| 20 মে 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

নবজাগরণের দূত ফকির লালন সাঁইজি

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

গ্রামীণ বাংলার নবজাগরণের দূত ফকির লালন শাহ। একদিকে ছিলেন সমাজ বিপ্লবী আর কর্মে ছিলেন যোগসিদ্ধ পুরুষ। জনসংস্কৃতির উবর ভূমি কুষ্টিয়া তথা নদীয়া জেলার সকল অঞ্চলে লালনের জ্ঞানের কথা, শাস্ত্রের কথা যেমন জন্মেছে, তেমনি মর্ম কথা ও প্রেমের কথাও এসেছে ।

অধাত্মবাদের সাধক লালন সাঁই তাঁর গান যুগযুগ ধরে মরমী মানুষের আধ্যাত্ম ক্ষুধা ও রস তৃষ্ণা মিটিয়ে আসছে। লালন ফকির এই বাউল সাধনায় একটি স্বতন্ত্র ঘরানাও সৃষ্টি করেছেন লোকসংস্কৃতিতে। সর্বোপরি তাঁর আধ্মাতিকতা ও মরমি তাত্ত্বিকতা দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ব্যাপকতা লাভ করেছে। আশুতোষ ভট্টাচার্যের উক্তি ‘কুষ্টিয়া বাউলের লীলা ভুমি।’ তবে সত্যিকার অর্থে কুষ্টিয়া অঞ্চল (নদীয়া, যশোর, ফরিদপুর, পাবনা ও মেহেরপুর) শুধু ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই নয়; দীর্ঘকাল আগ থেকেই মধ্যবঙ্গের এ অঞ্চলে পল্লী জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেড়ে উঠেছিল মুসলিম ফকির ও বাউলপন্থ হিন্দু বৈষ্ণবেরা। এরই পরবর্তীতে এ অঞ্চল বাউল প্রধান হয়ে ওঠে (কুমারখালী, খোকসা, চাপড়া-ভাঁড়রা, ছেঁউড়িয়া, হরিনারায়নপুর ও শিলাইদহ)। আর এই ভূমিতেই আসেন বাউল সম্রাট লালন ফকির। লালনের জীবন কাহিনী রহস্যাবৃত। তাঁর জন্ম স্থান, ধর্ম ও জাতিগত পরিচয় নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। তিনি নিজেকে কোনো জাত-ধর্মের মধ্যে রাখতে চাননি। তাইতো তিনি নিজেই বলেছেন“ সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে”। লালন গবেষক ড. আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, ‘লালন ফকির ছিলেন সত্যের উপাসক। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী, অসামপ্রদায়িক ও লোক কল্যাণকামী।’

গবেষকদের আনুমানিক বিবরণে জানা যায়, ১৭৭৪ সালে কুষ্টিয়া (তৎকালীন নদীয়া) জেলার কুমারখালী উপজেলার চাপড়ার ভাঁড়রা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। গড়াই পাড়েই এই গ্রামেই তাঁর বেড়ে ওঠা। বাবা মাধব কর ও মা পদ্মাবতী। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান লালন। আর্থিক অসঙ্গতির কারণে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সুযোগ পাননি। তিনি জীবনে কখনো বিদ্যালয়ে যাননি। লালন চিলেন স্বশিক্ষিত। লালনের বেড়ে ওঠা গ্রামটি চাপড়া ভাঁড়রা জনসংস্কৃতিতে পরিপূর্ণ ছিল। এখানকার সকল বয়সি মানুষ সন্ধ্যায় আড্ডায় বসতেন লোকগান, বাউল গান, কবি গান ও কীর্ত্তন নিয়ে। এখানে বসবাস কালে একবার প্রতিবেশীদের বৈরীতায় আবাসন পাল্টে একই গ্রামের দাসপাড়ায় যেতে হয়। সেখান থেকে বাউল দাসদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে/ নবদীপে নদী পথে গঙ্গাস্নান/ তীর্থ ভ্রমনে যান লালন। ফেরার পথে নৌকায় মহামারী বসন্ত রোগ দেখা দেয় লালনের শরীরে। ছোঁয়াছে এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সঙ্গীয়রা তাঁকে নদীতে ফেলে পালিয়ে যায়। পরে তারা লালনের মা ও স্ত্রীর কাছে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দেয়। দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু সবাই স্বীকার করে নেয়।

এদিকে নদীকুল থেকে ছেঁউরিয়ার মুসলমান রমনী নদীকুল থেকে লালনকে মুমূর্ষু অবস্থায় তুলে নিয়ে যায়। সেবা শুশ্রূষার পর আরোগ্য লাভ করে নিজগৃহ ভাঁড়রার নিজ বাড়িতে ফিরে যান লালন। মা ও স্ত্রী অভাবনীয় প্রত্যাবর্তনে অভিভূত হলেও তাঁকে সমাজে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। হতাশ লালন ফিরে আসে ছেঁউরিয়ার বর্তমান আখড়াবাড়ীতে। যৌবনে গৃহত্যাগী লালন আবারও আশ্রয় নেন মলম শাহ এর বাড়িতে। এখানেই বসবাস শুরু করেন। সান্নিধ্য পান তত্ত্বজ্ঞান সিদ্ধ বাউল গুরু সিরাজ সাঁইয়ের। এরপর থেকে লালন নিরাশ্রয়ের মাঝে বৈরাগ্য জীবনের নতুন দিশা খুঁজে পান। দীক্ষিত হয়ে বেড়িয়ে পড়েন দেশ-বিদেশে। এরই মাঝে তিনি এপার-ওপার বাংলায় অসংখ্য ভক্ত সৃষ্টি করেন। দেশ ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে তিনি আধ্যত্মবাদ মরমি গান রচনা শুরু করেন।

‘ওরে আমার পুনা মাছের ঝাঁক এসেছে’ লালনে এই কথা শোনা মাত্রই শিষ্যরা ছুটে এসে কাগজ কলম ধরতো, আর লালন ফকির বলে যেতেন। তার সকল গানই সাধন সিদ্ধ। ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর-সেথায় এক পড়শি বসত করে-আমি একদিন না দেখিলাম তারে’, মুখে-মুখে রচিত এসব গান শিষ্যরা সংগ্রহে রাখতো। তবে তার মোট ৮’শ গান পাওয়া গেলেও অসংখ্য গান মানুষের মুখে-মুখে ছড়িয়ে রয়েছে। এই গানের সুর এবং বাণীর প্রতি মুগ্ধ হয়ে দু’বঙ্গে হাজার হাজার ভক্তকুল লালন তত্ত্বে মুগ্ধ হয়। বর্তমানে তাঁর ভক্তের সংখ্যা লাখ লাখ পেরিয়ে গেছে। লালনের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক ছিল ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার সম্পাদক কাঙ্গাল হরিনাথের। তাঁর কয়েকটি গানও সেখানে ছাপা হয়েছে এই পত্রিকায়। তিনি ঘোড়ার পিঠে চড়ে কুমারখালী কুন্ডুপাড়ার ঐতিহাসিক এম এন প্রেসেও যেতেন। একবার ঠাকুর জমিদারের লাঠিয়ালরা কাঙ্গাল হরিনাথের প্রেসে আক্রমণ করতে যায়। খবর পেয়ে লালন তাঁর বাউলদের নিয়ে তা রক্ষা করেছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কোনো দেখা সাক্ষাতের যোগসূত্র পাওয়া যায় না বললেও রবীন্দ্রনাথ নাকি কলকাতা যাবার পথে লালনের আখড়াবাড়ীতে বসে লালনের বাউল গানে মুগ্ধ হতেন এবং আখড়া বাড়ি থেকে রবীন্দ্রনাথ লালন ফকিরের খাতা নিয়ে সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়। সিরাজ সাঁই এর থেকে লালন শাহ উপযুক্ত শিক্ষা নিয়ে দেশ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। বঙ্গদেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে তিনি বাঙলা ১২৩০ সালে ছেঁউরিয়ায় স্থায়ীভাবে আখড়া গড়ে তোলেন। পরে এই আখড়া বাড়ীতেই তাঁর সাধন ভজন চলতো। তাঁর নির্দেশেই ভক্ত অনুসারীরা আয়োজন করতো দোল পূর্ণিমার উৎসব। এই উৎসবে দুই বাঙলার বিভিন্ন জেলা ও আশ্রম থেকে অসংখ্য বাউল, ফকির ও অনুসারীরা আসতেন সাঁইজী লালন ফকিরের চরণে ভক্তি দিতে। ঊনবিংশ শতাব্দির নানা ক্রান্তিকালে লালন সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে নিজেকে প্রকাশ করেন। লালন সার্বক্ষনিক ব্যাপৃত থাকতো বাউল মতাদর্শ নিয়ে। মানব কল্যাণকামী বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ শেষ দিনগুলোতেও সব সময় শিষ্যদের নিয়ে পরিবেষ্টিত থাকতেন।

একদিকে বার্ধক্য অন্যদিকে পেটের পীড়ায় ক্রমেই তাঁকে অসুস্থ করে তোলে। বিছানাগত হয়েই শিষ্যদের গান্ল শুনতেন। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (১২৯৭ সালের ১ কার্তিক) শুক্রবার তিনি ভীষণ অসুস্থবোধ করেন। রাত প্রায় শেষ। শিষ্যরা ‘পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে/ ক্ষম হে অপরাধ আমার ভাব কারাগারে।’ গানও শেষ হয় লালন ফকির বলে ওঠেন ‘আমি চলিলাম।’ স্তব্ধ হয়ে যায় তার দেহ। ১১৬ বছর বয়সে তিনি দেহ ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর কোনো ধর্মীয় অনুস্বর্গ হয়নি। শুধু বাউল সম্প্রদায়দের নিয়ে মহোৎসব হয়েছিল। মৃত্যুকালে তিনি সেবা সঙ্গীনি বিশোখা ও ধর্ম কণ্যা পিয়ারীকে রেখে যান। এছাড়া তাঁর আখড়ায় নগদ দুই হাজার টাকা ও কিছু গৃহস্থ’লির জিনিসপত্র ছিল। কারিগর মলম শাহ’র দানকৃত সাড়ে ১৬ বিঘা জমির ওপর আখড়া বাড়িটি ছিল খড়ের তৈরী বারান্দা যুক্ত চৌচালা ঘর। বাউল সম্রাট লালনের ইচ্ছানুযায়ী আখড়ার ভেতরেই তাঁর সমাধিস্থ হয়েছিল।

এরপর থেকেই প্রতিবছর লালন স্মরণোৎসবে সাড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে হচ্ছে। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য লালন ভক্ত আখড়াবাড়িতে এসে সমবেত হয়। দিনদিন লালন গবেষকদের পদচিহৃও পড়ে জোড়ালোভাবে। তবে আখড়াবাড়ির প্রতিবেশ সাহিত্যনুকুল না হওয়ায় অনেকেই হতাশ হন। লালন আজ এক ইন্সটিটিউট। এখানে শিক্ষিত-অশিক্ষিতের মিলন মেলায় বহু ভাষাভাষিদের যোগসূত্রায়ন হবে এই স্বাভাবিক। বাংলার জনসংস্কৃতি লোকশিল্পকে লালন বিশ্বের দরবারে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন একথা হাজার বার সত্য। তাঁর অধ্মাতবাদ সম্পর্কে সিদ্ধ হচ্ছেন বর্তমান সাহিত্যবিশ্বের অসংখ্য গবেষক ও ভক্ত।

তবুও জাতীয়ভাবে সঙ্গীতে লালন একাডেমি পুরস্কার প্রবর্তনের কথা কেউ চিন্তা করেনি যা সংস্কৃতির স্বার্থে দরকারী। মরমী বাউল সাধক ও অতি উচ্চাঙ্গের লোককবি বাউল সম্রাট লালন শাহের বহু ভক্ত প্রতিদিনই তাঁর ছেঁউরিয়া মাজারে সমবেত হয়ে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক গান ও তাঁর কর্মকান্ড ও জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করে থাকেন। দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক মাজারটি দর্শনের জন্য প্রতিদিনই ভিড় জমান।

 

লেখকঃ কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত