পরের বিশ্বকাপে যাদের মিস করবে ক্রিকেট বিশ্ব

Reading Time: 4 minutes  আগামী ৩০ মে লন্ডনের ওভালে স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা ওঠছে ২০১৯ বিশ্বকাপের।   বিশ্বকাপ মানে মহা তারকা হওয়া, আবার পতন ঘটে অনেক তারকার। এবারের আসরের পর অনেক তারকাকেই খেলতে দেখা যাবে না বিশ্বকাপের পরের আসরে। অর্থাৎ এটাই হতে যাচ্ছে তাদের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ। তার আগে সেইসব ক্রিকেটারদের দিকে চোখ দেওয়া যাক, এই বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে যাদের শেষ! মাশরাফি বিন মর্তুজা (বাংলাদেশ) : চোট বাগড়া না দিলে এটা হতে পারত মাশরাফি বিন মর্তুজার পঞ্চম বিশ্বকাপ। ২০০৩ বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই তারকা পেসার নিজ দেশের মাটিতে ২০১১ বিশ্বকাপে দর্শক বনে গিয়েছিলেন। সেখানেই থেমে যেতে পারতো তার ক্যারিয়ার! তবে মাশরাফি হার মানার পাত্র নন! চোটের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করে বারবার বিজয়ী হয়েছেন তিনি। ফিরেছেন ক্রিকেট মাঠে। এই অদম্য মানসিকতার কারণেই বাংলাদেশের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপে অধিনায়কত্ব করার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছেন ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’। আগের তিন আসর মিলিয়ে বিশ্বকাপে মোট ১৬টি ম্যাচ খেলেছেন মাশরাফি। নিয়েছেন ১৮ উইকেট। একেকটা উইকেট নিতে খরচ করেছেন ৩৬.০৫ রান। ওভারপ্রতি রান দেওয়ার গড় ৪.৯৪। মাশরাফির সেরা বোলিং সাফল্য ভারতের বিপক্ষে, ওই ২০০৭ আসরে। সুইংয়ের ভেলকি দেখিয়ে আর গতির ঝড় তুলে ৩৮ রানে নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। আর গেল আসরে ৫ ম্যাচ খেলে তিনি শিকার করেছিলেন ৭ উইকেট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাশরাফি পালন করছেন ভিন্ন এক ভূমিকা। একা হাতে দলকে জিতিয়ে দেওয়ার মতো পারফরম্যান্স হয়তো তার ঝুলিতে নেই, কিন্তু টাইগারদের প্রতিটি জয়ের আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে তার অবদান। নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে রানের গতি আটকে রাখা কিংবা দরকারের মুহূর্তে প্রতিপক্ষের উইকেট তুলে নিয়ে ব্রেক থ্রু আনা কিংবা কাপ্তান হিসেবে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া- সবক্ষেত্রেই দারুণ সফল তিনি। আয়ারল্যান্ড তথা ইংল্যান্ডের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার আগে মাশরাফি বলেছিলেন, নিজের শেষ বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত কোনো লক্ষ্য রাখছেন না তিনি। খেলতে চান দলের জন্য। স্পট করে বললে, জেতার জন্য। মাশরাফির সেই প্রার্থনা প্রতিধ্বনিত হয়েছে দেশের প্রতিটি ক্রিকেটপ্রেমীর অন্তরে। তাদের সবারও একটাই কামনা- ‘জয়’! নিজের কাছে বয়স কোন বিষয় না হলেও ২০১৯ হতে পারে তার শেষ বিশ্বকাপ। মহেন্দ্র সিং ধোনি (ভারত) :  ক্যাপ্টেন কুল নামেই ক্রিকেট মহলে পরিচিত। বয়স এই মুহূর্তে ৩৭। ক্রীড়াঙ্গন থেকে বিদায় নিলেও ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে মহেন্দ্র সিং ধোনির নাম। অনেক বিশেষজ্ঞদের মতেই তিনি সর্বকালের সেরা উইকেটকিপার। তার নেতৃত্বেই ভারত ২০১১-র বিশ্বকাপ এবং ২০১৩-র চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতে। অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৩৪১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড ক্যারিশম্যাটিক এই ক্রিকেটারের দখলে। যেখানে ৯০টি টেস্টে করেছেন ৪৮৭৬ রান। ৩৪১ ওয়ানডেতে ৫০.৭২ গড়ে তার মোট রান ১০,৫০০! এছাড়া ৯৮টি টি-টুয়েন্টিতে ৩৭.৬০ গড়ে ১৬১৭ রানের মালিক এই উইকেট রক্ষকের। ২০১৪ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন ধোনি। ২০১৮ সালে ফর্ম হারিয়ে সমালোচনায় মুখর ছিলেন তিনি। তবে এ বছর অস্ট্রেলিয়া সফরে তিন ওয়ানডের সব ম্যাচেই হাফ সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বিশ্বকাপের আগে ফর্মে ফিরেছেন দুর্দান্তভাবে। নির্বাচিত হয়েছিলেন সিরিজ সেরা খেলোয়াড়। আইপিএলেও ধরে রেখেছেন সেই ফর্ম। তার দল হয়েছে রানার-আপ (চেন্নাই সুপার কিংস)। ইংল্যান্ডে আনুষ্ঠিতব্য আসন্ন বিশ্বকাপ শেষেই ধোনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেবেন বলে ধারণা করছেন অনেকেরই। শোয়েব মালিক (পাকিস্তান) :  ২০১৫তে সাদা পোশাক থেকে অবসর নেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শোয়েব মালিক। বয়স ৩৭। টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলেও ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি খেলে যাচ্ছেন তিনি। ক্রিকেটের সব ফ্যারমেটেই তার রয়েছে সমৃদ্ধ রেকর্ড। ৩৫ টেস্টে বল হাতে ৩২টি উইকেটসহ তার মোট রান ১৮৯৮। ওয়ানডেতে ২৮৪ ম্যাচ খেলে ৭৫২৬ রান ও ১৫৭টি উইকেট রয়েছে তার দখলে। ১১১ আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টিতে ২২৬৩ রান ও উইকেট ২৮টি। ১৯৯৯তে অভিষেকের দুই দশক পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে পারেন মালিক। মোহাম্মদ হাফিজ (পাকিস্তান):  এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম সিনিয়র ক্রিকেটার হাফিজ। বয়স ৩৮। বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। দেশের হয়ে ২১০টি ওয়ানডে খেলেছেন এই পাক ক্রিকেটার। রান করেছেন ৬৩৬১। বল হাতে উইকেট নিয়েছেন ১৩৭টি! ২০১৯ বিশ্বকাপের পরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে পারেন তারকা এই ব্যাটসম্যান। সরফরাজ আহমেদ (পাকিস্তান): ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদের অধীনে খেলবে পাকিস্তান। বয়স ৩১। বয়সের বিবেচনায় তারও এই বিশ্বকাপের পর খেলার সম্ভাবনা কম। তা ছাড়া তরুণদেরও সুযোগ দেয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে বিশ্বকাপ আর নাও খেলতে পারেন তিনি। অর্থাৎ এটাই হতে পারে তার শেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট। সরফরাজ এখন পর্যন্ত ওয়ানডের ১০৬টি ম্যাচ খেলে ২১২৮ রান করেছেন। টি-টুয়েন্টিতে করেছেন ৫৫ ম্যাচে ৭৪৫ রান। লাসিথ মালিঙ্গা (শ্রীলঙ্কা) :  ৩৫ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কান গতি তারকা লাসিথ মালিঙ্গাও এবারের বিশ্বকাপের পর অবসর নেওয়ার কথা বলে রেখেছেন। এবারের আসর মিলিয়ে ৩টি বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বহুবার নিজের বোলিং ক্যারিশমা দিয়ে দলকে জিতিয়েছেন তিনি। ইনজুরির কারণে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার আগে ৩০ ম্যাচে শিকার করেছেন ১০১ উইকেট। ২০১৮ ওয়ানডেতে শিকার ৩২২ উইকেট। ৭৩ টি-টুয়েন্টিতে উইকেট ৯৭টি। দলের প্রয়োজনে অনেক সময় জ্বলে ওঠছেন ডান-হাতি এই মিডিয়াম ফাস্ট বোলার। তবে তিনি দক্ষ বল হাতে; এর আগে বিশ্বকাপে দুবার হ্যাটট্রিকও করেছেন তিনি, যে রেকর্ডটি একমাত্র তারই দখলে। মালিঙ্গা ছাড়া অন্য কেউই এই রেকর্ডে এখনো ভাগ বসাতে পারেননি। ইমরান তাহির (দক্ষিণ আফ্রিকা): তার নাম শুনলেই মনে পড়ে পাখির ডানা মেলার ঢঙে দুহাত মেলে আগ্রাসী উদযাপনের কথা। বয়স ৪০। এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বয়স্ক ক্রিকেটার তিনি। ৩২ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় দলে সুয়োগ পান এই লেগ ব্রেক বোলার! ২০১১-র বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশ ঘটে তার। তার পর থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ৯৮টি ওয়ানডেতে মোট ১৬২টি উইকেট নিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট লিগে বল হাতে উজ্জ্বল ছিলেন তিনি। এটা নিশ্চিত যে তারকা এই বোলার এবারের বিশ্বকাপের পর নিজের জার্সিটি তুলে রাখবেন। জেপি ডুমিনি (দক্ষিণ আফ্রিকা) :  এক সময়ের বেশ পরিচিত নাম জেপি ডুমিনি। বয়স ৩৫। ইনজুরির কারণে দলের সঙ্গে নিয়মতি খেলা হয়নি তার। তবুও এখন পর্যন্ত ১৯৪টি ওয়ানডে ম্যাচে ৫০৪৭ রান করেছেন তিনি। এছাড়া টি-টুয়েন্টিতে বেশ উজ্জ্বল ডুমিনি। ৮১ ম্যাচে করেছেন ১৯৩৪ রান। বিশ্বকাপের পর ওয়ানডে দলেই হয়তো আর পাওয়া যাবে না তাকে। হামিদ হাসান (আফগানিস্তান) :  হামিদ হাসান, বয়স ৩১। বিশ্বকাপের আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, আসন্ন ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের পর ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে যাচ্ছেন তিনি। ইনজুরির কারণে দলের হয়ে তেমন কিছুই করতে পারেননি। ওয়ানডেতে ৩৩টি ম্যাচে ১২০৮ রান দিয়ে ৫৮টি উইকেট শিকার করেছেন হামিদ। ক্রিস গেইল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ) :  এবারের বিশ্বকাপে গেইলের খেলা নিয়ে ছিল শঙ্কা। ক্রিকেট দুনিয়ার এমন অনেক রেকর্ড আছে তার দখলে যার আসে পাশেও কেউ নেই। কিন্তু মাঝে কিছু সময় নিজের ফর্ম হারিয়ে বসেন তিনি। তবুও ৩৯ বছর বয়সী এই ক্রিকেট দানবকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নির্বাচকরা আরেকটি সুযোগ দিয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত এই বিশ্বকাপই তার শেষ বিশ্বকাপ! বিশ্বের অন্যতম বিধ্বংসী ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৮ হাজারেরও বেশি রান করেছেন। যেখানে ওয়ানডেতে ২৮৯ ম্যাচ খেলে করেছেন ১০১৫১ রান! টেস্টে ১০৩ ম্যাচে ৭২১৪ এবং টি-টুয়েন্টিতে মাত্র ৫৮টি ম্যাচে করেছেন ১৬২৭ রান! ডেভিড ওয়ার্নার (অস্ট্রেলিয়া) :  ৩২ বছর বয়সী এই অজি তারকা কিছুদিন হলো নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে জাতীয় দলে ফিরেছেন। দেশের হয়ে এই ওপেনার এবারের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত কিছু করবেন এমন ধারণা অনেকের। কেননা যে পরিমাণ ফর্মে আছেন তিনি তাতে এমনটি বলাই যায়। ওয়ানডেতে দেশের জার্সি গায়ে এই তারকার রান ৪৩৪৩ তাও মাত্র ১০৬টি ম্যাচ খেলে! সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটেও দুর্দান্ত ব্যাটিং করেন তিনি। ৭০টি ম্যাচ খেলে করেছেন ১৭৯২ রান! এবারের বিশ্বকাপ হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপ এমনটি অনেকের ধারণা!       .          

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>