লজ্জাটা কার, ধর্ষকের না ধর্ষিতার?

       

দিল্লির রামলীলা ময়দানে সম্প্রতি একটা সমাবেশ হয়ে গেল । এতে নানা রাজ্যের ধর্ষিতা নারী ও তাঁদের পরিবারের লোকজন ছিলেন । এছাড়া ছিলেন রাষ্ট্রসংঘের কর্তাব্যক্তি, বিশিষ্ট আইনজীবী, পুলিশের কিছু কর্তাব্যক্তি ও অভিনেত্রীরা । রাষ্ট্রের কাছে যে ৯টি দাবি এই সমাবেশ থেকে রাখা হয়েছে সেগুলি হল : ধর্ষিতার সামাজিক সম্মান ও সম্মানযোগ্য পুর্নবাসন, ধর্ষকের প্রতি ঘৃণা ও তার উপযুক্ত শাস্তি,  ধর্ষিতার সম্মানরক্ষাকারীদের পুরস্কার, যৌনকর্মী হিসেবে শিশুদের নিয়োগ বন্ধ করা, যৌননির্যাতন থেকে শিশুদের রক্ষা করার আইন কার্যকর করা, বিচারব্যবস্থার সংস্কার, ধর্ষণের ক্ষেত্রে দুই আঙুল পরীক্ষাপ্রহসন বন্ধ করা, প্রতি জেলায় বিপর্যয়কেন্দ্র স্থাপন  প্রথম দাবিটি সমাবেশের প্রধান দাবি আর সমাবেশের প্রধান মুখ হলেন ভানওয়ারি দেবী । যাঁর বয়স এখন ৬৫ বৎসর ।

এই সেই ভানওয়ারি দেবী , আজ থেকে ২৬ বছর আগে যিনি নিজেও হয়েছিলেন ধর্ষণের শিকার । এই সেই নারী, যিনি আজও তাঁর গ্রামে ব্রাত্য ।

মাত্র ৫ বৎসর বয়েসে ভানওয়ারির বিয়ে হয় ৮ বছরের মোহনলাল প্রজাপতের সঙ্গে । বিয়ের পরে তিনি আসেন ভাতেরি গ্রামে । রাজস্থানের এই গ্রাম জয়পুর থেকে ৫৫ কিমি দূরবর্তী । ১৯৮৫ সালে রাজস্থান সরকারের নারী উন্নয়ন প্রকল্পে একজন ‘সাথী’ বা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন তিনিজমিজায়গা, শিক্ষা, সাক্ষরতা এসব দেখাশোনা ছিল প্রকল্পের কাজ । নিষ্ঠার সঙ্গে সে কাজ করতেন প্রথাগত শিক্ষাহীন ভানওয়ারি দেবী । তাঁর গ্রামের কুমারনামক দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ ও উচ্চমর্ণের গুর্জররাও তাঁর পাশে ছিল । বিরোধ বাধল বাল্যবিবাহ বন্ধ করা নিয়ে । ১৯৯২ সালে গুর্জর সম্প্রদায়ের রামকরণ গুর্জর তাঁর শিশুকন্যার বিয়ের আয়োজন করায় ভানওয়ারি প্রতিবাদ করলেন । এর ফলে কুমার ও গুর্জর—উভয় সম্প্রদায় তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে বয়কট করে । গুর্জররা প্রতিশোধ নেবার পরিকল্পনা করে । ১৯৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে ভানওয়ারি ও তাঁর স্বামী যখন মাঠে কাজ করছিলেন, তখন শ্রাবণ শর্মা, বদ্রি গুর্জর, রামসুখ গুর্জর, রামকরণ গুর্জররা আক্রমণ করে । মোহনলালকে মেরে অজ্ঞান করে দেয় এবং ভানওয়ারিকে ক্রমিক ধর্ষণ করে । এই ঘটনায় গ্রামবাসীরা কেউ স্বাভাবিকভাবে সাহায্যের হাত বাড়াননি। পুলিশের কাছে জানানো হয়েছিল, সুবিচার মেলেনি। ধর্ষণকারীদের কোন শাস্তি হয় নি।

নিজের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ভানওয়ারি বুঝতে পেরেছিলেন এ দেশে ধর্ষিতাকে লজ্জা পেতে হয়, ধর্ষককে নয় । তাই তিনি ধর্ষিতার পাশে দাঁড়াতে চান, সমাজে তার সম্মান ও উপষুক্ত পুর্নবাসনের প্রচারে অংশগ্রহণ করেন ।

নারীপ্রগতির নানা দৃষ্টান্ত সত্ত্বেও দেখা যায় এ দেশে প্রতি ২ মিনিটে নারীর উপর নির্যাতন হয়, আর প্রতি ১৫ মিনিটে ধর্ষিতা হন নারী । লোকলজ্জার ভয়ে বেশির ভাগ ঘটনা জানানো হয় না পুলিশকে । নথিবদ্ধ ধর্ষণের হিসেব বছরে ৩৭ হাজার । যে দেশে নারী-পুরুষের অনুপাতে [সমাজতাত্বিকদের ভাষায় বেয়ার ব্রাঞ্চেস ফেনোমেনা] প্রবল বৈষম্য থাকে, যে দেশে অবাঞ্ছিত বলে কন্যাসন্তানকে মেরে ফেলা হয় , যে দেশে মুক্তির পথে কাঞ্চনের মতো কামিনীকে অন্তরায় বলে মনে করা হয়, সে দেশে ধর্ষণ একটা সামাজিক অপরাধ বলে গণ্য করার প্রবণতা না হওয়াই স্বাভাবিক ।

অধ্যাপিকা জ্যাকুইলিন ভাবা সঠিকভাবে বলেছেন যে ধর্ষকদের মৃত্যুদন্ড দিলেই ধর্ষণসমস্যার সমাধান হবে না ; শিশুকন্যা হত্যা, বাল্যবিবাহ, স্বল্পবয়েসে গর্ভধারণ, পারিবারিক অত্যাচার বন্ধ না করলে কাজের কাজ কিছুই হবে না ।

গবেষক মধুমিতা পান্ডে ১০০জন ধর্ষককে নিয়ে একটা সমীক্ষা করেছিলেনতিনি সমীক্ষায় দেখেছেন ১০০জনের মধ্যে মাত্র ৪জন তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনাগ্রস্ত । বাকিরা এটাকে গর্হিত বলে জানেনা অথবা ধর্ষিতার ঘাড়ে দোষ চাপায় । তার মানে নারী অগোচরে প্রলুব্ধ করে বলেই তো পুরুষ এগিয়ে যায় । ইদানিংকালে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল সেরকম একটা তত্ব খাড়া করতে চাইছেন ।

রামলীলা ময়দানের সমাবেশে একটা পোস্টারে চোখ আটকে যায় । ইংরেজিতে লেখা আছে : ‘ We are living in  Republic not in rape-public’. ভানওয়ারি দেবী তাঁর প্রচারে সে কথাতাই তুলে ধরতে চান । তিনি বলেন, ‘ কেন আমরা এসব নীরবে সহ্য করব ? আমার সারা জীবন গেল সুবিচারের জন্য লড়াই করে । এখনও মানুষের মনোভাবের আমূল পরিবর্তন হয় নি । তবে নারীরা মুখফুটে বলতে শুরু করেছে । আমি মরে যাব, কিন্তু এ লড়াই থামবে না । একদিন সমাজের, শাসনকর্তাদের হুঁশ ফিরবেই ।’

 

[লেখিকা ইউনেস্কোর ডান্স কাউন্সিলের সদস্য]

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত