| 2 মার্চ 2024
Categories
প্রবন্ধ লোকসংস্কৃতি

বাংলার মুখোশ শিল্প

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

 


চূ ড়া ম ণি হা টি


ভয় ছিল, বাসনা ছিল, ছিল অলীকের প্রতি আসক্তি। মানুষের অন্তরমহল এক বিচিত্র মঞ্চ, সেখানে অজস্র কুশীলবের ভিড়। সেই ইতিহাস-পূর্ব সময় থেকেই।

আদিতে ছিল হিংস্র জীবজন্তুর ভয়। কিংবা অশরীরী অশুভ শক্তির কল্পনা। এসব মানুষকে নানাভাবে ভাবিয়েছে। প্রথম প্রথম অভিজ্ঞতার উপর ভরসা রেখে আর অলৌকিক ভাবনার উপর বিশ্বাস রেখে তারা মুক্তির উপায় খুঁজে নিতে বাধ্য হয়েছিল। বিরুদ্ধ শক্তিকে ভয় দেখানো ও বশীভূত করার প্রয়োজন থেকে দেহচিত্রের বিকল্প হিসেবে ঘটেছিল মুখোশের ব্যবহারিক সূচনা। শুধুমাত্র শরীরের মাধ্যমে যে-অনুভূতির প্রকাশ সম্ভব নয়, তা মুখোশের মাধ্যমে প্রকাশের চেষ্টা। মুখোশের আড়ালে অদৃশ্য থাকার অর্থই হল নিজেকে গোপন করে অন্য রূপে নিজেকে প্রকাশের চেষ্টা করা। ভয়ংকর রহস্যময় শক্তির প্রকাশ। বীরত্বের প্রকাশ। একইসঙ্গে ব্যক্তিগত চরিত্রের রূপান্তর ঘটিয়ে আত্মগোপনের ইচ্ছা, বা কোনও সত্তার ভাবরূপকে আত্মস্থ করে গোপনীয়তা রক্ষার মধ্যে যে-রসবোধ কাজ করে, পরবর্তীকালে তারই প্রকাশ ঘটল মুখোশ নৃত্যে।

মুখোশের মাধ্যমে মায়াশক্তি রচনা করে অদৃশ্য শক্তিকে সন্তুষ্ট করার কৌশল যেমন রয়েছে, তেমনই মুখোশের আড়ালে আত্মরক্ষা ও শিকারে সাফল্য আনার দিকটিও ছিল সমান গুরুত্বপুর্ণ। ছদ্মমুখ অর্থাৎ মুখোশের আড়ালে থাকা এ মানুষগুলি বাস্তবেও অবিরাম অসম যুদ্ধের ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত। অরণ্য-ঘেরা পরিবেশ কিংবা গ্রামীণ লৌকিক জীবনে তাঁরা শ্রমজীবী। অদৃশ্য ভাবনা ও পশু-পাখির রূপ নিয়ে মুখোশগুলি তৈরি। এই মুখোশগুলিকে সঙ্গী করে একদিন যা ছিল বিরামহীন যুদ্ধের প্রস্তুতি, পরবর্তীকালে তা নান্দনিক চেহারা নিয়ে হয়েছে বিনোদন মাধ্যম। মুখোশের সাহায্য নিয়ে অদ্ভুত কৌতুকরস সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। ধর্মীয় চরিত্র যেমন আছে, তেমনই ধর্মীয় আচারের সঙ্গেও মুখোশের যোগ ক্রমে দৃঢ় হয়েছে। পৃথিবীর সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন মুখোশধারীকে দেখা যায় ফ্রান্সের ত্রোয়া ফ্রেরে (Trois-Frères)-র গুহাচিত্রে, বল্গা হরিণের মুখোশে। এ এক জাদুসম্পৃক্ত অদ্ভুত ভাবনাও বটে। দেবদেবী এবং দেবদেবীর বাহনের রূপকল্পনার মধ্যেও, অনেক ক্ষেত্রেই এরকম ভাবনা কাজ করেছে। অবাস্তব ভাবনা আসলে জাদুভিত্তিক শক্তির ব্যঞ্জনা নিয়ে মানুষকে মানসিকভাবে মুক্তির সন্ধান দিয়েছে। পাশাপাশি মনকে অন্য জগতে প্রবেশ করানোর চেষ্টাও কাজ করেছে। ঠিক যে-কারণে ছদ্মমুখকে আশ্রয় করে ধর্মীয় ভাবনা ও অন্য ধারার নৃত্যাভিনয়ের জন্ম হল। আবার লোকনাট্য পালার কোনও কোনও চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট করতে মুখোশকেই বেছে নিল লোকনাট্যের শিল্পীরা। বাংলার লৌকিক সংস্কৃতিতে মুখোশ নানা আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিচিত্র রূপে উপস্থিত হয়েছে। মন্দির বা মূর্তির শীর্ষদেশে থাকা মুখ যেমন নানা কু-নজর থেকে রক্ষা করে, তেমনই বাংলার ধানখেত বা আলুখেত রক্ষা করছে খেত-রাক্ষস বা কাকতাড়ুয়া। প্রয়োজনে পোড়ামাটির হাঁড়ি বা সরায় ভুসোকালি লেপে তৈরি হয় তার মুখ।

সুন্দরবন অঞ্চলের হিংস্র জন্তুদের ঠকানোর জন্য তৈরি হয়েছে পশ্চাৎ-মুখোশ। এর জন্ম অবশ্য একেবারেই সাম্প্রতিক। এ মুখোশ মুখে না-পরে মাথার পিছন দিকে ঘাড়ের অংশ ঢেকে পরা হয়। পিছনে হঠাৎ আসা আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এমন ভাবনা। দক্ষিণরায়কে বিভ্রান্ত করতেই তৈরি হয় বড় বড় চোখওয়ালা এই মুখোশগুলি। এগুলো মূলত পোড়ামাটি কিংবা কাঠ দিয়ে তৈরি। কখনও আবার সাদা-কালো রঙে নাক-মুখ ফুটিয়ে তোলা হয় ন্যাড়া মাথার পিছন দিকে। ধর্মীয় উৎসব লৌকিক উৎসবে পরিণত হয়েছে লোকনৃত্য ও লোকনাট্যানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। যেমন বাংলার চেনা ছবিতে ছিল চৈত্র মাসে মহাদেব নৃত্য, নির্দিষ্ট খোলা প্রাঙ্গণে এসে ঢে়াল বাজানো। অন্যজন উঁচু করে মুখোশটি তুলে ধরে ভূমিকে প্রণাম করে নৃত্যের জন্য তৈরি হন। তারপর কেউ একজন মুখোশটি বেঁধে দেন। মুখোশের সঙ্গে ঘর্ষণ থেকে মুখকে রক্ষা করার জন্য কান ঢেকে পাগড়ি বাঁধা হয়। সাদা-কালো রঙে রাঙানো, তিন বা পাঁচটি সাপের ফণা দিয়ে সাজানো মহাদেবের মুখোশ। শিল্পীর এক হাতে ত্রিশূল, অপর হাতে শঙ্খ। ধীর থেকে চরমে পৌঁছয় নৃত্যের লয়। কালীনৃত্যের সময় পুরুষ নৃত্যশিল্পী লাল-নীল কাপড় পরে একহাতে নেন খড়্গ আর অন্য হাতে প্রদীপ। শিব আগেই শুয়ে থাকে। চারদিক ঘুরে ঘুরে কালীনৃত্য চলে। অন্য অনেক মুখোশনৃত্যে গুরুত্ব পায় নানা জীবজন্তু, কিংবা দাম্পত্য জীবন নিয়ে কোনও কৌতুক দৃশ্য।

যুদ্ধের প্রস্তুতি বা যুদ্ধ জয়ের উত্তেজনা নৃত্যের মাধ্যমে নান্দনিক চেহারা নেয়। ছৌ নৃত্য আসলে ছিল শারীরিক পটুত্বের পরিচয় দিয়ে সাধনায় সিদ্ধিলাভ। ছৌ নৃত্যের ‘কাপঝাপ’ এই ইঙ্গিত দেয়। ছিল চুন-কালি মেখে নাচ। ১৭৫৩ সাল নাগাদ সামন্ত রাজাদের ডাকে বর্ধমান থেকে মৃৎশিল্পীরা এসেছিলেন রাধাগোবিন্দ মন্দির ও প্রতিমা নির্মাণের কাজে। এই শিল্পীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই তৈরি হয়েছিল রঙিন মুখোশ। আর কথক ঠাকুর ও ব্রাহ্মণদের কাজ থেকে, নানা পৌরাণিক চরিত্রের মুখের নানা বৈচিত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করে নিয়েছিলেন পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি অঞ্চলের চড়িদা গ্রামের সূত্রধরেরা। প্রথমে কেঁচো মাটি বা নরম মাটির মুখ তৈরি হয়। তারপর তাতে পড়ে ছাইয়ের প্রলেপ। তারপর আঠা দিয়ে একটির পর একটি কাগজ সাঁটা হয়, রোদে শুকিয়ে পাতলা মাটির আস্তরণ চাপানো হয়। চোখ-মুখ ঠোঁটের ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাটির গোলাতে ভেজানো সুতির কাপড় সেঁটে দেওয়া। শুকিয়ে গেলে টোকা মারলে খুলে যায় নিচের মাটির মুখ। এরপর মুখোশটি গাছের পাতা দিয়ে ঘসে মসৃণ করা হয়। রং করা হয়। শেষে জরি, রাংতা, চুমকি, পুঁতি ও পালক লাগিয়ে মুখোশটির সাজ সম্পূর্ণ হয়। প্রধানত রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে ছৌ নাচে, কিন্তু কোনও লৌকিক বিষয় গুরুত্ব পায়নি। এ অঞ্চল একসময় জৈন ও বৌদ্ধধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল, কিন্তু বর্তমান ছৌ নৃত্যের ধারায় সে ইঙ্গিত মেলে না। যদিও বৌদ্ধ গান ও দোহায় বুদ্ধ নাটকের উল্লেখ আছে। তামাং সম্প্রদায় অধ্যুষিত অঞ্চলে তান্ত্রিক বা বজ্রযানী বৌদ্ধধর্মের ওপর ভিত্তি করে, বাকপা নৃত্যে ব্যবহৃত হয় নানা রঙে রাঙানো কাঠের মুখোশ। আবার বাংলার ডোম জাতি নানা পরিস্থিতিতে তুলে ধরেছিল তাদের বীর রূপ। ‘আগডুম-বাগডুম’ লোকক্রীড়ার ছড়াটিও তার সাক্ষী।

দুর্গ অর্থাৎ ছাউনিতে যে-নৃত্যচর্চা, তাই হল সৈন্য সাজে ছৌ-নৃত্য। সংলাপহীন। নদিয়ার তেহট্ট-১ ব্লকের নফরচন্দ্রপুর গ্রামের মালপাহাড়ি আদিবাসী গোষ্ঠী মাঘী পূর্ণিমার রাতে তীরধনুক পুজো উপলক্ষে এবং শিকারে যাওয়ার আগে শোলার তৈরি মুখোশ পরে নৃত্য করেন। সঙ্গে বাজে ঢোল-কাঁসি। রামায়ণে যুদ্ধ, শূকর শিকার নৃত্যের বিষয় হয়ে উঠেছে। নদিয়ার নাজিপুর ও বেতাইয়ে এই মুখোশ তৈরি হয়।

মেদিনীপুর জেলার বেলিয়াবেড়ার নোটা ও চেনাবাড়িয়া গ্রামের দলাই পদবিধারীরা কাগজ-কাপড়-কাদামাটি দিয়ে তৈরি করেন নানা ধরনের রঙিন মুখোশ। মুখোশের বিষয় পৌরাণিক চরিত্র, ভূত-প্রেত-রাক্ষস, পশু-পাখি। এ মুখোশগুলি শীতলার গান, বহুরূপী ও সংয়ের সাজে ব্যবহৃত হয়। রাধাকৃষ্ণের গীত নিয়ে কাঠি নৃত্যে আছে মুখোশের ব্যবহার। লবণ, নিমফল, তুঁতে মেশানো গরম জলে গামার কাঠ দু’-তিনদিন ভিজিয়ে রেখে তৈরি হয় এই মুখোশ। কতটা জোরে মারতে হবে, কতটা কাটতে হবে, এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হয় কাঠের মুখোশ। যাই হোক, দুর্গাপুজোর শেষ তিনদিন বিষ্ণুপুরের রঘুনাথ জিউ মন্দিরকে ঘিরে চলে রাবণকাটা নৃত্য। কুম্ভকর্ণ বধ দিয়ে শুরু। একাদশীর দিন বধ হয় ইন্দ্রজিৎ। দ্বাদশীর দিন রাবণ। বারো ফুট উঁচু মাটির মূর্তি ও দশটি কাঠের মাথা নিয়ে রাবণ। নৃত্য করে অন্য প্রান্তে থাকা বিজয়ীরা, মুখোশ এঁটে পাটের পোশাক পরে সেজে থাকা রাম-ভক্ত বৈষ্ণব। এঁরা নিম্ন বৃত্তির মানুষ। কালো জাম্বুবান, সাদা সুগ্রীব ও হনুমান। সঙ্গ থাকেন লাল বিভীষণ। পাড়ায় পাড়ায় ঘোরেন এরা। বাজে নাকাড়া, টিকারা, কাঁসি, ঝাঁঝ। বীরভূমের ধর্মরাজের ভক্তরা কাঠের চামুণ্ডা মুখোশ পরে নৃত্য করে। জয়নগরের কালীনৃত্যেও মুখোশের ব্যবহার আছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় বনবিবি পালায় বাঘের মুখোশ গুরুত্ব পায়। মেদিনীপুর-ঝাড়খণ্ড সীমান্তে মুখোশ পরা নাচকে বলে মহড়া নাচ।

পশ্চিম দিনাজপুরের চামুণ্ডাপুজোর দেবীর রূপ হল একটি মুখোশ। চৈত্র সংক্রান্তিতে ত্রিমোহিনী গ্রামে দাপট কালীর পুজোয় একটি ভগ্ন শিলাখণ্ডকে মুখোশ পরিয়ে পুজো করা হয়। আবার গাছে মুখোশ বেঁধে দক্ষিণ দিনাজপুরে শ্মশানকালীর পুজো হয়। মালদার জহুরা কালীও একটি মুখোশ। গর্ভগৃহে একটি সিঁদুরচর্চিত গোলাকার স্তূপের উপর কালিকার মুখমণ্ডল এবং দু’পাশে আরও দু’টি ছোট ছোট মুখ থাকে। চৈত্রমাসে মালদায় গম্ভীরা পুজো উৎসবের দ্বিতীয়-তৃতীয় দিনের তামাশা পর্বে শিবের বন্দনা করে হয় মুখোশ নৃত্য। অবশ্য পালাগানে মুখোশের ব্যবহার নেই। এই নৃত্যে নিমকাঠের নরসিংহী মুখোশটি বেশ বড়। দীর্ঘ নাক, বড় লাল জিভ এবং দু’টি শিং নিয়ে অদ্ভুত রূপ। কালীকাচ নৃত্য হল বেতের অর্থাৎ ‘কাচ’-এর আঘাতে বেজে ওঠা ঢাকের বোলের সঙ্গে সঙ্গে মুখোশ নৃত্য। জলপাইগুড়ির গাইযাত্রা নৃত্যেও মুখোশের ব্যবহার আছে। তেল, সিঁদুর দিয়ে পুজো করে তুলে রাখা মুখোশ ঘর থেকে বের করে এনে, তা মুখে এঁটে রাজা, মন্ত্রী, চাকর, বাঘ এরকম নানা চরিত্র নিয়ে জলপাইগুড়ির মুখাখেইল নৃত্য। দিনাজপুরে গোমিরা উৎসবের অর্থ গ্রামচণ্ডীর সম্মানে গামিরা খেলা এবং মূলত উত্তর দিনাজপুরের পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর মোখা নাচ বেশ জনপ্রিয়। গ্রামচণ্ডীর শক্তিরূপ বা চণ্ডীয়াল পালা, উড়ানকালী বা শিকনি ঢাল, বুড়ো-বুড়ি, ছোকরা-ছুকরি এবং রামায়ণের চরিত্র বেশ আকর্ষণীয়। শিমুল, ছাতিম, গামার, নিম কাঠ দিয়ে মুখোশগুলি তৈরি হয়। এগুলোকে রঙিন করে তুলতে ব্যবহৃত হয় চুন-সিঁদুর, সাদা খড়ি মাটি, হাঁড়ির কালি। সঙ্গে তেঁতুল বীজ ও বেলের আঠা। কাঠের মুখোশ ছাড়াও লাউয়ের মুখোশ, শোলার মুখোশ, এমনকী কাগজের মুখোশও ব্যবহৃত হয়। মুখোশ শিল্পীরাও কাঠের মুখোশ তৈরির পাশাপাশি বাঁশের মুখ বা মুখোশ তৈরি করে এই শিল্প মাধ্যমটিকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। জলপাইগুড়ি ও পশ্চিম দিনাজপুরে কালীপুজোর অমাবস্যা তিথিতে চোর-চুরনির গানে শোলার মুখোশ ব্যবহৃত হয়। বলা বাহুল্য, উত্তরবঙ্গে মুখোশকে বলা হয় মোখা। কথিত আছে, যিনি কাঠের মুখোশ ধারণ করেন তাঁর উপর দেবী বা জাদুশক্তি ভর করে। পূজকের কাছে নতুন কাঠের মুখোশের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা এবং শুদ্ধ চিত্তে তা ধারণ করার রীতিও আছে। এই আবেগ ও বিশ্বাস দিয়ে মুখোশগুলি সারা বছর তার গুরুত্ব অটুট রাখে। যাই হোক, দার্জিলিংয়ে দেখা যায় সিংহের মুখোশ নিয়ে তিব্বতীয় মুখোশ নৃত্য সিঙ্গিছম, মুখোশ পরে ভুটিয়াদের মহাকাল নৃত্য এবং আদিবাসীদের ডাইনি-পিশাচ নৃত্য। গুমরিমতি পালায় ব্যবহৃত হয় মেচ মুখোশ। ঝাড়গ্রামের পারভা নাচের কাঠের মুখোশগুলি বেশ বড়। কথিত আছে, চিলকিগড় রাজবাড়ির পাইকরাই একসময় এই নাচ করতেন।

দেবতার থানে ছলন দেওয়ার রীতি কিংবা টোটেম-স্মৃতির মতো মুখোশকে ঘিরে থাকা লোকাচার বিশ্বাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে অলৌকিক ভাবনা বা জাদুবিশ্বাস। মুখমণ্ডল বা মূর্তি তৈরির পাশাপাশি তৈরি হয়েছিল চামড়া, গাছের ছালে তৈরি মুখোশ এবং পরবর্তীকালে মাটি ও কাঠের মুখোশ। আবার পুজো-পার্বণের আনন্দকে নতুন মাত্রা দিতে গুরুত্ব পেল মুখোশ নৃত্য। মুখ ও মুখোশের দ্বন্দ্ব নিয়ে নৃত্যের আবেগেও নাটকীয় দ্বন্দ্ব তৈরি হল। গুরুত্ব পেল কাহিনি বা কয়েকটি মুহূর্ত। নানা চরিত্র নিয়ে সেজে উঠল মুখোশ। এই বৈচিত্রগুণে পরবর্তীকালে মুখোশ যেমন শিশুদের খেলনা হয়ে উঠেছে, তেমনই হয়েছে গৃহসজ্জার উপকরণ। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুসমুণ্ডির কাঠের মুখোশের পাশাপাশি সস্তার বাঁশের মুখোশও ইদানীং গুরুত্ব পাচ্ছে। পুরুলিয়ার চড়িদায় কাগজের মণ্ড দিয়ে তৈরি হচ্ছে ঘর সাজানোর নানা ধরনের মুখোশ। বর্তমানে নিত্য নতুন মুখোশ তৈরি হচ্ছে। মুখোশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লৌকিক আবেগ ও জাদু বিশ্বাস মুখোশের আড়ালেই লুকিয়ে পড়েছে। কারণ শিল্পী বাঁচতে চায়।

 

 

 

কৃতজ্ঞতাঃ দেশ

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত