলেও অন্যরা সম্মতি জানালেন।

বিদূর তখন কুন্তী ও দ্রৌপদীসহ পঞ্চপাণ্ডবকে  নিয়ে এলেন হস্তিনাপুরে। পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী  ধৃতরাষ্ট্র তাঁদের দিলেন খাণ্ডবপ্রস্থ নামক এক স্থান। কৌরবরা থাকলেন  হস্তিনাপুর।

খাণ্ডবপ্রস্থ ছিল বনাকীর্ণ অম্চল । কৃষ্ণের সহায়তায় সেখানে অতি দ্রুত গড়ে উঠল  এক সুরম্য নগরী। নগর নির্মাণের জন্য বনাঞ্চল উচ্ছেদ করতে হল। এতে বিপদে পড়লেন অরণ্যের অধিবাসীরা। বনবাসী অনার্য নাগ পরিবার আশ্রয়চ্যুত হয়ে গভীরতর অরণ্যে প্রবেশ করতে বাধ্য হলেন । অনবধানবশত একদিন অর্জুন তাঁদেরই  একজনকে হত্যা করে বসলেন।

একদিন  ইন্দ্রপ্রস্থের এক ব্রাহ্মণ অর্জুনের কাছে এসে অভিযোগ করলেন যে খাণ্ডববনের এক অধিবাসী এক অনার্য তাঁর গোধন অপহরণ করে নিয়ে গেছে। ব্রাহ্মণের সঙ্গে অর্জুন সেই অনার্যের অনুসরণ করতে লাগলেন । কিছুক্ষণ বাদে তিনি দেখতে পেলেন সেই অনার্যকে। তার সঙ্গে আছে অপহৃত গোধন ও তার এক কিশোরী কন্যা। অর্জুনের তিরে বিদ্ধ হয়ে অনার্যটি লুটিয়ে পড়ল মাটিতে । ভীত কিশোরীটি প্রবিষ্ট হল গভীর অরণ্যের গভীরে। তার আর সন্ধান পাওয়া গেল না। ব্রাহ্মণ তাঁর গোধন নিয়ে চলে যাবার পরে মুমূর্ষু অনার্যের করুণ কাহিনি শুনলেন অর্জুন।

তার নাম চন্দ্রচূড় নাগ। ইন্দ্রপ্রস্থ নগর নির্মাণের ফলে তাকে উদ্বাস্তু হয়ে স্ত্রী-কন্যাসহ প্রবেশ করতে হয়েছে গভীর অরণ্যে। কন্যাটি একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রয়োজন হয় একটু দুধের। অনার্য পূর্বোক্ত ব্রাহ্মণকে অনুরোধ জানায় দুধের। কিন্তু ব্রাহ্মণ তা অস্বীকার করেন । তখন নিরুপায় হয়ে সে অপহরণ করে গোধন। এটুকু ব্যক্ত করার পরে অনার্যটি ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে।

এ কথা শুনে অর্জুনের মনে অনুশোচনা শুরু হয়। ছি, ছি, এ কি করলেন তিনি! কোথায় গেল অসহায়া সেই কিশোরী! কে তার রক্ষণাবেক্ষণ করবে! কে তাকে দেবে নিরাপত্তা ! তিনি কিশোরীর অনুসন্ধান করলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হলেন অর্জুন।

ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এলেন অর্জুন। কৃষ্ণ লক্ষ্য করলেন অর্জুনের ভাবান্তর। দ্রৌপদীকে কেন্দ্র করে মনের ভেতর একটা অশান্তি তাঁর ছিল। বীর্যশুল্কে লব্ধা পাঞ্চালীকে তিনি এককভাবে লাভ করতে পারেন নি। তার উপর যুক্ত হল  এই কিশোরীকন্যার জন্য অনুশোচনা। এ সবের জন্য তিনি কেন্দ্রভ্রষ্ট হয়ে পড়েছেন।

কৃষ্ণ এসব অবগত হয়ে  অর্জুনকে কঠিন দায়িত্বে নিবদ্ধ করতে চাইলেন, যার ফলে তিনি ব্যক্তিগত চিন্তা থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন।

কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে জানালেন রাজ্যকে আরও উন্নত করার জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক দক্ষতার। সে জন্য ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। সে অভিজ্ঞতা লাভ করা যাবে ভিন্ন ভিন্ন রাজ্য পরিক্রমা করে। কৃষ্ণ বললেন যে একমাত্র অর্জুনের দ্বারাই তা সম্ভব।

কিন্তু যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের কথা শুনে দ্বিধান্বিত হলেন। অর্জুন অনুপস্থিত থাকলে রাজ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। এতদিন অর্জুনের নেতৃত্বে অক্ষুণ্ণ ছিল নিরাপত্তা। অর্জুনই পরিচালনা করতেন সৈন্যবাহিনী। কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে অভয় দিলেন ল বললেন যে নকুল ও সহদেবের সহায়তায় ভীম পারবেন সে কাজ।

দ্রৌপদী শুনলেন এ সব। কিছুটা বিস্মিত হলেন তিনি। কৃষ্ণের অভিপ্রায় কি! কেন তিনি  শুধু অর্জুনকে দেশান্তরে পাঠাতে চান? নিশ্চয়ই কোন গূঢ় উদ্দেশ্য আছে। পাণ্ডবদের মঙ্গলকামী  কৃষ্ণ।  তাই দ্রৌপদীর মনে হল, কৃষ্ণের এই প্রয়াসের কোন কারণ আছে নিশ্চয়ই।  

[ক্রমশ]

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত