| 20 মে 2024
Categories
নারী

লকডাউনে নারীজীবন

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

মন্দিরের ঘন্টা চেনেন? সেই ঘন্টা হইতেছে নারী জীবন। আসিতে যাইতে যে কেহ বাজাইয়া যাইতেছে এই লকডাউন পিরিয়ডে। যখন ‌লকডাউন শুরু হইল, প্রাণে ফুরফুরে বাতাস বহিতেছিল, অফিসের কাজ অপ্রতুল, বাড়িতে সবকটা কে ঘাড় ধরিয়া কাজ করাইতেছিলাম আমার সহিত। যদিও আমার পঁচাত্তর শতাংশ, উহাদের পঁচিশ। তবুও, একটা গভীর পরিতৃপ্তি আসিতো বরকে রুটি বেলিতে দেখিয়া। তা,যা হয় আর কি,সময় বড় তাড়াতাড়ি রঙ পাল্টায়।অফিস কাজ বাড়াইতে লাগিলো, বাড়ির লোকেরা নিজেদের কাজ কমাইতে লাগলো।তারপর যা বিনাপয়সায় সবসময় পাওয়া যায় ও বিলোনো যায়,তা হইল টিপ্পুনি। যতদিন কাজের লোক রাঁধিয়া দিত, গু-গোবর-আধসেদ্ধ সবই খাইতেন তারা, আর অপেক্ষা করিতেন শুক্রবার রাত হইতে রবিবার সকাল অবধির, কেননা ওইসময় ভালোমন্দ রাঁধিয়া খাওয়ান গৃহিনী। করোনা দিল সব দিন-সময়ের গন্ডি ধুইয়া মুছিয়া। ফেসবুক জোড়া রান্নার বিজ্ঞাপন গিন্নীদের। আম্মো কম নয় বলিয়া ময়দানে নামিলুম এবং she came,she conquered প্রমাণ করিয়া ছাড়িলুম।

এতে ঘন্টা হইল। মানে প্রশংসাসূচক বাক্য ফেবুর ভক্তকুলেরা বর্ষণ করিলেও, বাড়ির অর্বাচীনের দল চাটিয়াপুটিয়া খাইয়া, একটি শব্দ ও ব্যয় করেননা স্তুতিতে, উপরন্তু আশার পাহাড় জমাইয়া তোলেন। জমিয়া উঠে ক্ষোভ, অমুক দিন গার্লিক পনীরটার তুলনায় আজিকারটা কিছুই হয় নাই। কাল তো পপকর্ণ বানাইয়াছিলে। আজিকেও কেন বানাইতেছ? আজি সন্ধ্যায় চিঁড়ার পোলাও বানাও তবে। এরকম ফিরিস্তি অফিসের ও বাড়িতে থাকিল।পূর্বে এমতাবস্থায় একটি প্রিয় বাক্যবন্ধকে আপন করিয়া পথে বাহির হইয়া পড়িতাম। তাহা হইল ” নিকুচি করিয়াছে সংসারের।” কিন্তু এই জগৎ-সংসারে যে পথই একমাত্র আপন ছিল, সে মুখ ফিরাইয়া লইবে এমন দুঃস্বপ্নের অতীত ঘটনাটি চাক্ষুষ করিবার নিমিত্ত এযাবৎকাল শ্বাসবায়ু চলিতেছিল কে জানিত? তাই পথ পড়িয়া থাকিল উদাসীন, অ্যাক্রোপলিসের সুরাদরবার চোখের জলে ভাসিল, আর আমি গৃহকোণে নিজেকে মানাইতে লাগিলাম। তস্করের অনুশীলনের মধ্যে ‌থাকে মার হজম করা, হজম করিতে করিতে তার গায়ে একসময় কিছুই লাগেনা, আমিও বাজিতে বাজিতে এটির সঙ্গে কেমন সুন্দর মানাইয়া‌ লইলাম, কেমন আর গাত্রদাহ হইতে লাগিল না।

এমন করিয়া কতকিছুই আমরা গিলিয়া লইতে শিখি, সহ্য করিবার চিরন্তন অভ্যাসে। ভাবিয়াছিলাম এই দ্বাররুদ্ধ পরিবেশে কতনা পড়িব, কত না জ্ঞানার্জন করিব। দিনশেষে জ্ঞানের ভান্ডারে আস্ত একটি রসগোল্লা লইয়া ঘুমাইতে যাই রোজ। আহা এইরূপ জীবন দর্শনেও মানাইয়া লইলাম। আপিসের কার্য যখন সমাধা হয় তখনই শুরু হইয়া যায় গৃহকার্য। লোকে কচরমচর করিয়া খায়, আমি চক্ষু সার্থক করিয়া ভাবি আহা, এটুকু তো শান্তি , পুত্র আমার প্রত্যহ দ্বিপ্রাহরিক আহার করিতেছে। পূর্বে মাঝেমধ্যেই তিনি তাহার প্রতি উদাসীন থাকিতেন।

বাহিরে পাখি ডাকে, বাতাস আকুল হয়, পাতার মর্মরে সুখধ্বনি ওঠে, আমি পড়াইয়া চলি অহোরাত্র, কালিদাসের রসশাস্ত্র পড়াইবো এমন সৌভাগ্য নাই কপালে, তাই এই দগ্ধ ভালে মেঘ করিলেও, বৃষ্টি পড়িলেও মেঘদূতম নহে বিক্রয়শাস্ত্র পড়াইয়া যাই।কখন প্রত্যুষ পার করিয়া দ্বিপ্রহর হইল, কখন সূর্য সবটুকু লালিমা লইয়া সন্ধ্যার ঘাটে অবতরণ করিল কিছুই জানিতে পারিনা। “ঘরেও নাহি, পারেও নাহি, যেজন আছে মাঝখানে” আমি সেই মধ্যম স্থানের গরবে দাঁড়াই কখনো ঊষাকালে ছাতে, ওইটুকু ক্ষণে নিজেকে চিনি, পুনর্বার দেখি মুখখানি দর্পণে ঘুরাইয়া, ঘুরাইয়া, আর আমার চরিত্রের উদাসীনতা আমায় আরো সাজাইয়া তোলে, আরো চিকণ করিয়া তোলে।

 

 

 

 

 

3 thoughts on “লকডাউনে নারীজীবন

  1. আহা! কি লেখা! কিন্তু এই ঘন্টা বাজানো টা যেনো তেনো প্রকারেনো বন্ধ করা দরকার। শব্দ দূষণ!

  2. দারুন লেখা। তবে ওই ঘন্টা বাজানো টা কে যেনো তেনো প্রকরেনো বন্ধ করা জরুরি। শব্দ দূষণ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত