Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Leela Majumdar

লীলা মজুমদারের শিশুতোষ দুটি গল্প

Reading Time: 6 minutes

লীলা মজুমদার একজন বাঙালি লেখক। ফেব্রুয়ারি ২৬, ১৯০৮ সনে তিনি কলকাতার রায় পরিবারের প্রমদারঞ্জন রায় ও সুরমাদেবীর সন্তান (বিবাহপূর্ব নাম লীলা রায়)। তাঁর জন্ম রায় পরিবারের গড়পাড় রোডের বাড়িতে। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (যাঁর পৈতৃক নাম ছিল কামদারঞ্জন রায়) ছিলেন প্রমদারঞ্জনের ভাই এবং লীলা মজুমদারের কাকা। সেইসূত্রে লীলা মজুমদার হলেন সুকুমার রায়ের খুড়তুতো বোন এবং সত্যজিৎ রায়ের পিসি। লীলা মজুমদারের ছোটবেলা কাটে শিলঙে যেখানকার লরেটো কনভেন্টে তিনি পড়াশোনা করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজী পরীক্ষায় তিনি ইংরাজীতে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেন। তিনি অনেক বাংলা গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাসের রচনা করে অনেক পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেন। তিনি অনেক শিক্ষামূলক রচনা ও রম্যরচনা ইংরাজী থেকে বাংলায় অনুবাদও করেন। ১৯৩৩ সালে লীলা মজুমদার বিবাহ করেন দন্ত চিকিৎসক ডাঃ সুধীর কুমার মজুমদারকে। এই বিবাহে তাঁর পিতার প্রবল বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তার স্বনির্বাচিত পাত্রকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন। পিতৃ পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট থাকলেও পিতার সঙ্গে সম্পর্ক চিরকালের মতো ছিন্ন হয়। বিবাহিত জীবনে লীলা-সুধীর খুব সুখী দম্পতি ছিলেন। স্বামী আজীবন লীলা মজুমদারের সাহিত্য চর্চায় উৎসাহী ছিলেন। তাঁদের একপুত্র ডাঃ রঞ্জন মজুমদার ও এক কন্যা কমলা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রথম গল্প লক্ষ্মীছাড়া ১৯২২ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায় সন্দেশ পত্রিকা পূনর্জীবিত করলে তিনি ১৯৬৩ থেকে ১৯৯৪ অবধি সাম্মানিক সহ-সম্পাদক হিসাবে পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ১৯৯৪-এ তাঁর স্বাস্থের অবনতির জন্য অবসর নেন। তাঁর সাহিত্য জীবন প্রায় আট দশকের। ৫ এপ্রিল ,২০০৭ তিনি মারা যান।

তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনা হল ঃ-    হলদে পাখির পালক    টং লিং    পদি পিসীর বর্মী বাক্স    সব ভুতুড়ে

গুপির গুপ্তখাতা  ইত্যাদি রচনা আল টাইম ফেবারিট। বড়দের জন্যও কলম ধরেছেন , পাকদণ্ডী , ‘আর কোনখানে’, রান্নার বই ইত্যাদি।

পাকদণ্ডী নামে তাঁর লেখা আত্মজীবনীতে তাঁর শিলঙে ছেলেবেলা, শান্তিনিকেতন ও অল ইন্ডিয়া রেডিওর সঙ্গে তাঁর কাজকর্ম, রায়চৌধুরী পরিবারের নানা মজার ঘটনাবলী ও বাংলা সাহিত্যের মালঞ্চে তাঁর দীর্ঘ পরিভ্রমণের কথা বর্ণিত হয়েছে। পুরস্কার ও সম্মাননা ঃ-    আনন্দ পুরস্কার    শিশু সাহিত্য পুরস্কার

আজ থাকছে তার দুটি গল্পঃ

হাতি আর দরজির গল্প

এক রাজার মোতি বলে চমৎকার এক হাতি ছিল। যেমনি তার বুদ্ধি, তেমনি তার খোসমেজাজ। সবাই তাকে ভালোবাসত। শহরের ধার দিয়ে কুলকুল করে সুন্দর এক নদী বয়ে যেত। সেই নদীতে দাউদ বলে এক মাহুত রোজ  মোতিকে স্নান করতে নিয়ে যেত। হাঁটুজলে নেমে, শুড় দিয়ে জল ছিটিয়ে মহা আনন্দে মোতি স্নান করত। তারপর আবার ওই একই পথে রাজবাড়ির হাতিশালে তারা ফিরে যেত। পথটি রাজবাড়ির সিংহদরজা থেকে একেবারে নদীর তীর পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। মাঝখানে শহরের বড়ালোকেদের বাড়ি, বাগান, তারপর বাজার হয়ে তবে নদীতে পৌঁছোতে হত। ওই বাজারে একটা দরজির দোকান ছিল। দরজির সঙ্গে দাউদের বড়ো ভাব। রোজ ওইখান দিয়ে যাবার সময় দাউদ মোতিকে থামতে বলে, তার ঘাড়ের ওপর বসে বসেই দরজির সঙ্গে গল্প করত। দরজি মোতিকেও খুব ভালোবাসত। মোতি মিষ্টি খেতে ভালোবাসে শুনে রোজ তার জন্যে দরজি কিছু না-কিছু রেখে দিত। মোতি এসে দাঁড়িয়েই মিষ্টির আশায় শুড় বাড়িয়ে দিত। আর দরজি অমনি তাকে হয় একটা মিষ্টি ফল, নয় একটা লাড়ু, কি বরফি, কি বাতাসা দিত। সেটাকে মুখে ফেলে, চোখ বুজে মোতি তারিয়ে-তারিয়ে খেত। তারপর দাউদের গল্প করা শেষ হলে, ওরা আবার নদীর দিকে চলত। এর মধ্যে একদিন হয়েছে কি, দরজির কাছে একটাও ফল, মিষ্টি বা কোন খাবার ছিল না, যা মোতিকে দেওয়া যায়। দরজির কেমন দুষ্টু বুদ্ধি জাগল। যেই মোতির শুড় বাড়িয়ে দিয়েছে, অমনি দরজি তার হাতের ছুঁচটি শুড়ের ডগায় ফুটিয়ে দিয়েছে। শুড়ের ডগাটি মানুষের ঠোটের মতো নরম। মোতির তাই খুব ব্যথা লাগল। তবু সে শুড়টি সরিয়ে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দাউদের গল্প শেষ হলে দুজনে রোজকার মতো নদীতে গেল। খুব জল ছিটিয়ে স্নান করল মোতি সেদিন। দাউদের মনে একটু ভাবনা ছিল, দরজি কাজটা ভালো করেনি। কী জানি, হাতির মেজাজ যদি বিগড়ে যায়। তাই জলে নেমে মোতির ফুর্তি করে স্নান করা দেখে দাউদও নিশ্চিন্ত হল। এবার ফেরার পালা। অন্যদিন ফেরার পথে কোথাও থামা হয় না। ওরা। সোজা বাড়ি ফেরে। আজ দরজির দোকানের সামনে পৌছে মোতি নিজের থেকেই থামল। দাউদ ভাবল কী ব্যাপার! এমন সময় শুড় তুলে এক শুড়-ভরতি কাদাজল মোতি দরজির গায়ে ও মাথায়; তার হাতের সাদা রেশমি কাপড়ের ওপর পিচকিরির মতো ছিটিয়ে দিয়ে ধীরেসুস্থে আবার পথ ধরল।। হাতের সেলাই নষ্ট হল বলে দরজি হায়-হায় করতে লাগল, দাউদকে আর তার হাতিকে গালি দিতে লাগল। তখন সামনের দোকানের পানওয়ালা বলল, “ঠিক হয়েছে, যেমন কর্ম, তেমনি ফল। তুমি ভেবেছিলে বোবা জানোয়ার অন্যায় বোঝে না। তাই বেচারির শুড়ে ছুঁচ ফোটালে। হাতি যেমন-তেমন জানোয়ার নয়। ওরা সব বোঝে, সব মনে রাখে। অন্যায় করলে ওরা সাজা না দিয়ে ছাড়ে না। ভালো চাও তো কাল ওর জন্য একটা ভালো খাবার রেখো। তাই রেখেছিল দরজি। মোতির সঙ্গে আবার তার ভাব হয়ে গেছিল।

 
আরো পড়ুন: লীলা মজুমদারের গল্প ক্যাবলাকান্ত

বদ্যিনাথের বড়ি

দাদার ফাউন্টেন পেন হারিয়ে গেল; চিনুদার কবিতার খাতা হারিয়ে গেল; বদ্যিনাথের নতুন চটি হারিয়ে গেল গোরামামার বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে; সেইদিনই আবার পার-সাহেবের ছাতাও কোথায় হারিয়ে গেল; ছোড়দির চুড়ি ড্রেনের ভিতর তলিয়ে গেল, এত সব গেল কোথায়? তারকিচ্ছু মোটে কোত্থাও পাওয়াই গেল না। অথচ সেই লোক দুটো কত কাদা ওঠাল! রাত্রে মাস্টারমশাই পড়াতে আসেন, বুবু পড়ে না, কলু পড়ে।—রোজ রাত্রে, রবিবার ছাড়া। কলু কত সময়ে সেই দুজনের কথা ভাবে, সন্ধি-সমাস গোল হয়ে যায়, মাস্টারমশাই রেগে কাঁই! বলেন, ‘ওরে আহাম্মুক! আমার ছেলে বিধুশেখর তোর অর্ধেক বয়েসে তোর তিনগুণ পড়া শিখত।’ ছেলে বটে ওই বিধুশেখর। তার কথা শুনে শুনে কলু তো হেদিয়ে গেল। সে কক্ষনো হাই তুলত না, কক্ষনো চেয়ারে মচ্মচ্ শব্দ করত না, কক্ষনো চটি নাচাত না। প্রথম প্রথম কলু ভাবত তা হলে সে বোধ হয় এত দিনে নিশ্চয় মরে গিয়েছে। কিন্তু মাস্টারমশাই বলেছেন সে নাকি বিয়ে করে কোথায় পোস্টমাস্টারি করে। একদিন বদ্যিনাথ কতকগুলো সাদা বড়ি এনেছিল। বলেছিল ওগুলো নাকি ছানা বাঁদরের রস দিয়ে তৈরি, কোনো কবিরাজের কাছ থেকে এনেছে। নাকি অনেকদিন আগে মানুষদের পূর্বপুরুষরা বাঁদর ছিল, সেই বাঁদুরে রক্ত মানুষের গায়ে আছেই আছে, ওই আশ্চর্য বড়ি খেলে তাদের আবার বাঁদর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে—ওই একরকম ধাত কিনা! কলু তার দুটো বড়ি চেয়ে রাখল, কাজে লাগাতে পারে। মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি বহুদূরে, উনি তবু রোজ ঠিক সময়ে এসে উপস্থিত হতেন। কী সখ বাবা পড়াবার! মাঝে মাঝে দাদারা এসে মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে গল্প জুড়ত, কলুকে শব্দরূপ মুখস্থ করতে হত। কলুর চোখ বুজে আসত, মাথা ঝিমিঝম্ করত, আর দাদারা শুধু কথাই বলত। কলু দড়িবাঁধা ছেলেটার কথা ভাবত, আর শুনতে পেত পাশের বাড়ির ছোটো ছেলেরা খেতে বসে হল্লা করছে। আর ভাবত, এমন অবস্থায় পড়লে মাস্টারমশাইয়ের ছেলে সেই বিধুশেখর কী করত! এক-একদিন যেই পড়া শেষ হয়ে আসত, বাইরে ঝমঝম্ করে বৃষ্টি নামত। মাস্টারমশাই হয়তো বাড়িতে ছাতা ফেলে আসতেন, আটকা পড়তেন। কলু ব্যস্তভাবে বলত, ‘ছাতা এনে দিই, ভালো ছাতা?’ মাস্টারমশাই বলতেন, ‘না না, থাক্, থাক্। একটু বসে যাই।’ কলু আবার সেই মচ্মচে চেয়ারটাতে বসত। মাস্টারমশাই তাঁর ছোটোবেলাকার অনেক গল্প বলতেন। তখন বাবাও নাকি ছোটো ছিলেন, একসঙ্গে ইস্কুলে পড়তেন, পুজোর সময় কাদের বাড়ি যাত্রাগান হত, পালিয়ে গিয়ে শুনতেন। কলুর চোখ জড়িয়ে আসত, হাই তুলতে সাহস হত না; ভাবত এতক্ষণে সেই দড়িবাঁধাটা নিশ্চয়ই ঘুমুচ্ছে। হাইগুলো মাথায় গিয়ে জমাট বাঁধত, চমকে জেগে যেত, শুনত মাস্টারমশাই বলছেন, ‘দে বাবা, ছাতাই দে। এ আর আজ থামবে না।’ কলু ছুটে ছাতা এনে দিত, মাস্টারমশাই চলে যেতেন আর কলুর ঘুমও ছুটে যেত। এমনি করে দিন যায়। একদিন বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, মাস্টারমশাই বিধুশেখরের কথা বলছেন। সে শ্বশুরবাড়ি যাবার আগে কক্ষনো বায়স্কোপ দেখেনি, থিয়েটারে যায়নি, বিড়ি টানেনি, গল্পের বই খোলেনি। বলতে বলতে মাস্টারমশাই বললেন, ‘ওরে, চুপিচুপি দুটো পান সেজে নিয়ে আয় তো দেখি।’ কলু দৌড়ে গেল, পান দিল, চুন দিল, দুটো করে এলাচ-দানা দিল, বড়ো-বড়ো সুপুরির কুচি দিল, আর সব শেষে কি মনে করে বদ্যিনাথের সেই আশ্চর্য বড়িও একটা করে গুঁজে দিল। মাস্টারমশাই একটা পান তক্ষুনি মুখে পুরে দিলেন, একটা বইয়ের মতন দেখতে টিনের কৌটোতে ভরলেন। কলু তাক করে রইল। প্রথমটা কিছু মনে হল না—তার পর ভালো করে দেখল, মনে হল মাস্টারমশাইয়ের কপালের দিকটা কিরকম যেন লম্বাটে দেখাচ্ছে, থুতনিটা যেন ঢুকে পড়েছে, চোখ দুটোও কিরকম পিটিপট করতে লাগল। কলুর বুকের ভিতর কেমন ঢিপিঢপ্ করতে লাগল। মাস্টারমশাই বাড়ি যান না কেন? যদি হঠাৎ ল্যাজ দলিয়ে হুপ্ করেন? এমন সময়ে বৃষ্টি থেমে গেল, মাস্টারমশাই ধুতির খুঁটটা কাদা থেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে চলে গেলেন। কলু ভাবতে লাগল, কদিন আর ধুতির খুঁট? অন্য পানটা বিধুশেখর বোধ হয় আজ রাত্রে চেয়ে নেবে, তারপর সেই—বা ধুতি নিয়ে করবে কি! পরদিন বিকেলে বই নিয়ে কলু অনেকক্ষণ বসে রইল, কিন্তু মাস্টারমশাই এলেন না। সন্ধ্যাবেলা বাবা বললেন, ‘ওরে তোর মাস্টারমশাই যে হেডমাস্টার হয়ে বিষ্টুপুর চলে গেলেন।’ কলু ভাবল, বিষ্টুপুর কেন, কিষ্কিন্ধে হলেও বুঝতাম! তারপর বহুদিন চলে গেছে। কলুর নতুন মাস্টার এসেছেন, তাঁর ছেলের নাম বিধুশেখর নয়, তাঁর ছেলেই নেই। তিনি কলুকে রোজ ফুটবলের, ক্রিকেটের গল্প বলেন—কিন্তু কলুর থেকে থেকে মনে হয়, অন্ধকারে ও বাড়ির পাঁচিলে দুটো কি ল্যাজঝোলা বসে আছে! একটার মুখ কেমন চেনাচেনা, অন্যটা বোধ হয় বিধুশেখর!

             

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>