অমর মিত্রের ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই : ছিটমহলের আখ্যান

Reading Time: 11 minutes

                

                                        

বাংলা উপন্যাসের কালসীমা দেড়শো বছরও অতিক্রম করে গেছে। বহু ঔপন্যাসিক স্বতন্ত্রের খোঁজে অগ্রসর হয়েছেন বিভিন্ন পথে। বিষয়, রীতি, গঠন ও ভাবাদর্শ নিয়ে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। সাহিত্যের আদর্শ রক্ষা করে দেশজ ঘরনার সঙ্গে লোকজ উপাদান মিশিয়ে কেউ স্বতন্ত্র রচনায় অগ্রসর, কেউ নিজের চোখে দেখা বর্জিত মানুষের কথা তুলে ধরতে সচেষ্ট, কেউ-বা রাষ্ট্রের শোষণকে উপেক্ষা করেই লিখে চলেছেন শোষণের ইতিবৃত্ত। আবার কেউ বাজারচলতি লেখা লিখে পাঠকের মন জয় করে ঔপন্যাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চেয়েছেন। নক্‌শাল আন্দোলন পরবর্তীকালে বাংলা কথাসাহিত্যের পালাবদলে যেসব ঔপন্যাসিক অগ্রসর হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হল অমর মিত্র। জমি দানপত্রের আইনি ভাষাতেও যে গল্প লেখা যেতে পারে তা তিনিই প্রথম দেখালেন। উপন্যাসে যাত্রা সেই সময়। উপন্যাস তাঁর কাছে এক নিরন্তর পরীক্ষার পরিসর। তাই প্রাচীন ভারতবর্ষের উজ্জয়িনী নগর থেকে মহারাষ্ট্রের ভূমিকম্পপীড়িত লাতুর যেমন উঠে আসে, তেমনি ভার্চ্যুয়াল ওয়ার্ল্ড অতিক্রম করে ওপার বঙ্গের কথা লেখেন। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ পেয়েছিল ‘দশমী দিবসে’ উপন্যাস। মধুসূদনের জীবনবৃত্তান্ত ও দেশভাগের যন্ত্রণা মিলিয়ে এক স্বতন্ত্র আখ্যান গড়ে তুলেছিলেন। আর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ পেল ছিটমহলের বৃত্তান্ত নিয়ে ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’ উপন্যাস। এপার বাংলার কথাসাহিত্যে ছিটমহলকেন্দ্রিক প্রথম উপন্যাস ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’-যা লিখতে সময় লেগেছিল তিনবছর। তবে গল্পে ছিটমহল কিন্তু আগেই এসেছিল, এমনকি ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ‘শারদীয় বর্তমান’-এ ‘পুনরুত্থান’ উপন্যাসের বিস্তর অংশ জুড়ে ছিল ছিটমহলের প্রসঙ্গ।

                                                                   ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে ‘আজকাল’ পত্রিকায় রবিবাসর সংখ্যায় নলিনী বেরার একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল ‘মেখলীগঞ্জ তিস্তাপাড়ে’। এ গল্পের কিছুটা অংশ জুড়ে ছিল ছিটমহল ও করিডরের প্রসঙ্গ। পুলিশি অত্যাচারে কীভাবে নারীরা শোষিত হত বর্ডার ও ছিটমহল অঞ্চলে সে বৃত্তান্ত লেখক তুলে ধরেছিলেন। দারিদ্র্যের তাড়নায় বর্ডারের মহিলারা খুব সহজেই পুলিশের হাতে চলে আসত। তেমনি এক শোষিত মহিলার কথা নলিনী বেরা তুলে ধরেছিলেন। বহুদিন আগে অমরবাবু ই-মেল-এ একটি গল্প পাঠিয়েছিলেন। গল্পের নাম ‘অপাপবৃদ্ধা’। ছিটমহলের জীবনযন্ত্রণার কথা সেখানে প্রাধান্য পেয়েছিল। হেরাতুন ছিটের সেরা ধাই। হেরাতুনের মেয়ের প্রতি ভালোবাসা ছিল বাংলাদেশী ছিটমহলের হাবিবের। কিন্তু হাবিব ছিটের মানুষ বলে হেরাতুন কন্যার বিবাহ দেয়নি। কন্যার বিবাহ অন্য যুবকের সঙ্গে দিতে বাধ্য হয়েছে। কন্যা সন্তানসম্ভবা হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু ছিটমহলের মানুষ বলে হাসপাতালে ভর্তি নেয়নি, মৃত্যু হয় কন্যার—এই ভয়ংকর জীবন উঠে এসেছিল এ গল্পে। ‘যুদ্ধে যা ঘটেছিল’ ছিটমহল-কেন্দ্রিক গল্প। গল্পের আঙ্গিকটি বড় চমৎকার। সাধুভাষা ও চিঠির আকারে লেখা। বাতৃগাছি, মুনসির ছিট ও মশালডাঙার মনসুর মিঞা, হাতেম মিঞা ও নীলকণ্ঠ আধিয়ার চিঠি লিখেছে কোচবিহার জেলাশাসকের কাছে। জাদুবাস্তব ও চিঠির ভাষার কোমলতা খুব সহজেই পাঠককে আকর্ষণ করে। মিথনির্ভর ছিটমহল গড়ে তোলার যে ইতিহাস তা যেমন এসেছে তেমনি ছিটের নারীরা যে ধর্ষিত হতেই জন্মায় তা উঠে এসেছে-

‘’ইহা যদি ইন্ডিয়া হইত, তবে তাহারা এখানে আসিয়া পরম নিশ্চিন্তে মেয়েটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করিতে পারিত না। পুলিশ খবর পেয়েছিল মেয়েটিকে নিয়ে দুষ্কৃতীরা ছিট বাতৃগাছ-এ প্রবেশ করেছে। কিন্তু ছিটমহল যেহেতু বাংলাদেশ, অন্য রাষ্ট্র, পুলিশ প্রবেশ করিতে সাহস পায় নাই। ছিটে প্রবেশ করা পুলিশকে যদি হত্যা করে কেহ, ইন্ডিয়ার পুলিশ কিছু করিতে পারিবে না ভিন্ন রাষ্ট্র বলিয়া।‘’ (যুদ্ধে যা ঘটেছিল, হারানো দেশ হারানো মানুষ, সম্পাদনা মননকুমার মণ্ডল, সোপান, পৃ ২৯৮ )

 এই গল্পগুলির আখ্যান পাব ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’ উপন্যাসে। লেখক উপন্যাস লিখছেন ঘরে বসে, উপন্যাসের আখ্যানকে ভেঙে ভেঙে গল্প আকারে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। উপন্যাসের প্রকাশ ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে আর গল্পগুলি ২০১৫তেই আমরা পড়ছি। যদিও তখনও অনুমান করা সম্ভব হয়নি এগুলো উপন্যাসের অংশ। অন্যদিকে ‘পুনরুত্থান’ পুলিশি অত্যাচারের কাহিনি, সেই সঙ্গে মধ্যবিত্তকে কীভাবে শোষিত হতে হয় তা তুলে ধরেছেন। ভরত কুইলার মৃত্যুতে আসল অপরাধী বেঁচে যায় উচ্চবিত্তের সহায়তায়। মধ্যবিত্ত পুলিশ অফিসার গোলকের ওপর সমস্ত দোষ চাপে। নিজেকে বাঁচাতে গোলক চলে যায় ছিটমহলে, রাষ্ট্রহীন দেশে। যেখানে পুলিশ কাউকে ধরতে পারে না রাষ্ট্রের কথা বলে।

                                                এখন প্রশ্ন হল ছিটমহল কী ? কেন এই ছিটমহল ? ছিটমহল বলতে আমরা বুঝি এক বিচ্ছিন্ন ভূমিখণ্ডকে। রাষ্ট্রের যে অংশ অন্য রাষ্ট্রের মধ্যে পরে থাকে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘Enclave’। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই ছিটমহল বা Enclave রয়েছে। যেমন রোমের ভিতরে ভাটিক্যান সিটি বা দক্ষিণ আফ্রিকার ভিতরে লিসোথো। ছিটমমহল একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ-যার চারিদিকে অন্য রাষ্ট্রের সীমানা। ছিটমহলের নেই নিজস্ব দেশ, নিজস্ব শাসন, নিজস্ব অধিকার। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে ছিটমহল ছিল তা পৃথিবীর বৃহত্তম ছিটমহল। বাংলাদেশের ভিতরে রয়েছে ভারতীয় ১১১টি ছিট, আয়তন ১৭১৫৮ একর। আর ভারতের ভিতর রয়েছে বাংলাদেশের ৫১ টি ছিট, আয়তন ৭১১০ একর। ছিটমহল গড়ে ওঠার নানা ইতিহাস রয়েছে। আগ্রহী পাঠক দেখতে পারেন দেবব্রত চাকীর ‘ব্রাত্যজনের বৃত্তান্ত : প্রসঙ্গ ভারত-বাংলাদেশের ছিটমহল’(সোপান ) গ্রন্থটি। ছিটমহল সম্পর্কে একটি মিথ হল কোচবিহারের রাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ কোনও এক সময়ে রংপুরের নবাবের কাছে কিছু পরগনা বাজি রেখে পাশা খেলেছিল। রাজার ইচ্ছা পূরণ করতে সাধারণ মানুষকে হত হতে হয়েছিল। যে-সমস্ত প্রজা একদিন কোচবিহারের রাজাকে খাজনা দিয়ে এসেছিল রাজার ইচ্ছা পূরণ করতে তাদের হতে হয়েছিল রংপুরের নবাবের প্রজা। ঠিক রংপুরের প্রজাদের এই অবস্থা ঘটেছিল—এভাবেই গড়ে উঠেছিল ছিটমহল।

                                                ( ২ )

‘’অতীত সীমাটিও জড়িয়ে যাচ্ছে মূর্খ হাওয়ার ভেতর

ভূগোলের স্ফীতি, নিজস্ব অক্ষরেখা

নিচু হয়ে কথা বলছে কাঁটাতার

নিরুদ্দিষ্ট মানুষের বিবৃতি

আসলে প্রতিটি সাদার একটি নিজস্ব ছিটমহল থাকে

প্রতিটি কালোর অনুপ্রবেশের নির্দিষ্ট দিন তারিখ থাকে।”

                                      -‘ছিট দহগ্রাম’ / শৌভিক দে সরকার

‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে। দীর্ঘ তিনবছর ধরে তিনি এই উপন্যাসটি লিখেছেন। প্রথমেই বলি অমরবাবু ভূমিরাজস্ব বিভাগের অধিকর্তা ছিলেন বলেই এমন উপন্যাস লেখা সম্ভব হয়েছিল। জমি সম্পর্কে এমন আইনি জটিলতা অমরবাবু ছাড়া কারও পক্ষে বোধগম্য করা বোধহয় সম্ভব ছিল না-এজন্যই ছিটমহলের বৃত্তান্ত বাংলা কথাসাহিত্যে তেমন ভাবে আসেনি। ওপারবঙ্গে বসে লিখেছেন সেলিনা হোসেন ‘ভূমি ও কুসুম’ উপপন্যাস। ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’ উপন্যাস এক যুগসন্ধির চিহ্নবাহী, সামাজিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় দলিল। ছিটমহলের মানুষের যে ভয়ংকর জীবনযাত্রা তা লেখক অত্যন্ত বাস্তবভাবে এঁকেছেন। হ্যাঁ, তিনি দেখেছিলেন বলেই চিত্র অঙ্কন করতে পেরেছিলেন। ছিটমহলের বৃত্তান্ত লিখতে দিনের পর-দিন ছিটমহল ঘুরেছেন। লেখক প্রচলিত ইতিহাসের সঙ্গে কল্পিত ইতিহাস ও অলিখিত ইতিহাস মিলিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার রঙে চিত্র এঁকেছেন। লেখক নিজেই বলেছেন –

‘’আমি নিজে যদি অনুভব না করি ভিতর থেকে, উপন্যাস লেখা হয় না। উপন্যাস শুধুই বাস্তবতার চর্চা নয়। অন্তনির্হিত বাস্তবতাকে খুঁজতে বারবার গিয়ে মনের উপর চাপ বাড়াতে হয়েছে। আমি একটি দেশের সুবিধাভোগী নাগরিক, আর এপারের ৫১ টি গ্রামের মানুষের কোনো দেশ নেই। দেশ নেই ! হতে পারে ? এই উপন্যাস যতটা তথ্য, ততটাই অনুভব। যতই এর বাস্তবতা ততই এর নিহিত কল্পনা। অলীকতা। এদেশ ওদেশ, সীমান্ত, কাঁটাতার, তিস্তা ধরল ডাহুক… কত নদী আর নদীর জল চোখের জল দেখেছি ছিটমহল পরিক্রমায়।‘’( কুমারী মেঘের দেশ চাই, দে’জ, প্রথম প্রকাশ ২০১৭, ভূমিকা, পৃ. ৮)

 উপন্যাসটি তিনটি পর্বে বিভক্ত –

ক. ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’— ৩১ টি পরিচ্ছেদ।

খ. ‘চোখ আর নদীর জল’— ২০ টি পরিচ্ছেদ।

গ. ‘কুমারী মেঘের দেশ নাই’— ৯ টি পরিচ্ছেদ।

প্রথম পর্ব ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’ ভারতের ভিতরে যে বাংলাদেশি ছিট তার প্রেক্ষাপটে লেখা। মশালডাঙার মানুষদের জীবনযাপন, দুঃখ বেদনার ইতিহাস, নারী শোষণের চিত্র ও সেইসঙ্গে ছিটমহল গড়ে ওঠার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো এ উপন্যাসের কাহিনি কতকগুলি মুসলিম পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অমরবাবু চাকরি সূত্রে দীর্ঘদিন গ্রামে ছিলেন। ফলে প্রথমপর্বের গল্পে মুসলিম জনজীবন বিরাট আকারে দেখা দিয়েছিল। সাগির আলি, আজগার আলির পরিবার নিয়ে গড়ে উঠেছে কাহিনি। সাগির আলি, আজগার আলি-দুজনেই বৃদ্ধ, একশো উত্তীর্ণ। ছিটমহলের স্বাধীনতা দেখার জন্যই তাঁরা বেঁচে আছেন। ইতিহাসের সত্য উদ্‌ঘটনে লেখক যেমন ব্যাখ্যায় অবতীর্ণ হয়েছেন তেমনি বহু অলিখিত ইতিহাস উদ্‌ঘটন করেছেন। আবার কোথাও কল্পনায় ভর করে পাড়ি দিয়েছিন। এই কল্পনা অমরবাবুর নিজস্ব স্বতন্ত্রতা। কাহিনির প্রয়োজনে তিনি নিজে রূপকথা লেখেন। এ যেন নবীন প্রজন্মের রূপকথা। ‘ধ্রুবপুত্র’, ‘অশ্বচরিত’-এর বিস্তর অংশ ও ‘ধনপতির চর’-এর সমগ্রটাই লেখকের কল্পনার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। লেখকের ভাষায় ছিটমহলের ইতিহাস এমন –

‘’ছিটমহল কথাটা দুই রকম। একটা নাকি ইতিহাস। অন্যটা ইতিহাস থেকে লুকিয়ে রাখা এক কাহিনি। তবে সেও এক ইতিহাস। রাজা-নবাবের ইতিহাস তো সমস্তটা লেখা হয় না। লেখা যায় না। রাজা নবাব যেমন করে বলবেন, ইতিহাস লেখা হবে তেমন করে। তাই সেই ইতিহাসের ভিতর যা লুকিয়ে থাকে, তার কিছুটা আন্দাজ করে নিতে হয়। পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা কথা ও কাহিনি সেই আন্দাজটা দিতে পারে। আর তা থেকে ইতিহাস তৈরি হতে পারে। ইতিহাস তো নির্মাণ, যে যেমন ভাবে তার আভাস পায় ছড়িয়ে থাকা জীবন থেকে।’’( তদেব, পৃ. ১৭ )

সাগির আলি বলে যায় ইতিহাসের কথা নাতিদের কাছে। সাগির আলির স্মৃতিচারণায় দেশভাগ, দাঙ্গা, মুক্তিযুদ্ধ, মুজিবর-ইন্দিরা চুক্তি ও করিডর গড়ে ওঠা সমস্তই উঠে আসে। সাগির আলি ও আজগার আলি ছিটমহলের ইতিহাস বলে যেতে পারে। এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারীচরিত্র জিন্নাত। তাঁকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের কাহিনি যেমন এগিয়ে গেছে, তেমনি ছিটমহলের নারীদের যন্ত্রণার ইতিবৃত্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জিন্নাত শিক্ষিত নারী, সে চায় ছিটমহলের স্বাধীনতা। কিন্তু ছিটমহলের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর পড়াশোনা। ছিটমহলের জীবনযাত্রা যে কী ভয়ংকর তা উপন্যাস পাঠেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জিন্নাত আজ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে পারবে না সে ছিটমহলের সন্তান বলে। তাঁর পিতার কোনও নাগরিক পরিচয় নেই। তেমনি ছিটমহলের নারীরা সন্তান প্রসবের সময় হসপিটালে ভর্তি হতে পারে না। কোনও ভারতীয় পুরুষ নাগরিককে স্বামী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ঘুসের বিনিময়ে হসপিটালে ভর্তি হতে হয় –

‘’বুড়ি বলছিল, সে কতবার যে বাপ হইছে তার ঠিক নাই, সিতাই যায়, মেখলিগঞ্জে যায় ভোটার কার্ড লিয়ে, বাবা হওয়াই তার পেশা, ছিটে ছিটে ঘোরে, কখনো ছিট থেকে আসা প্রসূতির স্বামী হয়ে প্রসবের সময় হাসপাতালের খাতায়, কখনো ছিটের ছেলেপুলের বাপ হয় তাদের স্কুলের ভর্তির সময়। পরীক্ষার ফর্ম ফিল আপের সময়। তাকে দেখে আসাদুলের হাত শক্ত করে ধরে তাকে অবলম্বন করেছিল নয়িম। নয়িমের মনে হয়েছিল, তার সর্ব্বোনাশ করে দেবে লোকটা। বাচ্চা হওয়ার পর সায়মাকে নিয়ে যাবে নিজের বাড়ি। কী রকম ধূর্ত চোখ !‘’ ( তদেব, পৃ. ৫৫)

হাফিজুর চেয়েছিল আবার পাকিস্তান ফিরে আসবে। বাংলাদেশের জনজীবনে হাফিজুররা এখনও বর্তমান। হাফিজুর ভেবেছিল জিন্নাতকে নিয়ে পাকিস্তানে চলে যাবে। রাতের অন্ধকারে ধর্ষিত হতে হয়েছে জিন্নাতকে। আপনা মাংসে হরিণা বৈরী হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ জিন্নাত। ছিটমহলের সুন্দরী নারীরা ধর্ষিত হতেই জন্মায়, তাদের কোনও রাষ্ট্র নেই, প্রতিবাদের ভাষা নেই। কিন্তু সাহিত্যই তো পারে মানুষকে জাগিয়ে তুলতে। তাই লেখকের সৃষ্ট চরিত্র জিন্নাত আজ চিঠি লিখেছে ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে। ‘যুদ্ধে যা ঘটেছিল’ গল্পের ভাষার সৌন্দর্যের কথা আগেই বলেছি। এ উপন্যাসের চিঠির ভাষায়ও অমরবাবুর নিজস্ব স্বতন্ত্রতা সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জিন্নাত আজ শুধু একজন নারী নয়, সে ছিটমহলের সমস্ত নারীর প্রতিনিধি। তাই চিঠিতে জানিয়েছে—

‘’আমরা তো ইন্ডিয়ার হইতাম, ভাগ্যের ফেরে হই নাই। আকাল বৃষ্টি আমাদিগকে এই করিয়াছে। ইন্ডিয়ার ইস্কুল কলেজে পড়ার কোনো উপায় নাই মিথ্যা পরিচয় গ্রহণ করা ব্যতীত। ছিটমহলের কন্যার কুমারীত্ব সেই অঘ্রানের কুমারী মেঘের মতো, তাহাকে ফাটাইয়া ফসলের স্তবে ভাসিয়া ফেলা অতি সামান্য ঘটনা। সেই কথা বলিতেই এই পত্রের অবতারণা। আমাদিগের পাশের গ্রাম মদনাগুড়ির সব রহিয়াছে। সেই অক্ষ ক্রীড়ার সময় মদনাগুড়ির আকাশে মেঘ ভাঙিয়া অকাল বৃষ্টি হয় নাই। তাই ফসলও মরে নাই। এখন মদনাগুড়ি যাইতে বাতৃগাছি পার হইতে হইবে। বাতৃগাছি বাংলাদেশ, মদনাগুড়ি ইন্ডিয়া। তাহার পাশে সিঙিমারি নদী ইন্ডিয়া।‘’ (তদেব, পৃ. ১৫৫)

হাফিজুরের ছেলে নয়িম। হাফিজুর চায় পাকিস্তান, নয়িম চায় ছিটমহলের স্বাধীনতা। হাফিজুরের কাছে স্বপ্নের দেশ পাকিস্তান। সে স্বপ্ন সফল করতে হাফিজুর বহু মানুষকে নিজের দলে এনেছে। অন্যদিকে সুফল রায় ওরফে বেচুন মুখুজ্জ্যকে ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে বিচার করতে চাই। বেচুন মুখুজ্জ্যে বাস্তব চরিত্র-যারা ছিটমহল টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। বেচুন ছিটমহলের বারোশো বিঘা জমির মালিক। ছিটমহলবাসীদের দিয়ে সে ইচ্ছামতো পরিশ্রম করায়, বিনিময়ে শুধু খাদ্যটুকুই দেয়। সে ইচ্ছামতো ছিটমহলবাসীকে বি.এস.এফ পুলিশের হাতে তুলে দেয়। সে মনেপ্রাণে চায় ছিটমহল টিকে থাকুক, ছিটমহল স্বাধীন হলে বহু জমি হাতছাড়া হবে বেচুনের। সে শুধু ইন্ডিয়ার স্তুতির কথা বলে, সে জানে ভারত কোনদিনও পাবে না—‘’ইন্ডিয়ার দশ হাজার একর ওপারে আছে বেশি, ইন্ডিয়া ছাড়বে কেন, তাইলে ইন্ডিয়া আজাদ কাশ্মীর স্বীকার করুক, ছেড়ে দিক ওপারের কাশ্মীর, কী বলো মিঞা ?’’

                                                ছিটমহল রক্ষার জন্য বেচুন বহু টাকা দেয় বংশী-সিরাজুলদের। শুধু তাই নয়, বেচুন নিয়োগ করে গিরীন্দ্রকে। গিরীন্দ্র ছদ্মবেশী লেখক। সে ছিটমহল টিকিয়ে রাখতে কলম ধরে। গিরীন্দ্র চরিত্রকে লেখক ব্যঙ্গবানে বিদ্ধ করেছেন –এই শ্রেণির লেখকরা এখনও সমাজে বর্তমান। ছিটমহলের সেরা ধাই হেরাতুন। কিন্তু ছেলে জামিলের স্বার্থের কাছে বহু নারীকে বলি দিয়েছে। ছিটমহলের মানুষ বলে হেরাতুন হারিয়েছে কন্যাকে। কন্যাকে হারিয়ে সব শূন্য হয়ে গেছে হেরাতুনের জীবন। তাই হেরাতুন আজ আর ছেলের কথা শোনে না। সে বিনা স্বার্থে সন্তান প্রসব করে চলে ছিটমহলের নারীদের। হেরাতুন সন্তান প্রসব না করালে ছিটের নারীদের যেতে হয় হাসপাতালে, আর সেখানে ক্ষত-বিক্ষত হয় ছিটের নারীরা। নারীদের এ যন্ত্রণা হেরাতুনকে দগ্ধ করেছে-তাই সে অনুশোচনা প্রকাশ করেছে।

                                                          দ্বিতীয় পর্ব ‘চোখ আর নদীর জল’। এই খণ্ডের প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের ভিতরে ভারতীয় ছিটমহল। বাংলাদেশ লেখকের পিতৃপুরুষের দেশ, বাংলাদেশের প্রতি লেখকের গভীর মমতা। কোনও এক বন্ধু লেখককে বলেছিল-অমর, তুমি বড্ড ওপার-ওপার করো, কেন কর, এই দেশের খাও পরো, এটাই তোমার দেশ ( ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষ জলে )। এই খণ্ডে দুটি চরিত্রের দ্বন্দ্ব অত্যন্ত সুন্দর। নিয়তি ও নির্মলা দুই বোন। নিয়তি চায় বাংলাদেশ, নির্মলা চায় ভারত। নিয়তি পিতা-মাতার প্রথম সন্তান। বাঙালি সমাজে প্রথম সন্তান সাধারণ ভাবে মাতুলালয়েই প্রসব হয়। তাই নিয়তির চিঠিতে বাংলাদেশ প্রাধান্য পেয়েছে—

‘’সীমান্তের ওপারে ভারত বহুদূর। বহু পথ। কাঁটাতার সেই দূরত্ব রচনা করেছে। একটা দেশের সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে আর একটা দেশ। আমার বাংলাদেশের ভিতরে ভারতীয় ছিটের বাসিন্দা হলেও বাংলাদেশ আমাদের দেশ। আমরা ভারত দেখিনি। ভারতের সীমান্তরক্ষী দেখেছি। দেখে ভয় পেয়েছি। সত্য যে অস্ত্র আতঙ্ক জাগায়।‘’ (তদেব, পৃ. ১৭০)

নির্মলা স্কুলে ভর্তি হয়েছে পিতৃনাম গোপন করে। নির্মলার পিতা রামচন্দ্র রায়। রামচন্দ্র রায় ছিটমহলের অধিবাসী- তাঁর কন্যার স্কুলে পড়ার অধিকার নেই। তাই পিতৃনাম গোপন করে নামচন্দ্র রায় নামে এক ব্যক্তিকে পিতা সাজিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। নামচন্দ্র বাংলাদেশের নাগরিক, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড আছে। স্কুলে ভর্তির জন্য পিতৃনাম হিসেবে ব্যবহার করায় টাকা নেয় নামচন্দ্র-এমনই ভয়ংকর জীবন ছিটমহলের। নিয়তির গভীর মমতা বাংলাদেশের প্রতি। তাই সে চায় দশিয়ারছড়া বাংলাদেশ হোক কিন্তু নির্মলার মত পৃথক –

‘’নিয়তি বলে, তা হয় না, আমরা বাংলাদেশের হতে চাই, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ঠাকুদ্দা প্রাণ দিয়েছে বোন, শহিদের বংশ আমাদের, কেন এদেশ আমাদের হবে না, আমরা চাই বিনিময়ে আমাদের গ্রাম বাংলাদেশ হয়ে যাক।

আমি চাইনে, ভোট হলে আমি ইন্ডিয়ার পক্ষে ভোট দেব। নির্মলা বলে।

 একথা কেন বলিস বোন, বাংলাদেশ আমাদের জন্মভূমি। নিয়তি বুঝিয়েছে।

মোটেই না, ইন্ডিয়া আমার জন্মভূমি, দশিয়ারছড়া কি ইন্ডিয়ার নয়।

নিয়তির জন্ম বাংলাদেশ, কুলেরহাট মামার বাড়ি। প্রথম সন্তান তো বাপের বাড়ি গিয়ে জন্ম দেয়ে মেয়েরা। নির্মলার জন্ম এখানে। এখানে মানে দশিয়ারছড়ায়। মানে ইন্ডিয়ায়। সে বলে, জন্মসূত্রেও সে ভারতীয়। তাই সে ভারত চায়।‘’ ( তদেব, পৃ. ১৯৭)

নির্মলা একটু বেশি শিক্ষিত, সে ভার্চ্যুয়াল ওয়ার্ল্ডের সদস্য, কিন্তু নিয়তি ভার্চ্যুয়াল ওয়ার্ল্ড বোঝে না। তবে নিয়তিও বাংলাদেশের বিজয় দিবসে প্রভাতফেরিতে অংশ নেয়। নামচন্দ্রের আশ্চর্য পরিবর্তন দেখিয়েছেন লেখক। নামচন্দ্রের মধ্যে আজ জেগে উঠেছে পিতৃসত্তা-তবে তা নিছক অভিনয়। নামচন্দ্রের আজ চোখে জল পরের মেয়ের জন্য। তবে নির্মলার ধর্ষণের জন্য দায়ী নামচন্দ্র, সেই ধর্ষণে সহায়তা করেছে। ছিটমহলের মেয়েরা হয়ত ধর্ষিতা হতেই জন্মায়। তাদের নেই কোনো প্রতিবাদের ভাষা, তাই শিক্ষিত নির্মলা আজ নীরব হয়ে গেছে।

                                                তৃতীয় পর্ব ‘কুমারী মেঘের দেশ নাই’ ছিটমহলের স্বাধীনতার ইতিহাস। এই পর্বে প্রথমেই আলোচনা করতে চাই বিমলেশ চরিত্রকে। বিমলেশ আসলে লেখক অমর মিত্র। উপন্যাসের তিনটি পর্ব ধরেই রয়েছে বিমলেশ। বিমলেশ নামটি বোধহয় লেখকের বড় প্রিয়। ‘সাঁকোবাড়ি’ গল্পের একটি চরিত্র বিমলেশ। আবার ‘দৈনিক যুগান্তর’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ‘জন্মান্তর’ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র বিমলেশ। বিমলেশকে আমরা এ উপন্যাসে প্রথম পাই প্রথম পর্বের সতেরোতম পরিচ্ছেদে। সৌমেন অধিকারী জানায়, বিমলেশ একজন সাংবাদিক, যে ছিটমহলের কথা জানতে এসেছে। বিমলেশ যে লেখক স্বয়ং নিজেই তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই কথাগুলিতে—

‘’বিমলেশ বসু ষাটের উপরে। মাঝারি উচ্চতার মানুষ। এখন ছিটমহল নিয়ে কিছু একটা লিখবে মনস্থ করেছে। বহুদিন আগে সে ভূমিকম্প বিদ্ধস্ত মহারাষ্ট্রের লাতুর জেলায় গিয়েছিল, মনে আছে। লিখবে বলেই গিয়েছিল। মানুষের বিপন্নতা নিয়ে লিখেও ছিল। সাংস্কৃতিক বিপন্নতাও ছিল তার ভিতরে।‘’ ( তদেব, পৃ. ৯২ )

অমরবাবুর অত্যন্ত প্রিয় বিষয় দেশভাগ। অমরবাবুই বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক যিনি দেশভাগ না দেখেও দেশভাগের ষাট বছর পরেও দেশভাগের আখ্যান লিখতে পারেন। দেশভাগের ফলেও যেহেতু ছিটমহলগুলি গড়ে উঠেছিল তাই ছিটমহলের প্রতি লেখকের কৌতূহল দীর্ঘদিন ধরেই। লেখককে বারবার বিভ্রান্তিতে ফেলার চেষ্টা করেছেন বেচুন মুখুজ্জ্যে। লেখক চেয়েছিলেন ছিটমহলের প্রাক্তন অধিবাসী সাগির আলি ও আজগার আলির কথা শুনতে। কিন্তু এখানেও বিভ্রান্তি ঘটাতে চেয়েছে হাফিজুর। আসলে হাফিজুর, বেচুন মুখুজ্জ্যরা চেয়েছিল ছিটমহল যেন থাকে। গিরীন্দ্র যেমন টাকার বিনিময়ে বেচুনের প্রশংসার কথা কাগজে লিখে দেয়, বেচুন ভেবেছিল বিমলেশ যেন সেই পথে হাঁটে। কিন্তু লেখক অমর মিত্র আত্মস্বাধীনতায় বিশ্বাসী, তিনি বিপন্ন মানুষের কথাকার। তিনি টাকার কাছে পরাজিত হননি। বেলগাছিয়ার এক ছোটো ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকেন। প্রথম জীবনে ইচ্ছা করলে লক্ষ-লক্ষ টাকা ঘুস নিতে পারতেন, কিন্তু একটি টাকাও ঘুস নেননি। নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়কে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন –যাপিত জীবন কেমন হওয়া উচিত পিতামাতার কাছ থেকে সেই শিক্ষাই নিয়েছেন। উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বে বিমলেশ ও ভুবন বাংলাদেশের ছিটগুলি ঘুরে দেখেছে, তাদের অন্তরের কথা শুনেছে। বিমলেশ পিতৃভূমির দেশ সম্পর্কে নিজের অনুভবের কথা বর্ণনা করে চলেছে এমনকি সঙ্গে নিয়ে গেছে মাতার লেখা ডায়েরির পাতা। লেখক দেশভাগের আখ্যান শুনেছিলেন মাতার কাছেই। মাতার ডায়েরি তিনি যত্ন করে রেখে দিয়েছিন। এ প্রসঙ্গে মনে আসে ‘কাঁটাতার’ উপন্যাসের কথা, এ উপন্যাসের বিভাবতী চরিত্রে রয়েছে লেখকের মাতার ছাপ। সেই বিভাবতীও ডায়েরি লেখে। অমরবাবুও কিন্তু ছিটমহল আন্দোলনের প্রত্যক্ষ দ্রষ্টা। শুধু উপন্যাস লিখেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি। টিভি চ্যানেলে বহু সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ছিটমহল নিয়ে।

                                                উপন্যাসের তৃতীয় পর্ব ‘কুমারী মেঘের দেশ নাই’— ছিটমহলের স্বাধীনতা লাভের ইতিকথা। বিমলেশ নিয়তিকে কথা দিয়েছিল ছিটমহল নিয়ে লিখবে। লেখক রেখেছেন সে কথা। আবার কখনও মনে হয়েছে ছিটমহল স্বাধীনতা পাবে না—‘’আমার তো মনে হচ্ছিল হবে না পাস, আসামকে বাদ রেখে দিয়েছিল বলে কংগ্রেস বেঁকে বসেছিল, আর সরকারি দল ভোটের ভয় করছিল, সামনে তো বিধানসভা ইলেকশন, যদি হিন্দু ভোটে এর ছায়া পড়ে, ছিটমহলের মানুষ তো বেশিরভাগ মুসলমান।‘’ (তদেব, পৃ. ২৬৩ ) কিন্তু বিল পাশ হয়েছে। ছিটের সমস্ত মানুষকে আবেদনপত্র দিতে বলা হয়েছে তারা কোন দেশে যাবে। বেচুন মুখুজ্জ্যে ও হাফিজুর বহু চেষ্টা করেছিল ছিটরোধের, কিন্তু শেষপর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। ৬ই জুন চুক্তি হয় ঢাকায়, ছিটমহল স্বাধীন হয় ১লা আগস্ট ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গী হয়েছেন লেখক। লেখক নিজে ভারতের স্বাধীনতা দেখেননি। তাই ছিটমহলের স্বাধীনতা দেখে খুশি হয়েছেন। বৃদ্ধ আজগার আলি ভারতের পক্ষে মত দিয়েছে। নতুন স্বাধীনতার সূর্য দেখেছে তারা। বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ছিটের স্বাধীনতা এসেছে। তাই স্বাধীনতা উদ্‌যাপন মুহূর্তে গাওয়া হয় শামসুর রা্মানের কবিতা। শোষিত মানুষের মুক্তির মুহূর্তে শ্রেষ্ঠ কলকণ্ঠ বোধহয় শামসুর রাহমানই—

‘’স্বাধীনতা তুমি

কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো

মহান পুরুষ, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা

স্বাধীনতা তুমি

শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা,

স্বাধীনতা তুমি

পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল,

স্বাধীনতা তুমি ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।‘’

                                                      -‘স্বাধীনতা তুমি’ / শামসুর রাহমান

নদীর কোনো দেশ নেই, পাখির কোনো দেশ নেই, মেঘের কোনো দেশ নেই, আর দেশ নেই কুমারী মেঘের। নদী, পাখি, মেঘ, স্বাধীন কিন্তু নারী পরাধীন। সেই মহাভারতের যুগ থেকে নারীরা যৌন লালসার শিকার হয়ে আসছে। স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও কি নারীরা স্বাধীন হয়েছে ? পুরুষের ক্ষমতার হাত থেকে বাঁচতে পেরেছে নিজেকে ? না, পারেনি। ছিট স্বাধীন হলেও বিবাহিত জিন্নাতের পাশের বাড়ির নারী অপহৃত হয়। জিন্নাত চিঠিতে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হয় –

‘’ভুবনদা কি এই মেয়ের হত্যাকাণ্ডের বিহিত পারবে ? মেয়ে মানুষ নিজেই তো নাগরিক সমস্ত জীবন ধরে। মেয়েমনাউষের কোনো দেশ নাই। ভুবনদা কি তাদের স্বাধীন করতে পারবে ? ভুবন হাঁটছিল জবার মা বুড়ির হাত ধরে।‘’ ( তদেব, পৃ. ৩০২ )

ছিট স্বাধীন হয়েছে, লেখকের মন থেকে মুছে গেছে সব। হঠাৎ একদিন ফেসবুকে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠায় নিখিলচন্দ্র ঘোষ। ছিট বিনিময়ে বহু মানুষ ছন্নছাড়া হয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে বন্ধুত্ব। সেইসব মানুষের খোঁজ পেতেই বোধহয় নিখিলেশ ফেসবুক খুলেছে। অনলাইনে দেখা হয়েছে বিমলশের সঙ্গে, কিন্তু একটু পরেই উধাও হয়ে গেছে। সে কোথায় গিয়েছে জানে না বিমলেশ, এ জীবনে আর দেখা হবে কিনা তাও জানে না। তাই বিমলেশ একটি ছড়া বলে চলে—

‘’আমি রয়েছি হেথা, আমি আর আমি

বাতাসে মিশিয়া আছি, হে অন্তর্যামী।

কুমারী মেঘের দেশ স্বজন খুঁজিবে,

স্বজন কুমারী মেয়ে অশ্রু ঝরিবে।

কুমারী মেঘ এস, এই তো সেই দেশ,

এইখানে সীমান্ত নাই, প্রাণেই অশেষ।‘’

                                                     ( তদেব, পৃ. ৩০৪ )

 এভাবেই দুই বঙ্গের মানুষকে মিলিয়ে দিয়েছেন লেখক। সাহিত্য তো অখণ্ডতা, বিচ্ছিন্নতার কথা বলে না। সাহিত্য বলে মিলনের কথা, মানুষের কথা। সেই মিলনেই উত্তীর্ণ হয়েছেন লেখক। মিথ, ইতিহাস, রূপকথা, অলিখিত ইতিহাস ও কল্পিত ইতিহাস মিলিয়ে প্রান্ত উত্তরবঙ্গের বর্জিত একশ্রেণির কথা তুলে ধরেছেন লেখক এ উপন্যাসে। এ বর্জিত মানুষ দুই বাংলার ছিটমহলের মানুষ, এ উপন্যাস ছিটমহলের মানুষের গাথাকাব্য। ছিটমহলের কাহিনির কথাকার হিসেবে এ উপন্যাস ও ঔপন্যাসিক বাংলা কথাসাহিত্যে আলাদা স্থান করে নেবে-এ বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>