| 17 এপ্রিল 2024
Categories
ইতিহাস

মোনালিসা রহস্য

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অসাধারণ সৃষ্টি মোনা লিসা। মোনালিসার রহস্য নিয়ে আজও মানুষের মনে হাজারও প্রশ্ন। মোনালিসা (ভুলভাবে মোনালিসা) (ইংরেজি : Mona Lisa (ইতালিতে : La Gioconda বা ফরাসি : La Joconde, বা Portrait of Lisa Gherardini, wife of Francesco del Giocondo) একটি বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম।

ইতালির শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ১৬ শতকে এ ছবিটি অঙ্কন করেন। অনেক শিল্প-গবেষক রহস্যময় হাসির এই নারীকে ফ্লোরেন্টাইনের বণিক ফ্রান্সিসকো দ্য গিওকন্ডোর স্ত্রী লিসা গেরাদিনি বলে সনাক্ত করেছেন। শিল্পকর্মটি ফ্রান্সের ল্যুভ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ল্যুভ জাদুঘরের তথ্যমতে প্রায় ৮০% পর্যটক শুধু মোনালিসার চিত্রটি দেখার জন্য আসে।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এমন একজন ব্যাক্তি ছিলেন, যিনি বিজ্ঞান বা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তিনি তার প্রতিভা দেখাননি। তার শিল্পকর্মগুলি ছিল অসাধারণ রহস্য পরিপূর্ণ। তার একটি অসাধারণ সৃষ্টি ‘মোনালিসা’ ছবিটি। এখনো মানুষের কাছে ‘মোনালিসা’ রহস্যময়।

‘মোনালিসা’ ছবির সম্পর্কিত তথ্য : মোনালিসা নামটির সাথে সাথে মনে অনেক রকমের প্রশ্ন এসে যায়। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন হয়, আলাদা আলাদা অ্যাঙ্গেল থেকে দেখলে মোনালিসার হাসি পরিবর্তন হতে থাকে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে মোনালিসার এই ছবিটির মধ্যে বিশাল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। যেমন ধরুন পাঁচ শ’ বছরেও মানুষ কেন দেখতে পাইনি মোনালিসার ছবির মধ্যে এলিয়েনের ছবি লুকিয়ে রয়েছে? ‘মোনালিসা’ আসলে ছেলের না মেয়ের ছবি? এই ধরনের অনেক প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে চলেছে মানুষ।

উল্লেখ্য ‘মোনালিসা’র এই ছবিটি কোনো কাগজ বা কাপড়ের উপর আঁকা হয়নি। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ১৫০৩ থেকে ১৫০৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে একটি পাইন কাঠের টুকরোর ওপর মোনা লিসার এই ছবিটি আঁকেন। চিত্রকলার ইতিহাসে এই চিত্রকর্মটির মতো আর কোনোটি এত আলোচিত ও বিখ্যাত হয়নি।

এই ছবিটি আঁকা হয়েছে কাঠের তিনটি তক্তার উপর। এই চিত্রটি ১৫০৩ সাল থেকে ১৫০৬ সালের মধ্যে আঁকা হয়েছিল। আসলে এই ছবিটির নাম Monalisa নয়, এটি বানানে ভুল ছিল। ছবিটির অরজিনাল নাম হলো Mona Lisa ইটালিয়ান ভাষায় এই শব্দটির অর্থ হলো Mona Lisa = My Lady ।

মোনালিসা ছবিটি ছিল লিওনার্দো দা ভিঞ্চি-র সব থেকে প্রিয় ছবি। এই কারণে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি যখনই যেখানে যেতেন, সাথে করে এই ছবিটি নিয়ে যেতেন। তিনি যখন এই ছবিটি আঁকতে শুরু করেন তখন তার বয়স ছিল ৫১ বছর। ১৭৫৭ সালে মোনালিসা ছবিটি লুভারস মিউজিয়ামে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।

কিন্তু কেউ জানে না যে কিভাবে এই ছবিটি লুভারস মিউজিয়ামে এসে পৌঁছলো। ১৯১১ সালের ২১ আগস্ট মোনালিসার এই ছবিটি লুভারস মিউজিয়াম থেকে আবার চুরি হয়ে যায়। কিন্তু দশ বছর পর আবার সেই ছবিটি খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৫১ সালে এক ব্যক্তি এই ছবিটিতে পাথর ছুড়ে মারেন। যার ফলে চিত্রটিতে মোনালিসার বাম হাতের কনুই এ একটি দাগ লেগে যায়।

মোনালিসার ছবি রাখা আছে বর্তমানে ফ্রান্সের ল্যুভ মিউজিয়ামে। এ ছবিটি রাখার জন্য ফ্রান্সের ল্যুভ মিউজিয়ামে একটি বিশেষ কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। কক্ষটিতে তাপমাত্রা এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে রাখা হয়েছে, যাতে মোনালিসার ছবিটি খারাপ না হয়ে যায়। এই কক্ষটি বানাতে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের প্রায় ৫০ কোটি টাকা খরচ করা হয়। মোনালিসার ছবিটি একটি বুলেট প্রুফ কাচের ভিতরে রাখা রয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৬২ সালে মোনালিসা ছবিটির বাজার মূল্য ছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে এই ছবিটির দাম ৭৯০ মিলিয়ন ডলার।

 

মোনালিসার সৃষ্টির রহস্য বা মোনালিসার রহস্য

মোনালিসা ছবিটির পিছনে লুকিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। এটা কার ছবি ছিল সে নিয়ে রয়েছে নানা মত বিরোধ। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি কখনই বলেননি যে এই ছবিটি কার ছবি? তার নিজের লেখা কোনো গ্রন্থেও মোনা লিসা সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ নেই । যার কারণে, মোনা লিসা ছবিটিতে যে মহিলার ছবি রয়েছে, “কে সেই মহিলা” নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

অনেকে বলেছেন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এই ছবিটি বানানোর সময় মাদার মেরির কথা চিন্তা করছিলেন। আবার অনেকের মতে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি তার এই ছবিটিতে নিজেকে মহিলা রূপে দেখিয়েছেন। কিন্তু এগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক, তা এখনো পর্যন্ত জানা যায়নি। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির এক বন্ধু তাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যেটি খুঁজে পাওয়া যায় ২০০৫ সালে।

ওই চিঠি অনুযায়ী সেটি লেখা হয়েছিল ১৫০৩ সালের অক্টোবর মাসে। তখন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি তার বন্ধু জিয়া কণ্ড-এর একটি ছবির উপরে কাজ করছিলেন। জিয়া কণ্ডের স্ত্রীর নাম ছিল লিসা জিয়া কণ্ড। বন্ধু জিয়া কণ্ড তার নতুন সন্তানের জন্ম এবং নতুন বাড়ি করার খুশিতে তার স্ত্রীর একটি চিত্র আঁকতে বলেছিলেন বন্ধু ভিঞ্চিকে।

এই চিঠির উপর ভিত্তি করে বলা যায়, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ওই সময় মোনালিসার ছবিটির উপরে কাজ করছিলেন। কিন্তু এই কথাটা জোর গলায় বলা যায় না যে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা ছবিটি সেই লিসা জিয়া কণ্ডের। কারণ বিজ্ঞানীরা অনেক বিশ্লেষণ করে বলেছেন যে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসা লিসার হাবভাব ছবির সাথে একেবারেই বেমানান।

২০০৫ সালে এক বৈজ্ঞানিক, যার নাম পাস্কেল কটেল, ছবিতটিকে ইসপেক্ট্রোলাইট টেকনোলজিতে হাই ইন্সেন্সিটিভ লাইট ও মাল্টি লেন্সের সাহায্যে চিত্রটির আলাদা আলাদা করে ছবি তোলেন। এবং এর থেকে তিনি যে তথ্য সংগ্রহ করেন তা সমগ্র বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। পরীক্ষায় পাওয়া যায় যে রং দিয়ে মোনা লিসার ছবিটি আঁকা হয়েছিল তার স্তর চল্লিশ মাইক্রোমিটার ছিল। যার মানে হলো একটি সরু চুলের থেকেও পাতলা এবং এই চিত্রটির মধ্যে আরো তিনটি চিত্র লুকিয়ে রয়েছে।

মোনালিসা ছবিটির মধ্যে আরো এক রহস্য রয়েছে। আলাদা আলাদা অ্যাঙ্গেল থেকে দেখলে এই ছবিটির মধ্যে থাকা হাসিটি পরিবর্তন হতে থাকে। স্যান্ডেলাইট ইউনিভার্সিটি তাদের সদস্য নিয়ে একবার মোনালিসা চিত্র টিকে সার্ভে করেছিলেন। সার্ভে করে তারা দেখেছিলেন, মোনা লিসার ছবিটিকে দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে সে হাসছে। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে মনে হয় যেন তার ঠোটগুলো একটু বাঁকা হয়ে রয়েছে। যার ফলে মনে হয় মোনালিসা চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এই চিত্রটি আঁকার সময় কিছু কৌশল ব্যবহার করেন। যাতে কোনো আউটলাইন থাকে না। আর যদি কোনো আউটলাইন থাকে তাহলেও তাকে রঙ দিয়ে চাপা দিয়ে দেন তিনি। আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ এত ভালোভাবে এই আউটলাইনের ব্যবহার করতে পারেনি, যেমনটা দা ভিঞ্জি খুবই সুন্দরভাবেই চিত্রটির মধ্যে ব্যবহার করেছিলেন।

তবে মোনালিসার হাসি বদলে যাওয়ার এটাই শুধু কারণ নয়। আসল কারণটি লুকিয়ে রয়েছে মোনালিসার চোখে। আমরা যখন মোনালিসার চোখের দিকে তাকাই তখন তা হাসিখুশি ব্যক্তির চোখের মতো মনে হয়। কিন্তু যখনই তার ঠোঁটের দিকে তাকাই সেই হাসি যেন অদৃশ্য হয়ে যায়।

মোনালিসার এই ছবিটির মধ্যে একটি গোপন বার্তাও লুকিয়ে রয়েছে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ভালোভাবেই জানতেন কিভাবে চিত্রের মধ্যে একটি গোপন বার্তা লুকিয়ে রাখা যায়।

মোনালিসার ডান হাতের কাছে গোপন একটি বার্তা দেয়া আছে। যখন আলট্রা লাইট পদ্ধতিতে এই ছবিটির বিভিন্ন অংশকে ভালোভাবে দেখা হচ্ছিল তখন এটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। এই অক্ষরগুলোর পরপর সাজালে দেখা যায় তৈরি হচ্ছে একটি সেন্টেন্স। যা হলো “La Risposta Si Trova Qui” । এটি ইটালিয়ান ভাষায় লেখা হয়েছিল। এর মানে হলো, The Answer Is Here ।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনা লিসার মধ্যে যে সমস্ত রহস্য লুকিয়ে ছিল, দিন যেতে যেতে ক্রমশই উদ্ধার হতে থাকল। কারণ আমরা সেই জায়গার সন্ধান খুঁজে পেয়েছিলাম যেখানে চিত্রের রহস্য লুকিয়ে ছিল। কিন্তু বিগত সময়ে অনেকেই এই রহস্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কেউ সফল হয়নি।

সম্প্রতি জনপ্রিয় ওয়েবসাইট প্যারানরমাল কুশ ওয়েব দাবি করে, মোনা লিসার ছবিটিতে এলিয়েন লুকিয়ে রয়েছে। শুনতে অবাক লাগলেও ব্যাপারটি একটু ভাববার বিষয়।

কারণ যখন আমরা মোনালিসার ছবিটিকে তার রোটেট করা ছবির সাথে একসাথে মিলিয়ে দেখি তখন দেখা যাচ্ছে চিত্র দুটির মাঝ খানে একটি এলিয়ানের চিত্র তৈরি হয়েছে। তাই বলা যায় লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অন্যান্য আবিস্কারের মতো মোনালিসা ছবিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও রহস্যময়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত