কাকচরিত

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comকাউয়াকে কাক বলে। কিন্তু আমার মা কখনো কাক বলেনি। তার কাছে কাউয়া। কাক হবে কেনো।

মা কেনো কাউয়াকে কাক বলে না তার কারণ সেভাবে আবিষ্কার করা হয়নি। কাকা শব্দের সঙ্গে কাক শব্দটির খুব ঘেষাঘেষি মিল। শুধু একটি আ-কার তুলে দিলেই হলো। কিন্তু সমস্যা হলো আমার মায়ের কোনো কাকা ছিল কিনা জানা হয়নি। আমরা যতবারই মামাবাড়ি নারিকেলবাড়িতে গেছি ততবারই দেখেছি আজা মশাই একা। তাকে সবাই মাস্টার মশাই বলে সমীহ করে। কিন্তু দাদা বা ভাই বলে সম্বোধন করে না। মামাবাড়িত অন্য আর কেউ মাস্টার ছিলেন না।

শুধু মামাবাড়ি কেন, নারিকেলবাড়ি গ্রামেই মাস্টার থাকার কথা না। অন্যসব বাড়ি কুলুবাড়ি। তারা তেলের ঘানিতে তেল করে গ্রামে গ্রামে বেচা বিক্রি করে। নাপিত বাড়িতে বলরাম নাপিতের ঘরগেরেস্থালি। সারা বছর বিনি পয়সায় সবার চুল দাড়ি কেটে বেড়ায়। আর ধান উঠলে বস্তা নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বছরের খোরাকি তুলে নিয়ে যায়। ঢাকি বাড়িতে ঢাকিরা, ঘরামি বাড়িতে ঘরামিদের বাস। ঘরামিরা  ছন দিয়ে ঘরের চাল ছায়। আর সুতার বাড়ির লোকজন নৌকা গড়ে। 

একটা বাড়ির নাম খরাতি বাড়ি। এই খরাতি অর্থ ঠিক কী সেটা নিয়ে যথেষ্ঠ সংশয় আছে। কারো কারো মতে  এ বাড়ির লোকজন ছিল চিরকালের অভাবী। অন্যের বাড়ি খয়রাত করে চলত। অর্থাৎ তারা ছিল ভিক্ষুক। দেশে অভাব লেগে গেলে এইসব দরিদ্র মানুষদের  খয়রাতে নামা ছাড়া উপায় ছিল না।  অভাব গেলে তারা মাঠে নেমে পড়ত। তবে একটা অভিযোগ আছে, খয়রাতি বাড়ির লোকজন অভাবের পরেও বহুকাল খয়রাতি পেশাটি চালিয়ে যায়। সে গত জন্মের ঘটনা। তবু এজন্যে গ্রামে তাদের সম্মান খুব বেশি নেই।

অবশ্য খয়রাতি বাড়ির লোকজন ভিক্ষে পেশাটির কথা স্বীকার করে না। বলে, তারা খয়রাতি নয়। তারা আসলে করাতি। করাত দিয়ে গাছ কাটে। শহরে কাঠগোলায় তাদের কাজকারবার আছে। কথা সত্যি। 

শুধু নারিকেল বাড়িই নয়! বটবাড়ি, গাববাড়ি, চিকটিবাড়ি, আম বাড়ি নয়– আমার মামাবাড়ির আশেপাশে যত গাও গেরাম আছে সেখানে মাস্টারমশাই বলতে আমার আজামশাই। আর কোনো মাস্টার মশাই নেই। অতীতেও ছিল না। ভবিষ্যতেও দেখা যাওয়ার কথা নয়। 

এই হেতু  এই মাস্টার মশাইয়ের আপন কোনো ভাই বেরাদার ছিল না বলেই মনে হয়। মাকেও কাউকে গড় করে প্রণাম করে বলতে শুনিনি,  কেমন আছেন কাকামশাই। কাকা শব্দটাই ছিল মায়ের মুখে অবোলা। ফলে আমার মা কাকা শব্দের প্রতি শ্রদ্ধাবশত কালো রঙের এই  পাখিটিকে কাক বলে না- একথা বলা যাবে না। আমার আজা মশাই সেইকালে পায়ে হেটে শান্তি নিকেতনে যেতেন পৌষমেলায়। গুরুদেবের মুখে শুনে আসতেন প্রমিত গলার রবিঠাকুরের গান! 

পাখি আমার নীড়ের পাখি অধীর হল কেন জানি… 

আকাশ-কোণে যায় শোনা কি ভোরের আলোর কানাকানি॥

এই গানটি আজামশাই সন্ধ্যাকালে গেয়েছেন বটে, কিন্তু নিজে কখনো কাককে প্রমিত হিসেবে কাক পাখি নয় বলতেন বায়সপক্ষী। ভুষণ্ডিতে অবস্থান করে। এই পক্ষী অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত দেখতে  পায়। ত্রিকালজ্ঞ ঋষিপক্ষী।   তাকে নমস্কার করি। 

২. 

বউ হয়ে আসার পরে আমার মা এ বাড়ির তুলশি তলায় প্রণাম করল। সেখানে একটি মাটির প্রদীপ রাখল। সে প্রদীপটি বেশ বড়ো। আর তার গায়ে লক্ষ্মীঠাকুরুনের চোখ আঁকা। প্রণাম করল নিম আর বেলেরগাছের জোড়তলায়। সেখানে রাখল বালকৃষ্ণের মূর্তি। মা নিজের হাতে  গড়েছে। ছোটোপিসি বিড়াল পছন্দ করে। কিন্তু বিড়াল আঁদাড়ে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় বলে তার ঘেন্না করে। শুনে মা বলল, চিন্তা করো না ঠাকুরঝি, তোমারে একটা বিড়াল বানিয়ে দেবো। একদম সত্যি বেড়ালের মতো হবে। কিন্তু আঁদাড়ে বাদাড়ে যাবে না। তোমার সঙ্গে থাকবে। ঘেন্না হবে না। 

শুনে আহ্লাদিত ছোটো পিসি শুধালো, তুমি ময়ূরপক্ষী বানাতে পারো? 

মাথা নেড়ে জানাল, পারে। কার্পাস তুলা দিয়ে বানিয়ে দেবে নিশ্চয়। কোনো আশাই অপূর্ণ রাখবে না। 

ঘুরে ঘুরে সব গাছপালাকে জলদান করল মা। বকুলতলার নিচে লেপে আলপনা করল। দেখতে পেল, তার শ্বশুরবাড়িতে চড়ুই আছে। গাছে গাছে শালিক বসে। পুকুরঘাটে পাতি বকও ঘোরে। বসন্তে কোকিল ডাকে। দুপুরে কয়েকটা ঘুঘু পাখি নির্বিঘ্নে ঘুমায়। মা এসব পাখিকেই বিনতি ভরে সম্ভাষণ করল। কিন্তু তার মনে হলো কী একটা যেন বাদ রয়ে গেছে। কাকে যেন সম্ভাষণ করা হয়নি। কিছুতেই মনে করতে পারল না। তার মনে খুস খুস করতে লাগল। 

দিন শেষে যখন এঁটো থালা বসন কলতলায় নিয়ে যাচ্ছে, তা দেখে পাশের বাড়ির কে একজন ভুলু কুকুরটাকে ডেকে বলছে, খা খা। তার উচ্চারণ ছিল একটু মৃদু লয়ে। ফলে সেটা শোনালো- কা কা। আর তক্ষুণি মার মনে পড়ল কাক পাখিটির কথা। কাক পাখিটিকে আজ দেখেনি। 

দু’ একটা দিন অপেক্ষা করে দেখলে, আশেপাশের বাড়িতে কাক বসে বসে বটে, কিন্তু তারা এ বাড়ির ত্রিসীমায় আসে না। দূর দিয়ে নিরবে চলে যায়।  ত্রিকালজ্ঞ কাকপাখি ওরফে বায়সপক্ষীকে সম্ভাষণ করা বাকি রইল।

চতুর্থ দিবসে মা অতি প্রত্যুষকালে পাদ্য অর্ঘ্য আর একথালা মিষ্টান্ন নিয়ে বাড়ির দক্ষিণ সীমানায় খোলা জায়গায় গিয়ে কাকের জন্য নিবেদন করতে বসল। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছিল। সঙ্গে বকুলগন্ধ।  

আমার ছোটপিসি ছুটে এসে শুধালো, কি করছ বৌদি? 

মা চোখ মুদ্রিত রেখেই বলল, কাউয়া ডাকছি। 

শুনে ছোট পিসি শিউরে উঠল। বলল, আর যাই কও না কেন বৌদি, এ বাড়িতে কাক ডাইকো না। তাইলে সর্বনাশ। 

কী সর্বনাশ তা বলার আগেই ছোট পিসি মাকে টেনে বাড়ির মধ্যে নিয়ে গেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে কানে কানে ফিসিফিস করে বলল, সরলাবালা খেইপা যাবে। তাইলে আর রক্ষা নাই। 

ছোট পিসি যা-ই বলুক না কেনো সেদিন কিছু না হলেও পরদিন পূব আকাশ ফর্সা হতে শুরু করলেই বকুলগাছটিতে একটি কাক এসে বসল। সে এক অন্যরকম কাক। আকার ছোটো খাটো। পুরোটা কালো নয়। গলার কাছটি সাদা। এটা পাতিকাক। তবে ঠিক পাতি কাক বলা যাবে না। কারণ কাকটির মাথার উপরে এক ফোটা সবুজ ছোপ আছে। আরো ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যায়- রোদে গেলে কাকটির বর্ণ পালটে যায়। হয়ে যায় সামান্য বেগুনি। সে অর্থে এটা বেগুনি কাক। কোনো রা করে না। খুব  শান্ত শিষ্ট। এরকম কাক এ এলাকায় এর আগে দেখা যায়নি। পরে ঠাকুরদা স্থানীয় নজরুল পাবলিক লাইব্রেরির ময়েনউদ্দিন স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এনসাইক্লোপিডিয়া বৃটেনিকা খুলে দেখিয়েছেন- এই বেগুনি কাক ইন্দোনেশিয়া ব্রুনেই দেশে বসত করে। তারা বলে ভায়োলেট করভাস। 

এই কাকটি মুখ খোলে না বলেই সরলাবালার চোখে পড়েনি। অথবা কাকটি ঐ গাছেই ছিল এতোদিন। কিন্তু কালো বর্ণ নয় বলেই তার চোখে পড়েনি। এই নিয়ে ছোটো পিসি প্রতিদিনই ভয়ে ভয়ে থাকে। সরলাবালা দেখে ফেললেই বিপদ হবে। নতুন বৌকেও ছেড়ে কথা কইবে না। তাই প্রতিদিন ভোরে উঠেই বকুল গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে হুস হুস করে কাকটি তাড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু কাকটি সেটা নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয়। সে বকুল গাছটির মগডালে বসে থাকে। রোদ উঠলেই ঝিকমিকিয়ে ওঠে। বেগুনি রঙ ঝলক দেয়। মা খুব ভক্তিভরে প্রণাম করে। এক থালা খাবার নিয়ে কাককে ভোগ দিল। 

এলাকায় এই বেগুনি কাক বিষয়ে কিছুটা জানাজানি হলো। কৌতুহলী হয়ে এলাকার দু একজন  আমাদের বাড়ির কাছে বকুল গাছটির নিচে এলো। এর মধ্যে কে একজন দীর্ঘদিন ধরে সন্তান কামনায় ডাক্তার কবিরাজ করে করে বয়স প্রায় পার করে ফেলেছিল। আর আশা নেই সেই জন্য মহিলার স্বামী আরেকটি বিয়ের ধান্ধা করছিল। আর সেজন্য মহিলাটিকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। কিছুদিন ভাইবেরাদারের  কাছে থেকে মহিলাটি খুব মনমরা হয়ে থাকল। ভাই বউরা খুব বেশি যত্ন-আত্তি করল না।  কী মনে করে সেই মহিলা কাকটির কাছে ধর্ণা দিল। যতক্ষণ না পর্যন্ত তার মনোবাসনা পূর্ণ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বকুলগাছটির নিচে হত্যে দিয়ে পড়ে রইল। ঘোষণা দিল, তার মনোবাসনা পূর্ণ না হলে এখানে সে মরে যাবে। কোথাও যাবে না।  শুরুতে ব্যাপারটি কেউই সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু কয়েকদিন যাবত দিন ও রাতে সেই মহিলা এই বকুলগাছটির নিচে এভাবে না খেয়ে পড়ে থাকার ফলে এলাকায় খবর হয়ে গেল। চতুর্থ দিনে সেই মহিলা উচু গলায় বলতে লাগল, সে কাকদেবের আশীর্বাদে মা হতে চলেছে। এবার কোনো ভুল নেই। সে লোকজনকে তার একটু উচু হয়ে আসা পেটটি উদোম করে দেখালোও। তাকে অবিশ্বাস করার কোনো উপায় নেই। 

বেদগাঁর মফিজ মোল্লার মেজ ছেলে বেশ কয়েক বছর বাম পায়ে হাটার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। এইজন্য তার বাড়িতে নয়াবিবি আসতে রাজি হচ্ছিল না। বেগুনী কাকের কাছে মানত করার দুদিনের মধ্যেই ছেলেটি হেটে শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। সবার সামনে নিয়ে দিনে দিনে বউ নিয়ে ফিরল। এই ঘটনা শুধু এলাকায় নয়- দূর দূর গাঁয়েও পৌঁছে গেল। ফলে আমাদের বাড়ির পাশে বকুলগাছটিকে কেন্দ্র করে বেশ মেলা বসে গেল। 

এতো কাণ্ড ঘটলেও এ বাড়ির সরলাবালা কিন্তু এসব কিছুই বিশ্বাস করল না। কারণ সবাই কাকটিকে দেখতে পেলেও সে দেখতে পেল না। দূর থেকে মুচকি মুচকি হেসে বলল, হুজুগে বাঙালি। 

ছোটো পিসি দুর্গা দুর্গা বলে শ্বাস ফেলল। সরলাবালা বুঝতে পারেনি কাকটি আমাদের মায়ের ভোগের আশায় এসেছে। বুঝতে পারলে তার রক্ষা ছিল না। নাস্তানাবুদ করে ছাড়ত। বেঁচে গেছে। ফিসফিস করে মাকে বলল, যা করছ করছ। আর কাকের আশেপাশে ঘেইষো না। বুড়ি টের পাইলে খবর ছিল।  

মা পিসির দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল!।

তবে ছোটো পিসির হাউস আছে, একদিন সেও বকুলতলায় যাবে। সেও মানত করবে যাতে তার স্বামীর মনটি তার দিকে ফেরে। যেন তাকে নিতে আসে। যেন শ্বশুরবাড়িতে পাকাপোক্তভাবে থাকতে পারে। বাপের বাড়ি থাকতে ভরসা পায় না। 

যেদিন সরলাবালা বাড়ি থাকবে না সেদিনই মানতে বকুলতলায় যাবে। কিন্তু সরলাবালা এ বাড়ি ছেড়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাইরে কোথাও যায় না। তার বোনের সবকিছু গুছিয়ে গাছিয়ে রাখে। তার অনুপস্থিতিতে যদি কেউ বাড়ির কোনো ক্ষতি-টতি করে ফেলে, যদি বোন অখুশী হয়, যদি তাকে রাগ করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়- তবে কোথায় যাবে সরলাবালা? যাওয়ার জায়গা নেই তার।

তবে এ বিষয়টা নিয়ে আমার ঠাকুরদার প্রতিক্রিয়া হলো একেবারে ভিন্ন। তিনি নিয়মিত মদ্যপান করেন বলে একটু যুক্তিবাদী। তার ধারণা হলো, যে মহিলা কাকের আশীর্বাদে গর্ভধারণ করেছে, সেটা কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। তার স্বামীটিই বন্ধ্যা। স্বামী তাকে বন্ধ্যাত্বের অভিযোগে ত্যাগ করলে তার জেদ চেপে যায়। তিনি অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গ করে গর্ভবতী হয়েছেন। তার প্রমাণ, মহিলাটির অন্তত চারমাসের গর্ভলক্ষ্মণ আছে। কাকের আশীর্বাদের পাঁচ দিনের মধ্যে চারমাসের গর্ভদশা হতে পারে না। আর দ্বিতীয় ঘটনা সম্পর্কে তার মত হলো, মফিজ মোল্লার ছেলেটি জন্ম থেকেই আতঙ্কগ্রস্থ। শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পরে তার বউটির কোনো গোপন প্রেমিকা প্রাণের ভয় দেখিয়েছে। ফলে শ্বশুরবাড়ির নামে তার পায়ে আতঙ্কে চলার শক্তি হারিয়ে যায়। এটা আসলে মানসিক রোগ। 

এই জন্য তিনি প্রথমে স্থানীয় বিজিতেন ডাক্তারের কাছে গেলেন। ডাক্তার খুবই বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি এলাকার একমাত্র এমবি ডাক্তার। লোকজন শেষ চিকিৎসা তার উপর ভরসা করে। ফলে লোকজনকে চটানোর ইচ্ছে নেই।  ঠাকুরদার সঙ্গে সহমত বা দ্বিমত কোনোটাই জানালেন না। শুধু পরামর্শ দিলেন, বিধুবাবু, আপনার বয়স হচ্ছে। একালে মদ্যপান স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। 

ডাক্তার  নিরাশ করলেও ঠাকুরদা কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র নন। এলাকার বিশিষ্ট পণ্ডিত ময়েনুদ্দিন সাহেবের কাছে গেলেন। ময়েনুদ্দিন সাহেব স্থানীয় হাইস্কুলে জীববিজ্ঞান পড়ান। আর বিকেলে দি করোনেশন লাইব্রেরীর লাইব্রেয়ান হিসেবে কাজ করেন। এই বাড়তি কাজটি করেন শুধু বই পড়ার ইচ্ছে পূরনের জন্য। দি করোনেশন লাইব্রেরীটি ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত। সেকালের বিখ্যাত উকিল ও অকৃতদার যদুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় পারিবারিক সংগ্রহ দিয়েই লাইব্রেরীটি স্থাপন করেন। তিনি প্রতি বছরই কোলকাতা  থেকে বইপত্র কিনে আনতেন। কিন্তু ১৯৪৩ সালে কর্ম উপলক্ষ্যে নোয়াখালি যান। কিন্তু নোয়াখালিতে দাঙ্গা হওয়ার পরে তাকে আর ফিরে আসতে হয়নি। কেউ বলেন, যদুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় দাঙ্গায় নিহত হয়েছেন। কেউ বলেন, না, তিনি নিহত হননি। আহত হয়েছিলেন। সুস্থ হলে পর গোপনে কোলকাতায়  চলে গেছেন। আর এ এলাকায় আসেননি। ফলে লাইব্রেরীতে ১৯৪৭ এর পরে আর নতুন কোনো বইপত্র যুক্ত হয়নি। 

ময়নুদ্দিন সাহেব কাক নিয়ে কোনো বইপত্র খুজে পেলেন না। তবে শাকুনশাস্ত্র নামে একটি জীর্ণ বই বের করলেন। লেখকের নাম বসন্তরাজ। সেখানে কাকচরিত নামে একটি অধ্যায় আছে। পরিচয় হিসেবে বলা হয়েছে, কাকস্য চরিত্রং বর্ণিতং যত্র। 

লেখা হয়েছে,

দেবতা পিতা ও ব্রাহ্মণদিগকে না দিয়া যে অন্ন ভক্ষণ করে সে কাক হয়ে জন্মাবে। জগতের আবর্জনা কুড়িয়ে খাবে। আর তার কর্কস কণ্ঠস্বরের জন্য সকলের অপ্রিয় হবে। 

এই সূত্রে সেখানে লেখা আছে, কাকের গলার এই কর্কস স্বরের নানা প্রকার রয়েছে। এর মধ্যে-
১. কাকের ডাক যদি কেয়া কেয়া হয়, তা হলে তা দেশের পক্ষে অমঙ্গলজনক। কোনও বিশিষ্ঠ দেশনেতার প্রাণনাশের সূচক এই ডাক।
২. কাকের ডাক যদি কুঁই কুঁই শেনায়, তা হলে ধননাশ অনিবার্য।
৩. কাকের কিঁ কিঁ ডাক খুবই অশুভ। যা খুশি অঘটন ঘটতে পারে।
৪. কাকের ডাক কোঁ কোঁ শোনালে তা পরিবারের পক্ষ অমঙ্গলজনক ধরতে হবে। পরিবারের কারও মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
৫. কাক যদি থেমে থেমে ক্রোড়ন বলে শব্দ করে, তবে দেশে গৃহযুদ্ধ বাধার আশঙ্কা রয়েছে।
৬. কাকের ক্লীন ক্লীন ডাক অশুভ। কোনও আত্মীয়ের বিপদ বা মৃত্যুর সূচক এই ডাক।

শুনে ঠাকুরদার ভ্রু একটু কুঁচকে গেল। তার মন খারাপ হয়েছে। বললেন, ময়েনুদ্দিন সাব, সবই দেখি কুডাক। সুডাক নাই? 

ময়েনুদ্দিন সাহেব একটু হাসলেন। এতক্ষণ পড়ছি এক পৃষ্ঠা। ঘাবড়াইয়েন না। পৃষ্ঠা উল্টালেন। সেখানে লেখা আছে-

১. কাক যদি ক্রো ক্রো করে ডাকে, তা হলে জানবেন আপনার শুভলাভ আসন্ন। 

২. কাক যদি কল কল করে ডাকে, তাবে তাকে দেশের পক্ষে মঙ্গলজনক বলে ধরতে হবে। এতে জিনিসপত্রের দাম কমে।

৩. কাকের ডাক যদি ক্রেন ক্রেন শোনায়, তা হলে জানবেন কোনও সুন্দরী নারীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ঘটবেই। 

এবারে ঠাকুরদার মুখেও হাসি ফুটল। এটাই তিনি শুনতে চাইছিলেন। তিনি সুন্দরী নারী পছন্দ করেন। এইজন্য তিনি তার বাপের পছন্দের মেয়েটি কিঞ্চিত শ্যামলা বলে অপছন্দ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন দেখে শুনে। এই বউটি শুধু সুন্দরীই নয়! বুদ্ধিমতিও বটে। তার স্বামীরত্নটিকে সদা চোখে চোখে রাখেন। অন্য নারীর দিকে ঘেষতে দেন না। এইজন্য ঠাকুরদার মেজাজ মর্জি ভালো থাকে না। এখন বয়স হয়েছে। অনেক আশাই বালি হয়েছে। ময়েনুদ্দিন সাহেবের কথায় সে আশা আবার দেখতে পেলেন।  তিনি বললেন, তাইলে তো কাক ফ্যালনা না দেখছি।

– নিশ্চয়ই। ফ্যালনা হবে কেনো। খুব খেয়াল করে কাকের ডাক শুনলেই কু ডাক, সু ডাক চিনতে পারবেন। 

– কু ডাককে কি সুডাকে বদল করা যায়? 

– নিশ্চয়ই যায়। তবে এজন্য ভুশণ্ডির কাককে ধরতে হবে। তাকে খুশি করতে পারলেই হলো। তিনি সেকাল  একাল আর ভাবীকালকে দেখতে পান। তার অসাধ্য কিছুই নাই।

– ভুশণ্ডির কাকরে পাই কই?

– সেটা তো বসন্তরাজ বইতে লেখে নাই। ময়েনুদ্দিন সাহেব বইটি বন্ধ করলেন। এ বিষয়ে তিনি আর বাড়তি কোনো কথা বলতে আগ্রহী নন। শুধু বললেন, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু- তর্কে বহুদূর। 

ঠাকুরদা পরদিন খুব ভোরবেলায় উঠেই পাউরুটি ছিড়ে ছিড়ে বকুল তলায়  দিতে শুরু করলেন। এই পাউরুটি পেয়েই ভুশণ্ডির কাক খুশি হবে। তার মনষ্কামনা পূর্ণ হবে। 

এই পাউরুটির প্রতি বকুল গাছে অবস্থানরত বেগুনি কাকটির কোনো আগ্রহ দেখা গেল না। সে ফিরেও তাকাল না। তবে পাউরুটির লোভে বেশ কিছু পাতি কাক উড়ে এল। তারা ঠকাঠক করে কুড়িয়ে খেতে লাগল নিরবে, নিঃশব্দে।  সেই নিঃশব্দতার ভেতরেও খুব কান খাড়া করে ঠাকুরদা  ক্রেন ক্রেন শব্দ শোনার চেষ্টা করতে লাগলেন। আর ঠাকুরদা কাকদের প্রতি নয়! কৌতুহলী লোকজনের মধ্যে সুন্দরী মেয়েদের প্রতি প্রীতিপূর্ণ চোখে তাকাতে লাগলেন।

এটা আর কেউ লক্ষ না করলেও ঠাকুরমা চোখ এড়াল না। তিনি ঠাকুরদাকে পাকড়াও করলেন। বললেন, কী করো? 

ঠাকুরদা অম্লান বদনে বলে ফেললেন, কাকের ক্রেন ক্রেন ডাক শোনার চেষ্টা করছি। 

– ক্রেন ক্রেন ডাক শুনলে কি হয়?

– মনের আশা পূর্ণ হয়। 

এবারে ঠাকুরমা আরো জোরে চেপে ধরলেন। বললেন, এই বুইড়াকালে আবার তোমার মনে কী আশা আছে? মাইয়া মানুষ? 

এইবার ঠাকুরদা কিছু জবাব দিতে পারলেন না।

– বুইড়া কালেও তোমার বদ স্বভাব গেল না!

ঠাকুরদা বয়সের কারণে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। 

বললেন, ক্রেন ক্রেন নয়। ক্রো ক্রো ডাকে কিনা তাই বুঝবার চেষ্টা করছি।

– ক্রো ক্রো করে ডাকলে কী হয়? 

– শুভ লাভ হয়। মঙ্গল হয়।  খুব কায়দা করে বললেন, সংসারের অবস্থা পড়তির দিকে। তিনি অন্য কিছুর জন্য নয়- ভুশণ্ডির কাকরে খাবার দিচ্ছেন সংসারের অবস্থা ফেরানো জন্য। 

এটা ঠাকুরমার পছন্দ হয়েছে। ঠাকুরদা করিতকর্মা নন। কোনো আয় রোজগারে মন নাই। মেজদার উপরেই চলেছেন। তার অবর্তমানে  মেজবৌদির উপরে ভর করে আছেন। এটা নিয়ে ঠাকুরমার মনোকষ্টের শেষ নেই। এই বুড়ো কালে হলেও আয় রোজগারে মন ফেরায় তিনি খুশি।  তিনি ঠাকুরদাকে পাউরুটির সঙ্গে কিছু মোয়া মুড়কিও বরাদ্দ করলেন। 

ঠাকুরদা এবার ঝোঁকে পড়ে গেলেন। তিনি ধরেই নিলেন এই বেগুনী কাকটিই ভূষণ্ডির কাক না হয়ে যায় না। তিনি এবার তালতলীর বাঞ্ছারাম কবিরাজকে হায়ার করে আনলেন। বেচারা সারাক্ষণই দমে থাকে। চক্ষু লাল টকটকে। মাথায় জটা জাল। আর হাতে সব সময় জ্বলন্ত গাজার কলকি। টান দিয়ে ধোয়া গিলে ফেলে। দম বন্ধ করে রাখে। তার গলার শিরা উপশিরা ফুলে ওঠে। মনে হয় এই বেগ সামলাতে পারবেন না। সোজা শিব ঠাকুরের কৈলাশে গমণ করবেন। 

এসব নিয়েই বাঞ্ছারাম কবিরাজ বকুলতলায় ঘাটি গাড়লেন। ধুনিটুনি জ্বালিয়ে ভূষণ্ডির কাক নামানোর জন্য যজ্ঞে বসলেন। 

সারারাত ধরে তিনি নানা ভঙ্গিতে নেচে কুঁদে কাকের উদ্দেশ্যে মন্ত্রপাঠ করে চলছেন। মন্ত্র মানে অশ্রাব্য কুৎসিত গালিগালাজ।  পাড়ার লোকের ঘুম টুটে গেল। তারা এসে জড়ো হলো। তাদের দেখে বাঞ্ছারাম কবিরাজের তাগদ গেলো আরো বেড়ে। বেগুনি কাকের নামার কোনো লক্ষণ নেই। এদিকে ভোর ভোর কবিরাজের গলা দিয়ে রক্ত বের হতে লাগল। তার মধ্যে বেচারী  কুয়ো বান ছুড়ে মারলেন কাকের  উদ্দেশ্যে। বানটি লাগল কি লাগল কিনা তা  বোঝা গেল না। বেচারি কবিরাজ দাপাতে দাপাতে স্থির হয় গেল। সেই অবস্থাতেই তার সঙ্গী-সাথীরা সেই স্থির দেহ নিয়ে ছুটতে ছুটতে চলে গেল। শোনা গেল তিনি ইন্তেকাল হয়েছে। কাকটি   তবু সেখানে স্থির হয়ে বসে রইল। নড়ন চড়ন নট।  দেখে ঠাকুরমা বকুলতলায় মাথা ঠুকে পড়ে গেলেন। তার গলা থেকে বেরিয়ে এলো– একি সব্বোনাশ হলো গো ঠাকুর। এবার তো নির্বংশ হওয়া ছাড়া উপায় নাই। রইক্ষা করো গো বায়স ঠাকুর। 

ঠাকুরদা এবারে আর কোনো রা করলেন না। জোড় হাত করে বকুলতলায় বসে পড়লেন। সেই জোড় আর খোলেনি। লোকে বলল, পাপের শাস্তি। ঠাকুরমা তাকে হাত দিয়ে মুখে তুলে খাওয়াতে লাগল। 

আর তখন   সরলাবালা হাঁক ছেড়ে বলল, উনি ওইখানে থাক বইসা। বাড়ি আননের কাম নাই।

আমাদের মা সেখানে ছুটে যেতে যাচ্ছিল। তা দেখে ছোটো পিসি মার আঁচল টেনে ধরল। বলল, বৌদি গো তুমি বকুলতলায় যাইও না। সরলাবালা বকা দেবে।

মা অবাক হয়ে বলল, সেকি! তাই বলে কি উনি গাছের নিচে বইসা থাকবে? 

ছোটো পিসি উপায় না দেখে বলল, সরলাবালা রাইগা গেলে আমাগো সবাইরে বাড়ি থেকে নামায় দেবে। নামায় দিলে যাওনের আর জায়গা থাকবে না। 

– ক্যান, এ বাড়িটার ভাগ শ্বশুর মশায়েরও আছে না? 

– না। বাড়ির ভাগ নাই। সব মেজো জ্যাঠার নামে ছিল। উনি মইরা যাওনের কালে মেজো ঠাকুরুনের নামে সব লিখে দিয়ে গেছেন। মেজো ঠাকুরুনের হয়ে সেসব  সরলাবালাই দেখে। 

শুনে চুপ হয়ে গেল মা। বিয়ের আগে একথা তাদের কেউ বলেনি। ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। চোখ বুজে বিড়বিড় করে বায়সপাখির উদ্দেশে বলতে লাগল, ঠাকুর, আমাগো জন্য বাড়ির জায়গা দিও। ঘর দিও। 

এই খবর যখন চারদিকে চাউর হয়ে গেল তখন এলাকার লোক ভেঙ্গে পড়ল। যারা এতোদিন আসবে কি আসবে ভেবে একটু দোনামোনা করছিল তারা ছুটে ছুটে এলো। বকুলতলাকে ঘিরে রীতিমতো মেলা বসে গেল। ছোটো ছাপড়া ঘর তুলে দোকান পাটও বসে গেল। পুলিশ এলো। প্রশাসন এলো। লোকাল এমপি এসে ঘুরে গেলেন। লোকজন দেখে মহা খুশি তিনি।  বললেন, প্রধানমন্ত্রীকে তিনি নিয়ে আসবেন।  দেশের জন্য তিনি কাকের কাছে দোয়া খায়ের করতে পারবেন। পত্রপত্রিকা ও টিভিতে এই খবর প্রকাশিত হতে লাগল। 

এদিকে এই উপলক্ষে বাড়িতে দূরদুরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনও আসতে শুরু করেছ। তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে করতে বাড়ির লোকের জেরবার অবস্থা।  আমাদের মার কষ্ট হলেও খুব খুশি। তার বাবার কাছ থেকে শুনেছেন, মানুষজনের সেবা করতে পারাটাই জীবনের পরম উদ্দেশ্য। 

এতোদিন সরলাবালা কিছু বলেনি। ঘরদোরের কাজ ঠিকঠাক মতো করে যাচ্ছিল। দূর থেকে একটু হাসি ঠাট্টা করছিল বটে। কিন্তু কাছে যায়নি। একদিন শুধু গভীর সত্য হিসেবে বলেছিল,  ওট আসলে কাউয়া না। নকল কাউয়া। কেউ রগড় করার জন্য ছাতিমের ডালে গোপনে বেঁধে রেখে গেছে। সত্যি কাউয়া হলে নিশ্চয়ই উড়ে যেতো। একবারও তাকে উড়তে দেখা যায়নি। 

সেদিন দক্ষিণ এলাকা থেকে একটা চিঠি এলো। চিঠিটি পেয়েই সরলাবালা আমাদের মাকে খুঁজতে লাগল। সেটা টের পেয়ে ছোটো পিসি ভয়ে আতঙ্কে আধখানা হয়ে গেল। মা ঘরের জানলার পাশে বসে ছোটো পিসির জন্য ময়ূর বানাচ্ছিল। জানালার পাশ থেকে টেনে নিয়ে  পিসি মাকে  কোথায় লুকোবে বুঝতে পারছিল না। কখনো আলমারির পেছনে তো, কখনো খাটের নিচে। বলল, বৌ, তুই সরলাবালার সামনে বাইর হইস না। বাইর হইস না। 

কিন্তু মা তো লুকিয়ে থাকতে পারে না। শরম লাগে। ততক্ষণে বাইরে সরলাবালা এসে পড়েছে। তার সামনে এসে প্রণাম করে দাঁড়াল মা। পিসি ভয়ে কানে আঙুল দিল। সরলাবালার চিৎকার শুনতে পারবে না। কিন্তু সরলাবালা চিৎকার করল না। একটু চিন্তিত মুখে চিঠিটা এগিয়ে দিয়ে বলল, একটু পইড়া দাওতো বৌমা। 

 চিঠিটি লিখেছে তার দিদি, লীলাবতীর নাতি বিশু। তারা বহুদিন পরে দু’ একদিনের মধ্যেই রওনা করে মামাবাড়ি আসবে। চিঠিটা মা-ই তাকে পড়ে শোনাল। শুনে কিছুক্ষণ থম ধরে থাকল। তারপর জিজ্ঞেস করল, কে কে আসবে?

– সেটা লেখে নাই। লেখা আছে আমরা। নিচে বিশুর নাম। বিশু আসবে এটা নিশ্চিত। 

বিশু এ বাড়ি একবার এসেছিল। সে তখন ছিল  ছোটো।  বাড়ি ভর্তি লোকজন সে পছন্দ করেনি। তার মনে হয়েছিল, তার দিদিমার সহায় সম্পদ এইসব লোকজন লুটেপুটে খাচ্ছে। দিদিমা নামেই বাড়ির মালিক। সরলাবালাই সব কিছুর হর্তাকর্তা। ফিরে যাওয়ার সময় বিশু তাই বলে গিয়েছিল, আবার এসে বাড়ির দখল নেবে। শুনে অন্যরা হেসেছিল। কিন্তু সরলাবালা হাসতে গিয়েও হাসতে পারেনি। তার শির দাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বেয়ে নেমে৷ গিয়েছিল। তখন তার দিদি লীলাবতী সুস্থ ছিল। তাকে বলল, তোমার নাতিপুতি আসলে আমার কী হবে? 

লীলাবতী আশ্বস্ত করে বলল, আসলে আসবে। তাতে  তোমার কী? তুমি থাকবা তোমার মতো। তারা থাকবে তাগো মতো। 

কথাটা সহজ। কিন্তু সহজ বলে মানা কঠিন। সরলাবালা জানে, বুড়ো কালে ছেলেপুলেরাই এখন বাপমাকেই জায়গা দিতে চায় না। আর সে তো দূরের মানুষ। দিদিমার দিদি। নাতিপুতির কেউ না। তারে রাখবে কেনো!

লীলাবতী সরলাবালার হাত ধরে বলে, ভাইবো না দিদি। আমি বাঁইচা থাকতে তোমার কিছু হবে না। এখন যেমন আছ, আমার মরার পরও  তেমনি থাকবা।  

তখন মানলেও এখন মানতে ভয় হয়। লীলাবতী এখন সুস্থ নয়। বাক্যহারা। বিছানায় পড়ে আছে। তার নাতিপুতিরাও বেটা হয়েছে। তারা এই বুড়ি দিদিমার দেওয়া কথা মানবে কেনো? 

সরলাবালা চুপ হয়ে গেল। এ রকম চুপ হয়ে যাওয়া আগে কেউ দেখেনি। বাড়ির লোকজন সেটা দেখে আরো চুপ হয়ে গেল। যেন ঝড়ের আশংকা। ছোটো পিসি বিড়বিড় করে শ্রীকৃষ্ণের শতনাম পড়তে লাগল। কৃষ্ণ ছাড়া রক্ষা করার কেউ নেই। মাকে বলল, বৌদিগো, ঘরের বাইর হইও না। সরলাবালার সামনে পইড়ো না। 

সন্ধ্যানাগাদ সরলাবালা স্নান সারল। রান্না করল। তারপর সবাইকে ডেকে ডেকে খেতে দিল। ছোটো পিসি খাবার নিয়ে বসে রইল। মাকে ফিসফিস করে বলল, খাইও না বৌদি। বিষ টিষ দিছে নাকি- কওয়া যায় না। 

এই সময় ছোটো পিসিকে অবাক করে দিয়ে সরলাবালা বাড়ির দামড়া বিড়ালটাকেও এক পাত দিল। চেটে পুটে খেয়ে ঘুর ঘুর করতে লাগল।সে আরো খাবে। বারবার মিউ মিউ করতে লাগল। তারপর ছোটো পিসির কোলে গিয়ে উঠল। অন্য সময় হলে বিড়ালটাকে পিসি ঠেলা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিত। সরলাবালার জন্য সেটা করতে পারল না। কোলেই রাখল।   মা ফিসফিস করে পিসিকে বলল, চিন্তা কইরো না। তোমার জন্য তুলার বিড়াল বানানো প্রায় শেষ। আর দুটো দিন পরে দেবো। 

পিসি চুপ করে রইল। কোলের জ্যান্ত  বিড়ালটার জন্য তার ঘেন্না ঘেন্না করতে লাগল।  সেজন্য  ছোটো পিসি ভাত খেলো না।  নিশিপালন করবে। 

সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ল।  

পরদিন ভোর ভোর হৈ চৈ শুনে সবার ঘুম ভাঙল। বকুল গাছে সবুজ কাকটি নেই। উড়ে গেছে। সারা শহরের মানুষের বুক ভেঙে গেল। কেউ কেউ হাহাকার করল। কেউ কেউ কেঁদে ভাসাল চারিদিক। তাদের কামনা বাসনা পুরনের জায়গাটি রইল না বলে কেউ কেউ বকুল তলার নিচে মাথা ঠুকতে লাগল। 

বকুল গাছটির ডাল  যে ডালে কাকটি বসেছিল সেই ডালটির দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল ছোটোপিসি। মাকে ডেকে নিয়ে বলল, চাইয়া দেখো বৌদি, ডালে পাখিটা নাই সত্যি। কিন্তু পাখিটার চোখ দুটো আছে। 

মা ভালো করে দেখে জানাল, না, সেরকম কিছু নাই। 

পিসি অবাক হয়ে বলল, আমি তো দেখতি পাইতেছি। ওই যে, চোখ দুটো লাল। চোখ থেকে জল পড়ছে। জল না! দেখো দেখো, লাল রঙ্গের। রক্ত হইতে পারে। 

বলে মাকে টেনে নিয়ে গেল বকুল গাছের তলায়। ঠিক যে জায়গাটিতে কাক পাখিটি ছিল সে বরাবর নিচে মাটির উপরে লাল লাল দাগ দেখা গেল। সেটা রক্তই হবে। 

পিসি বলল, আমার মনে হয়, পাখিডা উইড়া যায় নাই। কেউ তারে মাইরা ফেলাইছে। 

সরলাবালা তখন বারান্দায় জাতি দিয়ে সুপারি কাটছিল। শুনে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, এই মাইয়াডার ছোট বেলা থেকে মাথা খারাপ। সেইজন্য শ্বশুরবাড়িতে টিকতে পারে নাই। আমরা কেউ দেখতি পাইতিছি না, আর ও দেখতে পাইতেছে কাকপক্ষীর চোখ। পাখি উইড়া গেছে। ঝামেলা শ্যাষ। গাছের তলায় পাখির রক্ত না। মাথা ঠোকানো মাইনসের রক্ত। যত্তসব পাগল ছাগল। 

অন্য কেউ একথা বললে ছোটো পিসি ক্ষেপে যেতো। কিন্তু সরলাবালার মুখের উপর কথা বলার সাহস এ বাড়ির কারো নেই। 

মানুষের হাহাকার আর আর্তনাদ থামানোর চেষ্টায় স্থানীয় প্রশাসন হিমশিম খেতে লাগল। কাক কীভাবে উড়ে গেল, কোথায় গেল, সেই উড়ে যাওয়া কাককে ফেরত আনা যাবে কীভাবে এইসব ব্যাপারে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করল। যখন কোনো কুল কিনারা পাওয়া যাচ্ছিল না ঠিক তখন   দক্ষিণ দেশ থেকে বিশু এসে হাজির। 

বিশু এসে সব দেখেশুনে গম্ভীর হয়ে গেল। দক্ষিণ দেশ থেকে মিস্ত্রী নিয়ে এসেছে। তারা বাড়িতে অনেকগুলো ঘর তুলবে। সেখানে দূর এলাকা থেকে আসা কাকদর্শনার্থীদে জন্য বোর্ডিং হাউস হবে। তারা ভাড়ায় থাকবে। বকুলগাছটির গোড়া বাঁধিয়ে দেবে। একটা পুকুরও কাটা হবে। নাম হবে শান্তি পুকুর। কাকের নাম করে সে পুকুরে স্নান করলেই জীবনের অশান্তি কেটে যাবে। কাক উড়ে যাওয়ায় এই সব পরিকল্পনা মাঠে মারা গিয়েছে। ব্যবসাপাতি শেষ।

কিছুক্ষণ  মাথায় হাত বসে রইল বিশু। তারপর সরলাবালাকে বলল, তুমি এই কাককে তাড়ায়ে দিছো। 

সরলাবালা বিমূঢ় হয়ে গেল। বলল, না, আমি কাকটিকে তাড়াইনি। 

– তুমি কাক পছন্দ করো না। তুমি ছাড়া আর কে তাড়াবে?

– আমি তাড়াতে চাইছিলাম। তার আগে অন্য কেউ তাড়ায় দিছে। 

– তোমারে বিশ্বাস করা যায় না। তোমার জন্য আগে এই বাড়িতে কাক আসতো না।  মানুষের ভরসার জায়গাটা মুছে ফেলেছ। তুমি যে কাকটিরে তাড়ায় দিছ এই কথাটা যদি শহরের লোকজনরে বলে দেই তাহলে কী হবে জানো? সরলাবালা মাথা নাড়ল। শহরের লোকজনরে সে থোড়াই কেয়ার করে। 

বিশু তাকে কঠিন করে বলল, শহরের লোকজন তোমাকে পিটিয়ে মেরে ফেলবে। তারা কিছু না করলেও আমি তোমাকে এ বাড়িতে আর থাকতে দেবো না। ফাইনাল। 

একথা শুনে সরলাবালার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। এবারে তার রক্ষা নেই। তার দিদি দক্ষিণ দেশে বিছানায় পড়ে আছে। কথাবলার সামর্থ্য নেই। তার ফেরারও সম্ভাবনা নেই। এবার বিশুর ঘোষণা ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। তার অন্য কোথাও যাওয়ারও নেই। এই বুড়োকালে তাকে পথে পথে ঘুরতে হবে। 

এবারে পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ল। তাকে দেখে মনেই হয় না কিছুক্ষণ আগেও এ বাড়িতে তার ইশারা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ত না। এখন নিজেই নড়ে গেছে। 

ঠাকুরদা তার দশা দেখে বলল, একমাত্র কাকটাই তোমারে রক্ষা করতে পারবে। তার কাছে প্রার্থনা করলে এ বাড়িতে বাকি জীবন থাকার ইচ্ছে পুরণ সেই করতে পারে।

কাককে সে পাবে কোথায়? তবু ভোর হওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়ল কাক খুঁজতে। খুঁজতে থাকলে কোথাও না কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। না পেলেও খুঁজতে খুঁজতে তার জনম কেটে যাবে। 

সরলাবালা যখন বাড়ির বাইরে পা ফেলেছে, তখন আমাদের মাও ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তাকে দেখে পিসিও এলো। বলল, কোথায় যাও বৌদি? 

মা বলল, বকুল তলায়।। 

– সেখানে কী এই ভোরে? 

এ কথার উত্তর না দিয়ে মা বকুলতলায় গেল। তখনো অন্ধকার সরেনি। আমাদের কিশোরী মা এদিক ওদিক তাকিয়ে বকুল গাছে উঠল। নিচ থেকে ভয়ে ভয়ে পিসি চেচিয়ে উঠল, কী করো! কী করো! 

মা কিছুক্ষণের মধ্যে গাছ থেকে নেমে এলো। বলল, কিছু করিনি। 

– তাহলে উঠলে কেনো? 

সেকথারও কোনো উত্তর দিল না। বকুল গাছের সেই ডালটির দিকে আঙুল তুলে বলল, ঐ দেখো, তোমাদের কাক। বায়সপক্ষী। ফিরে এসেছে।   

কাকটিকে আবছা আলো অন্ধকারে দেখতে পেল কি পেল না, সেটা বোঝা গেল না। তবে চুপ করে কান পেতে রইল। কিছুক্ষণের মধ্যেই  পিসির মুখ হাসি দেখা গেল। বলল, শুনতে পাইতিছি– কাউয়া ডাকছে, ক্রো ক্রো ক্রো। 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত