| 21 এপ্রিল 2024
Categories
ইতিহাস এই দিনে

সেই লেনিন

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

তাঁর পুরো নাম ভ্লাদিমির ইলিচ উইলিয়ানভ। কিন্তু বিশ্বের অসংখ্য মুক্তিকামী ও প্রতিবাদী মানুষের কাছে তার পরিচয় তাদের প্রিয় নেতা লেনিন। ১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল জন্ম  নেওয়া এই মহান নেতা তাঁর জীবদ্দশায় মুক্তিকামী মানুষের জন্য করেছেন অনেক কিছু। জন্ম রাশিয়ায় হলেও সারা পৃথিবীর মানুষের কাছেই তাঁর সমান মর্যাদা। মুক্তিকামী সব মানুষের প্রিয় এই নেতা ছিলেন অক্টোবর এবং মহান নভেম্বর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান এবং লেনিনবাদ তত্ত্বের প্রবক্তা। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন— জিয়াউদ্দীন চৌধুরী।


বিপ্লবের মঞ্চে

১৮৮৭ সালে কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ার সময় ছাত্রদের বিপ্লবী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করে। এ সময় পুঁজিবাদ দ্রুত বিকাশ পাচ্ছিল, যান্ত্রিক টেকনোলজি ও হাজার হাজার মজুর নিয়ে চালু হচ্ছিল কল-কারখানা। সে সময় জারের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ‘নারোদবাদী’রা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। নারোদবাদ হচ্ছে মেহনতিদের শ্রমমূল্য প্রতিষ্ঠার জন্য জার পুঁজিপতিদের হত্যা করা। জারের বিরুদ্ধে হলেও লেনিন নারোদবাদীদের বিরুদ্ধে ছিলেন সবসময়। তিনি হত্যাযজ্ঞ এবং সন্ত্রাসকে কিছুতেই মানতে পারেননি। লেনিন সবসময় মার্কস এবং এঙ্গেলসের ধারণা ও তত্ত্বকে গুরুত্ব দিতেন। ১৮৮৯ সালে তিনি সামারায় যান এবং স্থানীয় মার্কসবাদীদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৮৯১ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করে সামারাতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। এরপর তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ চলে আসেন এবং শিগগিরই সেখানকার মার্কসবাদীদের অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এখানেই লেনিন ক্রুুপস্কায়া’র সঙ্গে পরিচিত হন। ক্রুপস্কায় শ্রমিক এবং কৃষকদের মধ্যে সাম্যবাদ এবং বিপ্লবী আদর্শের প্রচারে ব্রতী ছিলেন। এ সময় নারোদবাদীরা লেনিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মাঠে নামে এবং তার নীতিকে ভিত্তিহীন বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নানা প্রচারণা ও ব্যাখ্যা চালাতে থাকে। শুধু নারোদবাদীরাই নয়, তথাকথিত ‘বৈধ মার্কসবাদী’রাও তার বিপক্ষে মাঠে নামে। এই বৈধ মার্কসবাদীরা ছিল বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী। তারা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত পত্রপত্রিকায় লিখত এবং মার্কসবাদকে বুর্জোয়াদের স্বার্থের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করত। লেনিন এই নারোদবাদী ও বৈধ মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষকে বোঝাতে থাকেন এবং বড় বড় কল-কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘বিপ্লবী মার্কসবাদী পার্টি’ গড়ে তোলার জন্য।

জার সরকার ১৮৯৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি লেনিনকে ৩ বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করে। এখানে থাকা ভ্লাদিমির ইলিচের পক্ষে সহজ ছিল না। রেললাইন থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে এক অজো পাড়াগাঁ সাইবেরীয় গ্রাম। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি।

১৯১৪ সালের প্রথমার্ধে রাশিয়ায় বিপ্লবী আন্দোলন ক্রমেই ব্যাপক হয়ে উঠল এবং পনেরো লাখ শ্রমিক ধর্মঘটে অংশ নেয়। অর্থনৈতিক ধর্মঘটের সঙ্গে রাজনৈতিক ধর্মঘট জড়িয়ে পড়েছিল। এ বছরই ইউরোপে দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যে শুরু হয় লড়াই। যা বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়। এদের এক দলে জার্মানি ও অস্ট্রো হাঙ্গেরি এবং অন্য দলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়া। দুদলই অনুসরণ করছিল রাজ্যগ্রাসী নীতি। পরে যুদ্ধে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অন্যান্য রাষ্ট্র। যুদ্ধের সময় অস্ট্রিয়ার সরকার জার সরকারের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে লেনিনকে গ্রেফতার করে। তবে লেনিনের সমর্থকদের বিক্ষোভের কারণে দুই সপ্তাহ পর তিনি ছাড়া পেয়ে সুইজারল্যান্ড চলে যান। বিভিন্ন স্থানে গোপনে রাজনৈতিক কাজ করে প্রায় ১০ বছর পর ১৯১৭ সালের ৩ এপ্রিল রাতে লেনিন রাশিয়ায় পৌঁছতে সক্ষম হন। সেখানে শ্রমিক শ্রেণি ও গরিব কৃষকদের ক্ষমতা দখলের জন্য বিপ্লব ব্যবহারিক প্রস্তুতির কর্তব্য, সশস্ত্র অভ্যুত্থানের জন্য তৈরি হওয়ার জন্য জোর দেন। ভ্লাদিমির লেনিন বুর্জোয়া সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থান, প্রলেতারীয় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানালে তা সমর্থন করে দেশে ২৫০টির বেশি সোভিয়েত। ১ অক্টোবরের পত্রে লেলিন আর বিলম্ব না করে অভ্যুত্থানে এগুতে বলেন। ২৪ অক্টোবর রাতে পেত্রগ্রাদের ফাঁকা রাস্তাগুলোয় যখন কসাক ও ইউঙ্কার বাহিনী টহল দিচ্ছিল তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেলিন স্মোলনি আসেন এবং অভ্যুত্থান পরিচালনায় সরাসরি নেতৃত্ব দেন।

লেনিন ও বলশেভিক পার্টির নেতৃত্ব শ্রমিক, লালরক্ষী, সৈন্য ও নাবিকদের আত্মোৎসর্গী সংগ্রাম ও বীরত্বের ফলে বিশ্ব ইতিহাসে এক মহাসাফল্যের ঘটনা ঘটে— জমিদার ও পুঁজিবাদ ধ্বংস হয়। ২৫ অক্টোবর সকাল ১০টায় পেত্রগ্রাদ সোভিয়েতের অধীনস্থ সামরিক বিপ্লব কমিটি লেনিনের বিবৃতি প্রকাশ করে ঘোষণা দিল— ‘যে আদর্শের জন্য জনগণ লড়ছিল তা সফল হয়েছে।’ পরদিন সন্ধ্যায় স্মোলনিতে শুরু হয় দ্বিতীয় সোভিয়েত কংগ্রেস। এতে নানা অঞ্চল থেকে ৬৫০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে ৪০০ জনই বলশেভিক।

২৬ অক্টোবর কংগ্রেসে লেনিনের বক্তৃতাকে অভিনন্দিত করে প্রতিনিধিরা। কংগ্রেসের প্রতিনিধি এ এ আন্দ্রেয়েভ তার স্মৃতিকথায় বলেছেন, ‘লেলিন যেই মঞ্চে এলেন অমনি সমস্ত সভাকক্ষ উঠে এগিয়ে যায় লেনিনের দিকে। অবিরাম করতালি আর লেনিন জিন্দাবাদ ধ্বনিতে মুখরিত প্রাঙ্গণে তিনি বহুক্ষণ বক্তৃতা শুরু করতে পারেননি।’ এভাবেই যাত্রা শুরু হয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সোভিয়েত জনগণ যে বিরাট রূপান্তর সাধন করেছে, তার মধ্যে রয়েছে মার্কস-লেনিনবাদের বিজয়। লেনিন ১৯১৭ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার বলশেভিক পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ছদ্মনামে…