| 29 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

মন ভেসে যাক শৈশবের হাত ধরে

আনুমানিক পঠনকাল: 11 মিনিট

বলা হয় সাহিত্য একটি সমাজের আয়না বিশেষ। তাতে সে চিত্রই প্রতিফলিত হয় একটি সমাজ বা দেশে যা চর্চিত হয়ে থাকে। তারই নিরিখে ধরে নেয়া হয় জাতি হিসেবে মেধা-মননে কে কতটা অগ্রসর, ঋদ্ধ। সাহিত্যচর্চায় ব্যক্তির বয়স এবং বিষয়বস্তুর দিকটিকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। কারণ সব রচনা সব বয়সের জন্য সহজবোধ্য এবং পাঠউপযোগী নয়। এমন চিন্তার ভিত্তিতে বিশেষ এক শ্রেণির সাহিত্য সম্ভারকে শিশু কিশোরদের জন্য আলাদা শাখা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে ঐ সাহিত্যের পাঠক শ্রেণিটি কোন বয়সের, তাদের জন্য লিখিত সাহিত্যের বিষয়বস্তু কেমন হতে পারে ইত্যাদিও সুস্পষ্ট হয়ে যায়। একই সাথে শিশু সাহিত্যে জড়িত লেখকদের সামনে বয়স ভিত্তিক বিষয়বস্তু নির্বাচনে যত্নবান হওয়ার সুযোগ থাকে। সাহিত্যিকেরা শিশুর মনস্তত্ত্বকে ধারণ করে তার মনোরঞ্জনের দিকে গুরুত্ব দিয়ে সাহিত্য রচনায় মনোযোগী হন। শিশু কিশোরদের মনোজগতের ভিত্তি পুষ্ট করতে, তাদের মনে স্বপ্ন বুনে দিতে, ন্যায়-নীতি বোধের প্রাথমিক ধারণা জন্ম দিতে, নানা প্রশ্ন তৈরির আগ্রহ সৃষ্টি করতে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি শিশু সাহিত্যের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। আর এসব দিক বিবেচনায় রেখে শিশু-কিশোর সাহিত্যের সূচনা ঘটে। মোটামুটি সমভাবাপন্ন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রাচ্য-পাশ্চত্যের সাহিত্যে এই বিশেষ শাখাটির জন্ম হয়। যার ইতিহাস‌ও বেশ সুপ্রাচীন।

ইতিহাসে যাওয়ার আগে জেনে নেয়া যাক জাতিসংঘের সনদে কোন বয়সকে শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সনদে বলা হচ্ছে-  “a human being below the age of 18 years unless under the law applicable to the child, majority is attained earlier”. অর্থাৎ  ‘শিশু বলতে ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো মানুষকে বোঝাবে’। সেই অর্থে বাচ্চাদের জন্য রচিত সমস্ত সাহিত্যকেই শিশুসাহিত্য বলা হয়।  শৈশব এবং কৈশোরের বয়সসীমা খুবই কম সময়ের গণ্ডীভুক্ত; সেকারণে কিশোরসাহিত্যকে অনায়াসে শিশুসাহিত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। যদিও পাশ্চাত্যে  চরিত্রগত প্রভেদ রয়েছে এই সাহিত্য প্রকরণগুলোয়। প্রাশ্চাত্যে ‘Child Literature’ এর পাশাপাশি ‘Young Readers’ নামে কিশোর সাহিত্যের সমান্তরাল একটা ধারা প্রচলিত। প্রাচ্যে বিশেষত বাংলা ভাষায় এই গোটা অধ্যায়টি শিশুসাহিত্য হিসেবে বিবেচিত। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, বুদ্ধদেব বসু, নবেন্দু সেন, কাজী নজরুল ইসলাম, বন্দে আলী মিয়া, আলী ইমাম, রোকনুজ্জামান খান ছোটোদের জন্য লিখিত সাহিত্যকে সামগ্রিকভাবে শিশুসাহিত্য হিসেবেই অভিহিত করেছেন। অথচ বিষয়ের দিক থেকে এবং রসাস্বাদনের তারতম্যে শিশু ও কিশোরসাহিত্যে কিছু ভিন্নতা আছে এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই।

সামগ্রিকভাবে ছোটোদের জন্য যে সাহিত্য তা ‘শিশুদের মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় রেখেই রচনা করা হয়। এই বয়সসীমার ছেলেমেয়েদের শিক্ষামূলক অথচ মনোরঞ্জক গল্প, ছড়া, কবিতা, উপন্যাস ইত্যাদিকেই সাধারণভাবে শিশুসাহিত্য বলে। শিশুসাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর বিশেষ বক্তব্য, ভাষাগত সারল্য, চিত্র ও বর্ণের সমাবেশ, কলাকৌশলগত আঙ্গিক। শিশুসাহিত্যের বিষয়বৈচিত্র্য অফুরন্ত।’

শিশুদের উপযোগী সাহিত্য রচনার বিষয়বস্তুতে বৈচিত্র গ্রহনের স্বাধীনতা আজকের সময়ে অনায়াস হলেও; এমন একটা সময় ছিল যখন সমাজের হর্তাকর্তাদের বেঁধে দেয়া বিষয়ের উপরই সাহিত্য রচিত হতো। শিশুদের মানসিক বিকাশের চেয়ে আদর্শ চরিত্র গঠনের বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনার রীতি চালু ছিল তখন। প্রাপ্তবয়স্করা দীর্ঘ সময় ধরে নানাভাবে বাচ্চাদের জন্য লিখে গেছেন। তবে সেই প্রাচীন পুস্তকগুলোর আবেদন একটা সময় থিতিয়ে আসে। কেননা তখন শিশুদের লক্ষ্য করে তৈরি বইগুলো কেবলমাত্র তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সাথে সম্পর্কিত ছিল। মানসিক বিকাশের দিকটি ছিল চরমভাবে অবহেলিত। অথচ একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠবার পথে মানসিক বিকাশের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। এই ধারণাটি পুষ্ট হতে অনেক সময় উজিয়ে আসতে হয়েছে আজকের শিশু সাহিত্যের ভুবনকে।

শৈশব পর্বটি যে একজন মানুষের জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলার আদর্শ সময়কাল, এই বোধটা সমাজ সৃষ্টির আদিতে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব পায়নি। শিশু সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে পরিবার-সমাজ কেউ ভাবিত ছিল না। শিশুদের মনোজগতকে সমৃদ্ধ করতে আলাদা করে সাহিত্য সৃষ্টির ভাবনাটাও ছিল বাতুলতা মাত্র। ধারণা করা হয়, লিখিত শিশুসাহিত্যের পর্বকাল শুরুর বহু আগে থেকেই মৌখিকভাবে শিশুদের কাহিনি শোনানোর রীতি রেওয়াজ চালু ছিল প্রাচীন গোত্রগুলোর ভেতর। অবশ্য খুব সচেতনভাবে শুধুমাত্র শিশুদের জন্যেই সেটির সূত্রপাত ঘটেছে, তার সপক্ষে খুব জোরালো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সভ্যতার আদিপর্বে শিকারনির্ভর গোত্রগুলোর জীবনাচরণ বিশ্লেষণ করে এমন একটা ধারণায় পৌঁছানো যায়, যে তারা সারাদিনের পরিশ্রম শেষে আগুন ঘিরে নিজেদের মধ্যে নানা গালগল্পে মশগুল হতো। নারীদের পাশাপাশি শিশুরাও ছিল সেসব গল্পের শ্রোতা। অনেক গোত্রের বয়স্ক গোত্রপতিরা মুখে মুখে মনগড়া নানা গল্প, প্রচলিত উপকথা, কল্পকাহিনি, বীরত্বের গল্প শোনাতেন। পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলেই বিভিন্ন সভ্যতার ভেতর মৌখিকভাবে গল্প, রূপকথা, পৌরানিক কাহিনি বলার প্রথা চালু থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যা কিনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান ছিল। উপমহাদেশীয় বিভিন্ন সভ্যতার ভেতরও কথকদের মাধ্যমে কাহিনি বলার রীতি চালু ছিল। অস্ট্রেলিয়া- আমেরিকান আদিবাসী সংস্কৃতিরও একটি বহুচর্চিত মাধ্যম ছিল এটি। লিখিত সাহিত্য প্রকাশের আগে কথকের মাধ্যমে গল্প বলার এই রীতি ইউরোপেও যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। সামন্ততান্ত্রিক যুগের মধ্যভাগে এই সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটে। মুখে মুখে প্রচলিত বিভিন্ন কেল্লা আর তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনবসতির জীবনযাপনের নানা কাহিনি নিয়ে রচিত ‘The Tale of Castle Cottage’  আজও শিশু সাহিত্য হিসেবে সমাদৃত।

ছাপানো বই বের হওয়ার আগে বই বলতে মূলত হাতে লেখা পুঁথিকে বোঝানো হতো। সেগুলো সাধারণের জন্য সহজলভ্য ছিল না মোটেও। সমাজের উঁচু শ্রেণি ছিল সেগুলোর ভোক্তা। হাতে লেখা পুঁথি তথা বইগুলোকে আকর্ষণীর করতে তাতে নানা ছবি আঁকা হতো। বইগুলোতে শিশু-কিশোরদের জন্য ব্যাকরণ, সংখ্যাগণনা, অলংকার কিংবা সংগীতের পাঠ থাকত। কিন্তু অতিরিক্ত দামি হওয়ায় সেসব বই কিংবা আঁকা ছবিগুলো ছাত্রদের নাগালে বাইরেই থেকে যেত। শিক্ষকেরা সেইসব বই দেখে বিশেষ একধরনের স্লেটে ছাত্রদের পড়াতেন।

মধ্যযুগীয় বাচ্চাদের চিরাচরিত কাঠের স্লেটে বর্ণমালা, প্রার্থনা ইত্যাদি শিক্ষামূলক বিষয় পড়ে শেখানোর রীতি চালু ছিল। সেগুলো “হর্নবুকস” হিসাবে পরিচিত ছিল, কারণ এগুলি স্বচ্ছ শিংয়ের সুরক্ষামূলক পাত দ্বারা আবৃত থাকতো। মধ্যযুগে এ্সব গল্পের প্রচলন হয় এবং এসব গল্পের সংকলন প্রকাশ এবং প্রচার করা হয়েছিল শিশুদের আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্বিক উন্নতির লক্ষ্যে। তবে ওই গল্পগুলো শিশুদের আনন্দ দিতে কতটা সক্ষম ছিল তাতে সন্দেহ আছে।

ইয়োহান গুটেনবার্গ (Johannes Gutenberg) মুভেবল টাইপ প্রিন্টিং আবিষ্কারের পর চৌদ্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানিতে যেন বই ছাপানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এতদিন মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো গল্প, উপকথা ইত্যাদি ছাপানো বইয়ের মূল উপজীব্য হিসেবে প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে ১৪৪১ সালে চীনের বাই সিং মুভেবল টাইপ প্রিন্টিংয়ের উদ্ভাবন করেছিলেন। তার কয়েকশো বছর আগে থেকেই অবশ্য চীন, কোরিয়া ও পূর্ব এশিয়াতে কাঠের ব্লকের সাহায্যে ছবি ও লেখা ছাপার প্রযুক্তি চালু হয়ে গিয়েছিল। হাতে লেখা পুঁথির মতো গুটেনবার্গের ছাপানো বইয়ের অতিমূল্যের ছিল না। জার্মানে বিপুল সংখ্যক বই ছাপানোর তথ্য ইংল্যান্ডে পৌঁছে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনি। উইলিয়াম ক্যাক্সটন নামের এক বৃটিশ ব্যবসায়ী প্রিন্টিং পদ্ধতিটি শেখার কৌতূহল নিয়ে জার্মান যান। পদ্ধতিটি শিখে স্বদেশ ফিরে ক্যাক্সটন বই ছাপানোর পদক্ষেপ নেন। ঘটনাটি ঘটছে ১৪৭৬ সালের দিকে। উইলিয়াম ক্যাক্সটন প্রথম ব্রিটিশ ব্যক্তিত্ব যিনি শিশুদের জন্য বই প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলো মোটেও শিশুদের মনোরঞ্জন বিষয়ক ছিল না। ছিল কীভাবে তারা নির্মল চরিত্রের অধিকারী হতে পারে, লক্ষীমন্ত হওয়ার তত্ত্ব তালাশসহ, এই করো না, ওই করো না’য় ভরা উপদেশমূলক এক বই। যার পুরোটাই ছন্দ মিলিয়ে লেখা হয়েছিল। ‘Caxton’s Book of Curtsey’ ১৪৭৭ সালে প্রকাশিত প্রথম ব্রিটিশ শিশুতোষ বই।

বলাই বাহুল্য বইটি শিশুদের মনে আনন্দের বদলে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতাই হয়ত ক্যাক্সটনকে পরবর্তীতে শিশুদের জন্য লেখার বিষয়ে নিরুৎসাহী করে। তবে তিনি নিজে  মৌলিক বই রচনা না করলেও শিশুদের উদ্দেশ্যে বই প্রকাশনা কিন্তু থামিয়ে দেননি। বরং তাঁর প্রকাশনা সংস্হা থেকে তিনটি অত্যন্ত জনপ্রিয় শিশুতোষ বই প্রকাশিত হয়েছিল, যা আজও শিশুসাহিত্য বিভাগের ক্লাসিক বই হিসেবে পরিচিত। বই তিনটি হলো- ‘Reynard the Fox’ এটি রেনার্ড নামের এক বুদ্ধিমান শেয়ালের গল্প। শেয়ালটি কীভাবে বুদ্ধি খাটিয়ে দুষ্টু প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে তার মজাদার বর্ণনা আছে বইটিতে। ‘The Book of the Subtle History of the Fables of Esope’ মূলত পশুপ্রাণীর মাধ্যমে ঈশপের নানা মজাদার, বুদ্ধিদীপ্ত এবং গল্পের ছলে টুক করে উপদেশ দেবার অত্যন্ত আকর্ষণীয় এই বই। এবং  ‘Le Morte D’Arthurr‘ রাজা আর্থারকে নিয়ে লেখা এই বইটির কদর আজও ফুরায়নি। প্রথম প্রকাশিত বই ‘Caxton’s Book of Curtsey’ দিয়ে  উইলিয়াম ক্যাক্সটন শিশুমনে আঁচড় কাটতে না পারলেও, শিশুতোষ বইয়ের অনুবাদক এবং প্রকাশক হিসেবে শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে নিজের নামটা মযার্দার সাথে লিখতে সক্ষম হন। তাঁর অনূদিত ঈশপের গল্প সম্পর্কে F.J.Harvey Darton এর ভাষ্যে সেটা স্পষ্ট ,” With infinitely little mordanization, it is the best text for children today.”

হাতে লেখা পুঁথি, হর্নবুক, এবং প্রকাশিত ছাপা বইয়ের পাশাপাশি Chapbook নামে আরো এক ধরনের বইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়, যেটি মূলত সাধারণ জনগণের জন্য ছাপানো হতো। তাতে শিশুদের জন্যেও লেখাজোকা হতো। চ্যাপবুকের ছাপা ছিল খুবই জঘন্য, ব্যবহৃত কাগজ ছিল বাজে- সস্তা। মন্দের ভালো যেটি, তা হলো চ্যাপবুক সাধারণের নাগালের মধ্যে ছিল। এতে বড়দের জন্য নানা বিষয়ের পাশাপাশি শিশুদের জন্য ছোটো ছোটো গল্প, উপদেশমূলক নীতিকথা, উপকথা ছাপা হতো। চ্যাপবুকে  প্রকাশিত ‘The two children of the wood’, এবং ‘Jsck the giant Killer’ গল্প দুটি ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। প্রাণবন্ত ভঙ্গিতে লেখা একটি গল্পের সাথে রঙিন ছবি শিশু মনে ভালোলাগার আলোড়ন তোলে। কিন্তু তখনও শিশুতোষ বইতে জোরেশোরে ছবি জুড়ে দেবার রেওয়াজটা চালু হয়নি। সম্ভবত পনেরো’শ শতাব্দীর শেষভাগে জার্মানিতে শিশুতোষ বইয়ে ছবি জুড়ে দেয়ার রীতি চালু হয়।

লিখিত সাহিত্য বিশেষ করে শিশুতোষ সাহিত্য সতেরো’শ শতাব্দীতে ব্যাপক মাত্রায় প্রকাশিত হতে শুরু করে। সতেরো’শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ প্রকাশক জন — নিউবেরি(১৭১৩-১৭৬৭) ‘বইপাঠ শিশুদের উপভোগ করা উচিত’, জন লকের( John Locke) এই ধারণায় প্রভাবিত হয়ে বাচ্চাদের বিনোদনের জন্য বই প্রকাশনায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

‘১৭৬০ সালে জন নিউবেরি লন্ডন থেকে প্রকাশ করেন বাচ্চাদের ছড়ার বই ‘The Original Mothers Goose’s Melody’। এই ‘মাদার গুজ রাইম’ সেসময়কার এবং পরবর্তীকালের বহু শিশুদের ছেলেবেলার পরম বন্ধু হয়ে পাশে থেকেছিল, এখনও আছে। ছোটো ছোটো ছড়ার আকারের এই কবিতাগুলোয় জ্যাক, জিল, মিস মাফেট কিংবা হাম্পটি ডাম্পটির মতো চরিত্ররা আছে, এদের মনে রাখা সহজ, এদের নাচ-গান সহযোগে অভিনয়ও করা যায়। ফলে শিশুমনে এদের প্রভাব অপরিসীম । কবি ও গবেষক অলিভার গোল্ডস্মিথ ইংল্যান্ডের শহরে-গ্রামে ঘুরে ঘুরে লোকের মুখ থেকে এদের সংগ্রহ করেন, লিপিবদ্ধ করেন ও ১৭৪৪ সালে ‘Tonny Thumb’s song book: For all Little masters and Missess’ নামে প্রকাশ করেন। কিন্তু সে বইতে কোনো ছবি ছিল না। তাই নিউবেরি যখন পাতায় পাতায় ছবিসহ মাদার গুজের নামে বইটি প্রকাশ করেন তখন সেটি সে নামেই বিখ্যাত হয়ে যায়। শুধুমাত্র প্রচলিত লোক-কবিতাদের এক করতে গিয়ে ইংল্যান্ডে প্রথম এক আন্তর্জাতিক শিশু পুস্তকের জন্ম হয়।’

সতেরো শতকের পরে অধিকতর ধর্মনিরপেক্ষ গল্পের প্রচলন শুরু হয় যেখানে বিবিধ আনন্দদায়ক বিষয়বস্তু যুক্ত হতে থাকে। শিশুদের জন্য নৈতিক উপদেশের পাশাপাশি নির্মল কৌতুকের প্রচলনও শুরু হয় তখন থেকে। মূলত সেই সময় থেকেই আধুনিক শিশুসাহিত্যের জন্ম হতে থাকে।

পাশ্চাত্য শিশু সাহিত্যের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা মানুষটির নাম হচ্ছে হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন। জাদুকরী ভাষায় শিশুমনে ভালোবাসা, দয়া, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, স্বপ্ন দেখার দিগন্তজোড়া আকাশ বিছিয়ে দিয়েছিলেন এই মানুষটি। যে কারণে হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনকে রূপকথার জাদুকর বলা হয়। ডেনিশ এই সাহিত্যিকের শিশুতোষ রচনাগুলো ১২৫টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর জগদ্বিখ্যাত কাহিনিগুলোর কয়েকটি হলো – ‘দ্য এমপেরর্স নিউ ক্লদস’, ‘দ্য লিটল মারমেইড’, ‘দ্য নাইটিংগেল’, ‘দ্য স্নো কুইন’, ‘দ্য আগলি ডাকলিং’, ‘থাম্বেলিনা’, ‘ লিটল ম্যাচ গার্ল’ ইত্যাদি।

শিশু সাহিত্যে হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের বিশাল অবদানের জন্য International Board On Books for Young People(IBBY), ১৯৬৭ সালে তাঁর জন্মদিন ২ এপ্রিল দিনটিকে ‘International Children’s Book Day’ হিসেবে ঘোষণা করে। প্রতি বছর পৃথিবীর নানা প্রান্তের বই প্রিয় শিশু-কিশোরেরা দিনটি আনন্দের সাথে পালন করে থাকে। তবে অ্যান্ডারসন যখন শিশুদের জন্য লিখেছিলেন, সে সময় আধুনিক সময়ের মতো শিশু সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত বিশেষ কোনো বিভাগ নিদির্ষ্ট ছিল না।

পাশ্চাত্য সাহিত্যে গ্রিম ভাইদের গল্প, অ্যালিস ইন দ্য ওয়ান্ডারল্যান্ড, রবিনসন ক্রুসো, হ্যাকেলবেরি ফিন ইত্যাদি শিশুতোষ সাহিত্যসহ রুশ সাহিত্যের সুবিশাল ভাণ্ডারের ‘রুশদেশের উপকথা’, ‘ধলা কুকুর শামলা কান’, ‘বাবা যখন ছোট’ ‘পেন্সিল ও সর্বকর্মা’, নাম ছিল তার আইভান’, ‘দাদুর দস্তানা’, রূপের ডালি খেলা’,‘উভচর মানুষ’, ‘চুক আর গেক’, ‘কাশতানকা’, ইত্যাদি ধ্রপদী সাহিত্য যুগ যুগ ধরে পৃথিবী জুড়ে শিশু-কিশোরদের আনন্দ পাঠের সঙ্গী।

‘সবচেয়ে ভালো শিশুসাহিত্য এমন হবে যা পড়ে সংবেদনশীল বয়ষ্ক পাঠকও আনন্দ পাবেন।’ প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের এই বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় এইসব উৎকৃষ্ট শিশুসাহিত্যের পাঠক হিসেবে শিশুদের পাশাপাশি বড়দের স্বতঃস্ফূর্ত পাঠযোগ দেখে।

বাঙালির শৈশব জুড়ে কেবল বারো মাসের তেরো পার্বনের আনন্দ-উৎসবে ঠাসা নয়, ‘ঠাকুমার ঝুলি’, দেশি-বিদেশি নানা রূপকথার পাতাও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে। এমন বাঙালি হয়ত খুব কমই আছেন যারা এসব পড়ে শৈশবের রঙিন দিন পার করেননি। আরো এক কাঠি এগিয়ে কেউ কেউ এমনটাও বলে থাকেন- “যে বাঙালির জীবনে উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার নেই, দক্ষিণারঞ্জন, যোগীন্দ্রনাথ, পুণ্যলতা, সুখলতা, লীলা মজুমদারেরা কেউ নেই, সে বাঙালির কোনও ছেলেবেলাই নেই।” শৈশব কে রঙিন আর স্মরণীয় করতে শিশু সাহিত্যের ভূমিকা যে অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ এই বক্তব্যে সেটা স্পষ্ট।

শিশু সাহিত্য মানেই সেটা হেলাফেলার বস্তু, তা কিন্তু নয়। রামপদ চৌধুরী বলেছিলেন, “ছোটদের জন্যে লেখাকে শিশুসাহিত্য বলা হয় বলেই ব্যাপারটা নেহাত শিশুসুলভ নয়।” শিশুদের জন্য লেখালেখিটা বরং দারুণ কঠিনসাধ্য একটা ব্যাপার। শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় রেখে এ সাহিত্য রচনা করা হয়। গুরুত্বের সাথে বিষয়বস্তু নির্বাচন করা লাগে। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে একটু ভিন্ন সুরে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন-  “ছেলেরা যে-বই পড়িবে তাহার কিছু বুঝিবে এবং কিছু বুঝিবে না, এইরূপ বিধান থাকা চাই। আমরা ছেলেবেলায় একধার হইতে বই পড়িয়া যাইতাম। যাহা বুঝিতাম এবং যাহা বুঝিতাম না দুইই আমাদের মনের উপর কাজ করিয়া যাইত”। অর্থাৎ পড়বার আনন্দেই শৈশব জুড়ে  পড়ে যাওয়াটা পরবর্তী জীবনে ঠিকই প্রভাব রেখে যায়।

ছোটোদের মনে গল্প শোনার যে ব্যাপক আগ্রহ সেটা পূরণের লক্ষ্যে রূপকথা-লোককথার জন্ম। মৌখিকভাবে বলবার রীতিতে যার গোড়াপত্তন হয়। ভালো মন্দের লড়াই, মন্দকে হটিয়ে ভালোর বিজয় ছোটোদের আকৃষ্ট করবার সাথে সাথে মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেটিকেই নীতিশিক্ষার খোলসে কৌশল হিসেবে শিশুসাহিত্যিকেরা তাদের রচনায় ব্যবহার করেন। ‘সাহিত্যিক-সমালোচক জন রো টাউণ্ডসেণ্ডের মতে, “শিশুসাহিত্যে আবশ্যিক উপাদন হবে নীতিমূলক শিক্ষণীয় বিষয় (‘Morally Educative Quatilies’) উনিশ শতকে ছোটদের জন্য যখন লেখা শুরু হচ্ছে, বাংলার তাবৎ লেখককুলের মূল লক্ষ্য ছিল শিশু ও বালকশ্রেণির সামনে নীতিমূলক আখ্যান উপস্থিত করে তাদের মানসিক চরিত্র গঠন। মদনমোহন তর্কালঙ্কার ‘শিশুশিক্ষা’ (১৯৫০) গ্রন্থের তৃতীয়ভাগের ভূমিকায় এ কারণেই ঘোষণা করেন-

“কেবল মনোরঞ্জনের নিমিত্তে শিশুগণের উন্মেষোন্মুখ নির্ম্বল চিত্তে কোন প্রকার কুসংস্কার সঞ্চারিত করা আমাদের অভিপ্রেত নহে। এ নিমিত্ত হংসীর স্বর্ণডিম্ব প্রসব, শৃগাল ও সারসের পরস্পর পরিহাস নিমন্ত্রণ, ব্যাঘ্রের গৃহদ্বারে বৃহৎপাকস্থলী… প্রভাতি অসন্বন্ধ অবান্তর বিষয়সকল প্রস্তাবিত না সুসন্বন্ধ নীতিগর্ভ আখ্যান সকল সম্বন্ধ করা গেল।”

কাজেই এটা স্পষ্ট তখন পর্যন্ত শিশুসাহিত্য সৃষ্টির প্রধান বিষয়বস্তু হিসেবে নীতিশিক্ষাকেই অধিকমাত্রায় প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল।

‘বাংলাভাষায় বিশেষ গুরুত্বসহকারে শিশুসাহিত্যের সূচনা হয়েছে  উনিশ শতকের প্রথমার্ধে। ‘দিগ্দর্শন’ (১৮১৮) পত্রিকাকে কেন্দ্র করে শিশুসাহিত্যের সূচনা ঘটেছে। নবেন্দু সেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “প্রকৃত অর্থে বাংলা শিশুসাহিত্যের চর্চা শুরু হয় উনিশ শতকের পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে। জন মার্শম্যানের সম্পাদনায়  জন মার্শম্যানের সম্পাদনায় ১৮১৮’র দিগ্দর্শন পত্রিকায় তার সূত্রপাত বলা চলে।”

১৮১৮ সাল শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে আরো বিশেষ একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত “কলিকাতা স্কুলবুক সোসাইটি’র পরিকল্পনায় ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ‘নীতিকথা’ বইটি প্রকাশিত হয়। তারিণীচরণ মিত্র, রাধাকান্তদেব ও রামকমল সেনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি পাঠশালার জন্য রচিত হলেও এটিই ছোটোদের জন্য লেখা বাংলা ভাষার প্রথম গ্রন্থ।

এই গ্রন্থে ঈশপ ও আরবি অনূদিত একত্রিশটি গল্প প্রকাশিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ছেলে-মেয়েদের নীতি শিক্ষাদান। ছোটোদের সামনে উচ্চনৈতিক আদর্শ স্থাপনের প্রয়াস সমগ্র উনিশ শতকের বালক-বালিকাপাঠ্য শিশুসাহিত্যের মূল সুর, ‘যা ছিল মুষ্টিমেয় সিবিলিয়ানদের শিক্ষিত করে তোলার অন্যতম সহায়ক, তা রূপান্তরিত হয় শিশু-কিশোর পাঠ্য হিসেবে।’ সুতরাং শিশু-কিশোরপাঠ্য শিশুসাহিত্যের লক্ষণচিহ্ন নিয়ে ‘নীতিকথা’ গ্রন্থটি শিশুসাহিত্যের উদ্ভবের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তারিণীচরণ, রাধাকান্ত, রামকমল শিশুসাহিত্যের আদি সংকলকরূপে ইতিহাসে স্থায়ী আসন লাভ করেন।”

‘নীতিকথা’কে অবলম্বন করে শিশুশিক্ষার সূত্রে ছোটোদের সামনে যে নীতিকথার জগৎ তৈরি  হয়েছিল, তার সূচনা কিন্তু বহুপূর্বেই ঘটেছে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকদের রচনায়। ‘সিবিলিয়ন’ বা রাজকর্মচারীদের দেশীয় ভাষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের (১৮০০) লেখকবৃন্দ বাংলার লোককথা, সংস্কৃত, পঞ্চতন্ত্র, ঈশপের গল্পের অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন। বড়োদের জন্য লেখা হলেও ফোর্ট উইলিয়াম প্রকাশিত বইগুলিতে “নীতিকথা”র অবলম্বন স্বরূপ লোকগল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। ছোটোরা এই বইগুলিতে নিজেদের জগৎ খুঁজে পেতে পারে। ভাষার কাঠিন্য মুছে দিলে এবং অশ্লীলতা বর্জন করলে এই বইগুলিকে স্বচ্ছন্দে ‘স্কুলবুক সোসাইটি’ প্রকাশিত শিশুশিক্ষামূলক বই বা বিদ্যাসাগরের শিশুশিক্ষামূলক বইয়ের পাশে রাখা যায়। উনিশ শতকের সূচনা লগ্নে বাংলা গদ্যের প্রস্তুতির সূত্রে যে উপকরণ ও উপাদান সংগৃহীত হতে শুরু করলো, তা-ই পরবতী শিশুসাহিত্যের সোপান নির্মাণ করেছে। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই যে বাংলা শিশুসাহিত্যের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে, তার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, মৃত্যুঞ্জয়ের “বত্রিশ সিংহাসন” ৫১৮০২), “হিতোপদেশ” (১৮০২), গোলকনাথ শর্মার “হিতোপদেশ” (১৮০২), কেরীর ইতিহাসমালা” (১৮১২) গ্রন্থে।’

বাংলা “মৌলিক শিশুসাহিত্যের সূত্রপাত হয় কেশবচন্দ্র সেনের ‘বালকবন্ধু’ (১৮৭৮) প্রকাশিত হওয়ার পর। তার আগে বিদ্যাসাগর, মদনমোহন প্রমুখেরা যতটুকু লিখেছেন তা শিক্ষায়তনের প্রয়োজনে”। কেশবচন্দ্র সেনের ‘বালকবন্ধু’ (১৮৭৮) পত্রিকার পূর্ববর্তী যুগে শিশুসাহিত্যের লেখকরা মূলত বিদ্যালয় পাঠ্য গ্রন্থ, কিংবা অনুবাদমূলক গ্রন্থরচনার মাধ্যমে শিশুচিত্তের নৈতিক বিনোদনের চেষ্টায় মগ্ন ছিলেন। কেশবচন্দ্রের ‘বালকবন্ধু’ পত্রিকাতে নীতিশিক্ষার পাশাপাশি ছোটদের বিনোদনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

‘উনিশ শতকের শেষ তিন দশকে পত্রিকাকেন্দ্রিক বাংলা শিশুসাহিত্যে বিষয়ান্তর ঘটতে দেখা যায়। শিশুদের জন্য লেখায় নীতিকথা থাকলেও সেটিই একমাত্র বিষয় হিসেবে থাকার গুরুত্ব কমে যায়। তার জায়গায় শিশুদের মনোরঞ্জনের দিকটা বেশি গুরুত্ব পায়। শিশুসাহিত্যের এই ক্রমরূপান্তরের জগতে সার্বিক পালাবদল ঘটেছে উনিশ শতকের শেষ দশকে। প্রতিষ্ঠান ও পত্রিকাকেন্দ্রিকতার পথ পরিহার করে বাংলা শিশুসাহিত্যের বিশুদ্ধরূপটির সন্ধান পাওয়া গেল ব্যক্তি লেখকের উদ্ভাসে। যোগীন্দ্রনাথ সরকার, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠকুর বাংলা শিশুসাহিত্যের সার্বিক চালচিত্র বদলে দিয়েছেন।

বিশ শতকের প্রথমার্ধের শিশু ও কিশোর সাহিত্যে যে সুবর্ণযুগ লক্ষ করা যায়, তার সূচনা ঘটছে উনিশ শতকের শেষ দশকে। যোগীন্দ্রনাথ সরকার সংকলিত “হাসি ও খেলা” (১৮৯১) প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা শিশুসাহিত্যে নতুন যুগের সূচনা ঘটে।

বাংলা শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রে দুটি পরিবারের বিশেষ অবদান অনস্বীকার্য। একটি হচ্ছে উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী’র পরিবার, অন্যটি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। এই দুই পরিবার শিশুসাহিত্যের উন্নতির জন্য যে শ্রম-মেধা ব্যয় করেন তার ফিরিস্তি দিতে গেলে আলাদা একটি নিবন্ধ ফেঁদে বসতে হয়। সীমিত পরিসরের এই লেখার সেটি  সম্ভব নয় বলে তাঁদের কর্মযজ্ঞের প্রতি পৃথিবীর তাবত বাংলাভাষী পাঠকের পক্ষ থেকে কুর্নিশ জানাচ্ছি।

বিশ শতকের শুরুর দিকে আমরা প্রথমবারের মত শিশু প্রধান সাহিত্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করি যেখানে শিশু নিজেই অনেক বড় বড় কাজে অংশগ্রহন করছে বড়দের সাহায্য ছাড়াই এবং তার অনেকখানির মধ্যে কল্পজগতের প্রাধান্য রয়েছে। এই ধারায় যারা রসদ যোগান দিয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো লুইস ক্যারল, রবার্ট লুইস স্টিভেনসন, মার্ক টোয়েন, রোয়াল্ড ডাল, জে.কে. রাউলিং, সুকুমার রায়, লীলা মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমূখ।

শিশুসাহিত্যে এখনো নৈতিক শিক্ষা বহাল আছে, যেখানে পরবর্তী প্রজন্মের উদ্দেশ্যে সমাজের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসগুলোকে শিশুদের মগজে প্রবেশ করিয়ে দেবার চেষ্টা অব্যাহত। এর মানে এই নয় যে আমরা আমাদের শিশুদের জাদুকর বানাতে চাই, কিন্তু আমরা চাই তারা যেন সাহসী হয়, একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসে এবং নৈতিক মানদণ্ডে উন্নত হতে পারে।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো যে আধুনিক শিশুসাহিত্যে যেসব বিষয়ে কল্পনার অবকাশ আছে তাতে পূর্ববর্তী প্রজন্মের দীর্ঘ নৈতিক লড়াইয়ের বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে তেমন কিছু বলা হয় নি। অথচ একথা সত্যি যে প্রাক আধুনিক যুগের সেইসব শিশুদেরকে এসব বইপত্রের কল্পনার যোগান ছাড়াই নিজেদের গড়ে তুলতে হয়েছিল প্রতিকূল পরিবেশ এড়িয়ে।

শিশুসাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারটিকে সমৃদ্ধ করতে দুই বাংলার সাহিত্যিকেরা যাঁর যাঁর অবস্হানে থেকে শিশুদের জন্য আন্তরিকভাবে লিখে গেছেন। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, সুকুমার রায়, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লীলা মজুমদার, মোহাম্মদ নাসির আলী, জসীমউদ্দীন, আলী ইমাম, আতোয়ার রহমান, বন্দে আলী মিয়া, রোকনুজ্জামান খান, বেগম সুফিয়া কামাল, সেলিনা হোসেন, আনোয়ারা সৈয়দ হক, হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল, লুৎফর রহমান রিটন সহ আরো অনেক কবি, লেখক, ছড়াকারদের তুখোড় লেখনীতে বাংলা শিশুসাহিত্যের জগত ঋদ্ধ। সময়ের ধারাবাহিকতায় শিশুসাহিত্যে যেমন বিষয়বস্তুর পরিবর্তন এসেছে। একই সাথে গল্প বলার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে আকর্ষণীয় ভঙ্গি, তার পাশাপাশি প্রয়োজন মতো রঙিন ছবি জুড়ে দেবার চমকদার সব কারিগরি কৌশলও লক্ষ্য করা গেছে।

শিশুসাহিত্যের উন্নতির লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক অবদানও কম নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুসাহিত্যের উৎকর্ষের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও আগের মতো মন ভরিয়ে দেয়া শিশুসাহিত্যের যেন বড় অভাব। শিশু সাহিত্যের জগত থেকে যেন হারিয়ে গেছে সেই জাদুর ঝলক। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারির বইমেলায় শিশু-কিশোরদের জন্য রাশি রাশি বই প্রকাশিত হলেও বিষয় বৈচিত্রের অভাব, সম্পাদনায় দারুণ অবহেলা এবং কোনোভাবে ছাপিয়ে বইটি হাজির করার এক অসুস্হ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। যা শিশু সাহিত্যের ঝলমলে ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি অবহেলার সামিল বলে মনে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিক নজরদারী এই পরিস্হিতির রাশ টানতে পারে বলে মনে করি। শিশু সাহিত্য হিসেবে এমন মানসম্মত বই-ই ছাপা হোক, যে বই পড়ার রঙিন স্মৃতি সময় উজিয়েও যেন একজন মানুষের ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। আজও যেন আমাদের শৈশবে পড়া ‘আবল তাবল’ ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘বাঙালির হাসির গল্প’, ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী,’ ‘রূপের ডালি খেলা’ ইত্যাদির নাম স্মরণ করে বুকের ভেতর বাজতে শুনি আনন্দের অনুরণন।

প্রখ্যাত রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি মন্তব্য করেছিলেন, “ছোটোদের জন্য গল্প, উপন্যাস এবং শিক্ষামূলক সাহিত্য রচনায় আমাদের সাফল্য কিসের ওপর নির্ভর করে? প্রথমে আমাদের প্রয়োজন একদল প্রতিভাশালী লেখকের। যারা সরল, সহজ ভাষায় মহৎ শিশুসাহিত্য রচনা করার ক্ষমতা রাখেন। শিশুসাহিত্যকে গড়ে তুলতে হবে সম্পূর্ণ নতুন নীতির ভিত্তিতে।” বিশ শতকের বিশ্বসাহিত্যে শিশুদের নির্মল সাহিত্য পাঠের বাতায়নে বাংলা শিশুসাহিত্যের সুবাতাস আছে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে। আমাদের বিশ্বাস একুশ শতকের বাংলা সাহিত্যেও শিশুদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও মননশীলতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গোর্কির আশাবাদকে সত্যি করতে শিশু সাহিত্যের কারিগরগণ এগিয়ে আসবেন আরো অধিক সংখ্যায়। যাতে দিনরাত দমবন্ধ পাঠ্যপুস্তকের আবর্তে আটকে থাকা শিশুটি একটু মুক্ত হাওয়ায় ঘ্রাণ নিতে পারে। এ সময়কার শিশুরাও যেন সময় উজিয়ে উপভোগ করতে পারে দারুণ দারুণ শিশুসাহিত্য পাঠের মধুময়স্মৃতি; শুনে নিতে পারে চিরন্তন শৈশবগন্ধী সেই আহ্বান-

             

   “আয়রে যেথায় উধাও হাওয়ায়

     মন ভেসে যায় কোন্‌ সুদূর”

 

 

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার এবং উৎস:

১. ‘Once upon a time: a brief history of children’s literature’ by

Susan Broomhall, Joanne McEwan, Stephanie Tarbin

২.‘কুড়িয়ে বাড়িয়ে’ কৌশিক মজুমদার

৩. ‘শিশু-কিশোর সাহিত্য: স্বরূপ, উৎস, লেখক’

৪. উইকিপিডিয়া(ইংরেজি-বাংলা)

৫. বাংলাপিডিয়া

৬. প্রথম আলো, আনন্দবাজার, ইত্যাদি পত্রিকা

৭. ‘আবোল তাবোল’- সুকুমার রায়

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত