বাংলাদেশের লোকধর্ম (পর্ব-৫)

সামাজিক আচার সংস্কার ও দৈনন্দিন জীবন পরিচয়
পঞ্চম অধ্যায়

ভগবানিয়া সম্প্রদায়টি যেহেতু কোন বিশেষ নৃ-গোষ্ঠী নয় তাই এদের বসতি এলাকা নিয়ে নৃ-ভৌগোলিক আলোচনা অবান্তর। আউলেচাঁদের মূল অনুসারী হিসেবে কর্তাভজা সম্প্রদায়টি বসবাস করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। বাংলাদেশে ভগবানিয়ারা বসবাস করেন- যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায়। এছাড়াও বিক্ষিপ্ত ভাবে দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতে কিছু কিছু ভগবানিয়া পরিবার বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশে ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের প্রকৃত জনসংখ্যা কত তা নির্ণয় করা কঠিন। আদমশুমারির প্রতিবেদনে ভগবানিয়ারা কেউ হিন্দু পরিচয় সনাক্ত হয়ে গেছেন, কেউ বা মুসলিম পরিচয়। তাছাড়া তারা যেহেতু কোন নির্দিষ্ট জাতি গোষ্ঠীও নন তাই আদমশুমারির প্রতিবেদন থেকে তাদের সম্পর্কে কোন পরিসংখ্যান জানাও সম্ভব নয়।

এ অবস্থায় ভগবানিয়াদের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যে সব তথ্য পাওয়া যায় তার পরিসংখ্যান নিচে দেয়া হলো-
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার তেলিখালিতে বাস করে ৭ ঘর ভগবানিয়া সম্প্রদায়, ঘুষরায় বাস করে ১২ ঘর, মাগুরাঘোনায় ৩০-৩৫ ঘর, বেতাগায় ১৫ ঘর।
সাতক্ষীরার বটিয়াঘাটার গজেন্দ্রপুর গড়িয়াডাঙ্গায় বাস করে ৮-১০ ঘর, তালার চরগ্রামে প্রায় ১০০-১২০ ঘর, কলারোয়ার রায়পুর ২০০ঘর, কলারোয়ার বোয়ালিয়া ২০০ ঘর,এছাড়া লাউতাড়া, কাশিয়াডাঙ্গা,বারই পাড়া, কুশডাঙ্গা গ্রামে প্রায় ৫০০ এর বেশি ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। যশোর জেলার ঝিকরগাছার জগদানন্দকাটি, বাউশি, মণিরামপুর সদও, তাহেরপুর, কেশবপুরের বিদ্যানন্দকাঠি গ্রামে ১০০-১৫০ পরিবার বাস করে ।

 

আইন ও রাজনীতি

কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যশোর খুলনা অঞ্চলে ভগবানিয়া পাড়াগুলোতে এক বা একাধিক গুরু দ্বারা সামাজিক সমস্যা, অপরাধ ইত্যাদি সমাধান করা হয়।
তবে বাঙালি হিসেবে তারা রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার আওতাভুক্ত। তবে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সমস্যা, সামাজিক অনুষ্ঠান তারা গুরুর নেতৃত্বে সম্পন্ন করে থাকে। দেশের জাতীয় রাজনীতিতে দু একজন চেয়ারম্যন মেম্বর র্নিবাচিত হলেও এমপি নির্বাচনে এদের অংশগ্রহন নেই। তবে মুক্তিযুদ্ধে এদের অবদান রযেছে।সাতক্ষীরার মশিউর উদ্দিন গাইন( সনদ নং-১৮৯৭৪১, গেজেট- ১০০৭) একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এছাড়া জামাল শাহও ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তবে শিক্ষিত হবার সাথে সাথে এদের বিশ্বাস ও প্রথা পালনে এসেছে পরিবর্তন। বেশিরভাগ শিক্ষিত সম্প্রদায় নিজেদের কর্তাভজা বলে পরিচয় দেন। এমন একটি পরিবার সাতক্ষীরার এডভোকেট কিনুলাল গাইনের পরিবার। তিনি নিজে জর্জ কোর্টেও উকিল , তার একভাই দুলার চন্দ্র গাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার অফিসার, ছেলে সাগর সব্যসাচী গাইন সুপ্রীম কোর্টের এডভোকেট, মেয়ে সুপ্রিয়া গাইন দীপা ইডেন কলেজের খন্ডকালিন শিক্ষক। কিনুলাল বাবুর বড় ভাই ভুট্টোলাল গাইন কলারোয়া তারাগাছি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। এই পরিবারে কর্তাভজাসম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ মনুলাল মিশ্র সম্পাদিত ভাবেরগীত ও নবোকিশোরগুপ্তের সাধূসঙ্গীতের দেখা পাই। তিনি নিজেকে নফর চন্দ্র বিশ্বাসের বংশধর বললে এটা প্রমাণ হয়ে যায় যে তিনি ও তার পরিবার ভগবানিযা ছিলেন কিন্তু তিনি কিছুতেই তা স্বীকার করেন না।বরং তিনি সবসময় সতীমায়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে নিজেকে কর্তাভজা বলে প্রমান করতে চেষ্টা করেছেন। অথচ তিনি এটা স্বীকার করেন যে – তার স্ত্রী স্বর্ণ গাইনের মা নির্জলা দেবীর দিদি মা ছিলেন নফর বিশ্বাসের বংশের পুত্রবধু। ড. নন্দী বাংলাদেশে ভগবানিয়াদেও উদ্ভব নফর বিশ্বাসের মাধ্যমে বললেও ক্ষেত্র সমীক্ষায় তার প্রমান মেলে না। বরং নফর বিশ্বাসের অনুসারীদের আচার বিশ্বাসের সাথে গুপ্ত কর্তাভজাদের মিল লক্ষ করার মতো। তবে এ বিষয় চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবার আগে ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন।

 

বিবাহ সংস্কার

একই জাতির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তার ধর্ম সংস্কৃতির দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত হয়ে যায়। ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ভগবানিয়াদের বিয়ে গুরুদেব’ বা ‘মহাশয়’ দ্বারা মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে ও বর্ণ হিন্দুর নিয়মে ঠিক হয়। তথাপিও বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রে নিজস্ব ঐতিহ্য মেয়েলী আচার অনুষ্ঠান, লৌকিক বিশ্বাস নিজেদের সামাজিক বাধা নিষেধ মানা হয়।
ছেলের পক্ষে প্রথম মেয়ে দেখতে আসে। মেয়ে দেখতে আসে সাধারণত অভিভাবকগণ। প্রথম মেয়ে দেখতে এলে তারা সাধারণত সন্দেশ বা চমচম নিয়ে আসে। বর্তমানে অন্য যে কোন মিষ্টি আনলেই চলে। গাছিয়াদের মধ্যে মামার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
মেয়ে পানের বাটা সাজিয়ে সামনে আসে। মেয়ে পছন্দ হলে বাটায় ১ টাকা দেবার নিয়ম ছিলো। এখন ১০০ টাকা বা ৫০০ টাকা দেবার চল হয়েছে। এরপর পঞ্জিকা দেখে ঠিক করা হয় আশীর্বাদের দিন। মেয়েকে আশীর্বাদ করতে হলে নাকফুল অবশ্যই লাগবে। অনুরূপভাবে মেয়ের আশীর্বাদ হয়ে গেলে অভিভাবকগণ যান ছেলেকে আশীর্বাদ করতে। ছেলেকে সাধারণত আংটি দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়।
আশীর্বাদ শেষ হলে পঞ্জিকা দেখে ঠিক করা হয় পানপত্তরের(পানপত্রের) দিন।
এইদিন ছেলে পক্ষের অভিভাবক একটি ক্ষুতবিহীন পান ও সুপারী নিয়ে আসে মেয়ের বাড়ি। মেয়ের পক্ষ থেকেও সংগ্রহ করা হয় একটি ক্ষুৎবিহীন পান ও সুপারী।
মেয়ের বাবা মায়ের গুরুর সামনে ছেলের বাবা ও মেয়ের বাবা গলায় কাপড় দিয়ে হাত জোড় করে দাঁড়ায়। দু’জনের হাতে দুটি পান ও সুপারী।
গুরু জানতে চানÑছেলের বাবার কাছেÑ
গুরু : তুমি এখানে কেন দাঁড়িয়েছ?
ছেলের বাবা : আমি আমার ছেলের জন্য অমুকের মেয়ের বিয়ে দিতে চাই তার জন্য আপনার সামনে দাঁড়িয়েছি।
গুরু : কথা সত্য?
ছেলের বাবা : হ্যাঁ, সত্য।
গুরু : কথা সত্য?
ছেলের বাবা : হ্যাঁ, সত্য।
গুরু : কথা সত্য?
ছেলের বাবা : হ্যাঁ সত্য।
এভাবে মেয়ের বাবার কাছে গুরু জানতে চান এবং তিন সত্যকরেন।। উভয়ে তিন সত্যি স্বীকার করলে ছেলের বাবা মেয়ের বাবার হাতে পানটি দেন এবং মেয়ের বাবা ছেলের বাবার হাত থেকে পানটি নিয়ে তার পানটি ছেলের বাবাকে দেন। এভাবে তিনবার পান অদল বদল শেষে ছেলের বাবা পানটি নিয়ে তার গুরু দেবের কাছে পৌঁছে দেন এবং মেয়ের বাবা পানটি তার গুরু দেবকে দেন।
পানপত্তরের অনুষ্ঠান এভাবেই শেষ হয়। এরপর পঞ্জিকা দেখে ঠিক করা হয় গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান তিন দিন ধরে চলে। গায়ে হলুদের অনুুষ্ঠানের মধ্যেই হয় ক্ষির খাওয়ানো অনুষ্ঠান।
মেয়ের গায় হলুদ যেদিন হয় তার আগের দিন হয় ছেলের গায়ে গলুদ।
ছেলের গায়ের হলুদের তত্ত¡ এসে মেয়ের বাড়ি পৌঁছলে তবে শুরু হয় মেয়ের বাড়ির অনুষ্ঠান।
গায়ে হলুদে শুধু মাত্র কাচা হলুদ ও সরিষার তেল লাগে। হলুদ অনুষ্ঠানে বর বা কনের সামনে একটি ডালায় সাজানো থাকে দুর্ব্বা, ধান ও তেলের প্রদীপ।
মা এসে কনে বা বরের মাথায় তেল ও হলুদ দেয়ার পর যে কেউ হলুদ দিতে পারে। এসময় আতপ চালের ক্ষীর রান্না করে তা বর বা কনেকে খাওয়ানো হয় এবং আশীর্বাদ স্বরূপ ডালায় রাখা ধান, দুর্বা কপালে ছুঁয়ে দেয়া হয়। প্রদীপের আচও দেয়া হয় মাথায়।
গায় হলুদ ও ক্ষীর খাওয়ানো অনুষ্ঠান শেষ হলে শুরু হয়ে যায় বিয়ের প্রধান অনুষ্ঠান। বিয়ের দিনও ধার্য করা হয় পঞ্জিকা দেখে। বিয়ের ক্ষেত্রে ভাদ্র পৌষ ও চৈত্রমাসকে বর্জন করা হয়।
বিয়ের জন্য কলাগাছ দিয়ে ঘেরা যে মঞ্চ তৈরি করা হয় সেই কলাগাছ কাটতে যান ভগ্নিপতিরা। অর্থাৎ কনের দুলাভাই। কলাগাছ কাটা ও তা দিয়ে ছাদনা তলা তৈরি করার সব কাজই করবেন বোনের স্বামী। কলাগাছ কাটতে যাবার আগে প্রতিটি বোন জামাইকে শ্বাশুড়ি একটি করে নতুন গামছা দেবে যা কোমরে বেধে তারা কলাগাছ কাটতে যাবে।
উঠোনের একপাশে চার কোণায় চারটি কলাগাছ রোপন করার পর লাল তাগি দিয়ে উপড়ে আড়াইপ্যাচ ঘিরে দেবে। ভিতরে থাকবে দুটো পিঁড়ি। মাঝখানে কড়ি খেলার পুকুর।
বর আসবে ধূতি পাঞ্জাবী পড়ে। বরের সাথে থাকবে তার দুলাভাই। সে তাকে সারাক্ষণ ধরে থাকবে। এই দুলাভাইকে বলা হয় কোলগাবুইরগা। গায়ে হলুদ পর্ব শেষ হবার পর স্নান সেরে বিয়ের জামা পরিহিত হবার পর এই কোলগাবুইরগা তাকে এক সেকেন্ডের জন্য ছেড়ে দিতে পারবে না। যতক্ষণ না বিয়ে হয়। কোলগাবুইরগা যে কেউ-ই হতে পারে তবে সাধারণত দুলাভাইকেই এ দায়িত্ব দেয়া হয়। বর যে ড্রেস পরবে কোলগাবুইরগাও একইরকম কাপড় পরে থাকে।
বর এলেÑকনের বাড়িতে ভাজা খই বরযাত্রীদের উপর ছড়িয়ে দেয়া হয়। বরকে নিয়ে বসানো হয় আলাদা বর আসনে। এসময় বরের মাথায় টোপর থাকে।
লগন এলেÑবরকে মেয়ের ভগ্নিপতি নিয়ে যায় আগে থেকে তৈরি করা মঞ্চে। ছাদনা তলায় নয়। সেখানে পিঁড়ি থাকে তার একটিতে দাঁড়ায় বর। এসময় লাল বেনারসী আর টোপর মাথায় কনে আসে। তার হাতে একটি পিতলের ছোট ঘটে পানি থাকে। সে বরের চার দিকে একবার ঘুরে এসে বরের পায়ে পানি ঢালে। এভাবে সাতবার বরকে প্রদক্ষিণ করে সাতবার বরের পায়ে পানি ঢেলেÑসাত পাক সম্পন্ন হয়। এবার বরকে বরের ভগ্নিপতি এবং কনেকে কনের ভগ্নিপতি কোলে করে নিয়ে যায় ঘরে। এখানে গুরু দু’জনকে মন্ত্র দেন। গুরু একটি লাল রুমাল কনের শাড়ির আঁচলে বেধে দেন। যা ফের বাপের বাড়িতে ঝি জামাই আসার আগে তা খুলতে পারবে না তারা।
গুরু দু’জনকে গুরু মন্ত্র দেবার পর সিঁদুর কৌটা বরের সামনে তুলে ধরলে বর তর্জনী দিয়ে সিঁদুর ছুয়ে দিলে গুরু সেই তর্জনী ধরে কনের সিঁথিতে লাগিয়ে দেন। এসময় কোন উলু হয় না, শাঁখও বাজে না,বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। এবার কোলগাবুইরগার কাজ শেষ। যে দিন বিয়ে হয় সেদিন ফুল শয্যা নিষিদ্ধ। সকাল বেলায় ছাদনা তলায় দুজনকে স্নান করতে হয় এবং কনে চারটি কড়ি নিয়ে বর ও কনে তিনবার কড়ি খেলে। কড়ি খেলা পর্ব শেষ হলেÑবৌ নিয়ে বর বিদায় নেয়।
বরের বাড়ি পৌঁছলেÑবৌভাতের অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠান শুরুর আগে ছেলের গুরু পরমান্ন বর কনেকে বিতরণ করেন। এরপর কনে খাবারের অনুষ্ঠানে গুরুর পাতে প্রথম খাবার তুলে দেয়, আর সে সাথে অবশ্যই তিনজন অভাবী লোকের পাতে খাবার দিতে হয়। এভাবে বৌভাত পর্ব শেষ হয়। কিন্তু ঐদিন রাতেও তারা একত্রে থাকতে পারেন না। তাদের ফুলশয্যা হয় মূলত ৩য় দিন রাতে।
বৌ ভাতের পর কনে বরকে নিয়ে বাবার বাড়ি আসে। এটি ৩দিন, ৫ দিন বা সাত দিনও হতে পারে। বাবার বাড়ি এলেÑ মা কনের আঁচল থেকে রুমাল খানা খুলে দেয়। ঝি জামাই এলে পারিবারিক ভাবেই তাদের আপ্যায়ন করা হয়Ñতারা দু’চারদিন বেড়ায়।
এভাবেই সম্পন্ন হয় ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের বিয়ে। ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের বিবাহ সংস্কার পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যেÑনৃতাত্তি¡ক বিচারে এরা অস্ট্রিক গোষ্ঠীর লোক। এদের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে চাল, দুর্বা, কলাগাছ, সুপারী, পান, সিঁদুর এবং স্বামীর পায়ে জল ঢালার রীতিও আদিবাসী অস্ট্রিক গোত্র থেকেই এসেছে। বিয়েতে অগ্নিসাক্ষীর কারবার আর্যসংস্কৃতির অন্তর্গত ভগবানিয়া যাগ-যজ্ঞে বিশ্বাস নয় তাই অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ের পরিবর্তে তারা শিবের পায়ে জল ঢেলে সাতপাক সম্পন্ন করে। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উলুধ্বনি দেয়া যদিও বাঙালি সংস্কৃতির নিজস্ব অবদানÑভগবানিয়ারা তা করে না। সম্ভবত ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত হবার কারণেই এটি বর্জন করা হয়েছে। এছাড়াÑ ভগবানিয়া সম্প্রদায় বরের সাথে যে কোলগাবুইরা দেখা যায় তা আদিবাসী সমাজের কন্যা ছিনতাইয়ের প্রতীক।একারণে যতক্ষণ না বিয়ে হচ্ছে ততক্ষণ কোলবুইড়গার দায়িত্ব হচ্ছে বরকে পাহারা দেওয়া।

জন্মাচার 

ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের নারী বিয়ের পর প্রথম গর্ভবতী হয়ে সাতমাসে পদার্পণ করলে,শুভদিন দেখে তাকে সাধ খাওয়ানো হয়। এ অনুষ্ঠানকে তারা সাতসা বলে। এদিন বর-কনে উভয়কেই নতুন বস্ত্র দেয়া হয়। গুরু এসে পরমান্ন করে গর্ভবতী মা এবং বরকে খাওয়ান। এরপর পাড়া প্রতিবেশি, আত্মীয়স্বজন।তাদের আশীর্বাদ করেন। গুরুকে এসময় নতুনবস্ত্র, গামছা, ধুতি, গেঞ্জি ও একটি টাকা দেয়া হয়। এ অনুষ্ঠানটি কনের বাবার বাড়িতে হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে স্বামীর বাড়িতেও এ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।
ভগবানিয়াদের সমাজে দাইমা বা অভিজ্ঞ বৃদ্ধারা সন্তান ডেলিভারী করান। সন্তান ভুমিষ্ট হবার পর ছয় দিন ছয়রাত পর্যন্ত আশৌচ পালন করা হয়। এসময় কেউ তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। শিশু ও মাকে স্পর্শ করলে তাকে স্নান করতে হবে। দিনে দুইবার প্রসূতি মাকে খাবার দেয়া হয়। এসময় শোল মাছের ঝোল, পেয়াজ ও লংকা ভেজে তাকে খেতে দেয়া হয়। নবজাতকের ঘরে এসময় সারাক্ষণ একটি মাটির মাত্রে আগুন জ্বলতে থাকে।
২১ দিনের দিন নাপিত ডেকে শিশুর চুল ও নখ কেটে দেওয়া হয়। এই একুশদিন মা-রান্না করতে পারেন না। রান্না ঘরে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
শিশুর বয়স ৫ মাস হলে তাকে অন্নপ্রাসন করা হয়। গুরু দিন ধার্য করে পরমান্ন রান্না করে গুরু নিজে বাচ্চার মুখে পরমান্ন দেন। এসময় বাচ্চাকে নতুন কাপড় দেয়া হয়। গুরু তার কোমড়ে তাগি বেধে দেন।

 

মৃত্যু-আচার

ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের কোন লোক মারা গেলে ৫টি/৭টি বড়ই পাতা দিয়ে পানি গরম করে তাকে সাবান দিয়ে গোসল করানো হয়। গোসল শেষ হলে পাঁচ টুকরা সাদা কাপড়ে আতর ও গোলাপ জল ছিটিয়ে কাফন পরানো হয়।
লাশ খাটিয়ায় তোলা হলে লাশের পায়ের দিকে সকলে দাঁড়াবে এবং গুরু মাথার কাছে দাঁড়িয়ে লাশের কানে গুরুমন্ত্র তিনবার বলবে। গুরু প্রার্থনা শেষ হলে গুরুর নির্দেশে লাশ কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় কোন ধ্বনি দেয়া হয় না। লাশ কবরে নিয়ে যাবার আগ পর্যন্ত যে কেউ তাকে দেখতে বা ছুঁতে পারবে। মহিলাদের দেখা-বা ছোঁয়ার কোনো দোষ নেই তবে মাহিলারা লাশ কাধে নিতে পারবে না বা কবর স্থানে যেতে পারবে না।
লাশ কবরে নামানোর পর লাশের মুখ তিনবার মালিক বা ঈশ্বরকে দেখাতে হয়। এরপর লাশের মুখ খানিকটা পশ্চিম দিকে কাৎ করে দেয়া হয়। কবরে ওপরে বাঁশের মাচান দেয়া হয় তার উপর মাদুর দিয়ে মাটি দেয়া হয়।
কবর খোঁড়ার সময় যে মারা গেছে তার বড় ছেলে আগে মাটিতে কোদালের কোপ দেবে। ছেলে না থাকলে মেয়েরাও মাটিতে প্রথম কোপ দিতে পারবে। ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের চারদিনে চারামি, ৯ দিনে দশার কাজ, ১৯ দিনে বিশার কাজ এবং ৩৯ দিনে চল্লিশা করে থাকে।
চারামির দিন পরিবারে অশৌচ দূর করার জন্য বাড়িঘর দোর পরিষ্কার করা হয়। এ সময় মৃতব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র ফেলে দেয়া হয়। সন্ধ্যায় গুরুত এসে পদালাপ করেন এবং পদের গান হয়।
দশার দিনে-শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীর উপস্থিতিতে পদের গীত গাওয়া হয় এবং খাবারের আয়োজন করা হয়।
১৯তম দিনে ‘বিশার কাজ’ অনুষ্ঠান করা হয়। এই দিনে মৃত ব্যক্তির পাপমুক্তির জন্য প্রার্থনা করা হয়। এদিন গুরুকে মোট দিতে হয়।
৩৯ দিনে চল্লিশার কাজ হয়। এই দিন দাড়ি ফেলে স্নান সেরে চল্লিশার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে।প্রতিবেশি ও আত্মীয় স্বজনদের খাবারের আয়োজন করে।
এই চল্লিশ দিন পর্যন্ত ছেলেরা ৪০ দিন জুতা, তেল ব্যবহার করতে পারে না। পিঁড়িতে বসতে পারবে না, তবে কুশ দিয়ে তৈরি আসনে বসতে পারবে। একবার রান্না করা খাবার খাবে। এই খাবার অন্যরা রান্না করে দিতে পারবেন না। এই রান্না করা খাবার পাতে একবারে ঢাললে যতটুকু পড়বে ততটুকুই তার খেতে হবে। পুনরায় ঝাকি দিয়ে বা চামচ দিয়ে তুলে নিতে পারবে না।
চল্লিশা দিনের দিন অনুষ্ঠান শেষে গুরুকে নতুন বস্ত্র, মাদুর, খড়ম, পিঁড়ি, বালিশ, কাঁথা, বিছানার কাথা, হুকো কলকি ও গামছা দিতে হবে।
এই চল্লিশা না-হওয়া পর্যন্ত মৃতকে যেখানে স্নান করানো হয়েছে সেখানে ছেলে তার ধুতির খুটে বাধা চাল পানিতে ভিজিয়ে জল ঢেলে দেবে। ছেলের বৌয়েরা উক্ত স্থানে প্রদীপ জ্বালবে এবং একটি গ্লাসে চাল ভিজিয়ে জল ঢালবে। চল্লিশার অনুষ্ঠান হয়ে যাবার পর তারা পুনরায় স্বাভাবিক কাজ কর্ম করতে পারবে।

 

দৈনন্দিন জীবন পরিচয়:

যে কোন জাতির ক্ষেত্রেই তার রাজনৈতিক ভ‚মিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হয় যে ভগবানিয়া সম্প্রদায়টি কোন জাতিতাত্তি¡ক সম্প্রদায় নয়। এটি একটি উপধর্ম সম্প্রদায়তো বটেই এটি লোক ধর্ম সম্প্রদায়ও। ফলে এ ধর্মকে বা ধর্ম দর্শনকে কেন্দ্র করে এখানে এসে সম্মিলিত হয়েছে নানা জাতের মানুষ হড়ি, ডোম, বাগচি বাউরী, নমশুদ্র, নাপিত, ব্রাহ্মণসহ হিন্দু মুসলমান প্রভৃতি। ফলে এই লোকধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের সংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সর্বত্র এক হয় না হবার কথাও নয়।
ফলে Antohroplogcal Ditionary তে ট্রাইবের সংজ্ঞায় যে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বা ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে সে রকম রাজনৈতিক ব্যবস্থার সন্ধান এই গোত্রের মানুষের মধ্যে চালু নেই। কিন্তু তা হলেও,বিভিন্ন ধরণের সামাজিক সমস্যা, সামাজিক অনুষ্ঠান সমূহ সম্প্রদায়ের গুরু বা মহাশয়ের নেতৃত্বের সম্পন্ন হয়। প্রতিটি গ্রামে একজন করে গুরু বা মহাশয় দায়িত্বে থাকেন যিনি রাষ্ট্রীয় আইন বহির্ভূত কোন কার্য-কলাপের মীমাংসা করেন। বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এই সম্প্রাদয়ের চেয়ারম্যান ও মেম্বর নির্বাচিত হতে দেখা যায়। অনেকেই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে উকিল ও কলেজ শিক্ষক বা সরকারী কোন বড় কর্মকর্তা হয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে থাকেন। 

চির নিরীহ এই লোকধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষেরা কোন দাবিতে আন্দোলন করার পক্ষপাতী নন। তারা মালিকের উপর ভরসা ও গুরুর দেখান শান্তির পথেই অগ্রসর হন ফলে, এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বা সাড়ে তিনশ বছরের ইতিহাসে এই লোকধর্ম সম্প্রদায়ের উপর কোন নির্যাতন বা সংহিস ঘটনা ঘটে নি।
তবে ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধে এই লোকধর্ম সম্প্রদায়ের অনেকেই নিজের জীবন বাজী রেখে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ করেছিলো।

 

টোটকা চিকিৎসা ব্যবস্থা 

চিকিৎসাবিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের দিনেও ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা ধর্মীয় এবং আদি ধ্যানধারণার প্রতি তাদের বিশ্বাস অটুট রেখেছে। মারাত্মক কোন রোগ ব্যাধি হলেও তারা আধুনিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না। ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী তারা এর চিকিৎসা করে থাকেন। গুরুদেবমন্ত্র পড়ে তারা রোগীর গায়ে ফু দেয়; কিংবা গুরুদেবের আশীর্বাদের পানি খেয়ে তারা সুস্থ হয়ে ওঠে। এছাড়া এক নিঃশ্বাসে বাইশ ফকিরের নাম বলে তিনবার অসুস্থ রোগীর গায়ে ফু দিলে রোগ সেরে যায় বলে তারা বিশ্বাস করে।
কর্তভজা সম্প্রদায়ের লোকেরা ডালিম তলার মাটি, হিমসাগরের পানিকে রোগ উপশমের প্রধান উপকরণ মনে করে।

ভগবানিয়ারাও জগদানন্দকাঠির হিমসাগরের পানি বা শিবরাম মোহন্তে ভিটার মাটি কিংবা আউলে চাঁদ মহাপ্রভুর কাথার সমাধিতে মানত করে থাকে।
কেউ অসুস্থ হয়ে কোন ওষুধ খেলে আগে তাকে ৩ মাস এক ঘরে হয়ে থাকতে হত। অর্থাৎ ৩ মাস সে সমাজচ্যুত হয়ে থাকত। এরপর প্রায়শ্চিত করে তাকে গুরুর কাছে মোট নিয়ে যেতে হত। গুরূ পরমান্ন রান্না করে তাকে দিলে তবেই সে সমাজে উঠতে পারত। বর্তমানে এ আইন শিথিল হয়েছে। এখন কেউ অসুখ বিসুখ হলে ওষুধ সেবন করলে তাকে মাত্র সাতদিন সমাজচ্যুত থাকতে হয়।
সামাজিক কোন কাজে সে অংশ নিতে পারে না। তবে রোগ নিরাময়ের জন্য তারা বিভিন্ন গাছ-গাছড়ার ব্যবহার করতে পারবে।

# শরীরের কোন অংশ কেটে গেলে, লংকাবেড়ি বা গাঁদ্দা ফুলে পাতা থেতো করে লাগালে রক্তপড়া বন্ধ হয়।
# বুচপাতা চিবিয়ে ক্ষতস্থানে লাগালে কাটা অংশ জুড়ে যায়।
# বরই গাছের পাতা ও সজনেফুল বেটে বড়ি তৈরি করে নিয়মিত খেলে গ্যাস্টিক সেরে যায়।
# বুচগাছের শিকড় ও পাতা বেটে আধা তোলা রস আধা তোলা সরিষার তেলে মিশিয়ে খেলে গ্যাস্টিক ভালো হয়।
# পেটের ব্যথায় সরিষা, আতপচাল ও লবণ মিশিয়ে একসঙ্গে চিবিয়ে খেলে ব্যথা সেরে যায়।
# পাথরকুচির পাতা লবণ দিয়ে বেটে পেটের চারপাশে লাগালে পেট ব্যথা ভালো হয়ে যায়।
# ভাতের মাড় বা চিড়া ভিজিয়ে লেবুপাতা চটকিয়ে রোগীকে খাওয়ালে পাতলা পায়খানা ভালো হয়।
# তুলসীগাছের শিকড় বেটে রস করে খাওয়ালে ঘনঘন পায়খানা বন্ধ হয়ে যায়।
# আখের চিনির সাথে কুমুরকি লতার ডগা ৩/৪টি করে কয়েকদিন খালি পেটে খেলে ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া বন্ধ হয়।
# আটছটি পাতার রস নিয়মিত খেলে জলবসন্ত ভালো হয়।
# তেলাকুচার পাতা বেটে রস করে খেলে মাথা ব্যথা ভালো হয়।
# আধকপালি মাথা ব্যথা বুড়িপান পাতারস সূর্য ওঠার আগে কয়েক ফোঁটা দিলে মাথা ব্যথা সেরে যায়।
# স্মরণশক্তি কমে গেলে কুমুরকি লতার ডগা খালি পেটে কয়েকদিন খেলে স্মৃতিশক্তি বাড়ে।
# বাসক পাতার রস তুলসীর রস গোলমরিচের গুড়া, মধু ও সোরা মিশিয়ে খাওয়ালে হাপানি সারে।
# দুর্বাঘাস চিবিয়ে সদ্যকাটা স্থানে প্রলেপ দিলে রক্ত পড়া বন্ধ হয় ও ঘা শুকিয়ে যায়।
# ধুতুরার রস বাতআক্রান্ত স্থানে ঘষলে বাত সেরে যায় অথবা স্বল্প আলোয় (ডিম লাইটে) যৌনমিলন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। মহিলাদের গর্ভবতী হওয়ার প্রথম তিন মাস ও সন্তান প্রসবের পরবর্তী তিন মাস যৌনমিলন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।

 

খাদ্যাভ্যাস 

মাংসা খাওয়া তাদের ধর্মমত অনুসারে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সে কারণে মাংস খাওযা তো দূরের কথা, প্রাণীর শরীরের উপাদান থেকে তৈরি জিনিসপত্র যেমন-চামড়ার জুতা, বেল্ট ও ব্যাগ পর্যন্ত তারা ব্যবহার করেন না। তাদের ধারণা, চামড়ার জিনিস ব্যবহার করলে তারা রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।টিউবওয়েলের সিটবল চামড়া দিয়ে তৈরি হওয়ার কারণে দীর্ঘকাল তারা টিউবওয়েলের পানি খেতেন না। পরবর্তী সময়ে প্লাস্টিকের সিটবল তৈরি হওয়ার পর টিউবওয়েলের পানি খাওয়া শুরু করেন।

এই ধর্মমত অনুসারে মাংস ছাড়াও শোল মাছ, বোয়াল মাছ, গজার মাছ ও মসুরির ডাল খাওয়া নিষিদ্ধ। একসময় তারা পেঁয়াজ, রসুন খেত না। কিন্তু বর্তমানে গুরুদেবের সম্মতিক্রমে পেঁয়াজ, রসুন খেয়ে থাকে। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার দিন তারা নিরামিষ খাবার খেয়ে থাকে এবং এই সময় তাদের খাবার হচ্ছে রুটি ও ফল। তারা কখনো জুতা পায়ে রান্নাঘরে প্রবেশ ও খাবার পরিবেশন করে না। গুরুদেবদের না খাওয়ায়ে তারা কোনো ঋতুভিত্তিক ফল খায় না। বিধবাদের আমিষযুক্ত খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ মারা গেলে পরিবারের লোকেরা তিন দিন মাছ খায় না।
ভগবানিয়া অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়িতে কোনো খাবার খায় না অসুস্থ হওয়ার ভয়ে। তাদের পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের জন্য পৃথক থালা, বাটি, গ্লাস ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র থাকে। যদি কোনো অনুষ্ঠানে ৫০০ লোক উপস্থিত থাকে তাহলে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য।

এই ধর্মের অনুসারীদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের প্রায় সর্বক্ষেত্রেই বিভিন্ন ধরনের নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়, যেগুলো আবার স্বাস্থ্য পরিচর্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই সম্প্রদায়ের লোকেরা উত্তর দিক সম্মুখ (রাজপুতা) করে ঘর তৈরি করে, যাতে সহজে আলো বাতাস চলাচল করে। দক্ষিণ দিকে থাকে রান্নাঘর। দুর্গন্ধ থেকে মুক্ত থাকার জন্য পূর্ব অথবা পশ্চিম দিকে গোয়ালঘর তৈরি করা হয়। গুরুদেব প্রতিটি ঘর তৈরির কাজ উদ্বোধন করে থাকেন এবং বিশেষ প্রার্থনা করেন।
ইট পাথরের পরিবর্তে মাটির তৈরি বাড়ি তাদের বেশ পছন্দ। জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য বাড়ির চারপাশে রোপণ করা হয় নিমগাছ। বাড়ির সামনে থাকে তুলসীগাছ। সপ্তাহে অন্তত দু-তিন দিন গোবর দিয়ে উঠান লেপন করা হয়। সন্তান বড় হলে মূল ঘরের পাশে বারান্দা তৈরি করে আলাদাভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। আর্থিকভাবে সেটা সম্ভব না হলে মূল ঘরের ভেতর পৃথক শয্যার ব্যবস্থা করা হয়।

 

সামাজিক উৎসব 

কর্তাভজা সম্প্রদায়ের মতো ভগবানিযারা ও অউলেচাঁদকে সম্মান সমীহ করে। তারাও তাঁকে অবতার হিসেবে মান্য করে। আর তাই আউলেচাঁদের সাথে সম্পর্কিত ¯থান ও তিথিকে বাংলাদেশের ভগবানিয়াগণ শ্রদ্ধার সাথে মেনে চলে। তাই কর্তাভজাদেও মতো ঘোষপাড়ার সকল উৎসবে তারা একাত্মতা ঘোষনা করে পূণ্য সঞ্চয় করে। এখানকার সতীমার মেলায় যাওয়া তাই যেন তীর্থ ভ্রমণের মতো ব্যাপার তাদের কাছে। তবে বাংলাদেশে শিবরাম মোহন্ত নিত্য ধামেও রয়েছে ঘোষপাড়ার প্রতিচ্ছবি। এটি শিবরাম ঠাকুরের জন্মস্থান। এখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভক্তরা এসে মানথ করে। রোগ-ব্যাধি ও মনস্কামনা পূরণ হলেই তারা মানথ দিয়ে যায়। ভগবানিয়ারা এই স্থানটিকে মহাপবিত্র সিদ্ধিপিঠ বলে। এখানেও রয়েছে ঘোষপাড়ার মত হিমসাগর নামের একটি পুকুর। এ পুকুরের জলকেও ভক্তরা পবিত্র মনে করে।তারা বিশ্বাস করে হিমসাগরে স্নান করলে দন্ডী কাটে। এখানে কার্তিক মাসের পূর্ণিমাতে দোল উৎসবে ঠাকুরের অনুষ্ঠান হত কেননা ফকির আউলেচাঁদ ঠাকুর তার ভক্ত শিবরামের বাড়ি এসেছিলেন ১১৭৬ এর ১৬ কার্তিক । তিনি ঘোষ পাড়া থেকে শেষ যাত্রা করে এখানে আসেন কার্তিকের পূর্ণিমায় এবং সেদিন ছিলো শুক্রবার। তাই তখন থেকে ভক্তরা ফকির ঠাকুরকে স্মরণ করে কার্তিকের পূর্নিমায় দোল উৎসব উদযাপন করতেন। কিন্তু ১১৭৮ সালে ৩ ভাদ্র শিবরাম ঠাকুর স্বপরিবারে অলৌকিক ভাবে অন্তর্ধান করেন।ফলে ভক্তদের বিশ্বাস শিবরাম ঠাকুর সুক্ষদেহ ধারন করে এখানেই নিত্য অবস্থান করছেন।তাই বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনের উৎসব বন্ধ হয়ে যায় এবং তার বদলে প্রতি মাসে এখানে বৈঠক বসে।কিছু কাল পরে আবার মাসিক পর্ব পালনের পাশাপাশি কার্তিক মাসের দোল বা বড় উৎসব চালু হয়।
এছাড়া বরাতিরা তাদের মোহন্ত বা গুরুর বাড়িতে সারা বছর নিত্যপ্রার্থনা, সাপ্তাহিক বৈঠক ও কার্তিক পূর্ণিমার দোল উৎসব উদযাপন করতে পারেন।বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য ঠাকুর বাড়ির উৎসব সম্পর্কে ধারণা দেয়া হল।

# কেচুয়াডুবি ঠাকুর বাড়ি: মাগুরা জেলার, ভাবনহাটির কেচুযাডুবির প্রদীপ অধিকারী হলেন একজন মোহন্ত বা গুরু। এখানে শুক্রবার বৈঠক হয় এবং প্রতিবছর মাঘী পূর্ণিমাতে ধর্মীয় উৎসব হয়।

# মণিরামপুর ঠাকুর বাড়ি: যশোর জেলার মনিরামরপুর সদর থানার ভগবানিয়া পাড়ায় বিজয় সরদার মোহন্তের বাড়ি নিত্য সেবা, সাপ্তাহিক বৈঠক ও প্রতি মাসে ভক্ত সমাবেশ হয়। প্রতি বছর চৈত্র মাসের পূর্ণিমায় বিশেষ উৎসব হয়।

# চরগ্রাম ঠাকুর বাড়ি: সাতক্ষীরার তালা উপজেলার চরগ্রামের সন্তোস খার বাড়ি প্রতিদিন সেবা হয়, প্রতি শুক্রবার সাপ্তাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া প্রতিবছর শেষ চৈত্র থেকে ১ বৈশাখ ধরে তিনদিন ব্যাপি বড় উৎসব হয়।

# কুশডাঙ্গা ঠাকুর বাড়ি: সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উজেলার কুশডাঙ্গা গ্রামের ছবেদ আলী মোল্লার বাড়ি প্রতিদিন ধর্মানুষ্ঠান হয়। এছাড়া শুক্রবার সাপ্তাহিক বৈঠক ও মাসিক সমাগম হয়। চৈত্র মাসে ঠাকুর নির্দেশিত যে কোন দিনে বাৎসরিক উৎসব উদযাপন করা হয়।

# খড়িঞ্চা ঠাকুর বাড়ি: যশোরের চৌগাছা উপজেলার খরিঞ্চা গ্রামের গোবিন্দ অধিকারী মহন্ত।প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে সেখানে নিত্য কর্ম অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া শেষ জৈষ্ঠ্য ও রাস পূর্ণিমাতে এখানে বড় উৎসব হয়। এখানে সতীমায়ের পাগলা চাঁদ নামের এক ভক্তের সমাধী আছে সেখানে তার ভক্তরা তার সমাধি ঘরে প্রতিদিন নিত্য কর্ম করে।

# যাওয়াখালি ঠাকুর বাড়ি: সাতক্ষীরার শ্যামনগরের যাওয়াখালি বিমলকৃষ্ণ গাইনের বাড়ি নিত্য কর্ম ও প্রতি শুক্রবার বিশেষ প্রার্থনা হয়। এছাড়া ৯ ফালগুন বাৎসরিক উৎসব হয়।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত